অর্থনীতি যখন সাম্রাজ্যবাদের আরও এক কৌশল (পর্ব ৩)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশা ছিল যে, ইরানের শাহের মতই, সুহার্তো ওয়াশিংটনের জন্য কাজ করবেন। আশা ছিল যে ইন্দোনেশিয়া এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্য একটি মডেল হয়ে উঠবে; বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব পড়বে। এছাড়াও ছিল, ইন্দোনেশিয়ার পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ।

ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাস এবং পুরাকথা বহু চরিত্রের এক অসাধারণ ভাণ্ডার: ক্রুদ্ধ দেবতা, কোমোডো ড্রাগন, উপজাতীয় সুলতান, এবং খ্রিস্টের জন্মের অনেক আগের প্রাচীন কাহিনীগুলি। এখানকার কিংবদন্তি দ্বীপগুলির নাম– জাভা, সুমাত্রা, বরনিও, সুলাওয়েসি– মায়া সৃষ্টি করে।
১৯৭১ সালের গ্রীষ্মে ইন্দোনেশিয়ার উষ্ণ রাজধানী জাকার্তায় পার্কিনসের প্রথম দিনগুলি ছিল বিস্ময়কর। সৌন্দর্য নিশ্চয়ই ছিল– রঙিন সারং পরা সুন্দরী নারী, গ্রীষ্মকালীন ফুলের উজ্জ্বল সবুজ বাগান, অসাধারণ বালিনিজ নৃত্যকারী, ডাচ ঔপনিবেশিক অট্টালিকা এবং গম্বুজওয়ালা মসজিদ। কিন্তু শহরের একটি কুৎসিত, বিষাদময় দিকও ছিল। যক্ষ্মারোগীর হাতে রক্তাক্ত হাড় বার করা। তরুণীরা কয়েকটি পয়সার জন্য তাদের শরীর বিক্রি করতে রাজি। একসময়ের শোভা ডাচ খালগুলি মলকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। সুন্দর এবং কুৎসিত, মার্জিত এবং অশ্লীল, আধ্যাত্মিক এবং ভক্তিহীন– এরকম ছিল জাকার্তা, দারুচিনি এবং অর্কিডের সুবাস প্রতিযোগিতা করছিল মুক্ত নালার কুৎসিত গন্ধের সঙ্গে। পার্কিন্সের কথায়, “দারিদ্র্য আমি আগেও দেখেছি, কিন্তু এর কোনকিছুই জাকার্তা সম্পর্কে প্রস্তুত হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না”।
১৯৭১ সাল নাগাদ, ইন্দোনেশিয়াকে কমিউনিজমের প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা বেড়ে গিয়েছিল। মেইন-এর বৈদ্যুতিকীকরণ প্রকল্পটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকান আধিপত্য নিশ্চিত করার একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার অংশ ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশা ছিল যে, ইরানের শাহের মতই, সুহার্তো ওয়াশিংটনের জন্য কাজ করবেন। আশা ছিল যে ইন্দোনেশিয়া এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্য একটি মডেল হয়ে উঠবে; বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব পড়বে। এছাড়াও ছিল, ইন্দোনেশিয়ার পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ।
প্রকল্পের ব্যবস্থাপক চার্লি ইলিংওয়ার্থ প্রথমেই টিমের সকলের কাছে উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে দেন। আমেরিকার উদ্দেশ্য ইন্দোনেশিয়াকে কমিউনিজমের থাবা থেকে রক্ষা করা, যাতে সে তার উত্তরের প্রতিবেশী, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং লাওসের পদাঙ্ক অনুসরণ না করে। একটি সমন্বিত বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা একটি মূল উপাদান, এই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। মাস্টার পরিকল্পনায় নিশ্চিত করতে হবে, সমস্ত শিল্পক্ষেত্র যেন এই পঁচিশ বছরের পরিকল্পনার সময়জুড়ে তাদের প্রয়োজনীয় পরিমাণ বিদ্যুৎ পায়। আমেরিকা চায় না যে তারা লাল পতাকার নিচে বাস করুক!
প্রাথমিক আলোচনা হয় জাকার্তায় আমেরিকার দূতাবাসে বিভিন্ন অফিসারদের সঙ্গে। পরের গন্তব্য ছিল পাহাড়ি শহর বান্দুং। জাকার্তার তুলনায় আবহাওয়া কিছুটা আরামদায়ক, দারিদ্র কিছু কম, অনেক শান্ত। উইজমাতে একটি সরকারি অতিথিশালায় তারা থাকছিলেন ম্যানেজার, রাঁধুনি, মালি, একদল ভৃত্য সহ; যাতায়াতের জন্য ছিল চালক এবং দোভাষী সহ এগারোটি নতুন টয়োটা গাড়ি।
প্রায় সত্তর বছর বয়সী হাওয়ার্ড পার্কার ছিলেন নিউ ইংল্যান্ড ইলেকট্রিসিটি সিস্টেম-এর অবসরপ্রাপ্ত প্রধান চাহিদার পূর্বাভাসকারী। তাঁর কাজ ছিল জাভা দ্বীপের আগামী পঁচিশ বছরে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও উৎপাদন ক্ষমতার পরিমাণ (লোড) অনুমান করা এবং সেটিকে শহর ও অঞ্চলভিত্তিক পূর্বাভাসে ভাগ করা। যেহেতু বিদ্যুৎ চাহিদার সম্পর্ক রয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে, সেহেতু তার পূর্বাভাস নির্ভর করত অনুমিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারের উপর। এই ধাপটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি বড় পরিমাণে বিনিয়োগের পূর্বশর্ত হচ্ছে চাহিদা। সেই চাহিদাকে বড় করে দেখাতে না পারলে অসুবিধা। মোদ্দা কথায়: বড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি – বেশি বিদ্যুতের চাহিদা – বড় মাপের প্রকল্প – বড় পরিমাণ ঋণ – কর্পোরেটের বড় মুনাফা। দলের বাকি সদস্যরা এই পূর্বাভাসের উপর ভিত্তি করেই মাস্টার পরিকল্পনা তৈরি করবে; পাওয়ার প্ল্যান্ট, ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন লাইন এবং জ্বালানী পরিবহন ব্যবস্থা ডিজাইন ও স্থাপন করা হবে। চার্লি সর্বদাই জোর দিত পূর্বাভাসগুলি যেন খুব আশাবাদী ছবি দেখায়। মার্কিন বিদেশ নীতি এবং কর্পোরেট স্বার্থকে সমর্থন করাই ছিল জরুরী – ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ মানুষের জীবন উন্নত করার প্রয়োজনের চেয়ে নিজেদের লোভ ছিল বেশি।
প্রথম কাজ ছিল তথ্য সংগ্রহ। বর্তমান বৈদ্যুতিক সিস্টেম, বন্দরের ক্ষমতা, সড়ক, রেলপথ, এই ধরনের সমস্ত কিছু নিয়ে একটি বিস্তারিত ছবি তৈরি হবে। প্রথম মাসের শেষের মধ্যেই, হাওয়ার্ডকে একটি নির্ভরযোগ্য ধারণা দিতে হবে, নতুন গ্রিড চালু হলে যে ধরণের অর্থনৈতিক অলৌকিক কাণ্ড ঘটবে তার পূর্ণ পরিসরের। দ্বিতীয় মাসের শেষের দিকে, আরও বিস্তারিত তথ্যের প্রয়োজন হবে– অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণ করা। শেষ মাসটি হবে ফাঁকগুলি পূরণ করার জন্য। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তখন সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে। দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে নিশ্চিত করতে হবে যে সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য রয়েছে। আবার ফিরে আসার কোন সুযোগ নেই।
হাওয়ার্ড ছিলেন সদালাপী, কিন্তু ভিতরে ভিতরে বিষণ্ণ, যিনি জীবন থেকে ধোঁকা খেয়েছেন। নিউ ইংল্যান্ড ইলেকট্রিক সিস্টেমের উচ্চ মহলে পৌঁছাতে পারেননি, কারণ তিনি কোম্পানির রাজনৈতিক মতামত মানতে অস্বীকার করেছিলেন, এবং এ ব্যাপারে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাঁকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং তারপর, মেইন-এ পরামর্শদাতার চাকরি গ্রহণ করেছিলেন। এইনার এবং চার্লি দুজনেই তাকে জেদী, নীচুমনের, এবং প্রতিশোধপরায়ণ মনে করতেন।
তবে, হাওয়ার্ড ছিলেন একজন জ্ঞানী শিক্ষক, যদিও পার্কিনসের দৃষ্টিকোণ থেকে, তিনি একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। হাওয়ার্ড স্পষ্টভাবে বুঝেছিলেন পরিস্থিতি ও তাঁর কাছে যে ভূমিকা প্রত্যাশিত, তবে তিনি একটি বোড়েতে পরিণত হতে চাননি। তার জেদের বড় কারণ, দাস হতে না-চাওয়ার ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞা। তিনি হয়ত কখনও ‘অর্থনৈতিক ঘাতক’ শব্দটি শোনেন নি, কিন্তু জানতেন যে তারা তাঁকে এমন একটি কাজে ব্যবহার করতে চায় যা তিনি মেনে নিতে পারেননা।
চার্লির সঙ্গে বৈঠকের পরে হাওয়ার্ড পার্কিনসকে সতর্ক করার চেষ্টা করেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার আকাশচুম্বী হতে চলেছে, এইসব ভাবনাতে প্রভাবিত না-হতে। তার কথা পার্কিনসকে বিষণ্ণ করেছিল ঠিকই তবে তার কর্মজীবনের সাফল্য নির্ভরশীল ছিল মেইন-এর উপরওয়ালাদের সন্তুষ্ট করার ওপরেই। পার্কিনস হাওয়ার্ডকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার নিশ্চয়ই বাড়বে।
হাওয়ার্ড অবশ্য এসব কাহিনীতে বিশ্বাস করতেন না। তার পুরো জীবন কেটেছে – মন্দা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ধ্বংস ও উন্নতির সময় – বৈদ্যুতিক লোডের পূর্বাভাস করার কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে। তাঁর মতে, লম্বা সময় ধরে, বৈদ্যুতিক লোড ছয় শতাংশ হারে বাড়াই বেশি যুক্তিসঙ্গত। তিনি হয়ত ঠিক ছিলেন, কিন্তু তাঁর কথা মেনে নেওয়ার অসুবিধা ছিল পার্কিনসের; চার্লি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, বছরে অন্তত ১৭ শতাংশ বৃদ্ধির হার দেখাতে চান।
এর কয়েকদিন পর মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে বাধ্য হন হাওয়ার্ড। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন যে তার কাছে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য রয়েছে এবং সহজেই বোস্টন থেকে লোড পূর্বাভাসটি সম্পূর্ণ করতে পারবেন। তিনি পরিষ্কার করে দেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্পর্কে যা অলৌকিক ঘটনাই বলা হোক না কেন, তিনি সেই কেলেঙ্কারির অংশ হবেন না!
এরপর পার্কিনসকে মাস্টার প্লানের আওতাধীন এলাকার জনবহুল কেন্দ্রগুলিতে সফরে যেতে হয়েছিল। তিনি অনেকগুলি স্থান পরিদর্শন করেন, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে তাদের মতামত শোনেন। তবে, তাদের অধিকাংশই তথ্য শেয়ার করতে দ্বিধাগ্রস্ত, অনিচ্ছুক ছিলেন। তারা পার্কিনসকে পরামর্শ দেন, উপরওয়ালাদের সাথে, সরকারি সংস্থাগুলির সাথে, অথবা জাকার্তার কর্পোরেট সদর দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করতে। অর্থনৈতিক পূর্বাভাস তৈরির জন্য বেশিরভাগ পরিসংখ্যান শুধুমাত্র জাকার্তার সরকারি অফিসগুলিতে পাওয়া যেতে পারে। সুতরাং, পার্কিনসের জাকার্তায় দু-এক সপ্তাহ কাটানোর প্রয়োজন ছিল।
ইতিমধ্যে, বান্দুং থাকাকালীন, রাসি নামের একজন স্থানীয় তরুণের সাহায্যে পারকিন্সের পরিচয় হয় কিছু তরুণ-তরুণীর সঙ্গে। তাঁরা সকলেই ইংরাজিতে কথা বলছিলেন, কিন্তু পারকিন্সের বাহাসা বলার চেষ্টার প্রশংসা করলেন। সেই রাত পার্কিনসের জীবনে বড় ছাপ ফেলেছিল; রাসি এবং তার বন্ধুরা তাকে নিজেদের একজনের মতো মর্যাদা দিয়েছিল। তারা ভিয়েতনামে আমেরিকার আক্রমণকে ‘অবৈধ’ মনে করতেন। তাদের মতে, আমেরিকার আসল লক্ষ্য মুসলিম জগত; লোভ এবং স্বার্থপরতাই আসল বিপদ। বোঝা দরকার, বড় বড় বাড়ি এবং শৌখিন দোকানের চেয়েও বিশ্বে দরকারি আরও অনেক কিছু আছে – মানুষ ক্ষুধার্ত হয়ে আছে এবং লোভীরা নিজেদের গাড়ির জন্য তেলের চিন্তা করছে; শিশুরা তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছে এবং লোভীরা সর্বাধুনিক ফ্যাশন খুঁজছে। যারা এসব কথা বলার চেষ্টা করছে, সেই সব লোককে চরমপন্থী বা কমিউনিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। পার্কিনসের মনে হয়েছিল যে ইন্দোনেশিয়ায় তারা যা কিছু করছেন তা বাস্তবতার চেয়ে বরং একটি খেলার মতো। তবে, এই খেলা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বের, এবং এর পরিণতি লাখ লাখ মানুষের জীবনে দশকের পর দশক প্রভাব ফেলবে।
রাসি তাকে নিয়ে গিয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত পুতুল খেলা ‘ওয়াইয়াং’ দেখতে। সেখানে পুতুলনাচের মাধ্যমে আমেরিকা কীভাবে বিশ্বের নানা দেশকে গ্রাস করছে, তা দেখান হচ্ছিল। উপস্থিত জনতা অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে উঠছিল, শোনা যাচ্ছিল হাসির ফোয়ারা, চমক এবং রাগ।
বান্দুং-এর অভিজ্ঞতা পার্কিনসকে শিখিয়েছিল জীবনকে একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে। তরুণ ইন্দোনেশিয়ানদের সাথে কাটানো রাত্রি, দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা তাকে পাল্টে দিয়েছিল। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতাদের সাথে বৈঠকের সময়, তিনি বোঝেন যে অনেকেই তার উপস্থিতি অপছন্দ করছে। পার্কিনসকে অন্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময়ে, তারা প্রায়ই একটি বাহাসা শব্দ ব্যবহার করতেন যার অর্থ দাঁড়ায় তদন্তকারী এবং প্রশ্নকর্তা; তারা জানতেন না পার্কিনসের কিছুটা বাহাসা ভাষা জানা আছে। তিনি ছিলেন যেন একজন অযাচিত অতিথি, কোনও এক উঁচুমহল থেকে আদেশ এসেছে সহযোগিতা করার, এবং তা মেনে নিতে তাঁরা বাধ্য ছিলেন। তারা পার্কিনসের সাথে যথেষ্ট ভদ্র ব্যবহার করতেন, তবুও তাঁদের মনে এক ধরনের হতাশা এবং বিরক্তি ছিল।
সরকারি অফিসে, পার্কিনসের অনুমতি ছিল না সরাসরি কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করার; প্রথমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়েছে; জানাতে হয়েছে কোন ধরনের তথ্য প্রয়োজন। তারপর মিটিং-এর সময় নির্ধারিত হতো। মিটিং-এ আগে থেকে প্রস্তুত করা উপকরণের একটি ফোল্ডার দেওয়া হতো। তাতে থাকত শিল্পমালিকদের প্রস্তুত করা পাঁচ এবং দশ বছরের পরিকল্পনা, ব্যাংকারদের নানা চার্ট এবং গ্রাফ, এবং সরকারি কর্মকর্তাদের আসন্ন প্রকল্পগুলির তালিকা। ব্যবসাজগত ও সরকারের এই ক্যাপ্টেনদের সরবরাহ করা তথ্য এবং সাক্ষাৎকারের কথাবার্তা থেকে মনে হতো যে জাভা একটি অকল্পনীয় উন্নয়নের জন্য প্রস্তুত। তবে কেউই এ ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন করেনি বা কোনও নেতিবাচক তথ্য দেয়নি– বিষয়টি ছিল উদ্বেগের।
এ সময়ে পার্কিনস ঐ বিষয়গুলি নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা ও একটি ডায়েরিতে সে সম্পর্কে লিখতে শুরু করেছিলেন। তিনি শহরের রাস্তায় ঘুরতেন, ভিখারীদের অর্থসাহায্য করতেন এবং সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের সাথে আলাপ করতে চেষ্টা করতেন।
সব তথ্য সংগ্রহের পর আমেরিকায় ফেরেন পার্কিন্স। ইন্দোনেশিয়ায় তার কাজের প্রকৃত পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল মেইন-এ। পৌঁছে জানতে পারেন এইনারের পদোন্নতি হয়েছে পোর্টল্যান্ড, ওরেগন অফিসের প্রেসিডেন্ট হিসাবে। ফলে পার্কিনসকে রিপোর্ট করতে হবে ব্রুনো জাম্বটির কাছে। জাম্বটি ছিলেন সুবক্তা এবং সুশিক্ষিত। তিনি অর্থনৈতিক পরিমাপ সংক্রান্ত বিষয়গুলি বুঝতেন এবং মেইন-এর বৈদ্যুতিক শক্তি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং অধিকাংশ আন্তর্জাতিক প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন। সংস্থার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য তিনিই উপযুক্ত ব্যক্তি।
ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে কিছু সাধারণ আলোচনার পর, তিনি পার্কিন্সকে জানান, হাওয়ার্ড পার্কারকে বরখাস্ত করেছেন, কারণ তাঁর রিপোর্ট ছিল অবাস্তব; বছরে মাত্র আট শতাংশ হারে লোডবৃদ্ধির পূর্বাভাস গ্রহণযোগ্য ছিল না। তিনি পার্কিনসের কাছ থেকে নিশ্চিত হন, অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে ১৭ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে লোড বৃদ্ধির হারকেই মান্যতা দেওয়া হয়েছে। এরপর পার্কিনসকে অভিনন্দন জানিয়ে পদোন্নতির আগাম খবর দেন তিনি। এই পদোন্নতি সত্ত্বেও, কিন্তু, হোটেলের একাকীত্বে পার্কিনস হতাশ এবং বিষণ্ণ বোধ করছিলেন। এই পদোন্নতি যেন নিজেকে বিক্রির ইচ্ছার ওপর একটি তকমা মনে হচ্ছিল। হাওয়ার্ডের কথাগুলি কানে বাজছিল– আপনারা অর্থের জন্য নিজেদের আত্মা শয়তানের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।
পরের দিন সকালে, মেইন-এর অফিসে পার্কিন্স ভালো খবর পান। তাকে হাওয়ার্ডের পুরনো পদে উন্নীত করা হয়েছে – প্রধান অর্থনীতিবিদের খেতাব এবং সেইসাথে বেতনবৃদ্ধি। পরবর্তী সপ্তাহগুলিতে, ইন্দোনেশীয় অর্থনীতির উপর রিপোর্ট লেখা এবং হাওয়ার্ডের লোড পূর্বাভাস সংশোধন করার উপর নজর দেন তিনি। তার প্রস্তাব উপরওয়ালাদের পছন্দমত ছিল: নতুন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হওয়ার পর বার্ষিক ১৯ শতাংশ হারে গড় বিদ্যুৎ চাহিদার বৃদ্ধি, পরবর্তী আট বছরের জন্য ধীরে ধীরে কমে ১৭ শতাংশে, এবং তারপর পঁচিশ বছরের পূর্বাভাসের বাকি সময়ের জন্য ১৫ শতাংশ হারে স্থির থাকা। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলির সাথে আনুষ্ঠানিক সভায় তার রিপোর্ট পেশ করার পর, বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে, পরিশেষে তাঁদের স্বীকৃতির মোহর লাগিয়েছিলেন।
এরপর এক বিকেলে ব্রুনো পার্কিন্সকে নিজের অফিসে ডেকে তার কাজের প্রশংসা করেন। আরেকটি দেশে পার্কিন্সকে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি, “আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে, আমরা আপনাকে জীবনের সেরা একটি সুযোগ দিচ্ছি, যা খুব অল্প কিছু মানুষই পান, এমনকি আপনার দ্বিগুণ বয়সেরও।” সেই সুযোগ ছিল পানামায় কাজ করার।
পার্কিন্সের ডায়েরির একটি অংশ ব্যবহার করেই এ প্রসঙ্গ শেষ করা যায়-
“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কি কেউ নিরপরাধ? অর্থনৈতিক পিরামিডের সবচেয়ে উচ্চস্থানে থাকা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হন সত্য, তবে আমাদের মতো লক্ষ লক্ষ মানুষও নিজেদের জীবিকার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলির শোষণের উপর নির্ভরশীল– প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। যে সম্পদ এবং সস্তা শ্রম আমাদের প্রায় সকল ব্যবসার উন্নতির কারণ, তা আসে ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের কাছ থেকে, এবং তার খুব কম অংশই সেখানে ফিরে যায়। বিদেশী সাহায্যের ঋণ নিশ্চিত করে যে আজকের শিশুরা এবং তাদের নাতিনাতনিরা সারাজীবন কাটাবে পণবন্দী হয়ে। তারা বাধ্য হবে আমাদের কোম্পানিগুলিকে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করতে দিতে এবং কেবলমাত্র আমাদের ঋণ শোধের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য সামাজিক পরিষেবাগুলির আশা ত্যাগ করবে। এটি সত্য যে, এই অর্থের বেশিরভাগই ইতিমধ্যেই উদরস্থ করেছে আমাদের নিজস্ব কোম্পানিগুলি, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বিমানবন্দর এবং শিল্প পার্ক নির্মাণের নামে। অধিকাংশ আমেরিকানদের এই বিষয়ে অজ্ঞতা, কি তাদের নির্দোষিতা প্রমাণ করে? অজ্ঞ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অসচেতন, হ্যাঁ – কিন্তু নির্দোষ?”
তথ্যসূত্র: কনফেসন্স অফ অ্যান ইকোনমিক হিট ম্যান, জন পার্কিন্স
ছবিঃ সোশ্যাল মিডিয়া
লেখাটি তিন পর্বে শেষ হল
প্রকাশ: ৩১-অক্টোবর-২০২৫
শেষ এডিট:: 31-Oct-25 11:55 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/economy-the-other-way-part-iii-
Categories: International
Tags: bigcapital, economic crisis, economic discrimination, financecapital, neo-liberalism
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (165)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (150)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (81)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





