ভবিষ্যত প্রজন্মকে বাঁচাতে চাই বামপন্থার পুনরুত্থানঃ প্রসঙ্গ শিক্ষা

Author
দেবাঞ্জন দে

বিজেপি'র নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির মডেলকে সামনে রেখেই এই যান্ত্রিকতা নির্মাণ করা হয়েছে বাংলায়। যার মাধ্যমে দক্ষ সাম্প্রদায়িক মনন এবং অদক্ষ সস্তার শ্রমিকের ভান্ডার প্রস্তুত হবে বাংলার মাটিতে। উপকৃত হবে আরএসএস এবং বিশাল কর্পোরেট লবি।

I want to save future generations through the revival of the leftist movement Context education
এই শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্তও "লেখাপড়া" শব্দটার একটা সামগ্রিক গুরুত্ব, ভিত্তি, সম্ভাবনা ছিলো বাংলার জনমানসে। মানে বাংলার গড় মানুষের মধ্যে শিক্ষা বিষয়ক এক উঁচু দাগের মনোভাব মোটামুটি জায়গা করে নিয়েছিলো। আবার অর্থনীতি, সমাজের বিন্যাসে নীচু শ্রেণীর মানুষের মধ্যে এই শিক্ষা সম্পর্কে মানসিক উচ্চতা ছিলো চোখে পড়ার মতো। গরীব পরিবারের অভিভাবকেরও পরের প্রজন্ম আরো আরো উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত হোক, এই সামাজিক চাহিদা ছিলো। জীবন-জীবিকা, অর্থনৈতিক সূচকেও উত্তোরণের আশায় চিকচিক করতো তরুণ প্রজন্মের চোখমুখ। ভীড় লেগে যেতো স্কুলের দোরগোড়ায়, কলেজের গ্র্যাজুয়েট হওয়ার লাইনে, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসায় এমনকি কারিগরি শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও একটা সার্বিক  প্রতিনিধিত্বকারী জনচেতনার বিকাশ হয়েছিলো বাংলার দীর্ঘ শিক্ষা আন্দোলনের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। 

বাংলার শিক্ষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত আছে দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাসের ধারায়। বঙ্গদেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা মধ্যযুগের ভারতেও আলোচিত ও আলোকিত ছিলো অনেকাংশেই। পরবর্তীতে ব্রিটিশ রাজের শিক্ষানীতি কেরানীকেন্দ্রিক, জমিদারশ্রেণীর আওতাভুক্ত ন্যূনতম শিক্ষার পরিবেশে বাংলার মাটিতেই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবি ঠাকুর, নজরুল, বেগম রোকেয়ার পথ ধরে শিক্ষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ধারা তার মাইলফলক রচনা করতে থাকে। যদিও ডিরোজিও থেকে ডেভিড হেয়ার, জন ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন, অ্যালেক্সান্ডার ডাফের শিক্ষার জনপরিধি ক্রমবিকাশমান থেকেছে ইতিহাসের চর্চায়। দেশে স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রতিটি ধারা, উপধারার সাথে পরতে পরতে মিশেছে শিক্ষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ভিত্তি। জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গড়ে উঠেছে জনচেতনার মধ্যে লেখাপড়ার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করার নির্দিষ্ট তাগিদ নিয়েই। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয় শিক্ষার সম্প্রসারণের ভাবনা সবটাই নিহিত ছিলো জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের মধ্যে। 

বাংলার শিক্ষার এই দীর্ঘ পথচলায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণের ব্যবস্থা হয়েছিলো বামফ্রন্ট সরকার বাংলার দায়িত্ব পাওয়ার পর। শিক্ষার সাথে যুক্ত হয়ে যায় মর্যাদার প্রশ্নটাও। প্রান্তিক অংশের মানুষের মধ্যেও এই জনচেতনার বিকাশ ঘটে যে শিক্ষার মূলস্রোতে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সামাজিক, অর্থনৈতিক উত্তোরণের পথে এগোতে পারবে মানুষ। স্বাক্ষরতার হার বাড়াতে শুরু হয় স্বারক্ষতা আন্দোলন। নিরক্ষর থেকে স্বাক্ষর হওয়া, স্কুলে গিয়ে সহজ পাঠের সাথে পরিচিত হওয়া, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পার করে কলেজের গেট পেরনো- সবটার মধ্যেই ছিলো একটা মর্যাদার গন্ধ। শিক্ষা প্রসঙ্গে সরকারি তাগিদ এই মর্যাদার প্রশ্নটাকেই সামনে রেখে রুখেছিলো স্কুলছুট, বাল্য বিবাহ, শিশু শ্রম। শিক্ষার একেকটা ধাপ পার করে চাকরি করতে যাওয়াটা ছিলো সবোচ্চ মর্যাদা। সেই লক্ষ্যপূরণের রাস্তাও গড়ে তোলা হয়েছিলো কৃষির ভিত্তি, শিল্পের ভবিষ্যতের ওপর ভর করে। সেখানে কৃষিক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ফোরণে সাজিয়ে তোলা হয় বাংলার কাজ জোগানোর ক্ষেত্রকে।

যাইহোক, লেখাপড়ার কথায় ফিরে আসি। মোদ্দা কথা, বাংলার সাধারণ জনমানসে লেখাপড়া সম্পর্কে একটা উঁচু ধারণা তৈরী করা গিয়েছিলো সরকারি-সামাজিক উদ্যোগেই। বাংলার এই সাবলীল যুক্তিবাদী, শিক্ষামুখী, প্রশ্নবোধক সত্তাকে ধ্বংস করতেই আরএসএস গড়ে তোলে তৃণমূল কংগ্রেসকে। বিনিময় মূল্যে তৃণমূলের দায়িত্ব ছিলো আরএসএস'র সাংগঠনিক নেটওয়ার্ককে বাংলার তৃণমূল স্তরে ভিত্তিভূমি গড়ে দেওয়া। এই কাজে সফল হতে গেলে সবচেয়ে জরুরী কাজ অবশ্যই বাংলার লেখাপড়ার ভিত্তিকে ধ্বংস করা। '১১ সালে দীর্ঘ বামপন্থী দায়িত্বের পর পালাবদলের শুরুতেই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পরিবেশ ধ্বংস পালা অনুষ্ঠিত হয়ে যায় রাজ্যের বুকে সরাসরি সরকারি মদতে। 

শিক্ষাক্ষেত্র থেকে শিক্ষানুরাগী মানুষদের সরিয়ে, এক ছাত্রস্বার্থবিরোধী লেখাপড়ার কাঠামো প্রস্তুত করা শুরু হয় একদম প্রাথমিক স্তর থেকে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত, ছাত্র-শিক্ষক মোট সংখ্যা, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, ছাত্র-শিক্ষক নিয়োগ বা ভর্তি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা- সবটাই নিরুদ্দেশ করে দেওয়ার পরিকল্পনা গৃহীত হয় আরএসএস'র পক্ষ থেকে, যা প্রয়োগ করার বরাত পায় তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কমিয়ে আনা, বরাদ্দ ও খরচে ব্যাপক তারতম্য স্পষ্ট করে দেয় যে তৃণমূল সরকারি শিক্ষা সম্পর্কে একেবারেই আগ্রহী নয়। 

সরকারি আগ্রহের দিকনির্দেশ ঘোরানো হয় আরএসএস'র এনজিও পরিচালিত কম খরচের সরস্বতী বিদ্যামন্দিরের দিকে অথবা কিছু ক্ষেত্রে বড়ো কর্পোরেট, কিছু ক্ষেত্রে পিপিপি মডেল, আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এলাকার তৃণমূলের দুর্নীতির টাকায় ফুলেফেঁপে ওঠা নব্য ধনী ব্লক সভাপতিদের হাতে তৈরী বেসরকারি মডেল স্কুল। গরীবগুর্বো, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষ ভীড় করবে আরএসএস'র স্কুলে- বেড়ে উঠবে আরএসএস-বিজেপি'র নির্দিষ্ট সামাজিক-সাংস্কৃতিক এজেন্ডা মাথায় নিয়ে আর একাংশের মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তদের জায়গা হবে ঐ বেসরকারি মডেল স্কুল। নির্দিষ্ট এই পরিকল্পনামাফিক একেবারে নগণ্য খরচে সরকারি স্কুলশিক্ষার পরিকাঠামোকে ধ্বংস করে, স্কুলবাড়িতে তালা ঝুলিয়ে, ক্লাসরুম ফাঁকা করে, বাজেটে বরাদ্দের খরচ কমিয়ে, মৃত ঘোষিত হয়েছে প্রায় ৮৫০০ স্কুল, ভেন্টিলেশনে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে আরো প্রায় ৬০০০ (এর মধ্যে হাজার তিনেক স্কুল চালায় মোটে একজন শিক্ষক, আরো হাজার তিনেকে প্রায় ১০০ ছাত্র প্রতি একজন শিক্ষক, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছাত্র সংখ্যাই দশ-কুড়ি পেরোয় না)। তালা ঝুলেছে একের পর এক শিশু শিক্ষা কেন্দ্র, মাদ্রাসা শিক্ষা কেন্দ্রে। রাজ্যে শেষ পনেরো বছরে মাদ্রাসা তৈরী হয়েছে মাত্র নয়টি। 

মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকে স্তরে ড্রপ আউটের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেকটাই বেশী। কোভিড পরবর্তী অর্থনীতিতে দাঁড়িয়ে ড্রপ আউটের মতো সামাজিক সংকট প্রতিরোধে সরকারের কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নেই সেটা স্পষ্ট হয়েছে বচরের পর বছর। এমনকি মাধ্যমিক পার করে উচ্চ মাধ্যমিকে রেজিস্টার করার পরেও স্কুল থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী। পরিযায়ী শ্রম, বাল্য বিবাহ, নাবালিকা প্রসূতি,  শিশু শ্রম বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর যে স্বাভাবিক আগ্রহ তা হারাচ্ছে আজকের অভিভাবকরা। আর্থিক সংকট, বেরোজগারি, সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া বাবা-মা চাইছে তার ছেলেমেয়ে দ্রুত রোজগেরে হোক, সেই উপায় আছে কেবল পরিযায়ী হলে, এ রাজ্যে  সেই উপায় নেই। আবার আরেকদিকে উৎসাহ কমে গেছে ছেলেমেয়েদেরও। লেখাপড়ার শেষে কোনো কাজের হদিশ না দেখতে পেয়ে প্রত্যাশার অবনমন ঘটছে। ফাঁকা ক্লাসরুমে অনার্স পড়ার চেয়ে অনেক বেশী মর্যাদাপূর্ণ মনে হচ্ছে দলবেঁধে ভীনরাজ্যে গিয়ে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে অনেক কম মজুরিতে শ্রমদান। ঘরছাড়া, ছিন্নমূল, ভবিষ্যত সম্পর্কে হতাশ এই ছেলেমেয়ের সংখ্যা আমাদের রাজ্যে সর্বোচ্চ। 

পাড়া, মহল্লা, কলেজের করিডোর, কমনরুম, চায়ের দোকান, বাজারে আর তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাজ্যের স্নাতক স্তরে মোট আসন সংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের ওপর ফাঁকা। আবার অধ্যাপকদের আসনও প্রায় ৬০ শতাংশ ফাঁকা। স্কুলের মতোই কলেজেও নেই ছাত্র, নেই অধ্যাপক, নেই লেখাপড়ার পরিবেশ, নেই গবেষণার পরিকাঠামো, নেই ছাত্র সংসদ, নেই উন্নত মানের লাইব্রেরি-ল্যাবোরেটরি। আছে শুধু বছর পর বছর ধরে ক্যাম্পাসে অপরাধ চক্র চালিয়ে যাওয়া কিছু লোকজন, যারা স্থানীয় তৃণমূল বলে পরিচিত এবং ভাইপো ঘনিষ্ঠ বলে প্রতিষ্ঠিত। সবমিলিয়ে মূল লক্ষ্য, একাংশের ছেলেমেয়ে যারা যাহোক করে স্কুল, কলেজের ক্লাসরুম অবধি পৌঁছতে পারছে তাদের একটা নির্দিষ্ট মস্তিষ্ক প্রক্ষালন যান্ত্রিক সিলেবাসের মধ্যে গড়ে তোলা। বাকি ব্যাপক অংশে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার মূল স্রোত থেকে সরিয়ে দেওয়া। 

বিজেপি'র নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির মডেলকে সামনে রেখেই এই যান্ত্রিকতা নির্মাণ করা হয়েছে বাংলায়। যার মাধ্যমে দক্ষ সাম্প্রদায়িক মনন এবং অদক্ষ সস্তার শ্রমিকের ভান্ডার প্রস্তুত হবে বাংলার মাটিতে। উপকৃত হবে আরএসএস এবং বিশাল কর্পোরেট লবি। বাকি লেখাপড়ার মূলস্রোত থেকে ছিটকে যাওয়া ছেলেমেয়েরা জায়গা পাবে তৃণমূলের দপ্তর, বিজেপি'র দপ্তর, মদের দোকান অথবা পরিযায়ী শ্রমিকের লাইনে। ভাতানির্ভর একটা প্রজন্ম ভুলেই যাবে যে ভাতাটা অধিকার, দয়ার দান নয়। ভুলে যাবে যে অনুদান সাময়িক, স্থায়ী কাজ সমাধান। সেই সমাধান গত পনেরো বছর ধরে গায়েব বাংলার জনমানস থেকে। 

তাহলে বিজেপি? মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, বিহার, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ- সর্বত্র পরিসংখ্যানটা প্রায় কাছাকাছি। রোগগুলোও একদম এক, ঠিক যেমন উপসর্গগুলোও। স্কুলছুট, কলেজছুট, বাল্য বিবাহ, নাবালিকা প্রসূতি, স্কুল-কলেজে শিক্ষক-অধ্যাপকদের নিয়োগের হার, নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতি, শিশু শ্রম, পরিযায়ীকরণ, শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিসর, ক্যাম্পাস নিরাপত্তা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির মার্কশিট রীতিমতো প্রতিযোগিতায় আছে বাংলার সাথে। আবার বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দখলে নিতেই রামনবমী উগ্র মিছিলে ভীড় করানো হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের এই বিপুল বেকারবাহীনিকে। হাতে ধরানো হচ্ছে তলোয়ার থেকে ওয়ান শাটার। উগ্র তান্ডবে পরিচয়হীন এই প্রজন্ম মানসিকভাবে তার রাগ, ক্ষোভের পরিচয় খুঁজছে রাগী হনুমানে! ফোনের ওয়ালপেপার থেকে বাইকের স্টিকারে এই রাগী হনুমান উত্তেজিত করছে আমাদের প্রজন্মের টুকরো টুকরো না পাওয়ার ক্ষোভগুলোকে। তারপর আর কোনো কিছু পাওয়ার সন্ধান দিচ্ছে কী? উল্টে হিন্দুর রাগ আর মুসলমানের রাগটাকে ভাগ করে দিচ্ছে। ঠিক যেমন পদ্ধতিটা নিয়েছিলো ব্রিটিশ হুকুমত। ঠিক যে পদ্ধতিটা ব্রিটিশদের থেকে আত্মস্থ করেছিলো আরএসএস। সেই একই পদ্ধতি ব্যবহার করেই বাংলার তরুণ প্রজন্মের মন নির্মাণ করার কাজ চলছে।

তাহলে উপায়? সমাধান পুনরুত্থানেই। লেখাপড়াকে পুনরুদ্ধার করতে হবে বাংলায়। ড্রপ আউট আটকাতে বাড়াতে হবে স্ট্রাইপেন্ড, স্কলারশিপ। হাতে টাকা পেলে, সরকার উৎসাহ দিলে ছেলেমেয়েরা ফের স্কুল, কলেজে ভীড় করার সাহস পাবে। লেখাপড়ার সাথে মর্যাদা শব্দটা যুক্ত করা যাবে। সকলের জন্য সর্বজনীন ছাত্রবৃত্তি, একদম প্রাথমিক স্তর থেকে গবেষণা পর্যন্ত। আদিবাসী, দলিত ছাত্রছাত্রীদের জন্য আম্বেদকর স্কলারশিপ, সংখ্যালঘুদের জন্য নজরুল স্কলারশিপ, চা বলয়ের পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিরসা স্কলারশিপ, পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য বিশেষ স্কলারশিপের নিশ্চয়তা। মোট বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ খরচ করতে হবে শিক্ষার পরিবেশ পুনর্গঠনে। বছরের পর বছর আটকে থাকা কম্পোজিট গ্রান্টের টাকা উদ্ধার করে বন্ধ স্কুলগুলো পুনরায় খুলতে হবে। গড়তে হবে অত্যাধুনিক স্মার্ট স্কুল, স্মার্ট মাদ্রাসা। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ধারার উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ছাত্রছাত্রীদের আকর্ষিত করতে হবে স্কুল, কলেজের দিকে। নিয়োগ করতে হবে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক। ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ফেরাতে হবে ৩০:১ পুরনো পর্যায়ে। দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সচল করতে হবে। দীর্ঘ পনেরো বছরের দুর্নীতির জঞ্জাল সাফ করে ফেরাতে হবে স্বচ্ছতা। অভিভাবক, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ফেরাতে শিক্ষকদের সম্পর্কে ভরসা, আস্থা, বিশ্বাস। স্কুল-কলেজের দরজা অবধি পৌঁছতে চাই গণপরিবহনে বিশেষ ছাড় দিয়ে ছাত্রভাড়া, প্রত্যন্ত এলাকায় স্কুল-কলেজ প্রতি নির্দিষ্ট বিনামূল্যে সরকারি বাস পরিষেবা।

প্রাইভেট কোচিং সিস্টেমের বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হবে পাবিলক কোচিং ইকোসিস্টেম। সরকারি উদ্যোগে বিশ্বমানের প্রযুক্তির সাহায্যে ট্রেনিং নেবে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা। সর্বভারতীয় স্তরের ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে শুরু করে সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষার প্রস্তুতির দায়িত্ব নেবে সরকার। কলেজ পর্যন্ত মকুব হবে টিউশন ফি। কেন্দ্রীয় ট্রাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে সরকার সর্বক্ষণ নজর রাখবে ড্রপ আউটের হার, পরিকাঠামো নির্মাণ, প্রতিযোগিতামূলক সাফল্যের হারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নের জন্য দরকার বিশেষ বরাদ্দের। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বমানের স্মার্ট ক্যাম্পাস, গবেষণার উন্নত পরিকাঠামো, হোস্টেলের মান বাড়ানো, প্লেসমেন্টের নিশ্চয়তার মাধ্যমে প্রত্যেক পড়ুয়ার চাকরি নিশ্চিত করা। দক্ষ, বিশেষ প্রশিক্ষণযুক্ত শ্রমবাহিনী গড়ে তুলতে দরকার কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিটি মাধ্যমিক স্তরের স্কুলে। 

ক্যাম্পাসে ছাত্রীসুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে মেয়েদের ক্যাম্পাসমুখী করতে। আত্মরক্ষা শিবির, সরাসরি অভিযোগ নথিভুক্ত করার ডিজিটাল ব্যবস্থা, স্কুল-কলেজের নীতি নির্ধারণকারী কমিটিগুলিতে নির্বাচিত ছাত্রী প্রতিনিধি, বাল্য বিবাহ, নারী পাচার রুখতে বিশেষ নজরদারির স্কোয়াড- উন্নত সরকারের চেহারা এমনটাই। বর্তমান প্রজন্মে দাঁড়িয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর জোর দিতে স্কুল জীবনশৈলীর ক্লাস, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি খরচায় নিযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নিয়মিত শিবির, সরকারি উদ্যোগে সরাসরি মনের কথা জানার প্রযুক্তিনির্ভর চ্যাটবট। প্রযুক্তির সাহায্যের পাশাপাশি তার সুষম বন্টনের ওপর জোর দিতে হবে। সকলের জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা নিশ্চিত করা গেলেই তবেই সমস্ত অংশের মানুষের অংশগ্রহণ এই উন্নতমানের শিক্ষা পরিষেবায় যুক্ত করা যাবে।

তাহলে প্রথম কথা লেখাপড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ ফেরানো, তারপর স্কুল-কলেজের তালা খুলে উন্মুক্ত করা লেখাপড়ার পরিসর, তারপর তাকে উন্নতমানের সরকারি পরিষেবায় পরিণত করা। এই সামগ্রিক বিকল্পকে সত্যি করতে পারে একমাত্র বামপন্থীরাই। বামফ্রন্টের ইশতেহার বলছে শিক্ষায় বাজেটের ২০ শতাংশ খরচের কথা। বলছে পরিবারপিছু একটা করে কাজের কথা। মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার কথা আছে বামপন্থীদের বয়ানেই। লেখাপড়াকে পুনরুদ্ধার করার জন্য যে ধাপে ধাপে পরিকল্পনা রূপায়িত করতে হবে সেটা একমাত্র বাস্তবায়িত করার চেতনাসম্পন্ন রাজনৈতিক ভিত্তি আছে বামপন্থীদেরই। বাংলা শিক্ষার ভবিষ্যত নিহিত আছে বামপন্থার পুনরুত্থানে, বাংলার ভবিষ্যত নিহিত আছে বামপন্থার পুনরুত্থানে, আমাদের প্রজন্মের ভবিষ্যত নিহিত আছে বামপন্থার পুনরুত্থান। প্রজন্মের পুনর্জীবনই, বামপন্থার পুনরুত্থানের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যপূরণ করতেই রাজ্যের সমস্ত প্রান্তে বামপন্থীদের জয়ী করে বিধানসভায় পাঠাতে হবে।
প্রকাশ: ০৯-এপ্রিল-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 09-Apr-26 08:34 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/i-want-to-save-future-generations-through-the-revival-of-the-leftist-movement-context-education
Categories: Fact & Figures
Tags: 34 years left front, higher education, leftalternative, alternative education, school education, drop out
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড