বর্গা উচ্ছেদকে আইনি বৈধতা দিতে চায় রাজ্য

Author
ওয়েবডেস্ক

Mamata Govt. Willing To Remmove Bargas

প্রকাশ: ০৯-মার্চ-২০২০

বর্গা উচ্ছেদকে আইনি বৈধতা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে রাজ্যের তৃণমূল সরকার!

ক্ষমতায় আসার পর পাট্টা ও বর্গার জমি থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এবার সেই উচ্ছেদকেই আইনগত স্বীকৃতি দিতে উদ্যোগ নিচ্ছে মমতা ব্যানার্জির সরকার।

বিভিন্ন জেলাতে গত দু’বছর ধরে ওয়ার্কশপের নাম করে সরকার উচ্ছেদের জমিকে আইনি বৈধতা দেওয়া চেষ্টা চালিয়েছে। সরকারের গোপন অ্যাজেন্ডা প্রকাশ্যে এসেছে হাওড়া জেলা প্রশাসনের এক সভা ঘিরে। গত ২৯ফেব্রুয়ারি জেলা শাসকের উপস্থিতিতে জেলার ভূমিসংস্কার দপ্তরের কর্মীদের নিয়ে একটি ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনার বিষয় ছিল, ‘ওয়ার্কশপ অন মিউটেশন, কনভারশান অ্যান্ড বর্গা ডিলিশান।’ মিউটেশন ও কনভারশান নিয়ে আলোচনার সঙ্গে বর্গা বাতিলের আলোচনা ঘিরে তুমুল আলোড়ন তৈরি হয়েছে। কর্মীদের অভিযোগ, ‘দীর্ঘ চাকরি জীবনে সরকারের উদ্যোগে শিবির করে জমির পাট্টা তুলে দেওয়া হয়েছে। বর্গাদারদের সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু সরকার বর্গা বাতিল নিয়ে ওয়ার্কশপের কোনও নজির এর আগে কখনো ঘটেনি।’

জেলা প্রশাসনের এই বৈঠকের খবর সোশ্যাল মিডিয়া মারফত প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। কীভাবে বর্গা বাতিল নিয়ে আলোচনার বিষয় ঠিক হলো, তা জানতে চেয়েছেন ভূমি সংস্কার দপ্তরের জয়েন্ট লেবার কমিশনার।

হাওড়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ভূমি সংস্কার দপ্তরের ডিরেক্টরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লিখিত অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সেটেলমেন্ট কর্মচারী সমিতি। ‘আমরা আধিকারিকের কাছে জানতে এতদিন বেআইনি উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে আইনগত বৈধতা দেওয়ার জন্যই কী প্রশাসন উদ্যোগ নিচ্ছে।’ হাওড়ার ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কর্মচারী সংগঠন।

ঘটনা হলো, ২০১২সাল থেকে গোটা রাজ্য জুড়ে শাসক দলের মদতে জমি থেকে ব্যাপকহারে পাট্টাদার ও বর্গাদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। উচ্ছেদের সেই জমি তুলে দেওয়া হয়েছে রিয়েল এস্টেট কোম্পানি, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, বেসরকারি বিটি কলেজকে। এখন ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ সহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নেওয়ার জন্য আবেদন জমা করার সময় রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে জমির মালিক পাট্টাদার। কোথাও আবার বর্গাদার আছে জমিতে। ফলে রাজনৈতিকভাবে উচ্ছেদের জমিকে কীভাবে আইনগতভাবে বৈধতা দেওয়া যায়, তার পরিকল্পনা শুরু করেছে সরকার। ভূমি সংস্কার দপ্তরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘আগের সরকারের আমলে কতজনকে বর্গা সার্টিফিকেট দেওয়া গেছে, কতজন পাট্টা পেয়েছেন, তার ভিত্তিতে পারফরমেন্স রিপোর্ট তৈরি হতো। এখন ঠিক তার উলটোটা চলছে।’

২০১২সালের মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাত্র এক বছরেই ২৬হাজার ৮৩৮জন পাট্টাদার ও বর্গাদারকে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। ৯হাজার ৪০০একর জমি থেকে এই উচ্ছেদ অভিযান সংগঠিত হয়েছিল। সাত বছর আগে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে এই অভিযোগ জানিয়ে এসেছিলেন বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ। ২০১২সালের পর থেকেও লাগাতার পাট্টাদার ও বর্গাদারদের জমি থেকে এই উচ্ছেদ চলেছে। এখন সেই উচ্ছেদকেই আইনগত বৈধতা দিতে সরকার উঠেপড়ে লেগেছে।

প্রশাসনের একটি সূত্রের খবর, গত আট বছরে রাজ্যে বহু পাট্টার জমিকেই আইনগতভাবে রদ করা হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, হুগলী, পূর্ব বর্ধমান, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় ব্যাপকহারে পাট্টার জমি থেকে পাট্টাকে রদ করা হয়েছে। প্রশাসনিক ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে ‘পাট্টা অ্যানালমেন্ট’ বলা হয়। একইভাবে বর্গার জমিকে আইনি প্রক্রিয়া মারফত দখলের স্বীকৃতিকে প্রশাসন ‘বর্গা ডিলিশান’ বলে উল্লেখ করে। আইনগতভাবে এই কাজ করার জন্য পাট্টাদার ও বর্গাদারদের জন্য রক্ষাকবচের ব্যবস্থা আছে। প্রয়োজন থাকে তাঁদের সম্মতির। একইসঙ্গে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থার সংস্থানও আইনে আছে। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে মোটরগাড়ি কারখানার জন্য সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণের পর পাট্টাদার ও বর্গাদারদের আইন মেনেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এখন সেসব রক্ষাকবচ উধাও। আগে দখল হয়েছে জমি। এবার সেই বেআইনি উচ্ছেদকে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ভূমি সংস্কার দপ্তর সূত্রেই জানা গেছে, গত দু’বছর ধরে সরকার ওয়ার্কশপ করে সামনে এনেছে মিউটেশন ও কনভারশানকে। কিন্তু সরকারের গোপন অ্যাজেন্ডায় ছিল পাট্টা ও বর্গার জমিতে বেআইনি উচ্ছেদকে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়ার। হাওড়ার জেলা প্রশাসন প্রকাশ্যে ‘বর্গা ডিলিশান’ লিখে ফেলায় তা ফাঁস হয়ে গেছে।

হাওড়া জেলা প্রশাসনের এই পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ভূমি সংস্কার দপ্তরের ভিতরেই। ঘটনা প্রকাশ্যে চলে আসাতেই জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে সাফাই দেওয়া হচ্ছে, আলোচনায় বিষয়ে বর্গা রদ থাকলেও তা নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। বিষয়টি স্রেফ চোখ এড়িয়ে গেছে চালানোর চেষ্টা চলছে। সভামঞ্চের ব্যাকড্রপে এমনকি সূচনার সময় জেলা শাসক যেখান থেকে প্রদীপ জ্বালান, সেখানেও বড় ব্যানারে জ্বলজ্বল করেছে বর্গা ডিলিশান লেখাটি।

হাওড়ার পাশপাশি রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও এইভাবে ওয়ার্কশপের নাম করে কীভাবে পাট্টা ও বর্গাকে আইনি প্রক্রিয়ায় রদ করা যায় তা শুরু হয়েছে। সংখ্যালঘু নিবিড় মুর্শিদাবাদ জেলাতে নাম ছিল ‘মিউটেশন মেলা’। এখন মিউটেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে অনলাইন নির্ভর। সেখানে মেলার কী প্রয়োজন, প্রশ্ন ভূমি সংস্কার দপ্তরেই। আসলে বেআইনি কাজকে আইনি করার জন্য ভিন্ন নামে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরে গত তিন বছরে ধরে বহু জমির পাট্টা আইনগতভাবেই রদ করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, খুবই গোপনে ফাইল তৈরি করে মহকুমা পর্যায়ের আধিকারিদের কাজে লাগিয়ে পাট্টা রদ করা হয়েছে।

গোটা দেশে ৩শতাংশ জমি পশ্চিমবঙ্গে। অথচ বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে রাজ্যে ৩০লক্ষের ওপর ভূমিহীন কৃষক পাট্টা পেয়েছেন। ১১লক্ষ ২৭হাজার একরের ওপর জমিতে গরিব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ভূমি সংস্কারে বামফ্রন্ট সরকারের এই ভূমিকার জন্য ২০০৬সালে বিশ্বব্যাঙ্ক ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’এ রাজ্যের প্রশংসা করা হয়। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে পাট্টা প্রাপক কৃষকেদের মধ্যে ৩৭শতাংশ তফসিলি জাতি, ১৮শতাংশ করে আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কৃষক জমির ওপর নিজের অধিকার পেয়েছিলেন।

গত আট বছরে কৃষকের পাট্টার পরিমাণ খুবই নগণ্য। আর বর্গাদার নথিভুক্তির একটাও নজির নেই। বরং জমি থেকে বর্গাদার ও পাট্টাদারদের উচ্ছেদ পর্বের পর তা আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 09-Mar-20 17:58 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/mamata-govt-willing-to-remmove-bargas
Categories: Current Affairs
Tags: agricultureinwb, bargarecordwb, mamata banerjee cm
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড