মার্কসবাদের আলোয় সংস্কৃতি (তৃতীয় পর্ব)

Author
চন্দন মুখোপাধ্যায়

"মহান জার্মান চেতনার"' আহ্বান জানিয়ে এবং জার্মানির  ছাত্র-যুবকদেরকে তাদের মহান দেশকে সমস্ত  ইহুদি, কমিউনিস্ট, শান্তিবাদী, 'ভবঘুরে' এবং সমকামীদের থেকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েএকটা  গম্ভীর, ভয়ানক অঙ্গীকার করানো হয়েছিল:   "পতন এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে! পরিবার ও জাতির শৃঙ্খলা ও শালীনতার জন্য! আমি অগ্নিশিখার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ..."

Culture in the Light of Marxism(Third Part)


   পরবর্তী যুগে যখন এদেশে বিদেশী পুঁজির সাথে দেশীয় পুঁজির দ্বন্দ শুরু হয়েছিল।অন্যদিকে সামন্ততান্ত্রিক শোষণ গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছিল,তখন  দেশের সাহিত্য,সংস্কৃতি কর্মীদের বিরাট অংশ থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সামন্তন্ত্রকে আঘাত করতে দ্বিধা করেন নি।  রবীন্দ্রনাথের প্রদর্শিত পথে বিংশশতাব্দীর প্রথম চার দশক প্রায় সামন্ত বিরোধীতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি,ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা,ফ্যাসিবাদ বিরোধিতা প্রভৃতি বিষয়গত উপাদান বাংলার শিল্প সাহিত্যকে এক ঐতিহ্যের সিংহদুয়ারে পৌঁছে দিয়েছিল। তারই পাশাপাশি তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর দেশেদেশে সমাজতন্ত্রিক ভাবনার স্ফুলিঙ্গ দেখা যাচ্ছে। তারই আগুনে চল্লিশের দশকে প্রলেতারিয় সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে থাকলো  এদেশে বামপন্থার হাত ধরে।

গত শতাব্দীতে ত্রিশের দশকের সূচনা থেকেই অবিভক্ত বাংলায় মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবীরা শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কমিউনিজমের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে থাকে। ইতোপূর্বে বিশের দশক থেকেই প্রধানত রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের প্রেরণায় কাজী নজরুল ইসলাম, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় (যিনি বাংলা ভাষায় প্রথম ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাস অনুবাদ করেন); শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (বাংলা কথা-সাহিত্যে শ্রমিকশ্রেণি যাঁর জন্য প্রথম সম্মানজনক স্থান করে নিতে পেরেছিল) প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকগণ সাম্যবাদী বা মার্কসবাদী মতাদর্শের মূল নির্যাসকে তাঁদের সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ।

১৯৩৭ সালের জানুয়ারি মাসে Mode Review-এ সারা বিশ্বের  কাছে মনীষী রোমা রল্যাঁ র ‘‘মনুষ্যত্ব, মানব সভ্যতা আজ বিপন্ন’’ শীর্ষক আকুল আবেদন ছড়িয়ে পড়ে । মার্চ মাসে প্রগতি লেখক সংঘের তৎপরতায় রবীন্দ্রনাথকে সভাপতি, অধ্যাপক কে টি শাহকে কার্যকরী সভাপতি ও সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সম্পাদক করে গঠিত হয় "Leagu Against Fascism & War"-এর সর্বভারতীয় কমিটি। স্বামী সহজানন্দ থেকে জয়প্রকাশ নারায়ণ, তুষারকান্তি ঘোষ, ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত সহ ভারতের প্রায় সকল সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের দিকপালরাই এতে যুক্ত হয়েছিলেন। এইসব শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের মহান সব সৃষ্টি নিয়ে, প্রগতি লেখক সংঘ প্রকাশিত "Towards Progressive Literature"এবং সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত "প্রগতি" নামের দুটি মূল্যবান সঙ্কলন গ্রন্থ  বের হয় , যা সেই সময়ের  এক মহান দলিল। অধ্যাপক নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত প্রগতি-র ভূমিকাংশে লিখেছিলেন : ‘‘সামাজিক চৈতন্য ,সাহিত্য সৃষ্টির পরিপন্থি নয় এবং রাষ্ট্রনীতি বিষয়ে পরস্পর মতভেদ থাকা সত্ত্বেও ফ্যাসিজমের বিরোধী হওয়া যায়। যাঁরা এই নীতিতে বিশ্বাসী প্রগতি লেখক সংঘ ও প্রগতির পৃষ্ঠায় সকলেই স্বাগত।’’

১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে সংঘের সর্বভারতীয় দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যাতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ অভিভাষণ প্রেরণ করেন মুসলিম জগতে তুরস্কের অগ্রগতিকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। সংঘের সক্রিয় সংগঠক রূপে এমন কয়েকজন তরুণ লেখক-সাহিত্যিক-কবি আত্মপ্রকাশ করেন যাঁরা পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের মোড় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে গোপাল হালদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিনয় ঘোষ, সমর সেন, সরোজ দত্ত, অনিল কাঞ্জিলাল, সুবোধ ঘোষ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ অবশ্য ১৯৪২সালের ২৮শে মার্চ তারিখে কলকাতায় তরুণ কমিউনিস্ট লেখক সোমেন চন্দ-র (ইনি ঢাকার রাজপথে নির্মমভাবে প্রো-ফ্যাসিস্তদের দ্বারা নিহত হন ৮ই মার্চ, ১৯৪২) স্মরণসভা থেকে নাম বদল করে ফ্যাসিস্ত-বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ পরিণত হয়। তার আগের বছর জ্যোতি বসু ও স্নেহাংশুকান্ত আচার্যের উদ্যোগে স্থাপিত হয় সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি। ১৯৪৩-এ প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় গণনাট্য সংঘ। সারা ভারতজুড়ে সৃষ্টি হয় সংস্কৃতি জগতে এক মার্কসবাদী জাগরণের,  যা যুদ্ধ, মন্বন্তর, সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন সৃষ্টি করেছিল। নিঃসন্দেহে প্রগতি লেখক সংঘ ছিল তার প্রধান পথ প্রদর্শক ও অনুপ্রেরণা।

চল্লিশের দশকে  শিল্প,সাহিত্য এবং সমগ্র  সংস্কৃতি জগতে  যে প্রলেতারীয় বৈশিষ্ঠ দেখা গিয়েছিল,স্বাধীনতার পরে একদিকে দেশীয়   বুর্জোয়া শ্রেণী আর  সামন্ততন্ত্রের  গাঁটছড়া বাঁধা অবস্থায় অনেকেই দিকভ্রান্ত  হয়ে সরে যান। আর অন্যদিকে বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে  সংকীর্ণতা, সংশোধনবাদ এবং অতিবাম ঝোঁক সেই আন্দোলনকে  অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।এমনকি অনেকে প্রলেতারীয় সংস্কৃতির রূপকার হিসাবে আত্মপ্রকাশের পর নিজেদের স্বার্থে বুর্জোয়া শিবিরে ঢুকে গেছেন। আর তার প্রভাব পড়েছে পরবর্তী সৃষ্টির মধ্যে।

এই রকম এক সময়ে  আজ গণনাট্য শিল্পীদের কাছে আমাদের অতীতের সুকৃতিগুলোকে সামনে রেখে নতুন লড়াই করার সময়। আর সেই লড়াইয়ে অগ্রবর্তী বাহিনী হিসাবে সব অংশের প্রগতিশীল মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। আর তাই এই সময় সামনে থেকে  এই সংস্কৃতির লড়াইটাও খুব জরুরী। এখন সময় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে দাঁড়ানোর নয়। এ সময় নতুন করে যুদ্ধাস্ত্রে শান দেওয়ার। যুদ্ধ কেবল বাইরে নয়, যুদ্ধ ভেতরেও। যুদ্ধ প্রকাশ্য নয় শুধু, যুদ্ধ গভীর গোপনেও।  এক মুহূর্তের জন্যেও আদর্শের প্রতি ভরসা হারালে চলবে না । যদিও আজকের শাসকশ্রেণী এই প্রজন্মের সাথে  এই সমাজের একটা বড় অংশকে সুকৌশলে চেষ্টা করছে আদর্শ থেকে সরিয়ে,  সুন্দর জীবনের পথ থেকে নিয়ে যেতে অন্ধকার জীবনের পথে।  যুগে যুগে যারা বাঁধতে চেয়েছে কোনো শেকলে, তারাই ইতিহাসে হারিয়ে গেছে । আজ ও  ওরা পারবে না। কিছুদিন ভুল পথে রাখা যায় যদিওবা তবে চিরকাল নয় ।

 হিটলারের সময়ে 10 মে, 1933।"মহান জার্মান চেতনার"' আহ্বান জানিয়ে এবং জার্মানির  ছাত্র-যুবকদেরকে তাদের মহান দেশকে সমস্ত  ইহুদি, কমিউনিস্ট, শান্তিবাদী, 'ভবঘুরে' এবং সমকামীদের থেকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েএকটা  গম্ভীর, ভয়ানক অঙ্গীকার করানো হয়েছিল:   "পতন এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে! পরিবার ও জাতির শৃঙ্খলা ও শালীনতার জন্য! আমি অগ্নিশিখার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ..."। সেই ডাকে নাৎসি ছাত্র ইউনিয়নগুলি সেদিন জার্মানির চারপাশে 'পরিষ্কার' অভিযানের ঘোষণা করে, জার্মান জাতির 'আত্মা'র 'শুদ্ধিকরণ' এর একটি প্রকল্পকে বাস্তবায়নের নামে অগ্নিশুদ্ধি করতে পথে নামে । সেদিন তারা 'আন-জার্মান' বই, সংখ্যায় 20,000 (কিছু অনুমান অনুসারে 25,000), পাবলিক লাইব্রেরি, ব্যক্তিগত বইয়ের তাক এবং একাডেমিক সংগ্রহ থেকে লুট  করে ,যে তালিকায় ছিল ,স্টেফান জুইগ, টমাস এবং হেনরিখ ম্যান, কার্ল মার্কস, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, রোজা লুক্সেমবার্গ, ফ্রাঞ্জ কাফকা, এরিক মারিয়া রেমার্ক, অগাস্ট বেবেল, বার্টোল্ট ব্রেখ্ট, আনা সেঘার্স, ক্লাউস মান, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, হেনরিক হেইন, আপটন সিনক্লেয়ার এবং এরিক কাস্টনারদের সব বই,তার সাথে  ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, ম্যাক্সিম গোর্কি, ভিক্টর হুগো, বারবুস এবং  লেনিনের কাজগুলো, সেগুলোক ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে । সেই জার্মানিতেই আবার মানুষ জেগে উঠে নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়ে আবার প্রমান করে দিল মানুষ যখন জাগে তখন আকাশে তার মাথা ঠেকে যায় । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কবি, হেলাল হাফিজের একটি কবিতা মনে পড়ে যায়,

"কে আছেন?

দয়া করে আকাশকে একটু বলূন-

সে সামান্য উপরে উঠুক।

আমি দাঁড়াতে পারছি না।’

তাই শাসকরা যতই  অন্ধকার নামিয়ে আনুক,  আলোর দিশারিরা আলো খুঁজে নেবেই। ইংরাজিতে একটা প্রবাদ আছে," every dark cloud has a silver lining." রবিঠাকুরের ভাষায়, তাই বলতে হয়," অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত  আলো, সেই তো তোমার আলো"।

আজ পথে নামার সময় জীবনের লড়াইয়ে। আজ গণনাট্য সংঘের সাথে সাথে সমস্ত প্রগতিশীল শিল্পীদের সামনে তাই কঠিন দায়িত্ব এসে পড়েছে, আজ শুধু গান নয় সংঘ সংগীতকে প্রতিদিনের লক্ষ্য হিসাবে এগিয়ে নিয়ে যাবার - "এসো মুক্ত করো, অন্ধকারের এই দ্বার।"
প্রকাশ: ২৭-মে-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 27-May-26 13:28 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/culture-in-the-light-of-marxismthird-part
Categories: Fact & Figures
Tags:
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড