গায়ানার নির্বাচন: তেল, সাম্রাজ্যবাদ ও জনসাধারণের ভবিষ্যৎ

তেলের ঐ প্রাচুর্য গায়ানার জন্য একই সঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে দেশের পরিকাঠামো, স্বাস্থ্যপরিষেবা ও জীবনযাত্রার মানন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে তেল নির্ভর অর্থনীতির উপর অতিরিক্ত বাধ্যবাধকতা আগামীদিনে ‘ডাচ ডিজিজ’র জন্ম দিতে পারে।

গায়ানা, দক্ষিণ আমেরিকার ক্ষুদ্রতম দেশ, বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সোমবারের নির্বাচন কেবল একটি নতুন সরকার নির্বাচনের বিষয় নয়, বরং এতেই নির্ধারিত হবে কীভাবে দেশটি তার বিশাল তেল সম্পদের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক খেলায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করবে। এ নির্বাচনের ফলাফল গায়ানার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো—যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের—প্রভাব বিস্তারের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তেল এবং অর্থনীতির রূপান্তর
২০১৫ সালে গভীর সমুদ্রে বিশাল তেল ভাণ্ডার আবিষ্কারের পর থেকে গায়ানার অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে দেশটির জিডিপি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ ও ২০২৩ সালে এই প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৬৩.৩% ও ৩৩.৮%। ২০২৪ সালেও এই ধারা অব্যাহত ছিল, যা ৪৩.৬% বৃদ্ধি দেখিয়েছে। এহেন অর্থনৈতিক উত্থান মূলত তেল উৎপাদন ও তেল রপ্তানির উপর নির্ভরশীল। আজকের সময় গায়ানা প্রতিদিন প্রায় ৬,৫০,০০০ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিদিন ২ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
কিন্তু তেলের ঐ প্রাচুর্য গায়ানার জন্য একই সঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে দেশের পরিকাঠামো, স্বাস্থ্যপরিষেবা ও জীবনযাত্রার মানন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে তেল নির্ভর অর্থনীতির উপর অতিরিক্ত বাধ্যবাধকতা আগামীদিনে ‘ডাচ ডিজিজ’র জন্ম দিতে পারে। তেমন কিছু ঘটলে দেশীয় অর্থনীতির অন্যান্য খাত দুর্বল হয়ে পড়ে, তাঁর সাথেই দুর্নীতি, বৈষম্যকেও বাড়ায়।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে দ্বৈরথ
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্পষ্ট বিভেদ ছিল। ক্ষমতাসীন পিপলস প্রগ্রেসিভ পার্টি/সিভিকের নেতা ইরফান আলী পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রধান বিরোধী দল পিপলস ন্যাশনাল কংগ্রেস রিফর্ম পার্টির নেতা অব্রে নরটন এবং ব্যবসায়ী আজুরদ্দিন মোহাম্মদের মতো প্রার্থীরাও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক এই বলে সতর্ক করেছেন যে জাতিগত বিভাজন এবারের নির্বাচনকে আরও জটিল ও কঠিন করে তুলতে পারে।
এসবের মধ্যেই ভেনেজুয়েলার সঙ্গে গায়ানার দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ভেনেজুয়েলা গায়ানার একটি বৃহৎ অংশ বিশেষ করে তেল সমৃদ্ধ এসকুইবো অঞ্চলের ওপর সার্বভৌমত্বের দাবি জানাচ্ছে। ভেনেজুয়েলার এমন আগ্রাসী মনোভাব গায়ানাকে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করতে বাধ্য করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রভাব
গায়ানার তেল সম্পদের গুরুত্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন উভয় দেশই সেখানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। মার্কিন কোম্পানি এক্সনমোবিল তেল উৎপাদনে নেতৃত্ব দিচ্ছে, এর বিপরীতে চীন পরিকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করছে। বিশ্লেষকদের মন্তব্য গায়ানা সম্ভবত এদের কারোর দিকেই ঝুঁকবে না বরং উভয় দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক প্রকল্পসমূহের স্বার্থক রূপায়নে মনোযোগ দেবে।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সম্ভাব্য দ্বৈরথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গায়ানাকে সমর্থন জানিয়েছে। তারা ঐ অঞ্চলে সামরিক শক্তির উপস্থিতি বাড়িয়েছে, গায়ানার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়াও চালাচ্ছে। এমন অবস্থায় তাদের দেশের অর্থনীতিতে অংশীদার হিসাবে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বামপন্থীদের দায়িত্ব
গায়ানার বামপন্থী দল ও সংগঠনগুলোর জন্য এ পরিস্থিতি এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে বলা চলে। বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে বলা চলে বামপন্থীদের সম্ভাব্য এজেন্ডাগুলি হল-
১. জনগণের সম্পদ সুরক্ষা: তেলের রাজস্ব যেন মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসনের মাধ্যমে এই সম্পদ দেশের সকল মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে।
২. শ্রমিক ও কৃষকের অধিকার: তেল শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি শ্রমিক ও কৃষকদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। তাদের ন্যায্য মজুরি, কাজের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা: গায়ানার বামপন্থীদের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৪. আঞ্চলিক সংহতি: প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। ভেনেজুয়েলার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে হবে।
৫. পরিবেশ রক্ষা: সুস্থিত উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিবেশ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তেল উত্তোলনের ফলে পরিবেশের ওপর যাতে কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
গায়ানার নির্বাচন এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত যা দেশটির ভবিষ্যৎ’কে পথনির্দেশ দেবে। সারা দুনিয়ার মতো এদেশেও জনগণের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য বামপন্থী দল ও সংগঠনগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে, শোষণমুক্ত, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিচল থাকবে এমনটাই প্রত্যাশা।
ব্যবহৃত ছবির সুত্রঃ গায়ানার নির্বাচন কমিশনের তরফে বিজ্ঞপ্তি
প্রকাশ: ০৩-সেপ্টেম্বর-২০২৫
শেষ এডিট:: 03-Sep-25 00:19 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/election-in-guyana-a-report
Categories: International
Tags: economy, freemarketeconomy, neo-liberalism
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (159)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (144)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (80)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





