মুদ্রার মূল্যহ্রাস ও সাম্রাজ্যবাদের ফাঁদ

Author
প্রভাত পট্টনায়ক

বর্তমান পরিস্থিতি এই নব্য-উদার ব্যবস্থা থেকে সরে আসার একটি বড় সুযোগও এনে দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক-আগ্রাসন ভারতসহ অন্যান্য দেশের সামনে নিজস্ব শুল্ক নীতি নির্ধারণ করে চলতি হিসাব নিয়ন্ত্রণের পথ খুলে দিয়েছে।

Currency Devaluation and the Trap of Imperialism


মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অধিকাংশ এশীয় মুদ্রাই মার্কিন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে এদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে খারাপ পরিস্তিতিতে পড়েছে ভারতীয় টাকা। যুদ্ধ শুরুর আগের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি টাকার দর ছিল ১১.০১ টাকা প্রতি ডলার; সেখান থেকে শুক্রবার ২০ মার্চ নাগাদ তা নেমে এসেছে ১৩.৭৩ পর্যন্ত।

এই পতনের তাৎক্ষণিক কারণটি স্পষ্ট। ভারত তেল ও গ্যামের একটি বড় আমদানিকারক দেশ, যার বড় অংশ আসে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে। এই প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু ভারতে এই পণ্যদুটির সরবরাহ কমেনি, বরং দেশের লেনদেনের ভারসাম্যেও তীর চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা টাকার মূনাকে নিম্নমুখী করছে। এর সাথে যোগ হয়েছে আরও কিছু কারণ, যেমন প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ শুকিয়ে আসা যা এতদিন দেশের লেনদেন ভারসাম্যকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিন।
তবে বিষয়টা শুধু চলতি হিসাবের ঘাটতি (Current Account Deficit)-এর আকস্মিক বৃদ্ধির প্রশ্ন নয়। মাত্র তিন সপ্তাহের যুদ্ধে চলতি হিসাবের এতটা নাটকীয় অবনতি সম্ভব নয়। আমলে এই ধরনের অবনতির আশঙ্কাই ভারত থেকে অখ-খুঁজির পলায়ন ঘটাচ্ছে, এবং সেটাই টাকার পতন ডেকে আনছে। আসল কথা হলো, বৈশ্বিক অর্ধ-বাজারে বিচরণকারীদের প্রত্যাশ্যর। তারা কিনা এখন আবার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ডলারের দিকে ছুটছে অথচ আমেরিকা নিজেই এই যুদ্ধে একটি সক্রিয় পক্ষ এবং মার্কিন আগ্রাসনই এই যুদ্ধের মূল কারণ। এখানে সত্যিই এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে। ভেলের হিসাবে ডলারের মান কমনে, অন্যান্য মুদ্রার বিশেষত দক্ষিণের দেশগুলোর মুদ্রার তুলনায় আরও কমে যায়। মান ডলারের এই বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি রয়েছে। যেকোনো মুদ্রার অবমূল্যায়ন আমদানি-বায় বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে মূল্যস্ফীতি অনিবার্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। তেলের দাম ডলার বাড়াল দক্ষিণের দেশগুলো দুটি দিক থেকে একসাথে মূল্যস্ফীতির কামড় অনুভব করে: প্রথমত, ডলারে ভেলের দাম সরাসরি বাড়ার ফলে যে মূল্যস্ফীতি ঘাট। দ্বিতীয়ত, ডলারের তুলনায় নিজেদের মুদ্রার দর কমে যাওয়ায় আমদানি করা সব উপকরণের দাম আরও বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ: যদি ডলারে তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে আমেরিকায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি হয়তো এ শতাংশ হবে। কিছু পরিধির দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি হবে এর চেয়ে বেশি। এক কথযে, একটি মূল্যস্ফীতি-প্রণক' কাজ করে, যার ফলে কেন্দ্রের দেশে যে মূল্যস্ফীতি হয়, পরিধির দেশে তা আরও ভীর আকারে প্রকাশ পায়।

টাকার বিরুদ্ধে ডাটকাবাজি মনোভাব এতটাই প্রবন যে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (RBI)-এর সখেষ্ট হস্তক্ষেপ মর্মেও পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। জানা যাচ্ছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে টাকাকে গিতিশীল রাখতে ৪৪। প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার বায় করেছে। তবু টাকার দ্রুত অবমূল্যায়ন অটকানো যায়নি। এই হস্তক্ষেপ না থাকলে পতন হয়তো আরও বেশি হতো কিরু তা সত্বেও পতন ঘটছে, এটাই প্রমাণ করে টাকার বিরুদ্ধে ডাটকা মনোভাব কতটা শক্তিশালী।

এই ফাটকাবাজি মনোভাবের শক্তির একটি কারণ হলো, ওটা আসলে ইরান যুদ্ধের আগে থেকেই শুরু হযেদিন। যুদ্ধ শুরুর আগেও টাকার অবমূল্যায়ন ঘটছিল: ২০২৬ সালের ১ জানুযারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মাত্র দুই মাসে টাকা ৮৯.১৪ থেকে ২১.০১ পর্যন্ত নেমেছিল, এবং ইরান যুদ্ধ শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। বর্তমান পতন এত তীব্র হচ্ছে কারণ যুদ্ধের ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ডসারের দিকে 'নিরাপদ আশ্রয়' খোঁজার প্রবণতা আগে থেকেই চলমান টাকা-বিরোধী ফাটকাবাজীর উপর আরোপিত হয়েছে। বাজার-বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই পত্তন অব্যাহত থাকবে এবং শীঘ্রই টাকা ১৫-এর নিচে নেমে যাবে এবং এটা ঘটবে RBI-এর হাতে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ থাকা সত্ত্বেও।
এখানেই একটি অভ্যয় কৌতূহলোদ্দীসক বিষয় সামনে আসে: বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ থাকলেও মুদ্রার পতন ঠেকানো যাচ্ছে না কেন? ব্যাপারটা হলো, ফাটকাবাজরা যখন মুদ্রার দাম পড়বে বলে আশা করে এবং দেশ থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়, তখন সেই প্রবাহ ঠেকাতে রিজার্ভ খরচ করলে মুদ্রার আরও পতনের প্রত্যাশাকেই শক্তিশালী করা হয়। এটা জেনেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রার মান রক্ষায় রিজার্ভ বাবহারে সতর্ক হয়ে পড়ে। তাই বৈদেশিক মুদ্রার বিপুল মজুদ থাকলেও বাজারের 'মেজাজ' প্রতিকূল হনে মুদ্রার পতন ঠেকানো কঠিন হয়। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ঋণ পরিশোধ বা চলতি হিসাবের ঘাটতি মেটাতে কাজে লাগে কিরু বাজারের মেজাজ মুদ্রার বিরুদ্ধে চলে গেলে পতন ঠেকাতে তা খুব একটা কাজে আসে না।
আরও একটি বিষয় বিবেচনায় নিলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ যদি দেশীয় বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত থেকে না এসে বিদেশি বিনিযোগকারীদের অর্থ-প্রবাহ থেকে তৈরি হয়, তাহলে সাধারণত যে সুদ পাওয়া যায় তার চেয়ে বেশি হারে সুদ দিতে হয় যারা এই অর্থ এনেছে তাদের। ভারতে RBI বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের উপর গড়ে ১.৫ শতাংশের বেশি সুদ পায় না, অথচ যারা এই অর্থ এনেছে তাদের মূলধন-দাভ সহ গড় প্রাপ্তি কমপক্ষে ৭-৮ শতাংশ। এভাবে ঋণ-নির্ভর বিদেশি মুদ্রা মজুদ আসলে 'চড়া দামে ধার নিয়ে দস্তায় ধার দেওয়ার' শামিদ মজুদ যত বড়, দেশের উপর পরগাছা-নিষ্কাশন তত বেশি।

ঋণ-নির্ভর বিপুল রিজার্ভের এই সমস্যাগুলোর কথা মাথায় রেখেও মূল যুক্তিটি তুলে ধরা দরকার। 'উদারীকৃত বাণিজ্ঞা ও মূলধন হিসাবের একটি ব্যবস্থা যেখানে শুল্ক ও পরিমাণগত বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ বর্জন করা হয়েছে, যেখানে অর্থ-পূতি দেশে-বিদেশে অবাধে যাতায়াত করতে পারে, এবং যেখানে বিনিময় হার ও তার সাথে লক্ষ কোটি শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান একদল আন্তর্জাতিক ফাটকাবাজের খেয়ালখুশির উপর নির্ভরশীল সেই ব্যবস্থার মারাত্মক ঋতিকর দিকগুলো আমরা বর্তমানে ভারতে টাকার পতনের মধ্য দিয়ে প্রভাস্ক করছি। এটাই নব্য-উদারনৈতিক অর্থনীতির চরিত্র।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি এই নব্য-উদার ব্যবস্থা থেকে সরে আসার একটি বড় সুযোগও এনে দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক-আআগ্রাসন ভারতসহ অন্যান্য দেশের সামনে নিজস্ব শুল্ক নীতি নির্ধারণ করে চলতি হিসাব নিয়ন্ত্রণের পথ খুলে দিয়েছে। তেমনিভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এত বিপুলসংখ্যক দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে যে এই দেশগুলো ভারতের মতো অন্যান্য দেশকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিপাক্ষিক না বহুসাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে। এই ধরনের নাবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত লেনদেন নিষ্পত্তিতে মার্কিন ডলারের ব্যবহার এড়িয়ে পরস্পরের মুদ্রায় (যাদের মধ্যে গির বিনিময় হার থাকবে) বাণিজ্য করা, এবং দেনদেনের অবশিষ্ট ঘাটতি পরস্পরের পণ্য কিনে পূরণ করার পারস্পরিক চুক্তির মাধামে ক্রমশ নিষ্পত্তি করা। এটি ডলারের প্রযোজনীয়তা এবং মাম্রাজ্যবাদের নিগড় থেকে মুক্ত থাকতে আন্তর্জাতিক অর্থ-পুঁজিকে আকৃষ্ট করার বাধ্যবাধকতা দুটোকেই দূর করবে।
অথচ মোদি সরকার যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত পথে। সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংখ একের পর এক মুক্ত বাণিজ্য চুড়ি (FTA) সই করছে। এতে হয়তো ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়বে, কিজ নিট রপ্তানি বৃদ্ধি ও দেশীয় কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই FTA-গুলো বৈশ্বিক অর্থ-পুঁজির আধিপত্যের নিগড় থেকে ভারতীয় অর্থনীতিকে মুক্ত করবে না।

পিপলস ডেমোক্রেসী (মার্চ ২৩-২৯ ২০২৬)
প্রকাশ: ১৩-এপ্রিল-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 13-Apr-26 10:10 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/currency-devaluation-and-the-trap-of-imperialism
Categories: Fact & Figures
Tags: donaldtrump, imperialism,
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড