তৃণমূলের বিরুদ্ধে তদন্ত আটকে রেখেছেন মোদী নিজেই


প্রকাশ: ০৪-মার্চ-২০২০
কলকাতা, ৩ মার্চ— বিজেপি’কে পাঁচ বছরের জন্য সরকার গড়ার সুযোগ দিলে যারা তোলাবাজি করে, দুর্নীতি করে (চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি), তাদের সবাইকে ‘চুন চুনকে’ জেলে ভরার কাজ করবে বিজেপি। গত রবিবার শহীদ মিনারের সভায় দাঁড়িয়ে এমনই হুঙ্কার শুনিয়ে গিয়েছেন দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। গত ছয় বছর ধরে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্তদের জেলে ঢোকানোর গল্প পশ্চিমবঙ্গে এসে বার পাঁচেক শুনিয়ে গেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীও। কিন্তু বাস্তবতা কী? তৃণমূলের বিরুদ্ধে বিজেপি’র হুঙ্কারের চেহারা কী?
শাসক তৃণমূলের তিন সাংসদ ও এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আইনি প্রক্রিয়া চালু করার জন্য সিবিআই’র আবেদন গত দশ মাস ধরে ফেলে রেখেছে মোদী সরকার। এমনকী মমতা ব্যানার্জির আঁকা ছবির বিক্রিতে কেলেঙ্কারি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার আবেদনও ফেলে রাখা হয়েছে। সিবিআই’র তরফে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর আবেদন করা হলেও তা কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ ও জন অভিযোগ মন্ত্রক ধর্তব্যের মধ্যেই আনছে না। এই মন্ত্রকের অধীনেই রয়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। এই মন্ত্রক নরেন্দ্র মোদীর হাতেই রয়েছে। মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী জীতেন্দ্র সিং। তবে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই’র বিষয়ে অমিত শাহের তৎপরতা দিল্লির রাজনৈতিক মহলেও সুবিদিত।
অমিত শাহ চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে হুমকি দিচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রীও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস শোনাচ্ছেন। অথচ প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকা মন্ত্রকই গত দশ মাস ধরে নারদ ঘুষকাণ্ডে অভিযুক্ত তৃণমূলের চার সংসদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর জন্য সিবিআই’র আবেদন আটকে রেখেছে। দশ মাস আগে আবেদন করার পরেও সিবিআই’কে তদন্তে পরবর্তী ধাপে পৌঁছানোর কোনও সঙ্কেত দেওয়া হয়নি।
শাসক বিজেপি আর তৃণমূলের ছদ্ম লড়াইয়ের চিত্র সম্পূর্ণ বেআব্রু হয়েছে সেন্ট্রাল ভিজিল্যান্স কমিশনের (সিভিসি) সাম্প্রতিক রিপোর্টে। সিভিসি’র রিপোর্ট বলছে, ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গোটা দেশে একাধিক দুর্নীতির মামলায় (ব্যাঙ্ক, এমনকী সরকারি দপ্তরের দুর্নীতি) জনপ্রতিনিধি ও সরকারি আধিকারিক সহ ১১০ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর সম্মতিটুকু পর্যন্ত আটকে রেখেছে কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ ও জন অভিযোগ মন্ত্রক। প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকা এই মন্ত্রক ১২ জন আইএএস আধিকারিক এবং দুর্নীতিতে যুক্ত পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক, ইউবিআই’র আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও কোনও আইনি প্রক্রিয়া তথা মামলা শুরুর আবেদন আটকে রেখেছে। তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূলের তিন সাংসদ ও এক দাপুটে মন্ত্রী রয়েছেন।
সিবিআই’র একটি সূত্রের দাবি, চিট ফান্ড মামলায় ও নারদ ঘুষ কেলেঙ্কারির তদন্তের পরবর্তী ধাপে এগনোর কাজ শ্লথ গতিতে চলছে। যেভাবে ভুয়ো কোম্পানির মাধ্যমে টাকা নয়ছয় ও মুখ্যমন্ত্রীর ছবি প্রদর্শনী নিয়ে কেলেঙ্কারির তদন্ত থমকে গিয়েছে, তাতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই’র আবেদন পড়ে রয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসেই সিবিআই’র তরফে কলকাতা থেকে দিল্লির সদর দপ্তরে তৃণমূলের তিন সাংসদ ও এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া শুরুর জন্য সিবিআই আবেদন জানায়। সেই আবেদন সিবিআই’র সদর দপ্তর থেকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকা কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ মন্ত্রকে পৌঁছায়। তখন লোকসভা নির্বাচন চলছে। তারপরে দশ মাস পেরিয়েছে। সেই আবেদনের ফাইলে সম্মতির সই মেলেনি, তদন্ত প্রক্রিয়া মাঝপথেই আটকে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তকারী দল সম্মতির জন্য অপেক্ষায়।
সিভিসি’র গত ডিসেম্বরের রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছে, তৃণমূলের দমদমের সাংসদ সৌগত রায়, হাওড়ার সাংসদ প্রসূন ব্যানার্জি, বারাসতের কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও রাজ্যের পরিবহণ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে গত এপ্রিল মাসে নারদ ঘুষ কেলেঙ্কারিতে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর আবেদন জানানো হয়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তা বকেয়া রয়েছে, তৃণমূলের তিন সাংসদ ও এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর কোনও সঙ্কেত আসেনি প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকা মন্ত্রকের কাছ থেকে! ওই চার তৃণমূল নেতাকেই নারদ স্টিং অপারেশনে ঘুষ নিতে দেখা গিয়েছিল। ইতিমধ্যে কয়েক প্রস্থ জেরা, ঘটনার পুনর্নির্মাণও করা হয়েছে। কয়েক জনের গলার স্বরের নমুনাও নিয়েছিল সিবিআই। কিন্তু পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেনি সিবিআই।
এনআরসি ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে দেশজোড়া প্রবল বিক্ষোভের মধ্যেই তাৎপর্যপূর্ণভাবে গত ১৫ জানুয়ারি সারদা-রোজভ্যালি-নারদ ঘুষ কেলেঙ্কারির তদন্তকারী আধিকারিকদের বদলি করা হয়েছে। চূড়ান্ত চার্জশিটের আগেই কেন এই রদবদল? তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল, তা স্পষ্ট হলো সিভিসি’র রিপোর্টেই। মুখে ‘প্রতিবাদ’র স্বর শোনা গেলেও মমতা ব্যানার্জি ও তাঁর দল এবং রাজ্য সরকারের ‘সিএএ বিরোধী’ অবস্থান নিয়ে ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রাস্তায় রয়েছেন বরং বামপন্থীরা, ছাত্র-যুবরা। উলটে নরেন্দ্র মোদীর মতো অমিত শাহের সফরের সময়েও আশ্চর্যজনকভাবে গোটা তৃণমূল দলকে মৌনতা পালন করতেই দেখা গিয়েছে।
অভিযোগ আছে যে, চিট ফান্ডের টাকা মমতা ব্যানার্জির আঁকা ছবির হাত ধরে ঘুরপথে ঢুকেছিল শাসক তৃণমূলের তহবিলে। চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’র তদন্তে সিবিআই তদন্তের অভিমুখও ছিল এমনই। সেই তদন্তে একাধিক ব্যক্তিকে জেরা করা হয়েছে ইতিমধ্যে, বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর বিক্রি করা একাধিক ছবিও। অথচ সেই তদন্ত যখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন মমতা ব্যানার্জির ছবি বিক্রির তদন্তের দায়িত্ব থাকা আধিকারিককেই বদলি করে দেওয়া হলো। ছবি বিক্রির ঘটনায় নির্দিষ্ট অসঙ্গতির তথ্য প্রমাণ হাতে আসার পরেও তাই তদন্ত নতুন করে একচুলও এগতে পারেনি গত প্রায় চার মাস ধরে। দেশব্যাপী এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে দৃশ্যতই কোণঠাসা মোদী সরকার। এই পরিস্থিতিতেই চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেও ছবি কেলেঙ্কারির তদন্ত স্তব্ধ হয়ে যাওয়া, তৃণমূলী সাংসদ-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর জন্য সিবিআই আবেদন করার পরেও সামান্য সম্মতি দিতেও দশ মাস কাটিয়ে দেওয়া কি রাজনৈতিক বোঝাপড়ারই অংশ?
শেষ এডিট:: 04-Mar-20 13:27 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/no-investigation-for-tmc-mp-or-ministers-modi-the-firewall
Categories: Current Affairs
Tags: bjp, modididisetting, naradascam, saradascam, tmc
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (171)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (155)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (82)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





