ভারতীয় সম্পদশালীদের উৎকট আচরণ (১ম পর্ব)

প্রতি বছরে যে কয়েক শত কৃষক আত্মহত্যার খবর আমরা পাই, তার একটি প্রধান কারণই হল কৃষকের মেয়ের বিবাহ দিতে না পারা। অনেক ক্ষেত্রেই মাস ছয়েক বাদে মেয়েটিও নিজেকে পিতার আত্মহত্যার জন্য দায়ি মনে করে একই পথ বেছে নেয়।

২০২৪ সালের ২১-শে ডিসেম্বর ইন্ডি জার্নাল মিডিয়া কনক্লেভে অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও পিপলস্ আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক পি. সাইনাথ বক্তৃতা করেন। তিন পর্বের এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনে সে বক্তৃতারই বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হল। প্রতিবেদনের বাংলা শিরোনাম ওয়েবডেস্কের নিজস্ব।
পি সাইনাথ
সময় যেহেতু কম, তাই আমি আমার উপস্থাপনার অংশটি বাদ দিচ্ছি। বেশ দেরি হয়ে গেছে আর আপনারা নৈশভোজে যাওয়ার আগে বক্তব্য শেষ করতে হলে আমাকে দৌড়তে হবে।
প্রথম কথা, আমার মতে, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা - এই দুই শব্দকে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করতাম আমরা যে যুগে, সেই যুগ দীর্ঘকাল হল অতিক্রান্ত হয়েছে। সাংবাদিকতা হল আমাদের মত লোকেদের জীবিকা, কিন্তু গণমাধ্যম হল কর্পোরেশন। এগুলো প্রকৃতপক্ষে রাজস্বসন্ধানী মুনফাসন্ধানী প্রতিষ্ঠান। আপনি যদি গণমাধ্যমকে আর অন্য কোনো ভাবে বিশ্লেষণ করার প্রচেষ্টা করেন, তাহলে খুব বড় ভুল করবেন। আপনাদের একটি ধারণা দিই যে আদতে কী চলছে। ৩১-শে মার্চ আর্নস্টন ইয়ং ভারতীয় গণমাধ্যমের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মূল্যমানের একটি অঙ্ক প্রকাশ করেন। সব ভারতীয় গণমাধ্যমেরও না, মূলতঃ যেগুলির নিবন্ধিকরণ রয়েছে। এই মূল্যমান ছিল ২ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ২৮০০ কোটি ডলার। বর্তমানে ভারতীয় টাকার মূল্যের পতন, যা ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য ডলার প্রতি ৮৫ টাকা স্পর্শ করেছে, তার হিসেব রেখেও এই সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে ২৭০০ কোটি ডলার তো বটেই। প্রসঙ্গত, আমি গণমাধ্যম বলতে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম তথা যে জগদ্দল ভারতের গণমাধ্যম পরিসরের ৯৫% দখল করে বসে রয়েছে তাদেরই বোঝাচ্ছি, পারি (People’s Archive of Rural India) বা এই জাতীয় গণমাধ্যমগুলি যেহেতু স্বাধীন গণমাধ্যম তাই তাদের এর মধ্যে ধরা হচ্ছে না। এই প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলির মূল্যমান ৩১-শে মার্চ ছিল ২৭০০ কোটি ডলার, এর এক সপ্তাহের মধ্যেই তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৬০০ কোটি ডলার। ভারতীয় গণমাধ্যমের মূল্যের এই প্রায় ৮৫০ কোটি ডলার বৃদ্ধির কারণ ছিল মাত্র একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটি সংস্থার চুক্তি – মিঃ মুকেশ আম্বানির সঙ্গে ডিজনি হটস্টারের। এই চুক্তির অর্থ এই ছিল যে ভারতের গণমাধ্যমের প্রবাহ ক্ষমতার প্রায় ৬০% একটি ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভবন হয়েছে, গণমাধ্যমের বাকি অংশে তাঁর প্রভাবের কথা তো ছেড়েই দিলাম। আপনারা দেখবেন একসময় ইনাড়ু-এর ইটিভি মারাঠি, ইটিভি পাঞ্জাবি টিভি এইরকম কতগুলি চ্যানেল ছিল। এখনও ইটিভি নামে থাকলেও এই চ্যানেলগুলি কিন্তু আসলে আর ইনাড়ু-এর নেই, এগুলি বেশ কিছু বছর আগে মিঃ মুকেশ আম্বানি ভেতরে ভেতরে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিডিয়া ফাউন্ডিং নামক এক বিধি অনুসারে কিনে নিয়েছেন। নামটা বেশ মজার না ? আমরা সবাই জানি এই গণমাধ্যমগুলি কতটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট বা স্বাধীন। যাই হোক, মূল প্রসঙ্গে ফেরত আসি– এই হটস্টারের সঙ্গে চুক্তির ফলে ভারতের গণমাধ্যমের মূল্যমান হয়েছে ৩৬০০ কোটি ডলার এবং তার প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ একজন ব্যক্তির হাতেই কেন্দ্রীভূত।
দ্বিতীয়ত, এই প্রভাবশালী গণমাধ্যমের দাপটের যুগে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা (ফ্রিডম অফ দ্য প্রেস) বলে কিছু অবশিষ্ট নেই, যা রয়েছে তা হল অর্থের স্বাধীনতা (ফ্রিডম অফ দ্য পার্স)। আমরা এর অধীনেই রয়েছে। এখানে একটা প্রসঙ্গ এর আগে উত্থাপিত হল, যেখানে বলা হয়েছে আমরা যদি এই প্রভাবশালী গণমাধ্যমে কিছু বক্তব্য রাখার সুযোগ পাই, তাহলে তা রাখা উচিৎ। আমি সহমত। আমি যদি নিজের স্বাধীন সাংবাদিকতার বাইরে ধরা যাক টাইমস্ অফ ইন্ডিয়াতে কিছু বক্তব্য রাখার সুযোগ পাই অবশ্যই রাখব। আমি তো চাইব তাদের পাঠকদের কাছে পৌঁছতে। তবে এক্ষেত্রে আমার এই সম্পর্কে কোনো বিভ্রান্তিকর ধারণা থাকবে না যে আমি টাইমস্ অফ ইন্ডিয়ার চরিত্র পাল্টে দিচ্ছি। তাঁদের পাঠকদের মতামত অবশ্যই আমরা পাল্টাতে পারি এবং পাল্টানোর আশা রাখি, তাই নিজেদের বক্তব্য রাখার সুযোগ পেলে আপনারা অবশ্যই তা রাখবেন। কিন্তু দয়া করে আপনারা কেউ এইরকম আশা রাখবেন না যে এইরকম লেখালেখির ফলে কোনো প্রভাবশালী গণমাধ্যমের মূলগত চরিত্র পাল্টে যায়। এই গণমাধ্যমগুলি একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে নির্মিত। আগেই বলেছি, এগুলি আদতে মুনাফাসন্ধানী প্রতিষ্ঠান। হ্যাঁ, কখনো কখনো আমাদের মত লোকদের লেখা তারা ছাপতেই পারে, কিন্তু তার ফলে তাদের মূলগত চরিত্র পাল্টাবে না। একমাত্র প্রভাবশালী গণমাধ্যমের যে একচেটিয়া দখল রয়েছে, তা ভাঙার মধ্যে দিয়েই এই চরিত্র পাল্টাতে পারে। এটা অবশ্য যে কোনো ক্ষেত্রেই সত্যি, যেমন কৃষি ক্ষেত্র। তবে মনে রাখতে হবে বাকি প্রত্যেকটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রই তাদের মতাদর্শিক সুরক্ষার জন্য প্রভাবশালী গণমাধ্যমের দিকেই তাকিয়ে থাকে। আমরা হলাম আদতে পুঁজিবাদের ভাড়াটে গুন্ডা। এই বক্তব্যের যে বিরোধ করবে তাকে তো আমরা রাস্তায় ফেলে মারব। যেমন দেখুন, ২০২০ থেকে ২০২১ এই সময়কালের মধ্যে আমরা বিগত তিরিশ বছরের সর্ববৃহৎ শান্তিপূর্ণ সাংবিধানিক আন্দোলন দেখেছি। গণমাধ্যম আপনার সামনে কৃষক আন্দোলনকে কি এভাবে তুলে ধরেছে ? প্রভাবশালী গণমাধ্যম কি আপনাকে জানিয়েছে দিল্লির দোরগোড়ায় যে লক্ষ লক্ষ কৃষক বসে রয়েছে তারা বিগত তিরিশ বছরে ন্যায়ের জন্য সর্ববৃহৎ আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে ? অতিমারির সর্বোচ্চ পর্যায়ে যে এই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল, তা এঁদের বীরত্বেরই পরিচয়। ৭২০ জন কৃষক এতে প্রাণ দেন, শুধু কোভিডে নয়, পুলিশের জল কামানে ভিজে বিগত চল্লিশ বছরে দিল্লির ভয়ংকরতম শীতে অবোষ্ণতা (হাইপোথার্মিয়া) সহ্য করতে না পেরে, বিগত দশ বছরের সব থেকে উষ্ণ গ্রীষ্ম এবং ভয়াবহ বর্ষার কারণেও। আপনারা নিশ্চয়ই অনেক বেশি বিখ্যাত ২০১১ সালের অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের কথা শুনেছেন ? কয়েক হাজার প্রবল আদর্শবাদী প্রযুক্তিবিদ যুবক, আমার তাঁদের প্রতি প্রবল সহানুভূতি রয়েছে, নিউ ইয়র্কের জুকোটি পার্ক এই আন্দোলনের সময় দখল করেন। পার্কটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ছিল এবং মিঃ জুকোটি এই যুবকদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন। তিনি তাই তাঁদের উঠে যেতে বলেননি। কিন্তু নিউ ইয়র্কের মেয়র নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে আদেশ দেন, ‘এই হতভাগাদের তুলে ছুঁড়ে দাও।‘ এই কয়েক হাজার প্রযুক্তিবিদ এবং অন্য যারা প্রতিবাদী ছিলেন, তাঁদের জুকোটি পার্ক থেকে বলপূর্বক বের করে দেওয়া হয়, যদিও পার্কের মালিকের তাঁদের থাকা নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না। যাই হোক, এই অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট চলেছিল ৯ সপ্তাহ ধরে, অন্যদিকে কৃষকরা দিল্লি গেটে খাড়া ছিলেন ৫৪ সপ্তাহ। একমাত্র তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করার শর্ত সরকার মানার পরেই তাঁরা জায়গা ছাড়েন, যে কৃষি আইন বর্তমানে আবার পেছনের দরজা দিয়ে পাশ করিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। যাই হোক, আমার কথা হল আপনি প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলির একটি সম্পাদকীয় এবং প্রভাবশালী চ্যানেলগুলির একটি অনুষ্ঠান দেখান যেখানে এই আন্দোলনকে নিঃশর্ত সমর্থন প্রদান করা হচ্ছে। হ্যাঁ, প্রতীকী ভাবে আমার মত কাউকে কাউকে অনুষ্ঠানে ডাকা হয়েছে, যাতে এটা বলা যায় যে আমরা সবার কথা শুনছি, ভারসাম্য রেখে কাজ করছি। কিন্তু আপনি আমাকে একটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের নাম বলতে পারবেন না, যারা আন্দোলনের পক্ষে থেকেছে।
আবার গণমাধ্যমের উপর মিঃ আম্বানির প্রভাবের প্রসঙ্গে ফেরত আসি। আপনি জাতীয় সংবাদমাধ্যমে একটি সম্পাদকীয় বা দূরদর্শনে একটি অনুষ্ঠান দেখেছেন, যেখানে তাঁর পুত্রের এই ৬০ কোটি ডলারের বিবাহ অনুষ্ঠান কতটা অশালীন এবং উৎকট তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে ? আপনি আমাকে একটি সম্পাদকীয় দেখাতে পারবেন, যেখানে বলা হচ্ছে এই বিবাহ অনুষ্ঠিত হচ্ছে মহারাষ্ট্রে, যেখানে কৃষক পরিবারগুলিতে লক্ষ লক্ষ বিবাহ প্রতিবছর ভেস্তে যায় কৃষকদের আর্থিক দুরবস্থার কারণে ? প্রতি বছরে যে কয়েক শত কৃষক আত্মহত্যার খবর আমরা পাই, তার একটি প্রধান কারণই হল কৃষকের মেয়ের বিবাহ দিতে না পারা। অনেক ক্ষেত্রেই মাস ছয়েক বাদে মেয়েটিও নিজেকে পিতার আত্মহত্যার জন্য দায়ি মনে করে একই পথ বেছে নেয়। যদি সে এই পথ না বাছে, পুরো গ্রাম তাকে সব সময় মনে করাতে থাকবে তোমার জন্যই তোমার বাবার এই অবস্থা হল। অথচ একটি নেতিবাচক শব্দ খরচ করা হয়নি, একটি নেতিবাচক অনুষ্ঠান হয়নি, একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়নি যেখানে এই ভয়ংকর বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে দেখানো হয়েছে এ কী উৎকট ও দানবিক ব্যাপার। আমি যখন আপনাদের বলছি অর্থের স্বাধীনতা (ফ্রিডম অফ পার্স) তখন আমি এই ব্যাপারটার কথাই বলছি।
আম্বানির বিবাহ নিয়ে আমার বিশ্লেষণ হল এটি একটি অত্যন্ত ধূর্ত ব্যবসায়ী বিনিয়োগ। কেন বলছি ? কারণ ৬০ কোটি ডলার তাঁর ব্যক্তিগত বৈভবের মাত্র ০.২৭%। আদানি, আম্বানি, বিড়লা-র মত বৃহৎ ব্যবসায়ী সমষ্টিদের অর্থের উৎস কী ? উৎস হল নাগরিক সম্পত্তি যা তাদের ইজারা দেওয়া হয় অথবা বেসরকারিকরণের নামে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ভারতে ১০০ কোটি ডলারের উপর সম্পদ রয়েছে এমন কোটিপতির সংখ্যা ২১৭। এদের অর্থের উৎস হল তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ সম্পদ, অরণ্য সম্পদ – এই সব নাগরিক সম্পদ অনেক সময় অনন্তকালের জন্য এদের ইজারা দিয়ে দেওয়া হয়।
ছত্তিসগড়ের হাসদেও জঙ্গলের ৭৯ হাজার একর জমি মিঃ আদানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকদিনই কোনো না কোনো বড় কোম্পানির সিইও কোনো না কোনো মন্ত্রকের সঙ্গে বোঝাপড়া করছে। ধরা যাক, এখানে আপনারা সবাই সরকারী সচিব। আপনাদের দপ্তরে রোজ একবার মিস্টার আম্বানির সিইও একবার মিস্টার আদানির সিইও এসে তদবির করছে তাদের ফাইল ছেড়ে দিতে আর একটা বোঝাপড়া করে নিতে। আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো চিন্তিত যে এই বোঝাপড়ার ফল সাধারণ জনতার জন্য ইতিবাচক হবে না। তারপর আপনি সেই বিখ্যাত বিবাহ অনুষ্ঠান দেখলেন। দেখলেন সেখানে প্রধানমন্ত্রী থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার সকল মন্ত্রী উপস্থিত। দেখলেন উপস্থিত রয়েছে হলিউড আর বলিউডের প্রথম সারির সকল খ্যাতিবান ব্যক্তিত্ব। আপনি যখন একবার দেখলেন যে দেশের ক্ষমতাসম্পন্ন সকল ব্যক্তিত্ব আম্বানির পুত্রের বিবাহ অনুষ্ঠানে এসে হাজিরা দিয়েছেন, পরের দিন যখন আম্বানির সিইও এসে আপনাকে বোঝাপড়ায় আসতে বলবে, আপনি কি না বলতে পারবেন ?
আজ যদি আম্বানি তার ছেলের বিয়েতে ০.২ শতাংশ সম্পদ বা ৬০ কোটি ডলার খরচ করে, আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন পরের বছরে তার কোম্পানিগুলি যে সব চুক্তি আর বোঝাপড়া করবে তা থেকে তার তিন থেকে চারগুণ লাভ হবে। এই সমীকরণ নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা রাখবেন না। বর্তমানে আম্বানির ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ ১১৮০০ কোটি ডলার, যা প্রায় ১৯ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির সম্পত্তির পরিমাণ আমাদের রাষ্ট্রের কৃষি খাতে বরাদ্দ করা অর্থের সাড়ে সাতগুণ। ফোর্বেস দৈনিক যে হিসেব রাখে, সেই অনুসারে এই ১০-ই ডিসেম্বরে আমাদের দেশে ২১৭ জন এমন কোটিপতি রয়েছেন যাদের সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার বা তার অধিক। আপনি জানেন এই সমস্ত সম্পদ একত্রিত করলে কত দাঁড়ায় ? ১০৪১০০ কোটি ডলার। মানে, ১ লক্ষ চার হাজার কোটি ডলার। আমরা এখানে ১ লক্ষ কোটি ডলারের কথা বলছি। ভাবুন সম্পদের কী পরিমাণ কেন্দ্রীভবন ! আপনি সম্পদের এই কেন্দ্রীভবন প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে একটি কথাও বলতে দেখেছেন ? দেখেছেন যে তারা বলছে এটি একটি সুস্থ পরিস্থিতি নয় ? ভারতের উপর তলার ১% আর নিচের তলার ৫০%-এর মধ্যে গৃহস্থ সম্পদের যে ব্যবধান তা এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদশালী ১% আর নিচের তলার ব্যবধানের থেকেও বেশি। আমি একটা উদাহরণ দিচ্ছি। আমি তো ফোর্বেস সব সময় পড়ি। ওটা আমার সবথেকে প্রিয় ওয়েবসাইট। আমারও তো আকাঙ্খা থাকে নাকি, যে একদিন আমার নামও ফোর্বেসের তালিকায় জ্বলজ্বল করবে। তো যাই হোক, আমি ভাবলাম একবার পরীক্ষা করে দেখি যে এই যে পুঁজিবাদ বলছে আমরা সবাই যদি মিঃ আম্বানির মত পরিশ্রম করি, আর আপনারা তো জানেনই তিনি কী কোঠর পরিশ্রম করেন, তাহলে আপনি আমিও ১০০ কোটির মালিক হতে পারব, এই কথাটা কতদূর সত্যি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই বক্তব্য এমনকি তাত্ত্বিক ভাবনার স্তরেও গোড়াতে ধাক্কা খায়। যদি প্রচুর খাটলেই ১০০ কোটির মালিক হওয়া যেত, তাহলে গ্রামীণ ভারতের প্রত্যেক মহিলা কোটিপতি হতেন। একই কথা আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা আর এশিয়ার মহিলাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই গোটা বক্তব্যই যে একেবারে ভিত্তিহীন, তা এই পরিশ্রমী মহিলাদের অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়। তারপর আমি ভাবলাম একবার পরীক্ষা করে দেখি এই ১১৮০০ কোটি ডলারের কতটা আম্বানির নিজের সম্পত্তি। এই পাঁচ ছয় বছর আগে আম্বানি তাঁর বার্ষিক আয় ১৫ কোটিতে থামিয়ে দেন এই বলে যে তিনি যথেষ্ট আয় করছেন, এর বেশি তাঁর প্রয়োজন নেই। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এটা দেখব যে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইনের অধীনে কোনো প্রকল্পে শ্রমদাতা একজন সাধারণ মানুষ (মানুষ – শুধু পুরুষ নয় কারণ আপনি এই প্রকল্পে মহিলাদেরই অধিক দেখবেন) ১০০ দিনে আয় করে এই আয়তে কবে পৌঁছবেন। প্রথমেই আমি ধরে নিচ্ছি তিনি ১০০ দিনের কাজই পাচ্ছেন এবং এও ধরে নিচ্ছি তিনি প্রবল পরিশ্রম করছেন। এই পরিশ্রমের ফলে তিনি কি আম্বানির মত সম্পদশালী হতে পারবেন ? আলবাত পারবেন ! আমি আনন্দের সঙ্গে আপনাদের জানাচ্ছি, পরিশ্রম করে আম্বানির মত ধনী হওয়া সম্ভব। একটু সময় লাগবে, এই যা। এই ধরুন ৩৫ কোটি ৪ লক্ষ বছর। হিসেব করে মিলিয়ে দেখুন। অবশ্য যদি আপনার উচ্চাকাঙ্খা কম হয় এবং আপনি আম্বানির বার্ষিক আয় নিয়েই খুশি থাকেন, তাহলে আপনার কাজ আরও দ্রুত হবে, মাত্র ৫০৯১ বছরে। এবার ভাবুন, এই ব্যক্তিই এই দেশের গণমাধ্যমের সবথেকে বড় মালিক। হ্যাঁ, আর গণমাধ্যমের যে অংশগুলির তিনি মালিক নন, সেই অংশেরও তিনি সবথেকে বড় বেসরকারি বিজ্ঞাপন দাতা। কৃষক আন্দোলনের সময় আপনাদের মধ্যে কেউ যদি টিকরী, শাহজাহানপুর বা গাজিপুরে যেতেন, তাহলে দেখতেন প্রত্যেক দুটি স্লোগানের মধ্যে একটিতে আম্বানি আর আদানিকে নিশানা করা হচ্ছে। টিভি খুললে আপনি কিন্তু কিন্তু এই দৃশ্য দেখতে পেতেন না। আপনারা কি মনে করেন এই ব্যক্তির কর্পোরেট ক্ষমতার মাধ্যমে গণমাধ্যমের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই ? একটু ভেবে দেখবেন।
অনুবাদঃ রবিকর গুপ্ত
প্রকাশ: ১৫-অক্টোবর-২০২৫
শেষ এডিট:: 14-Oct-25 23:58 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-obscenity-of-india’s-wealthy-part-i-
Categories: Fact & Figures
Tags: capitalism, cronycapitalism, wealthy
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (157)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (142)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (79)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





