ভারতীয় সম্পদশালীদের উৎকট আচরণ (২য় পর্ব)

বিশ্বগুরু আম্বানি হেলথ্ ফাউন্ডেশনের উদ্বোধন করছিলেন এবং ভাষণ দিচ্ছিলেন যে আজ থেকে ২০-৩০ হাজার বছর আগেই ভারতীয়দের প্লাস্টিক সার্জারির ক্ষমতা ছিল, কেউ সাহস করেছিলেন প্রশ্ন করার?

২০২৪ সালের ২১-শে ডিসেম্বর ইন্ডি জার্নাল মিডিয়া কনক্লেভে অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও পিপলস্ আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক পি. সাইনাথ বক্তৃতা করেন। তিন পর্বের এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনে সে বক্তৃতারই বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হল। প্রতিবেদনের বাংলা শিরোনাম ওয়েবডেস্কের নিজস্ব।
পি সাইনাথ
(২য় পর্ব)
আরেকটি প্রসঙ্গ, যা পূর্বের আলোচনায় উত্থাপিত হয়েছিল, তা হল গণমাধ্যমে জাতপাতের প্রভাব। এই বক্তব্য একদম সঠিক। এই জাত ভিত্তিক বৈষম্যের বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয় নয়। ভারতীয় গণমাধ্যম, বা বলা ভালো প্রভাবশালী ভারতীয় গণমাধ্যম, ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে সব থেকে বেশি সামাজিক বর্জনের আদর্শে আস্থা রাখে। এই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে কোনো দ্বিধা রাখবেন না। এইরকমও ভাববেন না এদের একচেটিয়া দখলদারি না ভেঙে বা আইন প্রণয়ন না করে আপনি একে পাল্টে দিতে পারবেন। সেটা সম্ভব নয়। ভারতের ভূতপূর্ব উপ-প্রধানমন্ত্রী বাবু জগজীবন রাম ছিলেন দলিত। আমার হিসেবে এই দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্যের মধ্যে ৪০-৫০ জন দলিত আছেন। এই দেশের বর্তমান ও ভূতপূর্ব রাজ্যপালদের মধ্যে ৩০-৪০ জন দলিত আপনি পেয়ে যাবেন। একই ভাবে ১০-১২ জন মুখ্যমন্ত্রী পাবেন যারা দলিত, এদের মধ্যে মায়াবতী চারবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ভারতের দু’জন রাষ্ট্রপতি দলিত ছিলেন - আমার ভূতপূর্ব উপাচার্য কে. আর. নারায়ণ আর রামনাথ কোভিন্দ। শুধু মুখ্যমন্ত্রী নয়, ভারত দু’জন প্রধান বিচারপতি পেয়েছে যারা দলিত। ঠিক তো ? এইবার আপনি আমাকে একটি সংবাদপত্র দেখান যেখানে কোনো দলিত মুখ্য সহ-সম্পাদকের উঁচু কোনো পদে রয়েছে। কেন নেই ? তাঁদের মেধা নেই বলে ? দলিতরা বাকি সব জায়গায় উন্নতি করতে পারেন, কিন্তু একজনও দলিত পাওয়া গেল না যার মধ্যে গণমাধ্যমের নেতৃত্ব প্রদানের অবস্থানে যাওয়ার মত দক্ষতা রয়েছে ! গণমাধ্যমের পরিসরে মেধাতন্ত্রের নামে যে জাতপাত আর দ্বিচারিতার চল রয়েছে তা এই গণতন্ত্রের আর অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে নেই। মনে রাখবেন, বাকি প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে ঐতিহাসিক বা পদ্ধতিগত বৈষম্য হ্রাস করার উদ্দেশ্যে ইতিবাচক পদক্ষেপের অস্তিত্ব আছে। সেখানে সংরক্ষণ রয়েছে, কাউকে নির্যাতন করা হলে তার সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের পিপলস্ আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়া দলিত আর আদিবাসীদের থেকে জেনেছে যে তারা গণমাধ্যমের কাছে তাদের সমস্যার কথা বলতে প্রচন্ড দ্বিধা বোধ করে কারণ তারা জানে সেখানে তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হবে, যা আচরণের কোনো প্রতিকার নেই। এই দেশের পরিস্থিতি এমনই, আপনি তামিলনাড়ুর মত রাজ্যেও দূরদর্শনের সংবাদ পাঠক ও পরিচালকদের মধ্যে খুব কম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি খুঁজে পাবেন। ওইরকম কেউ যদি থাকেন, তাহলে পাউডার আর রঙ মাখিয়ে তাকে সাদা করে তবে সংবাদ সম্প্রচার করা শুরু হবে। এই হচ্ছে আমাদের মধ্যে প্রচলিত কু-আচারের গভীরতা। এটা আপনারা যত দ্রুত মেনে নেবেন এবং উপলব্ধি করবেন, তত দ্রুত তার সমাধানের জন্য কিছু করতে পারবেন।
১৯৮০-এর দশক থেকে আরেকটি যে বিষয় হয়েছে, তা হল অ-প্রযুক্তিগত অভিসরণ। আমি প্রযুক্তির প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। ভারতীয় গণমাধ্যমের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছর পুরনো। ২০২২ সালে আমরা এই ২০০ বছর পূর্ণ করেছি। আমার মতে এই ঐতিহ্যের সূচনা রূপে ধরা উচিৎ রাজা রামমোহন রায়ের ফার্সি ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্র ‘মিরাত-উল-আখবার’। আপনারা সাংবাদিকতা শিক্ষাকেন্দ্রে সূচনা বিন্দু হিসেবে উইলিয়াম হিকি ইত্যাদি যা পড়েন, তা সঠিক নয়। হিকি ভারতীয় ছিলেন না, ভারতীয় প্রসঙ্গও তাঁর কাগজে থাকত না। তাঁকে এমনকি সাংবাদিক বলা যায় কিনা, তা নিয়েও আমার সংশয় রয়েছে। তাঁর কাগজের মূল বিষয় ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইউরোপীয় সমাজ আর সামাজিক কেচ্ছা কাহিনি, গভর্নর-জেনারেলের স্ত্রী কার প্রতি প্রগলভতা প্রদর্শন করছেন ইত্যাদি মশলাদার খবর। তাই আমরা বলতে রামমোহন ছিলেন প্রথম ভারতীয় সাংবাদিক যিনি ভারতের প্রেক্ষিতে তাঁর রাজনৈতিক মতামত সংবাদপত্রে তুলে ধরেন। এই কাজটি তিনি পরে চালিয়ে যান ‘সংবাদ কৌমদীর’ মাধ্যমে। প্রসঙ্গত, রাজা রামমোহন তাঁর সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় সম্পাদকীয়তে একজন রায়ত, একজন কৃষক প্রসঙ্গে কী লিখেছিলেন সেটা একটু লক্ষ্য করবেন। তিনি একজন কৃষকের সমর্থনে লিখেছিলেন যাকে সামান্য একটি অপরাধের বিচারপতি দশ ঘা চাবুকের শাস্তির আদেশ দেন ও তা পালন করতে গিয়ে পুলিশ তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল। তিনি যখন এই সম্পাদকীয় লিখেছিলেন, যা প্রথম পাতা থেকে ভেতরের বেশ কয়েকটি পাতা জুড়ে ছিল, তার প্রভাব ছিল অসামান্য। এই বিচারপতি, যিনি কুমিল্লা জেলার জেলা বিচারপতি ছিলেন, তাঁকে ইংল্যান্ডের সুপ্রিম কোর্টে ডেকে পাঠানো হয় জবাবদিহির জন্য। এই ঘটনার পর, মনে রাখবেন ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্টের পঞ্চাশ বছর আগে, গভর্নর-জেনারেল ভারতীয় সাংবাদিকতা ও ভারতীয় সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেন ও বেশ কয়েকটি আইন প্রণয়ন করেন। এই পদক্ষেপের পর রাজা রামমোহন রায়ের প্রতিক্রিয়া কী ছিল ? আপনারা শোনার পর বলবেন এইরকম সাহস আজকের একটিও কর্পোরেট মালিকের আছে কিনা। রামমোহন রায় ‘মিরাত-উল-আখবার’-এর প্রথম পাতায় সম্পাদকীয়তে লিখলেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার এই অবক্ষয় ও অবমাননার কাছে মাথা নিচু করার পরিবর্তে আমি কাগজ বন্ধ করে দিচ্ছি। এই ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। আপনি হাজার একটা বিষয় খুঁজে বার করতে পারেন যে বিষয়ে রামমোহন রায়ের অবস্থান আমার পছন্দ নয় বা যে প্রসঙ্গে আমি ওনার সঙ্গে সহমত নই, কিন্তু আপনাকে তাঁকে এই কৃতিত্ব দিতে হবে যে তিনি ক্ষমতার সামনে মাথা নত করেননি। এখন কিন্তু নিয়ম হচ্ছে আপনি আর যা-ই করুন, সরকারের সমালোচনা করবেন না। ব্যক্তি উদ্যোগে যে সব সাংবাদিক তা করে থাকেন, তারা খুব দ্রুত তাঁদের ওপরওয়ালাদের সৌজন্যে টের পেয়ে যান এই কাজের পরিণতি কী। যেমন ধরুন, কোভিড – ১৯-এর সময় আপনি এই দেশের কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত প্রধান ও প্রাচীন সংবাদপত্রগুলির মধ্যে একটিতেও কি একটা সম্পাদকীয় দেখেছেন যেখানে অতিমারিতে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সরকারের প্রদত্ত তথ্যকে প্রশ্ন করা হচ্ছে ? একটি সংবাদপত্র দেখেছেন, যেখানে বলা হচ্ছে আপনাদের প্রদত্ত তথ্যের সঙ্গে পৃথিবীব্যাপী আর যে সব তথ্যসূত্র রয়েছে তাদের কারোর হিসেব মিলছে না ? আমি বলছি না যে তারাও সব সময় ঠিক তথ্য দিচ্ছেন। আমি মনে করি তথ্য আপনাকে নির্ভুল হিসেব সব সময় দিতে পারে না, তবে তথ্যের মাধ্যমে ঝোঁকটা আপনি বুঝতে পারবেন, যেমন নির্বাচনের ফলের ক্ষেত্রে। এই ঝোঁক ভুলও হতে পারে, ঠিকও হতে পারে। কিন্তু এটাও লক্ষণীয় ল্যান্সেট, জন হপকিন্স, ওয়ার্ল্ড ডেভলপমেন্ট কাউন্সিল, ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অর্গানাইজেশনের মত আট-নটা বিশ্ব সংস্থা জানাচ্ছে ভারতে কোভিড – ১৯-এর মৃত্যুহার ৪০ লক্ষের বেশি। ল্যান্সেট বলছে ৪২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আপনারা জানেন ল্যান্সেট একটি অত্যন্ত বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ্যার পত্রিকা। তবে ল্যান্সেট বললেই সহমত হতে হবে, আমি তেমন বলছি না। আপনাদের শুধু সংখ্যাটা জানাচ্ছি। ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অর্গানাইজেশন আমার মতে ল্যান্সেটের থেকে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। তারা জানাচ্ছে প্রায় ৪৭ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যত দূর মনে পড়ছে জন হপকিনস্ বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনটি তালিকা প্রস্তুত করেছিল। তিনটি তালিকাতেই মৃতের সংখ্যা ছিল ৪০ লক্ষের ঊর্ধ্বে। ওয়াশিংটন ডিসি-এর ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল জানিয়েছে ভারতে কোভিডের কারণে প্রায় ৪৯ লক্ষ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা হল যা বার্ষিক সাধারণ গড় মৃত্যুসংখ্যা কোভিডকালে তার থেকে অধিক মৃত্যুর একটি পরিসংখ্যান। এই পরিসংখ্যানগুলি যখন আসছে, সংবাদপত্রের এক কোনায় কোনো মন্তব্য ছাড়া, কোনোভাবে তা পাঠকের দৃষ্টিগোচর করার চেষ্টা না করেই, সামনের পাতাতে বা সামনের দিকে না রেখেই সেগুলো ছাপা হচ্ছে। আর সরকার যখন তার পরিসংখ্যান দিল যে অতিমারিতে ভারতে মৃত্যুর সংখ্যা ৪ লক্ষ ৮৬ হাজার, ব্যাস, আলোচনা শেষ। একবার বিশ্বগুরু বলে দিয়েছেন, কার ঘাড়ে ক’টা মাথা রয়েছে যে তার বিরুদ্ধে বলে ? যখন বিশ্বগুরু আম্বানি হেলথ্ ফাউন্ডেশনের উদ্বোধন করছিলেন এবং ভাষণ দিচ্ছিলেন যে আজ থেকে ২০-৩০ হাজার বছর আগেই ভারতীয়দের প্লাস্টিক সার্জারির ক্ষমতা ছিল, কেউ সাহস করেছিলেন প্রশ্ন করার? ঠিকই তো, তা না হলে প্রভু গণেশের যে হাতির মাথা তার ব্যাখ্যা হয় কীভাবে? যদি আমরা আইভিএফ পদ্ধতি না-ই জানতাম তো কর্ণের জন্ম আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? ওখানে বসে থাকা একজন বিজ্ঞানী একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি। একটি সংবাদপত্রে ছাপা হয়নি, এ প্রধানমন্ত্রী নয়, এ একজন গুরুতর বিভ্রমে ভোগা ব্যক্তি। এই বিভ্রমের একটা প্রেক্ষিত রয়েছে। এই প্রধানমন্ত্রী হলেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি সব সময় প্রথম বা নাম পুরুষে নিজের সম্পর্কে কথা বলে থাকেন। আমার মতে এই ভাবে কথা বলে তিন ধরণের লোক – এক, শিশুরা, যেমন – অর্জুন আজকে স্কুল যাবে না। দুই, কৌতুকশিল্পীরা, যা মিঃ মোদি নন, এমনকি আমিও তাঁর সম্পর্কে এই অভিযোগ করব না। তিন, যাদের অলীক শ্রেষ্ঠত্বের বিভ্রম রয়েছে। এই তৃতীয় ধরণের ব্যক্তিরা প্রথম পুরুষে কথা না বলে থাকতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে এই দেশের গণমাধ্যম, যারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বাপেক্ষা ব্যয়বহুল ব্যক্তি উপাসনার কাঠামোর নির্মাতা, প্রচারক ও রক্ষক। প্রসঙ্গত, বিজেপিকে একদিন এর মূল্য দিতে হবে। একবার যদি এই অর্চনার মোহ কেটে যায়, আরেকজনকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয়বার এইরকম কাঠামো নির্মাণ করা খুব কঠিন, তাই না? আপনি পারবেন না। খেয়াল করবেন, যে গণমাধ্যম ওনাকে গৌরবান্বিত করতে এত পরিশ্রম করে তারা একবারও প্রতিবাদ করে না যে উনিই হলেন পৃথিবীর সমস্ত গণতন্ত্রের একমাত্র নির্বাচিত নেতা যিনি বিগত ১০ বছরে একটিও সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। ভাবুন, পুরো গণমাধ্যম ওনার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছে, তাও ১০ বছরে একটা সাংবাদিক সম্মেলন করতে চাইছেন না।
বিগত ৩০ বছরে আমরা গণমাধ্যম ও সংবাদসংস্থাগুলিতে একটি নতুন অভিসরণ দেখেছি। প্রাচীন গণমাধ্যম সংস্থা আর সংবাদপত্রগুলি যেমন ‘সাকাল’ বা ‘হিতওয়াড়া’, প্রসঙ্গত ‘হিতওয়াড়া’-র একজন প্রতিষ্ঠাতা তত্ত্বাবধায়ক ও পরিচালনা পর্ষদের পদাধিকারি ছিলেন গোপালকৃষ্ণ গোখলে, এগুলি স্বাধীনতার পর মুনাফার জন্য পরিচালিত হত না। এই সংবাদপত্রগুলি পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ভাবে প্রবল সংকটের মুখে পড়ে। এই সুযোগে এই ব্যবসায়ী পরিবারগুলি সংবাদপত্রগুলিকে কিনে নেয়। আপনারা তো জানেনই, ‘সাকাল’-এর মালিকানা এখন কার। ১৯৫০-এর দশক থেকে এই অভিসরণ যখন দেখা দেখা যাচ্ছে, তখন তার প্রকৃতি বুঝতে ভারতে দুটি প্রেস কমিশন, কমিশন – প্রেস কাউন্সিল নয়, গঠিত হয়েছিল। একটি ১৯৫৫ সালে এবং আবার আরেকটি ১৯৭৮-৮০ সালে। এই দুটি প্রেস কমিশনেরই বক্তব্য ছিল ভারতের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সর্ববৃহৎ অন্তরায় হয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলির হাতে গণমাধ্যমের মালিকানা কেন্দ্রীভূত হওয়া। আপনারা খুঁটিয়ে দুটি প্রেস কমিশনের প্রতিবেদনই পাঠ করুন। ভয় নেই, এগুলো কোনো উগ্র বামপন্থীদের পরিচালিত কমিশন ছিল না। যারা এই কমিশনের দায়িত্বে ছিলেন তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। এই কমিশনগুলির সামনে একের পর এক ব্যক্তি এসে আবেদন করছিলেন যাতে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আর গণমাধ্যমের মধ্যে যে সম্পর্ক তা ছিন্ন করা যায়। তাঁরা এই আবদনে অবশ্য শিলমোহর দিতে পারেননি। এই আশা অবশ্যই ছিল একটি স্বপ্ন ও মরীচিকা।
যাই হোক, ৮০-এর দশকে যে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলি বৃহৎ কর্পরেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল, সেগুলি সাধারণ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ছিল না। গণমাধ্যমে প্রধান রাজনৈতিক পরিবারগুলির প্রভাবের একটা ঝোঁক আগেই ছিল। এই সময় সেই ঝোঁক বৃদ্ধি পেল। ইনাড়ু ছিল মিঃ চন্দ্রবাবু নাইডুর প্রতিষ্ঠান, সাক্ষী ছিল মিঃ রাজশেখর রেড্ডির, সান টিভি এবং মুরাসলি ছিল তামিলনাড়ুর ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক পরিবারের হাতে, জেআর টিভি, বাদলদের হাতে থাকা পিটিসি। এই যে গণমাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবার ও ব্যবসায়ী পরিবারগুলির প্রবেশ – তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। আপনারা লক্ষ্য করবেন লোকসভার সদস্যদের মধ্যে কোটি পতির সংখ্যা কত। ২০০৪ সালে প্রথম যখন নির্বাচনের সময় নিজের সম্পত্তির পরিমাণ ঘোষণা করার নিয়ম চালু হয়, তখন নির্বাচিত প্রার্থীদের প্রদত্ত হিসেব বিশ্বাস করলে লোকসভায় কোটিপতিদের সংখ্যা ছিল মোট সদস্যের ৩২%। ২০০৯ সালে এটা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩%। ২০১৯ সালে আবার লাফ দিয়ে হয় ৮৮%। ২৪ সালের নির্বাচনে এটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩%। এই লোকসভার প্রতিনিধিরা এমন একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন যা বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১০৭-তম, পরিবেশ কার্যকারিতা সূচকে ১৮০-টি দেশের মধ্যে ১৭৮-তম, মানবোন্নয়ন সূচকে ১৩২-তম স্থানে রয়েছে – কিন্ত ফোর্বেজ ১০০ কোটি সম্পদের মালিকদের সংখ্যায় ৩-য় স্থানে। এবার ভাবুন, এইরকম অসাম্যের মধ্যে সংবাদমাধ্যম কীভাবে সমতাবাদী বা গণতান্ত্রিক হতে পারে ? পারে না। ঠিক এই কারণেই স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রয়োজন রয়েছে। এই কারণেই তাদের অস্তিত্ব রয়েছে। আর এই কারণেই আপনাদের এই গণমাধ্যমগুলিকে সমর্থন করতে হবে। আজ আমার সামনে যে শ্রোতারা বসে রয়েছেন, আমি জানি তাঁদের প্রত্যেকেরই গণমাধ্যম নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু যদি আপনারা মুখে যা বলছেন তা কাজেও না করে দেখান, তাহলে আপনাদের এই অভিযোগ অর্থহীন। ইপিডাব্লিএস, ইন্ডি জার্নাল, পিপলস্ আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়ার মত প্রতিষ্ঠানগুলিকে সাহায্য করুন। যদি না করেন, আপনাদের অভিযোগ আমি শুনতে আগ্রহী নই।
অনুবাদঃ রবিকর গুপ্ত
প্রকাশ: ১৫-অক্টোবর-২০২৫
শেষ এডিট:: 15-Oct-25 00:06 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-obscenity-of-india’s-wealthy-part-ii-
Categories: Fact & Figures
Tags: capitalism, cronycapitalism, wealthy
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (157)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (142)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (79)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





