আয় সুরক্ষা ও স্বনির্ভর প্রকল্প

Author
মধুজা সেন রায়

স্বনির্ভর প্রকল্পকে উন্নততর করার মাধ্যমে ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পে আমাদের রাজ্যকে আবার দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এই লক্ষ্যে সমবায় ব্যাংক গুলির মাধ্যমে সহজ শর্তে কম সুদে আরও বেশি মানুষকে ঋণদান প্রকল্পের আওতাভুক্ত করতে হবে। ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া স্বরলিকরণ করা যেমন জরুরী তেমনি ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সময় যেন আরো কম লাগে তাও দেখতে হবে।

Income Security and Self-help Group


স্বনির্ভর গোষ্ঠী। গ্রামীণ ভারতের অর্থনীতির এক অন্যতম স্তম্ভ। ১৯৮০ দশকে ভারতবর্ষে এই গোষ্ঠী গঠন শুরু হয় ১৯৯০ এর দশকে আমাদের রাজ্যে স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা self help group গ্রুপ গুলি গড়ে উঠতে শুরু করে। মূলত ১০ থেকে ২০ জন মহিলাকে নিয়ে এক একটি গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এই গোষ্ঠীগুলিকে সহজ শর্তে কম সুদের ঋণদান করে মহিলাদের স্বাবলম্বী করে তোলাই ছিল প্রাথমিক লক্ষ্য। ১৯৯২ সালের নাবার্ড পশ্চিমবঙ্গ তথা গোটা দেশে স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও ব্যাংক গুলির সংযুক্তিকরণের রাস্তা খুলে দিলে সরকার পরিচালিত মাইক্রোফিনান্স এর মডেল কার্যকরী হয়। মহিলারা স্বল্প সুদের ঋণ নিয়ে হাঁস-মুরগি পালন থেকে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ বিভিন্ন হস্তশিল্পের প্রক্রিয়াকরণ এর মধ্যে দিয়ে ব্যক্তি পরিবার এবং সর্বোপরি গ্রামীণ ও শহুরে আয়ের বৃদ্ধিতে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। ২০০৫-৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে এই গোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৩.৮ লাখ। মোট ৩৮ লাখ মানুষ এই গোষ্ঠীগুলির সাথে যুক্ত ছিলেন।

যাদের নব্বই শতাংশই ছিলেন মহিলা। কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয় এই প্রকল্প। ২০০৬ সালে সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের সময় এই স্বনির্ভর প্রকল্পকে আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আলাদা মন্ত্রক গঠিত হয়। ২০১০ সালের শেষে এই গোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ লক্ষ ৫৬ হাজার ৭৩৯। প্রায় এক কোটি ৩৫ লক্ষ মহিলা তখন যুক্ত ছিলেন এই গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে। বর্তমানে রাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই SHG র সংখ্যা প্রায় ১২ লক্ষ। এক কোটি কুড়ি লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের সাথে বর্তমানে যুক্ত। অর্থাৎ এই সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা বাড়লেও স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং এই গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত মহিলাদের সংখ্যা কমেছে। অথচ ১০০ দিনের কাজ বন্ধ হওয়া সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া স্লথ হওয়া এবং কোথাও কোথাও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ প্রশস্ত করা এই সময়ের শুধু চাহিদা নয় জরুরি কাজও বটে। গ্রাম ও শহরের মহিলাদের স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে যে এই প্রকল্প বিশেষ ভূমিকা শুধু পালন করতে পারে তাই নয় স্বাস্থ্য সচেতনতা শিক্ষা সচেতনতা এবং বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসারের কাজেও এই গোষ্ঠীগুলি সহায়ক ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। 

স্বনির্ভর প্রকল্পকে উন্নততর করার মাধ্যমে ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পে আমাদের রাজ্যকে আবার দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এই লক্ষ্যে সমবায় ব্যাংক গুলির মাধ্যমে সহজ শর্তে কম সুদে আরও বেশি মানুষকে ঋণদান প্রকল্পের আওতাভুক্ত করতে হবে। ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া স্বরলিকরণ করা যেমন জরুরী তেমনি ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সময় যেন আরো কম লাগে তাও দেখতে হবে। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিবর্তে সমবায় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহনে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। ব্যবসা শুরুর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ঋণ যেন দেওয়া যায় সেই দিকে নজর দিতে হবে। উৎপাদিত পণ্য গুলির মান উন্নত করার লক্ষ্যে গোষ্ঠীগুলিকে সরকারি উদ্যোগে আরো ব্যাপক মাত্রায় উন্নততর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। উৎপাদিত পণ্যের গুণমান কে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সরকারকে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একদিকে প্রথাগত বিষয় (যেমন সেলাই) এ প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে বাংলার ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিতে হবে তেমনই, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মোবাইল-কম্পিউটার-ল্যাপটপ রিপেয়ারিং, নার্সিং আধুনিক প্রযুক্তিতে উন্নত মানের সার তৈরি ,বীজ তৈরি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেজিং, ড্রাইভিং, পানীয় জল প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেজিং এর প্রশিক্ষণও দেওয়া জরুরী। বিশেষত শহরাঞ্চলে এবং মফস্বলে বহু বয়স্ক মানুষই একলা থাকেন অথবা বয়স্ক দম্পতিরা বাড়িতে একলাই থাকেন। তাদের বিভিন্ন বিল জমা দেওয়া, প্রতিদিনের বাজারহাট করে দেওয়া,খেয়াল রাখা,ওষুধ সহ অন্যান্য জিনিস এনে দেওয়ার জন্য স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংগঠিত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

স্বনির্ভর গোষ্ঠীর উৎপাদিত পণ্য গুলিকে সরকারি ও বেসরকারি ই-কমার্স প্লাটফর্মে বিক্রির জন্য সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ যেমন দিতে হবে তেমনি প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সুবিধা ও দিতে হবে। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করার লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে প্রতি ব্লকে একটি বিপণনী তৈরি করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে তৈরি হওয়া এই শপিং কমপ্লেক্স গুলির মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের কাছে স্থানীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। এই স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির আয় সুরক্ষিত করার জন্য সরকারকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য সরাসরি গোষ্ঠীগুলির কাছ থেকে কিনে নিয়ে অন্যান্য বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। হিসেব ও কাজের যাবতীয় রেকর্ড রাখার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা মাথায় রেখেই প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রতিটি গোষ্ঠীকে সহজ কিস্তিতে ও কম দামে কম্পিউটার ও পণ্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় যান কেনার সুযোগ করে দিতে হবে সরকারকেই। দুর্ঘটনা জনিত বীমার উর্ধ্বসীমা যেমন বাড়াতে হবে তেমনি গোষ্ঠী পরিচালনার মানসিকতাকে আরো উন্নততর করার লক্ষ্যে কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে।

প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সময়োপযোগী পরিকল্পনা এবং  যথাযথ সরকারি উদ্যোগ ও সহায়তার মাধ্যমেই স্বনির্ভর প্রকল্পকে উন্নত করা সম্ভব। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে খাতায়-কলমে সরকারি উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবের মাটিতে চিত্রটা আলাদা। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সংখ্যা তো বাড়েইনি, উল্টে কমেছে। ঋণ পাওয়া গোষ্ঠীর সংখ্যা ও পর্যাপ্ত নয়। আন্তরিক নজরদারীর অভাবে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। পণ্য প্রদর্শনীর জন্য সবলা মেলা সহ বিভিন্ন মেলায় স্টল পেতে গোষ্ঠীগুলিকে যে পরিমাণ টাকা দিতে হচ্ছে তা কখনো কখনো তার লাভের অংকের থেকে অনেকটাই বেশি হওয়ায় গোষ্ঠীগুলি এই প্রদর্শনী গুলিতে অংশ নিতে পারছে না। এর ওপরে বিভিন্ন কাজের জন্য তৃণমূলের নেতাদের কাটমানি নেওয়া তো আছেই। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার শুধুমাত্র ছেলেদের জন্য স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরীর উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগ আসলে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগকে সার্বিকভাবে সংকুচিত করবে।

স্বনির্ভর প্রকল্প বাঁচলে শুধু গরিব মানুষের কর্মসংস্থান হবে না। বাঁচবে বাংলার অর্থনীতি ও। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বাঁচবে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে পশ্চিমবঙ্গকে আবার ভারতবর্ষের এক নম্বর রাজ্যে পরিণত করা সম্ভব হবে। বাড়বে মানুষের মাথাপিছু গড় আয় এবং খরচ করার সামর্থ্যও। গত ১৫ বছরে অন্য রাজ্যের তুলনায় আমাদের রাজ্যে মাথাপিছু গড় আয় কম বেড়েছে। শহরাঞ্চল এবং রামাঞ্চল উভয়ের ক্ষেত্রেই মানুষের গড় খরচের সামর্থ্য দেশের সামগ্রিক গড়ের থেকে অনেকটাই কম সাধারণ মানুষের আয় বাড়লে খরচা করার সামর্থ্য বাড়লে উন্নত হবে বাংলার অর্থনীতি। ভারী ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের অর্থনৈতিক পটভূমি আবার তৈরি হবে এই বাংলায়।

যে ভারী শিল্প আমাদের রাজ্য ছেড়ে চলে বাধ্য হয়েছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে, আইটি কোম্পানি সহ অন্যান্য যে সমস্ত শিল্প এই গত কয়েক বছরে আমাদের রাজ্য ছেড়েছে তাদেরকে আবার ফিরিয়ে আনতেই হবে।২০১১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য থেকে প্রায় ৬,৬৮৮টি কোম্পানি তাদের নিবন্ধিত অফিস অন্য রাজ্যে স্থানান্তর করেছে। এই স্থানান্তরিত সংস্থাগুলির মধ্যে ১১০টি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ছিল। শিল্পের জমিতে শিল্পই তৈরি হবে। ধর্মস্থান নয়। বন্ধু কলকারখানার জমিতে আবাসন প্রকল্প না, শিল্পই গড়ে তুলতে হবে। কৃষিভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, একাধিক আইটি হাব, গাড়ি শিল্প সহ অন্যান্য ভারী শিল্প গড়ে তোলায় জোর দিতে হবে। ভারী শিল্প গড়ে উঠলে তাকে কেন্দ্র করে যে অনুসারী শিল্প গুলি গড়ে উঠবে সেখানেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। শ্রমিক বান্ধব পরিবেশেই গড়ে উঠবে এ রাজ্যের যাবতীয় শিল্প।

ক্ষুদ্র মাঝারি এবং ভারী শিল্পের সময় অবস্থানেই স্বনির্ভর হবে বাংলার যুবসমাজ। স্বনির্ভর হবে বাংলা।

আগামীকাল প্রকাশিত হবেঃ শ্রমিকের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা - লেখক চন্দন মুখোপাধ্যায়

প্রকাশ: ০৫-এপ্রিল-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 07-Apr-26 01:28 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/income-security-and-self-help-group
Categories: Fact & Figures
Tags: left alternative, self help group
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড