ভারতীয় সম্পদশালীদের উৎকট আচরণ (৩য় পর্ব)

Author
পি সাইনাথ

আমরা কী করব? অবশ্যই আমাদের লড়ে যেতে হবে। আপনি হাল ছেড়ে বসে গেলেন তো মরলেন। সেটা করার অধিকার অবশ্য আপনার রয়েছে।

The Obscenity of India’s Wealthy (Part III)

২০২৪ সালের ২১-শে ডিসেম্বর ইন্ডি জার্নাল মিডিয়া কনক্লেভে অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও পিপলস্‌ আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক পি. সাইনাথ বক্তৃতা করেন। তিন পর্বের এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনে সে বক্তৃতারই বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হল। প্রতিবেদনের বাংলা শিরোনাম ওয়েবডেস্কের নিজস্ব।

পি সাইনাথ

(৩য় পর্ব)

 

ইন্টারনেট বা আন্তর্জাল এক আশ্চর্য আবিষ্কার। আমার মত একজন, যে ছাপা গণমাধ্যমের প্রতি আসক্ত, সে হঠাৎ করে ডিজিটাল প্রকাশনার দিকে কেন গেল ? একটা কারণ অবশ্যই তাতে খরচ অনেক কম আর বিশ্বে বর্তমানে পাঠকদের ঝোঁকও ঐদিকেই। কিন্তু আবার প্রতিকূল দিকও রয়েছে। আন্তর্জাল অঙ্গীকার করে যে সে সবার কন্ঠ হবে। কিন্তু সে এই কথা কখনই দিতে পারে না যে সেই কন্ঠের আওয়াজ একটি কর্ণের কাছেও পৌঁছবে। বিশেষ করে আপনি যদি খরচ না করেন, এই কথা তো সে আরই দেবে না। ধরুন আপনার টুইটারে অনুগামী সংখ্যা ৮৫ হাজার। আপনি একটি পোস্ট দিলে এর মধ্যে কতজনের কাছে পৌঁছতে পারবেন? বড়জোর মোট অনুগামীর ২%। তার থেকে বেশি মানুষের কাছে যদি আপনাকে পৌঁছতে হয়, তাহলে আপনাকে টাকা খরচ করে প্রচারমূলক পোস্ট দিতে হবে। তাই আমার মতে এই সংস্থাগুলি হল আদতে বৈশ্বিক গণসম্পত্তির সবথেকে বড় বে-আইনি দখলদার। বর্তমানে বিশ্বের সবথেকে বড় একচেটিয়া অর্থনৈতিক আধিপত্য হল ডিজিটাল একচেটিয়া আধিপত্য। চারজন ব্যক্তি নির্ধারণ করে চারশো-পাঁচশো কোটি লোক কী দেখবে, কী শুনবে, কী বলবে। এই প্রসঙ্গে বলি, আরেকটি বিষয়েও আমাদের নিজেদের অভ্যাস একটু পাল্টানো প্রয়োজন। একটু আগেই সভাপতি মহোদয় বলছিলেন না, যে প্রযুক্তি আমাদের কীভাবে প্রভাবিত করছে সেটা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন? আমি তার খেই ধরে এই প্রশ্ন করছি যে ভাবুন প্রযুক্তির প্রভাব সংবাদিকতায় কীভাবে পড়ছে? বা সামগ্রিক ভাবে পাঠের অভ্যাসের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব কী? এই নিয়ে বর্তমানে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। আপনারা জানেন এই বছর অক্সফোর্ড অভিধানের বার্ষিক শব্দ হিসেবে ‘ব্রেন রট’ (Brain Rot) কথাটি নির্বাচিত হয়েছে – যার অর্থ হল আন্তর্জালে ও সামাজিক মাধ্যমে প্রাপ্ত মামুলি বা ভাবনার উদ্রেক করে না এমন তথ্য অতিরিক্ত ঠেসে ঠেসে দিয়ে মগজ ভর্তি করা। আন্তর্জালে বার্ষিক শব্দ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘ডুমস্ক্রলিং’ (Doomscrolling), যার অর্থ কোনো সচেতন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই নেতিবাচক খবর আন্তর্জালে ও সমাজমাধ্যমে স্ক্রল করে দেখে যাওয়া। দয়া করে ফোনের বাইরেও একটু খবর পড়ুন। সাম্প্রতিক সময়ে হাভার্ড মেডিক্যাল স্কুল, লন্ডনের কিংস কলেজ, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গণস্বাস্থ্য সংক্রান্ত এক ডজনের কাছে গবেষণা রয়েছে এই প্রসঙ্গে, যেখানে বলা হয়েছে এই ডুমস্ক্রলিং এবং অন্তহীন গুরুত্বহীন তথ্য মাথায় ঠাঁসা, যা হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির মধ্যে পড়ে, তার একটা গুরুতর মানসিক অবক্ষয়ী প্রভাব আছে। আপনার স্মৃতি, আপনার মনঃসংযোগের ক্ষমতার উপর এর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আপনার বৌদ্ধিক ক্ষমতা  ও দক্ষতাও গুরুতর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যা নানা প্রবন্ধে প্রকাশিত হচ্ছে, অন্ততঃ তা-ই জানাচ্ছে। আপনি কিন্তু এই ডিজিটাল ক্ষেত্রে একচেটিয়া দখলদারি কায়েম করা আধিপতিদের কল্যাণে এই সমস্ত প্রবন্ধের হদিশ খুব একটা পাবেন না। ডিজিটাল ক্ষেত্রে একচেটিয়া অধিকার কায়েম করা এই চারটি সংস্থা এখন চিরাচরিত ও ঐতিহ্যশালী গণমাধ্যমগুলিকেও কিনে নিচ্ছে। মনে রাখবেন, আমাজনের মালিক জেফ বেজোস কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্টেরও মালিক। এও মনে রাখবেন ওয়াশিংটন পোস্ট যখন কমলা হ্যারিসকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে সমর্থন করতে চেয়েছিল, বেজোস তাতে বাধা প্রদান করেন। খুব সহজ হিসেব। আমার কথা শোন, নইলে কলের জল বন্ধ করে দেব। ব্যাস, ওয়াশিংটন পোস্ট বাঁচবে না। আমি এর মালিক, আমার ইচ্ছে আমি বন্ধ করে দেব, কার কী বলার আছে?

বুঝলেন?

এবার বলি কেন আমি জোরের সঙ্গে বলছি এই যে চারটি সংস্থার ডিজিটাল ক্ষেত্রে একচেটিয়া অধিকার স্থাপন, এইরকম একচেটিয়া ব্যবসা ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি আর কেনই বা আমি মনে করি ইতিহাসের বাকি সমস্ত একচেটিয়া পুঁজির দখলদারির থেকে এই ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত একচেটিয়া দখলদারি আলাদা। আমার মতে ডিজিটাল ক্ষেত্রে একচেটিয়া দখলদারি আলাদা, কারণ এই সংস্থাগুলি আপনার ব্যক্তিগত তথ্যের মালিকানা হাতিয়ে নিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো একচেটিয়া ব্যবসার হাতে ব্যক্তিগত তথ্যের মালিকানা থাকত না। আজ যদি প্রমথেশ তার বন্ধুকে একটা মেসেজ পাঠায়, আমি ভাবছি ছুটিতে ব্রাজিল বেড়াতে যাব – আপনি ই-মেলে এই সংক্রান্ত অসংখ্য বিজ্ঞাপন ভেসে উঠবে। আমরা আমাদের নিজেদের মগজকে এদের অ্যালগরিদমের হাতে তুলে দিচ্ছি। সমাজে অসাম্য যত বাড়বে এর ফলাফল তত খারাপ হবে। কী হবে জানেন ? এদের হাতে আপনার ক্রেডিট কার্ডের তথ্য রয়েছে, আপনার ব্যাঙ্কের তথ্য রয়েছে। এবার বুঝে নিন। তথ্যের ওপর এদের এই মালিকানা প্রাণঘাতী। এদের হাতে নিয়ন্ত্রণের যে ক্ষমতা রয়েছে অরওয়েলের ‘বিগ ব্রাদার’ তার কাছে নেহাতই শিশু।

তবে সব মাধ্যমের মত, এখানেও তুলনামূলক স্বাধীনতার কিছু ক্ষুদ্র ক্ষেত্র রয়েছে। এটাই আমাদের কাজ করার জায়গা। এই জায়গাতে আমাদের ঢুকতে হবে। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে আপনি যদি আজকের গণমাধ্যমের চরিত্র দেখেন, তাহলে দেখবেন গণমাধ্যমের দুটি ঘরানা। একটি হল সাংবাদিকতা আর আরেকটি হল লঘুলিপিতে শ্রুতিলিখন বা স্টেনোগ্রাফি। আমরা যে গণমাধ্যমের দ্বারা প্রভাবিত হই, তার ৯৫%-ই হল এই স্টেনোগ্রাফি। অবশ্য এই স্টেনোগ্রাফি রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক ক্ষমতা যা লিখিয়ে নিতে চায় তা-ই লেখে, আদত স্টেনোগ্রাফিও তা নয়। কেন বলছি জানেন ? একদিন আমি চেন্নাই-এর কাছে মায়লাপুরে এইরকমই একটা বক্তৃতায় এই কথাটা বলে হাহুতাশ করি, যে আমাদের সাংবাদিকতা ক্রমশঃ স্টেনোগ্রাফি হয়ে যাচ্ছে। এই শুনে এক বয়স্ক ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে উষ্মার সঙ্গে আমাকে বলেন, আপনি এই কথাটা এই নিয়ে তিনবার বললেন, আমার কাছে এটা খুবই অপমানজনক। আমি বললাম, আমি খুবই দুঃখিত স্যার, আপনি কে? উনি বললেন, আমি একজন স্টেনোগ্রাফার। আমি ৩৮ বছর আদালতে স্টেনোগ্রাফার ছিলাম, বর্তমানে অবসর নিয়েছি। আমরা আপনাদের থেকে অনেক নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করি। তা, এই ভদ্রলোকের কথার একটা গুরুত্ব রয়েছে। তিনি বললেন, আদালতের স্টেনোগ্রাফার হিসেবে আমি মহামান্য বিচারপতি, সাক্ষী, অপরাধী, আক্রান্ত, অভিশংসক উকিল আর প্রতিরক্ষা উকিল – সকলের বক্তব্য নিখুঁত ভাবে লিপিবদ্ধ করতাম আর এদিকে তোমরা তো হতভাগা মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদ আর কর্পোরেটের ধনকুবেররা কী বলেন শুধু সেসব লেখ। এই ভদ্রলোক এই যে কথাটা বললেন, তা ভুল, এমন কেউ বলতে পারবেন ? পারবেন না। কারণ এটাই সত্যি। এটাই আমাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আর আমরা এইভাবেই বর্তমানে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখছি। বাকি আমাদের মধ্যে যারা সত্যিকারের সাংবাদিকতা করতে চায়, তাদের মাঠ ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। আমি পূর্বের আলোচনার খেই ধরে আবার প্রশ্ন করছি, যদি আপনি একচেটিয়া দখলদারির বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহী না থাকেন, আপনি এই পথে আছেন কেন?

আপনাদের এটা বুঝতে হবে গণমাধ্যমে উচ্চ বর্গের এই যে প্রভাবশালী কর্তৃত্ব – তা কাকতালীয় নয়। আপনাদের আগেই বলেছি, টমাস পিকেটির অর্থনৈতিক বৈষম্য সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে ২১৭ জন ভারতীয় কোটিপতি রয়েছেন যাদের সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটির ডলারের বেশি আর এদের মিলিত সম্পদের পরিমাণ ১ লক্ষ ৪ হাজার কোটি ডলার। পিকেটির গবেষণায় আমরা আরো জানতে পারি এই সম্পদের ৯০%-ই আবার এমন ব্যক্তিদের হাতে যারা জাতিগত ভাবে উচ্চবর্ণের। আপনি যদি এর বিরুদ্ধে না দাঁড়াতে পারেন, গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারণ করার মত পদগুলি এদেরই হাতে থাকবে, কারণ এদের নিয়ন্ত্রিত কর্পোরেটই ঠিক করে গণমাধ্যমে কোন পদে কে থাকবে। বিগত একশো বছরের সবথেকে স্বল্প আলোচিত ও সবথেকে কম গবেষণার বিষয় যদি কিছু থাকে তা হল এই দেশে পুঁজিবাদ ও জাতিব্যবস্থার সুখী দাম্পত্য। আপনি রিলায়েন্স, আদানি, টাটা বা বিড়লার নিয়ন্ত্রক অংশীদার কারা, একবার খুঁটিয়ে দেখুন। দেখবেন তারা কোনো একটি জাতির সদস্য এবং তাদের হাতেই সিন্ধান্তের সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। জাতি পরিচিতির উপর ভিত্তি করে অত্যন্ত সংকীর্ণ একটি বৃত্তে এই অংশীদারিত্ব ও মালিকানাগুলি ঘোরাফেরা করে। এর থেকে তাহলে আপনি আর কী প্রত্যাশা করতে পারেন ?

তা আমরা কী করব? অবশ্যই আমাদের লড়ে যেতে হবে। আপনি হাল ছেড়ে বসে গেলেন তো মরলেন। সেটা করার অধিকার অবশ্য আপনার রয়েছে। কিন্তু আমি ভারতীয় গণমাধ্যমের বিগত ২০০ বছরের ইতিহাস ঘুরে দেখলে দেখি এর মধ্যে ১৬০ বছর এমন ছিল যা সম্পর্কে আমরা প্রত্যেকে ন্যায়সঙ্গত ভাবেই গর্ব করতে পারি। আমাদের দেশের গণমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম– স্বাধীনতা সংগ্রামের সন্তান। এই দেশের শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক কারা ছিলেন? গান্ধী, আম্বেদকরের মত মানুষ। আপনি পৃথিবীর দু’জন সাংবাদিকের নাম করতে পারবেন, যাদের ১৪০-১৫০ খন্ডের সংগৃহীত রচনা রয়েছে? এ ছাড়াও এঁরা দু’জনে তিনটে করে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিন-তিনটে সাময়িক পত্রিকা! স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতিষ্ঠিত বহু সাময়িকপত্র তাঁদের জীবদ্দশাতেই অবশ্য অর্থনৈতিক ভাবে অসফল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল, যেমন আম্বেদকরের ‘মূকনায়ক’। এর কারণ হল কংগ্রেস দলের সংবাদ ও সাময়িকপত্রগুলি যেমন বিড়লা বা বাজাজের মত ব্যক্তিত্বদের অর্থনৈতিক সহায়তা পেয়েছিল, তেমন কোনো সাহায্য এই পত্রিকাগুলি পেত না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা এই লড়াইয়ের ক্ষেত্র থেকে সরে আসেননি। একটি সংবাদপত্র বা পত্রিকা অসফল হলে আরেকটি শুরু করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের এই বীরত্ব প্রসঙ্গে আরেকটি কাহিনি বলি। বিখ্যাত সমাজতন্ত্রী, স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সাংবাদিক এইচ এস ডোরেস্বামী যিনি এই বছর দুই আগে কর্ণাটকে ১০৫ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন, তিনি মহীশূরের মহারাজার দেওয়ানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য একটি সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই দেওয়ান মহীশূরকে ভারতীয় সঙ্ঘের বাইরে রাখতে আগ্রহী ছিলেন। এর বিরুদ্ধে মহীশূর চলো আন্দোলন শুরু হয়। ডোরেস্বামী এই আন্দোলনের পক্ষে থাকলেন। তাঁর কাগজ যখন বন্ধ করে দেওয়া হল, তখন তিনি পার্শ্ববর্তী জেলা রায়ালসীমার অনন্তপুরে চলে গেলেন। জায়গাটা কর্ণাটকের কাছেই, অনন্তপুর থেকে ব্যাঙ্গালোর গাড়িতে লাগে সাড়ে তিন ঘন্টা। যাই হোক, তিনি অনন্তপুরে গেলেন আর তাঁর যে কাগজ, সেটি ছয়টি নামে নিবন্ধীকরণ করলেন। এর ফলে ধরুন তাঁর ‘পিপলস্‌ ভয়েস’ নামের কাগজ যদি ওরা একদিন বন্ধ করে দিত, পরের দিনই তিনি একই কাগজ, একই বিষয়বস্তু সমেত, ‘পিপলস্‌ চয়েস’, ‘পিপলস্‌ ভ্যানগার্ড’, ‘পিপলস্‌ গার্ডিয়ান’– এমন যে কোনো একটা নামে প্রকাশ করে দিতেন। এইটাই আপনাদের আমি বলতে চাইছি। এঁরা লড়াইয়ের ময়দান কিন্তু প্রতিকূলতার মুখে ছেড়ে দেননি।

পরিশেষে, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আপনাদের যা করতে হবে, আমাদের যে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে তা হল প্রাতিষ্ঠানিক গণমাধ্যমে আইনী স্তরে লড়াই, গণ আন্দোলনের স্তরে নাগরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে লড়াই– ঠিক যেমন কৃষকরা লড়েছেন কৃষিভিত্তিক বাণিজ্যের একচেটিয়া কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। মনে রাখবেন, তাঁদের এইরকম লড়াই ছিল ১৫০ বছরে প্রথমবার। এর আগে শেষ ভারতীয় কৃষকরা সরাসরি যে কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন তার নাম ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। দেশ স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর এ-ই তাঁদের প্রথম এই জাতীয় লড়াই ছিল। আমাদেরও একই ভাবে গণ উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে, গণ আন্দোলন সংগঠিত করে লড়তে হবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদের জন্য। মনে রাখবেন, বিবিধতা ও বহুত্ববাদ হল একচেটিয়া অধিকার কায়েমের প্রচেষ্টার সবথেকে বড় প্রতিষেধক। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশের একচেটিয়া ব্যবসার বিরোধী আইন রয়েছে, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও, যদিও সেই দেশে বর্তমানে সেইসব আইন প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। এই দেশে এই আইনের সমর্থনেও আমাদের লড়তে হবে। যদি আমরা এটা করতে না পারি গণমাধ্যম কখনই ঠিক ভাবে কাজ করতে পারবে না। এই দিকের সমস্যা যদি আমরা মেরামত করতে না-ও পারি, আমাদের দেখতে হবে সাংবাদিকতা, যা গণমাধ্যমের থেকে আলাদা, তা যেন সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনের কাহিনিগুলো তুলে ধরতে পারে। আমাদের পিপলস্‌ আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়ার তো এটাই নীতিবাক্য। আমরা যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো প্রতিবেদন তুলে ধরি, তখন আমরা সেই কাজটা করি যাঁরা এই পরিবর্তনের ফলে একেবারে প্রত্যক্ষ ভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন, তাঁদের কন্ঠ ও জীবন্ত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে। এ-ই আমাদের প্রতিবেদনের ধাঁচ। আমাদের সবকিছুর জন্যই ফিরে যেতে হবে মানুষের কাছে। তাঁরাই আপনাদের সাংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা করেন। যখন বালগঙ্গাধর তিলককে গ্রেপ্তার করে রাজদ্রোহের অভিযোগে কারাবন্দি করা হয়েছিল, তখন কোনো বাজাজ, গোদরেজ, টাটা প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামেনি। মুম্বাইয়ের বস্ত্র কারখানার শ্রমিকরা নেমেছিলেন রাস্তায়। গুলিতে ১৬ জন নিহত হন সেই প্রতিবাদে, আর পরবর্তী সময়ে আরও ৬ জন ঐদিনে প্রাপ্ত আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন। এই দেশের সাধারণ মানুষ, সাধারণ জনতা, যাঁদের অনেকে পড়তেও জানতেন না, তাঁরা তিলকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সমর্থন করে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁরা হয়তো তিলকের সমস্ত মতামতের সঙ্গে সহমতও ছিলেন না, কিন্তু তবুও তাঁরা তিলকের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ান কারণ তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন হয় আমাদের সবাই সাঁতার কাটার অধিকারী হব, নয়তো আমরা সবাই একসঙ্গে ডুবব, হয় সবাই একসঙ্গে বলব নয়তো সবাইকে একসঙ্গেই মৌন থাকতে হবে। আমার অভিমত হল, আমাদের এই জনতাকেন্দ্রিক সাংবাদিকতাতেই ফেরত যেতে হবে। এই বিখ্যাত তারকা কেন্দ্রিক, মোদি কেন্দ্রিক সাংবাদিকতা ত্যাগ করে ফিরতে হবে জনতা কর্তৃক জনতার দ্বারা জনতার জন্য সাংবাদিকতায়।

ধন্যবাদ।



অনুবাদঃ রবিকর গুপ্ত


প্রকাশ: ১৫-অক্টোবর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 15-Oct-25 11:08 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-obscenity-of-india’s-wealthy-part-iii-
Categories: Fact & Figures
Tags: capitalism, cronycapitalism, wealthy
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড