একালের শিক্ষা (প্রথম পর্ব)

Author
প্রতীম দে

পরিসংখ্যান বলছে ২০১১-১২ সালের পর থেকে এরাজ্যের কমেছে সরকারি স্কুলের সংখ্যা। ২০১১-১২ থেকে ২০২১-২২ ই দশ বছরে রাজ্যের প্রায় ৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বেসরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার হার। সরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার হার কমেছে ৮ শতাংশ। 

The Flaws of Modern Education
প্রথম পর্ব 

শেষ করা হচ্ছে সরকারি শিক্ষা


২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ প্রায় দশ বছরে গোটা দেশে সরকারি স্কুলের সংখ্যা কমেছে আট শতাংশ। বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা দেশে বেড়েছে ১৪.৯ শতাংশ। কোন সংস্থার তথ্য নয়, সরকারি তথ্য। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই পরিসংখ্যান সংসদে পেশ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারি তথ্য বলছে এই সময়কালে দেশে ১১,০৭,১০১ থেকে সরকারি স্কুলের সংখ্যা কমে হয়েছে ৮৯,৪৪১। সেই জায়গায় বেসরকারি স্কুল ৪২,৯৪৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩,৩১,১০৮।
প্রশ্ন থাকতে পারে কেন বেসকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে? এখানেই বলে রাখা দরকার সরকার চাইছে তাই তারা বাড়তে পারছে, পরিকল্পনা করে নতুন আইন বানিয়ে সরকারি শিক্ষাকে যেমন শেষ করা হচ্ছে তেমন কাজে লাগানো হচ্ছে সরকারি পরিকাঠামো। এরাজ্যের উদাহরণ দেওয়া যাক। শিক্ষক নিয়োগ নেই একাধিক স্কুলে ছাত্র শিক্ষকের অনুপাত ঠিক নেই, অনেক স্কুলে একজন মাত্র শিক্ষক। সেখানে কী ভাবে হবে লেখা পড়া? আবার কলেজে ভর্তির সময় বেসরকারি কলেজ গুলোকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে মুনাফা তুলে নেওয়ার। 

বাড়ছে বেসরকারি স্কুল
প্রসঙ্গত বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশের সরকারি স্কুলের সংখ্যা কমেছে সব থেকে বেশি। মধ্যপ্রদেশে ২৯,৪১০ গুলি এবং উত্তরপ্রদেশে ২৫,১২৬ গুলি সরকারি স্কুল উঠে গিয়েছে। দুই রাজ্য মিলিয়ে মোট ৮৯,৪৪১ গুলো সরকারি স্কুল কমেছে। 
অন্যদিকে একই সাথে উত্তরপ্রদেশে ১৯,৩০৫টি বেসরকারি স্কুল তৈরি হয়েছে। যা দেশের মোট ৪২,৯৪৪টি বেসরকারি স্কুল বৃদ্ধিতে ৪৪.৯% অবদান রেখেছে।
জম্মু ও কাশ্মীরে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ২১.৪% কমেছে ২০১৪-১৫ সালে ২৩,৮৭৪ থেকে ২০২৩-২৪ সালে সরকারি স্কুল কমে হয়েছে ১৮,৭৫৮। একই সময়ে, ওড়িশার সরকারি স্কুলের সংখ্যা ১৭.১% কমে ৫৮,৬৯৭ থেকে ৪৮,৬৭১ হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশে ১৬.৪% কমে ৩,৪০৮ থেকে ২,৮৪৭ হয়েছে। ঝাড়খণ্ডে ১৩.৪% কমে ৪১,৩২২ থেকে ৩৫,৭৯৫ হয়েছে। নাগাল্যান্ডে ১৪.৪% কমে ২,২৭৯ থেকে ১,৯৫২ হয়েছে। গোয়ার স্কুলগুলি ৯০৬ থেকে ১২.৯% কমে ৭৮৯ হয়েছে এবং উত্তরাখণ্ডের সরকারি স্কুলগুলি ৮.৭% কমে ১৭,৭৫৩ থেকে ১৬,২০১-এ দাঁড়িয়েছে।
যেই যেই রাজ্য গুলোর তালিকা এখানে দেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশ বিজেপি শাসিত রাজ্য। এখান থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট জাতীয় শিক্ষা নীতিতে শিক্ষার বেসরকারিকরণের যেই কথা বলা হয়েছিল তা মেনে চলছে বিজেপি শাসিত রাজ্য গুলো।
বেসরকারি স্কুল বাড়ার তালিকায় অন্যদের টেক্কা দিচ্ছে বিহার। সেখানে ২০১৪-১৫ সালে মাত্র ৩,২৮৪ গুলো বেসরকারি স্কুল ছিল, সেই সংখ্যা ১৭৯.১৪% বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে হয়েছে ৯,১৬৭। ওড়িশায় বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা ৮০.৩৬% বৃদ্ধি পেয়ে ৩,৩৫০ থেকে ৬,০৪২টিতে পৌঁছেছে। উত্তরপ্রদেশের বেসরকারি স্কুল ২৪.৯৬% বৃদ্ধি পেয়ে ৭৭,৩৩০ থেকে ৯৬,৬৩৫টি বেসরকারি স্কুলে পৌঁছেছে।
এখানে উল্লেখ করতে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের কথা। পরিসংখ্যান বলছে ২০১১-১২ সালের পর থেকে এরাজ্যের কমেছে সরকারি স্কুলের সংখ্যা। ২০১১-১২ থেকে ২০২১-২২ ই দশ বছরে রাজ্যের প্রায় ৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বেসরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার হার। সরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার হার কমেছে ৮ শতাংশ। 

পশ্চিমবঙ্গের বেহাল সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা
চলতি বছর আগস্ট মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্কুল শিক্ষা দপ্তরের প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান বলছে রাজ্যে মোট প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা ৪৯,৩৬৮। যার মধ্যে ২,২১৫ স্কুলে শিক্ষক নেই অথবা একজন শিক্ষক।
বাংলা শিক্ষা পোর্টালের মাধ্যমে জানা গিয়েছে কোনও শিক্ষক নেই অথবা ১ জন শিক্ষক আছে এরকম স্কুলের সংখ্যার শীর্ষে থাকা প্রথম পাঁচটি জেলা হল পুরুলিয়া (৩৭২টি স্কুল), বাঁকুড়া (৩৭১টি স্কুল), পশ্চিম মেদিনীপুর (২২৭ টি স্কুল), পূর্ব বর্ধমান (১৭৮টি স্কুল) এবং বীরভূম (১৫৬টি স্কুল)। এই তালিকায় নীচের দিকে আছে শিলিগুড়ি (১১), মালদা (১২), হাওড়া (১৩), কলকাতা (১৮) এবং আলিপুরদুয়ার (২৭)।
২০১২ থেকে ২০২২-এর মার্চ মাস পর্যন্ত তথ্য অনুসারে, সবথেকে বেশি প্রাথমিক স্কুল বন্ধ হয়েছিল দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায়। প্রায় ১,১৯২ গুলো স্কুল। তালিকায় এর পরেই পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নাম। ২০১২ সালে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল ঝাড়গ্রাম। যা পরে আলাদা জেলা হয়েছে। ২০১২ সালে ঝাড়গ্রাম সহ পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা ছিল ৮,৪০৪। যা ২০২২-এর পরিসংখ্যান অনুসারে কমে দাঁড়িয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরে ৫,৪১১ এবং ঝাড়গ্রামে ১৯৪৬। মোট ৭,৩৫৭। এক্ষেত্রেও প্রাথমিক স্কুল কমেছে ১,০৪৭। একইভাবে ২০১২ থেকে ২০২২-এর মধ্যে পূর্ব মেদিনীপুরে প্রাথমিক স্কুল কমেছিল ৮৬৭টি।

কি বলছে রাজ্য সরকারের রিপোর্ট
গত বছর বিধানসভায় সরকারের কমিটি শিক্ষা সংক্রান্ত যেই রিপোর্ট দিয়েছে তাতে ‘সুপারিশ’ শিরোনামে লেখা হয়েছে, ‘‘গ্রামাঞ্চলে বিদ্যালয়গুলিতে যথেষ্ট শিক্ষক/ শিক্ষিকার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে নিউ সেট আপ বিদ্যালয়গুলিতে, উক্ত বিদ্যালয়গুলিতে শূন্যপদ পূরণের বিষয়ে বিভাগকে সচেষ্টা হতে হবে।’’ এই ক্ষেত্রে তিনটি জেলার হাল বলা হয়েছে রিপোর্টে। পূর্ব মেদিনীপুরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শূন্যপদ আছে ৩৩৩৩টি। মুর্শিদাবাদে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শূন্যপদ আছে ৭৪৯টি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শূন্যপদের সংখ্যা ৫৫০৭। হাওড়া জেলায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শূন্য শিক্ষক পদের সংখ্যা ৪৭২৪।
উল্লেখ্য, ২০১০-১১ সালে রাজ্যে সরকারি স্কুলে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষক ছিলেন ৪ লক্ষ ১৪ হাজার ৭২৪ জন। এই হিসাব শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষকদের ধরে। কেন্দ্রীয় সরকার দেশের স্কুলগুলির পঠনপাঠন সংক্রান্ত সাম্প্রতিক রিপোর্ট পেশ করেছে গত ডিসেম্বরে। সেই রিপোর্ট বলছে, এখন রাজ্যে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে সরকারি স্কুলে শিক্ষকদের সংখ্যা ২ লক্ষ ৭২ হাজার ৪৪৩। এর সঙ্গে প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষক আছেন এসএসকে, এমএসকেগুলিতে। অর্থাৎ প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য সরকারি শিক্ষক আছেন ৩ লক্ষ ৪৭ হাজারের কাছাকাছি। 
অর্থাৎ শূন্য হয়ে আছে অন্তত ৬৯ হাজার শিক্ষকপদ।
শুধু প্রাথমিক এবং উচ্চপ্রাথমিক স্তরেই নয়। রাজ্যে শিক্ষকের অভাব মাধ্যমিক স্তরেও। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সম্প্রতি জানিয়েছে যে, সব মিলিয়ে সাড়ে ৩ লক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর পদ শূন্য। যদি বা শিক্ষক থাকে, তাঁদের পড়ানো ছাড়াও নানা কাজের দায়িত্বে ব্যস্ত রাখা হচ্ছে। শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত ২০০৮ সালের ১:৩৫ থেকে এখন হয়ে গিয়েছে ১:৭৩। সাম্প্রতিককালে সরকার ৮২০৭টি স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে এই স্কুলগুলিতে ৩০-এর বেশি ছাত্র-ছাত্রী নেই। এমন স্কুলের কথা স্ট্যান্ডিং কমিটিও তার রিপোর্টে জানিয়েছে।
শুধু তা নয়। কতটা অসহায় অবস্থায় আছে ছাত্র-ছাত্রীরা, তাও স্পষ্ট করা হয়েছে রিপোর্টে। লেখা হয়েছে, ‘‘জেলায় অনেক প্রাথমিক/মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। প্রধান শিক্ষক না থাকার কারণে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ ও পঠনপাঠনের কাজ ব্যহত হচ্ছে।’

আগামীকাল দ্বিতীয় পর্ব...
প্রকাশ: ১৯-অক্টোবর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image


অন্যান্য মতামত:

স্কুল কমার হিসেবটা সারণী আকারে দিলে আরও ভালো ভাবে বুঝতে সুবিধা হতো। একই সঙ্গে বাম আমল আর পরবর্তী সময় বছর ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের এবং স্কুল ছুট এর পরিসংখ্যান দিলে বুঝতে সুবিধা হতো।
- বিকাশ চক্রবর্তী, ১৯-অক্টোবর-২০২৫



শেষ এডিট:: 27-Oct-25 14:13 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-flaws-of-modern-education
Categories: Fact & Figures
Tags: assaults on education, higher education, school, system for education
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড