একালের শিক্ষা (সপ্তম বা অন্তিম পর্ব)

Author
প্রতীম দে

মেধার দিক দিয়ে যাদবপুর এগিয়ে। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে, খরচ করতে হবে দেশের মানব সম্পদকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে।  বলে রাখা ভালো চিনে শুধু সরকারি অনুদান নয়, বেসরকারি গবেষণার জন্যও নানা সুবিধা তৈরি করা হয়েছে। যার ফলে উদ্ভাবনী ক্ষেত্র দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিন কখনও বলেনি বেসরকারি ক্ষেত্রে প্রবেশ করায় তারা হাত তুলে নেবে শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে।

The Flaws of Modern Education
সপ্তম বা অন্তিম পর্ব


লড়াই বিকল্পের সন্ধানে
রাজ্যে ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর চালু হয়েছিল অবৈতনিক শিক্ষা। সরকারি স্কুল গুলোয় কম পয়সায় লেখা পড়া করার সুযোগ পেতেন ছাত্র ছাত্রীরা। একটা সময় সরকারি স্কুলেই ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা ছিল সব থেকে বেশি। এখন বন্ধ হচ্ছে সরকারি স্কুল। গবেষণার ক্ষেত্রেও কমছে বরাদ্দ।

গবেষণার সুযোগ কমছে
গত কয়েক বছরে গবেষণা খাতে ভারতের বাজেট বরাদ্দ ধীরে ধীরে বেড়েছে। যা বেড়েছে তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সামান্য। কিন্তু গত দু’দশকে এদেশে গবেষণা খাতে বরাদ্দ কখনওই জিডিপি-এর ১% পার করেনি। সেখানে পাশের দেশ চিনের মোট উৎপাদনের ২-৩% গবেষণায় ব্যয় করে। 
উল্লেখ্য ২০২৪ সালের বাজেটে পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী গবেষণা ফেলোশিপ প্রকল্প সম্প্রসারণের ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যার ফলে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার নতুন ফেলোশিপ দেওয়া হবে। কত দেওয়া হয়েছে এক বছরে তা এখনও পরিষ্কার হয়নি।
তবে প্রশ্ন থেকে যায় এই প্রকল্পের সুযোগ শুধুমাত্র আইআইটি, আইআইএসসি বা কয়েকটি প্রিমিয়ার প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণার সুযোগ সমান ভাবে সুযোগ পাবে?
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লেখা পড়ায় ভালো ছেলে মেয়েরা বিদেশে চলে যাচ্ছে সেখানে গিয়ে তারা গবেষণা করছেন। কেন? এই ‘ব্রেন ড্রেন’ আটকানোর জন্য কি সরকার কোন পদক্ষেপ নিয়েছে? না।
আমাদের জানা আছে ইউজিসির চক্করে গবেষকরা ঠিক ভাবে তাদের টাকা পাচ্ছেন না। টাকা আটকে থাকছে। একজন গবেষক বা একজন পড়ুয়া কি শুধুমাত্র টাকার জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছে এমনটা বলা উচিত? কখনও নয়। কারণ এই দেশের এবং আমাদের রাজ্যের বহু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহু গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়েছে অতীতে যা বিশ্বে সমাদ্রি হয়েছে। তাহলে এখন কেন হচ্ছে না সেই সব কাজ সেটা অনুসন্ধান করাটা সব থেকে বেশি প্রয়োজন।  
শিক্ষা বিদদের একটা বড় অংশ মনে করেন গবেষণার উন্নততর সুবিধা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, নতুন প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা এই সব কিছু গুরুত্বপূর্ণ একটা গবেষণার জন্য। আমাদের দেশে এই সব সুযোগ গুলোয় খামতি থাকছে বলেই পড়ুয়ারা বিদেশে যাচ্ছেন বলে তাদের মত। ভারতের গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে কম। সরকার শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়াচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় গুলো নিজেদের খরচ চালানোর মতো টাকা ঠিক ভাবে পাচ্ছে না। সেখানে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাওয়াটা কঠিন।

অনেকেই বিদেশের উদাহরণ টেনে বলতে পারে তাহলে বেসরকারি সংস্থা বা এককথায় কর্পোরেটদের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযেগ দেওয়া হোক। না। বিদেশে যা সম্ভব সেটা এই দেশে সম্ভব নয়। যদিও মোদী সরকারের নয়া জাতীয় শিক্ষা নীতি শিক্ষা ক্ষেত্রে কর্পোরেটদের প্রবেশের দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু কর্পোরেট যদি শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রবেশ করে তবে ভারতে শিক্ষার আর কোন সার্বজনীন চেহারা থাকবে না। গরীব প্রান্তিক অংশের ছেলে মেয়েরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। যেমন টেকনো কলেজে লেখা পড়ার যেই খরচ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই খরচ নয়। অথচ দেখা যাচ্ছে মেধার দিক দিয়ে যাদবপুর এগিয়ে। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে, খরচ করতে হবে দেশের মানব সম্পদকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে। 
বলে রাখা ভালো চিনে শুধু সরকারি অনুদান নয়, বেসরকারি গবেষণার জন্যও নানা সুবিধা তৈরি করা হয়েছে। যার ফলে উদ্ভাবনী ক্ষেত্র দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিন কখনও বলেনি বেসরকারি ক্ষেত্রে প্রবেশ করায় তারা হাত তুলে নেবে শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে। আবার ইউরোপীয় দেশগুলো গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে যোগাযোগ  তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে তারা গবেষণার ফলাফলকে সরাসরি প্রযুক্তি ও শিল্পে প্রয়োগ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। 
বিশ্বমানের গবেষণার জন্য পরিকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত ল্যাব, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং গবেষকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সেই কাজ সরকারকেই করতে হবে। অন্যদিকে গবেষণার মানোন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে হবে। যাতে বিদেশে ভারতীয় গবেষকদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় এবং গবেষণা ক্ষেত্রের ভাবনাচিন্তার আদান প্রদান করা সম্ভব হয়। উল্লেখ্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সহ আমাদের রাজ্যের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বহু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যোগ সূত্র ছিল। এখন সব অতীত। আট বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে কোন গবেষণা হয় না। বন্ধ হয়ে গিয়েছে ‘ফরেন পলিসি স্টাডিস’ বিভাগ।

পথ দেখাবে বিকল্প শিক্ষা নীতি
বিকল্পের সন্ধান দেওয়া বামপন্থীদের কাজ। তারা সেই দায়িত্ব বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন ভাবে পালন করে আসছে। ইতিমধ্যে এসএফআই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির পক্ষ থেকে একটি বিকল্প শিক্ষা নীতি প্রকাশ করা হয়েছে চলতি বছর ২ জানুয়ারি। সেখানে রাজ্যে এবং কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তেমন ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্কুল শিক্ষার ওপর। ছাত্র নেতৃত্বের কথায় স্কুল শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া সব থেকে বেশি প্রয়োজন। শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয়ের কথা যেমন বলা হয়েছে তেমন বলা হয়েছে স্কুলে ছাত্র শিক্ষক অনুপাত বৃদ্ধি করার। 

বিভিন্ন গবেষণার রিপোর্ট বলছে গোটা দেশে স্কুলমুখি পড়ুয়ার সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩৭ লক্ষ। আমাদের রাজ্য তার থেকে কোন ভাবে ব্যাতিক্রম নয়। করোনা পরবর্তী সময় থেকেই এই রাজ্যে ড্রপ আউট বাড়ছে। এসএফআইয়ের কথায় তাদের এই বিকল্প শিক্ষানীতিতে বলা আছে কি ভাবে ছেলে মেয়েদের ফের স্কুল মুখি করা যাবে।
বিকল্প শিক্ষা নীতিতে বলা হয়েছে মোদী সরকারের আমলে দেশের সংবিধান আক্রান্ত। ভারত ভাবনা আক্রান্ত। তাই এসএফআইয়ের বিকল্প শিক্ষানীতিতে বলা আছে স্কুলে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে সংবিধানের প্রস্তাবনা পাঠ এবং ভারত ভাবনা ও দেশ গঠনের মতো বিষয় নিয়ে বিশেষ পাঠক্রম তৈরি করার কথা। এছাড়া বামফ্রন্ট সরকারের সময় থাকা জীবন শৈলীর ক্লাস, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ পাঠক্রম তৈরির কথাও বলা আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লোক সংস্কৃতি কেন্দ্র তৈরি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বিকল্প শিক্ষানীতিতে।
গোটা দেশে ৫৭ শতাংশ স্কুলে কম্পিউটার রয়েছে, ৫৪ শতাংশ স্কুলে রয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা। 
শুধু ড্রপ আউট নয়। শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় রাজ্যের একাধিক স্কুলে ছাত্র শিক্ষক অনুপাত বেড়ে চলেছে। ১৫০ জন পড়ুয়া পিছু শিক্ষক সংখ্যা এক। আবার কোন কোন প্রাথমিক স্কুলে একজন শিক্ষককেই সব দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এসএফআইয়ের দাবি তাদের এই বিকল্প শিক্ষানীতি মাধ্যমিক স্তরে ছাত্র শিক্ষক অনুপাত নামিয়ে আনবে ১২:১ এ এবং উচ্চ-শিক্ষায় এই সংখ্যা হবে ১৫:১।

২০২২ সালের জুলাই মাসে ‘মিশন ৩৬০’ কর্মসূচির ডাক দেয় সিপিআই(এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিষয় নিয়ে বিকল্প একটা ভাবনার ডাক দিয়েছিল সিপিআই(এম) রাজ্য কমিটি। সেই কর্মসূচির আওতায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে চালু হয়েছে বিকল্প পাঠশালা। আর্থীক ভাবে পিছিয়ে থাকা অংশের পরিবারের ছেলে মেয়েরা এই বিকল্প পাঠশালায় লেখা পড়া করেন। পেশাদার শিক্ষকদের কাছেই তারা শিক্ষাগ্রহণ করেন। এর জন্য কোন টাকা তাদের দিতে হয় না। যেই শিক্ষকরা এই কাজের সাথে যুক্ত তারাও কোন টাকা নেয় না। অনেক পড়ুয়া এই বিকল্প পাঠশালায় লেখা পড়া করে মাধ্যমিক পাশ করেছেন। 
তাই লড়াই বিকল্পের।

প্রথম পর্ব লিঙ্ক
দ্বিতীয় পর্ব লিঙ্ক
তৃতীয় পর্ব লিঙ্ক
চতুর্থ পর্ব লিঙ্ক
পঞ্চম পর্ব লিঙ্ক 
ষষ্ঠ পর্ব লিঙ্ক
প্রকাশ: ২৫-অক্টোবর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image


অন্যান্য মতামত:

অনেক না জানা তথ্য জানলাম, এরকম আরও দিন
- ABDUS SAMIM, ২৫-অক্টোবর-২০২৫



শেষ এডিট:: 27-Oct-25 14:17 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-flaws-of-modern-education_7
Categories: Fact & Figures
Tags: assaults on education, cpim education minister, fight for alternatives, left alternative, , alternative education
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড