ভারতের ক্রীড়ানীতি: একটি ধারাবাহিক ইতিহাস (অষ্টম পর্ব)

Author
সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়

১৯৯৬–২০০৬ সময়কাল ভারতের এশিয়ান গেমস, অলিম্পিক ও কমনওয়েলথ গেমসের অভিজ্ঞতায় এক রূপান্তরের যুগ। এই দশক দেখায় যে আন্তর্জাতিক সাফল্য কেবল প্রতিভার ফল নয়; তা নির্ভর করে নীতি, অবকাঠামো, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতার উপর।

India's Sports Policy: A Continuous History (viii)
১৯৯৬ থেকে ২০০৬—এই দশকটি ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র রূপান্তরমূলক পর্যায়। এই সময়কালকে বোঝার জন্য ক্রীড়াকে আলাদা কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং উদারীকরণ-পরবর্তী রাজনৈতিক অর্থনীতি, রাষ্ট্রের নীতি-দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, কর্পোরেট পুঁজির বিস্তার, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং মধ্যবিত্ত সমাজের সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর যে বেসরকারিকরণ ও বাজারমুখী নীতির সূচনা হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ অভিঘাত ক্রীড়াক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মূলত ১৯৯৬–পরবর্তী সময়ে। এই পর্বে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতার জায়গায় ক্রমশ নীতিগত সহায়তা, নিয়ন্ত্রণ ও মধ্যস্থতার ভূমিকা জোরদার হয়, আর বাস্তব অর্থায়ন, সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়তার একটি বড় অংশ চলে যায় কর্পোরেট ও বেসরকারি উদ্যোগের হাতে।

এই সময়ে রাষ্ট্রের ক্রীড়া নীতিতে একটি সুস্পষ্ট দ্বৈততা লক্ষ করা যায়। একদিকে সরকার ক্রীড়াকে জাতীয় মর্যাদা, আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে আগ্রহী ছিল, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংস্কারের বাস্তবতায় সরাসরি সরকারি ব্যয় হ্রাস পায়। ফলে ক্রীড়া ফেডারেশন ও জাতীয় সংস্থাগুলিকে ‘স্বনির্ভরতা’ ও ‘বাজারযোগ্যতা’-র যুক্তির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। ভারতীয় ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কোচিং স্কিম ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রকল্প এই সময়ে বিস্তৃত হলেও তা ছিল অসম ও নির্বাচনী। ক্রিকেট বাদে অধিকাংশ খেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গ্রাসরুট প্রতিভা অন্বেষণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠেনি। ‘এলিট পারফরম্যান্স’-কে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও, সেই এলিট তৈরির সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বলই থেকে যায়।

১৯৯৬ থেকে ২০০৬—এই দশকটি ভারতের বহুক্রীড়া ইতিহাসে এক গভীর পুনর্বিন্যাসের পর্ব। এই সময়ে ভারতের এশিয়ান গেমস, অলিম্পিক ও কমনওয়েলথ গেমসে অংশগ্রহণ ও ফলাফলকে আলাদা আলাদা ক্রীড়া-ঘটনা হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের ক্রীড়নীতি, উদারীকরণ-পরবর্তী রাজনৈতিক অর্থনীতি, প্রশাসনিক কাঠামো, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং দেশীয় সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিচার করা জরুরি। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের পরে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে প্রত্যক্ষ অর্থায়ন থেকে সরে এসে নীতিনির্ধারক ও সহায়কের ভূমিকায় নিজেকে পুনঃস্থাপন করে; এই প্রবণতা ১৯৯৬–এর পর বহুক্রীড়া ক্ষেত্রেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে আন্তর্জাতিক বহু-ক্রীড়া আসরে ভারতের সাফল্য–ব্যর্থতা এই সময়ে আর কেবল ক্রীড়াবিদদের দক্ষতার প্রশ্ন ছিল না; তা হয়ে ওঠে নীতি, অবকাঠামো, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সম্মিলিত ফল।

এই দশকে অলিম্পিক মঞ্চে ভারতের অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত সাফল্য ও দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতার সমাহার। ১৯৯৬ সালের আটলান্টা অলিম্পিক থেকে শুরু করে ২০০০ সালের সিডনি এবং ২০০৪ সালের এথেন্স অলিম্পিক—প্রতিটি আসরেই ভারতের পদকসংখ্যা ছিল অল্প, কিন্তু প্রতিটি পদকের সামাজিক ও নীতিগত তাৎপর্য ছিল গভীর। সিডনি অলিম্পিকে ব্যক্তিগত ক্রীড়াবিদের মাধ্যমে পদক অর্জন একটি মনস্তাত্ত্বিক বাঁক নির্দেশ করে; এটি প্রমাণ করে যে উপযুক্ত সহায়তা ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রস্তুতিতে ভারতীয় ক্রীড়াবিদ বিশ্বমঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম। তবু এই সাফল্য ছিল ব্যতিক্রমী, কাঠামোগত নয়। অলিম্পিক প্রস্তুতিতে আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স, পুষ্টি, পুনর্বাসন, মানসিক প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি প্রকট ছিল। রাষ্ট্রের ক্রীড়নীতি অলিম্পিককে ‘মর্যাদার ক্ষেত্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, বাস্তবে বিনিয়োগ ছিল খণ্ডিত ও দেরিতে গৃহীত সিদ্ধান্তনির্ভর। ফলে পদকপ্রত্যাশা প্রায়ই ব্যক্তিগত উদ্যোগের উপর নির্ভরশীল থেকে যায়।

এশিয়ান গেমসে ভারতের অবস্থান এই দশকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও, তা এশিয়ার শীর্ষ ক্রীড়া শক্তিগুলির সঙ্গে ব্যবধান স্পষ্ট করে দেয়। ১৯৯৮ সালের ব্যাংকক এশিয়ান গেমস ও ২০০২ সালের বুসান এশিয়ান গেমসে ভারতের পদকসংখ্যা কিছু নির্দিষ্ট খেলায় বৃদ্ধি পায়—বিশেষত শুটিং, কুস্তি, বক্সিং ও কিছু অ্যাথলেটিক্স ইভেন্টে। তবে এই অগ্রগতি ছিল অসম এবং প্রায়ই নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা কোচিং উদ্যোগের ফল। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত, দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক ক্রীড়া ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে ভারতের নীতিগত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এশিয়ান গেমস ভারতের কাছে এক ধরনের ‘আঞ্চলিক আয়না’ হিসেবে কাজ করে—যেখানে সম্ভাবনা যেমন দেখা যায়, তেমনি প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বিনিয়োগের ঘাটতিও উন্মোচিত হয়।

কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের অভিজ্ঞতা এই দশকে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। ১৯৯৮ সালের কুয়ালালামপুর ও ২০০২ সালের ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের পদকপ্রাপ্তি বহুমুখী ছিল এবং কিছু খেলায় ধারাবাহিকতা দেখা যায়। ভারোত্তোলন, শুটিং ও কুস্তিতে ভারতের শক্ত অবস্থান এই সময়ে গড়ে ওঠে, যদিও তা ডোপিং বিতর্ক ও প্রশাসনিক দুর্বলতায় বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে। কমনওয়েলথ গেমসের প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো, অংশগ্রহণকারী দেশের বৈচিত্র্য এবং তুলনামূলকভাবে কম প্রযুক্তিনির্ভর কিছু ইভেন্ট ভারতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। রাষ্ট্রের ক্রীড়নীতি এই আসরকে অলিম্পিকের তুলনায় অধিক বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে, যার ফলে নির্বাচিত খেলায় লক্ষ্যভিত্তিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

এই তিনটি আন্তর্জাতিক আসরে ভারতের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের ক্রীড়নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করে—নীতি ও বাস্তবায়নের ফাঁক। কাগজে-কলমে ক্রীড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সম্প্রসারণ ও এলিট অ্যাথলিট স্কিমের ঘোষণা থাকলেও, বাস্তবে সেগুলির প্রয়োগ ছিল অসম। গ্রাসরুট স্তরে প্রতিভা অনুসন্ধান, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়ার সঙ্গে জাতীয় প্রস্তুতির সংযোগ এবং কোচিং পেশার পেশাদারীকরণ—এই ক্ষেত্রগুলিতে ঘাটতি রয়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক সাফল্য প্রায়ই নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

এই দশকে ক্রীড়া প্রশাসনের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যায়। আদালতের হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের দাবি ক্রীড়া শাসনে নতুন মাত্রা যোগ করে। নির্বাচন প্রক্রিয়া, ফেডারেশনের আর্থিক স্বচ্ছতা ও খেলোয়াড়দের অধিকার নিয়ে বিতর্ক আন্তর্জাতিক প্রস্তুতির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত করে, যা অলিম্পিক ও এশিয়ান গেমসের মতো উচ্চস্তরের প্রতিযোগিতায় বিশেষভাবে ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৯৬–২০০৬ সময়ে আন্তর্জাতিক বহুক্রীড়া আসরগুলির গুরুত্ব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা ও কর্পোরেট উপস্থিতির ফলে অলিম্পিক বা এশিয়ান গেমসের সাফল্য গণমাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কম জায়গা পায়। তবু অলিম্পিক পদক বা কমনওয়েলথ গেমসের সাফল্য জাতীয় গর্ব ও নীতিগত আত্মসমালোচনার উপলক্ষ তৈরি করে। এই দ্বৈততা—একদিকে ক্রিকেট-নির্ভর ক্রীড়া সংস্কৃতি, অন্যদিকে বহুক্রীড়া সাফল্যের সীমিত কিন্তু গভীর প্রতীকী গুরুত্ব—রাষ্ট্রের ক্রীড়নীতি নির্ধারণে জটিলতা সৃষ্টি করে।

এই দশকে কর্পোরেট পুঁজির প্রবেশ ভারতীয় ক্রীড়ার চরিত্র আমূল পাল্টে দেয়, বিশেষত ক্রিকেটে। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপের পর ক্রিকেট কেবল আবেগ বা জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক শিল্পে রূপান্তরিত হয়। টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, বিজ্ঞাপন ও খেলোয়াড়দের ব্র্যান্ড ভ্যালু—এই চারটি স্তম্ভ ক্রিকেটকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্রে পরিণত করে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও স্যাটেলাইট সম্প্রচারের বিস্তারের ফলে দর্শকসংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ক্রিকেটের বাজারমূল্য বহুগুণে বেড়ে যায়। বোর্ড কার্যত একটি কর্পোরেট সংস্থার মতো আচরণ শুরু করে, যেখানে আর্থিক লাভ, সম্প্রচার চুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব ক্রীড়া প্রশাসনের কেন্দ্রে অবস্থান নেয়। খেলোয়াড়দের আয়, সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেলেও, একই সঙ্গে ক্রিকেটের উপর বাজার ও কর্পোরেট স্বার্থের নিয়ন্ত্রণ গভীরতর হয়।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাফল্যের ক্ষেত্রে এই দশকটি ছিল খণ্ডিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। অলিম্পিক মঞ্চে ভারতের পারফরম্যান্স সামগ্রিকভাবে দুর্বলই থেকে যায়, কিন্তু এই সময়ে কিছু ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জিত হয় যা ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করে। ২০০০ সালের সিডনি অলিম্পিকে একক অ্যাথলিটের মাধ্যমে পদক অর্জন কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের ক্রীড়া ভাবনায় এক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনে। এরপর অ্যাথলেটিক্স, শুটিং ও ওজনোত্তোলনে ব্যক্তিনির্ভর সাফল্যের সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে থাকে। তবে এই সাফল্য ছিল কাঠামোগত নয়; প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার অসমতা, আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্সের সীমিত ব্যবহার এবং প্রশাসনিক জটিলতা আন্তর্জাতিক স্তরে ধারাবাহিক সাফল্যের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

এশিয়ান গেমস এই সময়ে ভারতের ক্রীড়া শক্তি ও সীমাবদ্ধতার সবচেয়ে বাস্তব প্রতিফলন ঘটায়। এশিয়ার শীর্ষ ক্রীড়া শক্তিগুলির সঙ্গে তুলনায় ভারতের পারফরম্যান্স মাঝারি পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল, তবে নির্দিষ্ট কিছু খেলায় উন্নতির ধারা লক্ষ করা যায়। শুটিং, কুস্তি, বক্সিং ও কিছু অ্যাথলেটিক্স ইভেন্টে পদকসংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। তবু চীন বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত, দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক ক্রীড়া পরিকল্পনার সঙ্গে ভারতের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই তুলনা রাষ্ট্রের নীতিগত সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগের অসমতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে।

কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল এবং এই সময়ে সেটি এক ধরনের ‘মধ্যম স্তরের সাফল্যের ক্ষেত্র’ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিযোগিতার কাঠামো, অংশগ্রহণকারী দেশের বৈচিত্র্য এবং কিছু খেলায় কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতার ভূমিকা এখানে কার্যকর হয়। ভারোত্তোলন, শুটিং ও রেসলিংয়ে ভারতের উপস্থিতি শক্তিশালী হয়, যদিও এই সাফল্যও ছিল অসম এবং প্রায়শই বিতর্ক, ডোপিং সমস্যা ও প্রশাসনিক ত্রুটিতে আচ্ছন্ন।

এই দশকে ক্রীড়া প্রশাসনের চরিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। আদালতের হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের দাবি ক্রীড়া শাসনে নতুন মাত্রা যোগ করে। ক্রিকেটে এই পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়—সম্প্রচার অধিকার, খেলোয়াড় চুক্তি, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রশ্নে আইনি ও নীতিগত বিতর্ক তীব্র হয়ে ওঠে। একদিকে খেলোয়াড়দের অধিকার ও পারিশ্রমিকের নিরাপত্তা কিছুটা বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে ক্রীড়া ব্যবস্থার উপর কর্পোরেট ও বাজারের আধিপত্য আরও সুসংহত হয়।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে এই দশকে ক্রীড়া মধ্যবিত্ত ভারতের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে। টেলিভিশন, বিজ্ঞাপন ও ভোক্তা সংস্কৃতির মাধ্যমে ক্রীড়া তারকা নতুন ধরনের সামাজিক আদর্শে পরিণত হয়। ক্রিকেটারদের জীবনযাপন, পোশাক, ভাষা ও জনপ্রিয়তা মধ্যবিত্ত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। এর ফলে ক্রীড়া অংশগ্রহণের স্বপ্ন বিস্তৃত হলেও, বাস্তবে সুযোগ ও সম্পদের বণ্টনে শ্রেণিগত বৈষম্য আরও প্রকট হয়।

এইভাবে ১৯৯৬–২০০৬ সময়কালকে ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে এক দ্বৈত বাস্তবতার যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। একদিকে ক্রিকেটে অভূতপূর্ব কর্পোরেট উপস্থিতি, আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা ও আর্থিক সমৃদ্ধি; অন্যদিকে অধিকাংশ খেলায় কাঠামোগত দুর্বলতা, অসম অর্থায়ন ও সীমিত আন্তর্জাতিক সাফল্য। রাষ্ট্র, বাজার ও কর্পোরেট পুঁজির পারস্পরিক সম্পর্ক ক্রীড়াকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিলেও, একই সঙ্গে এটি ক্রীড়ার সামাজিক দায়িত্ব, সমতা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

১৯৯৬–২০০৬ সময়কাল ভারতের এশিয়ান গেমস, অলিম্পিক ও কমনওয়েলথ গেমসের অভিজ্ঞতায় এক রূপান্তরের যুগ। এই দশক দেখায় যে আন্তর্জাতিক সাফল্য কেবল প্রতিভার ফল নয়; তা নির্ভর করে নীতি, অবকাঠামো, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতার উপর। রাষ্ট্র এই সময়ে নীতিগতভাবে ক্রীড়াকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, বাস্তবে বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়ে যায়। তবু এই দশকের সীমিত সাফল্য ও স্পষ্ট ব্যর্থতাই পরবর্তী সময়ে অধিক সমন্বিত ক্রীড়া নীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

নবম পর্বে থাকবেঃ ২০০৭–২০২৩ সময়ে ভারতীয় ক্রীড়া কর্পোরেট পুঁজি, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের সংযোগে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করে—যেখানে সাফল্য ও পেশাদারিত্বের আড়ালে ক্রীড়ার সামাজিক ভিত্তি, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ে।


প্রকাশ: ০৫-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 05-Feb-26 09:48 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/indias-sports-policy-a-continuous-history-viii
Categories: Fact & Figures
Tags: , indian sports, indian commonweath game
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড