বিপ্লবের জন্য জন্ম, বিপ্লবেই অমরত্ব

Author
দীপ্তজিৎ দাস

১৮৯৬ সালের ২৪ শে মে লুধিয়ানার নিকটে সারাভা গ্রামে জন্ম হয় কর্তার সিংয়ের। শৈশবে বাবার মৃত্যুর পর ঠাকুরদার কাছে বেড়ে ওঠেন তিনি। লুধিয়ানার স্কুলে শুরু হয় তার প্রাথমিক শিক্ষা। এরপর কর্মসূত্রে ওড়িশায় বাসরত এক কাকার কাছে চলে আসেন তিনি। সেই সময় অবিভক্ত বঙ্গ প্রদেশের অন্তর্গত ওড়িশায় বিপ্লবী তৎপরতা ছিল উল্লেখযোগ্য।

Born Revolutionary : Kartar Singh
' সুপারিনটেনডেন্ট সাহেব,ভেবো না কর্তার সিং মৃত। আমার প্রতিটা রক্তবিন্দু থেকে অনেক কর্তার সিংরা জন্মাবে। তারা সবাই দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করবে। '
১৬ ই নভেম্বর,১৯১৫। লাহোর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসির জন্য অপেক্ষমান বছর উনিশের এক অকুতোভয় তরুণ রীতিমত হুংকার ছাড়ছেন জেলের অফিসারকে। নিজের দেশকে স্বাধীন করার লড়াই তার। দেশের জন্য বীরের মতন মৃত্যু তার কাছে গর্বের। যে কাজে নেমেছেন যে কোনো মুহূর্তে নেমে আসতে পারে মৃত্যুর পরোয়ানা,নিশ্চিত ছিলেন তিনি। ফাঁসির দিন সকালে পাশের সেল থেকে আরেক বিপ্লবী ভাই পরমানন্দ জিজ্ঞেস করলেন কি করছো? ভয়ডরহীন তরুণ জানান দিল সে বিপ্লবের কবিতা লিখছে। কর্তার সিং সারাভার অভিধানে ব্রিটিশের জন্য ক্ষমা শব্দটি ধার্য ছিল না। তাই তাদের কাছে ফাঁসি মকুব করার আবেদন করতে গররাজি তিনি।

১৮৯৬ সালের ২৪ শে মে লুধিয়ানার নিকটে সারাভা গ্রামে জন্ম হয় কর্তার সিংয়ের। শৈশবে বাবার মৃত্যুর পর ঠাকুরদার কাছে বেড়ে ওঠেন তিনি। লুধিয়ানার স্কুলে শুরু হয় তার প্রাথমিক শিক্ষা। এরপর কর্মসূত্রে ওড়িশায় বাসরত এক কাকার কাছে চলে আসেন তিনি। সেই সময় অবিভক্ত বঙ্গ প্রদেশের অন্তর্গত ওড়িশায় বিপ্লবী তৎপরতা ছিল উল্লেখযোগ্য। সেখানে থাকাকালীন পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বিভিন্ন দার্শনিকের লেখা পড়ার সুযোগ হয় কিশোর কর্তারের। সেখান থেকেই শুরু রাজনৈতিক সচেতনতা।

এরপর পারিবারিক উদ্যোগে উচ্চশিক্ষার জন্য ১৯১২ সালের ১ লা জানুয়ারি আমেরিকায় পৌঁছান তিনি। এই সময় পাঞ্জাবের অনেক যুবকই উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডা,আমেরিকায় যেতেন।  আমেরিকায় বসবাসকারী নিজের গ্রামের রুলিয়া সিংয়ের সাথে এক সাথে থাকা শুরু হয় তার। বার্কেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে ভর্তি হন কর্তার। কিন্তু আমেরিকায়  থাকার কিছুদিনের মধ্যেই চরম বৈষম্যের অভিজ্ঞতা হয় তার। এর মাঝেই আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের দিন বাড়িওয়ালার বাড়ি সেজে উঠতে দেখে দেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রবলভাবে জাগরিত হয় তার মধ্যে। ১৯১২ সালের ডিসেম্বর মাসে বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আমন্ত্রণে বক্তব্য রাখতে আসেন লালা হরদয়াল। হরদয়ালের চিত্তাকর্ষক ভাষণ মন ছুঁয়ে যায় তার। এখানেই তার আলাপ ভাই পরমানন্দের সাথে। এরপরই দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে সর্বস্ব উজাড় করে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। 

১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের পর কয়েকগুণ বাড়তে থাকে ব্রিটিশের অত্যাচার। দেশের জমিদার,সামন্ত,অভিজাত ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়ে খেটে খাওয়া মানুষের উপর চলতে থাকে নির্মম শোষণ। পাঞ্জাবে অত্যাচার তীব্রতর হলে বহু কৃষক কাজের খোঁজে ভিনদেশে পাড়ি দেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেই কৃষক এবং ছাত্ররা ভিনদেশে যেতে থাকে। প্রবাসেই দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের সংগঠিত হওয়ার প্রয়াস শুরু করে ভারতীয়রা। এই সময় ইংল্যান্ড,কানাডা,আমেরিকায় গড়ে ওঠে একাধিক সংগঠন। প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রিকা। আমেরিকায় কৃষক, শ্রমিক,ছাত্রদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন লালা হরদয়াল। তার নেতৃত্বে একাধিক সভা সংগঠিত হওয়ার পর ১৯১৩ সালের ২১ শে এপ্রিল অ্যাস্টোরিয়ায় সভার মাধ্যমে গঠিত হয় ' হিন্দি অ্যাসোসিয়েশন অফ প্যাসিফিক কোস্ট '। প্রথম সাধারণ সম্পাদক হন লালা হরদয়াল এবং সভাপতি হন বাবা সোহন সিং ভাকনা। হরদয়ালের পরামর্শেই ১ লা নভেম্বর প্রকাশিত হয় ' গদর ' পত্রিকা। মূলত পত্রিকার নামেই পরবর্তী সময়ে এই সংগঠন গদর দল নামে পরিচিত হয়। প্রাথমিক ভাবে উর্দুতে প্রকাশিত হয় পত্রিকা। এরপর পাঞ্জাবি,গুজরাটি,হিন্দি ভাষাতেও বেরোতে থাকে সংস্করণ। গদর পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতার সংকলন প্রকাশিত হতে থাকে ' গদর কি গুঞ্জ ' নামে। শুরু থেকেই গদর  দলের সাথে যুক্ত হন কর্তার সিং সারাভা

সান ফ্রান্সিসকোয় প্রতিষ্ঠিত সদর দপ্তর ' যুগান্তর আশ্রমে'র কাজ দায়িত্ব নিয়ে সামলাতে থাকেন তিনি এবং রঘুবর দয়াল গুপ্ত। পাশাপাশি পত্রিকার পাঞ্জাবি সংস্করণের দায়িত্বও ছিল তার কাঁধে। মানবচালিত ছাপাখানায় পত্রিকার ছাপার ক্ষেত্রেও সপ্রতিভ ছিলেন তিনি। বাড়ি থেকে পড়াশোনার জন্য দুশো ডলার পাঠালে তার সবটাই সংগঠনে দিয়ে দেন কর্তার। মাসিক দুই ডলারের বিনিময়ে কার্যত সংগঠনের সর্বক্ষণের কর্মীর মতন কাজে যুক্ত তিনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, প্রাণোচ্ছলতা,কর্মনিষ্ঠার জন্য জগজিৎ সিং তাকে ' হিউম্যান ডায়নামো ' নামে আখ্যায়িত করেন।

এর মাঝেই কোমাগাতামারু জাহাজের ঘটনা রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোড় বদলে দেয়। ব্রিটিশের অত্যাচারে কানাডায় ভারতীয়দের অভিবাসন বাড়তে থাকে। ১৯০৫ সালে কানাডায় থাকতেন মাত্র ৪৫ জন ভারতীয়। ১৯০৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০২৩। এরপর প্রবাসী ভারতীয়দের উপর কানাডা সরকারের অত্যাচার বাড়তে থাকে। প্রথমে তাদের হন্ডুরাসে পাঠানোর চেষ্টা হয়। সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ১৯০৯ সালে কানাডায় সরকার কড়া  অভিবাসন আইন এনে ভারতীয়দের কানাডায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। এরপর কোর্টে সেই নির্দেশিকা কিছুটা শিথিল হলেও কোনো জাহাজেই ভারতীয়দের কানাডায় যাওয়ার টিকিট দেওয়া হতো না। এর প্রতিবাদেই ১৯১৪ সালে মালওয়া এবং গুরুদিত সিং নামক দুজন ব্যবসায়ী ' গুরু নানক নেভিগেশন কোম্পানি ' খুলে জাপান থেকে কোমাগাতামারু নামক জাহাজ ভাড়া করে ৩৭৬ জন ভারতীয়কে নিয়ে হংকং থেকে কানাডা যাত্রা করে। ভ্যাঙ্কুভার বন্দরে পৌঁছালে কানাডা সরকার তাদের প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। অবশেষে ২ মাস অপেক্ষার পর সেই জাহাজ বজবজ বন্দরে ফিরে আসে। ভারতে ফেরা মাত্রই ব্রিটিশ পুলিশ ২০ জনকে গুলি করে হত্যা করে এবং বাকি বেশিরভাগ যাত্রীকেই বন্দী করে। মাত্র ৩২ জন পালাতে সক্ষম হন।

এর মাঝেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে গদর দলের সভা বসে। সংগঠকরা একমত হয়ে ঠিক করেন যুদ্ধের ফলে এখন ব্রিটিশরা কিছুটা দুর্বল। এটাই সুযোগ চরম আঘাত হানার। ভারতে এসে বিদ্রোহ সংগঠিত করাই সময়ের দাবি। এর মাঝেই কোমাগাতমারু জাহাজের যাত্রীদের উপর বর্বতার খবর তাদের ক্ষোভে অগ্নিসংযোগ করে। ১৯১৪ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যে প্রায় ৮০০০ প্রবাসী ভারতে অভ্যুত্থান সংগঠিত করার পরিকল্পনা নিয়ে ফিরে আসে। কর্তার সিং সারাভা সেপ্টেম্বর মাসেই ফিরে এসে কলম্বো হয়ে পাঞ্জাবে চলে যান। স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনের শপথ নিয়ে ফেরা গদর দলের বিপ্লবীদের বেশিরভাগকেই ব্রিটিশ পুলিশ আটক করে। 

দেশে পা দেওয়ার পরই গদর দলের সদস্যরা পরিস্থিতির পরিবর্তন লক্ষ করেন। আমেরিকা থেকে তারা দেশের মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ,ক্রোধের  অনুমান করেছিলেন বাস্তবে তার বহিঃপ্রকাশ ছিল যথেষ্ট কম। এর মাঝেই ব্রিটিশ পুলিশের ধরপাকড় ব্যাপক হারে বাড়তে থাকলে দলের বড় অংশের সদস্যের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। এই সময়েই প্রকৃত নেতার ভূমিকা পালন করেন কর্তার সিং সারাভা। প্রতিদিন প্রায় পঞ্চাশ মাইল সাইকেল চালিয়ে পাঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নিজেদের আদর্শ এবং কর্মসূচির প্রচার করতে থাকেন তিনি। এমনকি বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ভারতীয় সিপাহীদের মধ্যেও প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন তিনি। ব্রিটিশদের সাথে লড়াই করার জন্য অস্ত্রের সন্ধান শুরু করেন গদর দলের বিপ্লবীরা। অর্থের প্রবল সংকট মোকাবিলায় তারা বিভিন্ন অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পরিকল্পনা করেন। কাশীরাম,কর্তার সিং, গন্ধা সিং,জগৎ সিং,জগৎ রাম,নিধন সিং,রহমত আলিদের নেতৃত্বে নতুন করে শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। এরপর লাহোরে মিয়ানমির অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পরিকল্পনা শুরু হয়। কর্তারের কথায় একজন সিপাহী তাদের অস্ত্রাগারের চাবি দিতে রাজি হয়ে যান। কিন্তু পরিকল্পনার আগেই তার বদলি হলে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এরপর তারা মোগায় সরকারি কোষাগারে আক্রমণ করে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করে। কিন্তু যাওয়ার পথেই পুলিশের সাথে বিপ্লবীদের সংঘর্ষ হয়। দুজনের মৃত্যু হয় এবং গদর দলের কোষাধ্যক্ষ কাশীরামসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি দেওয়া হয়।

মোগার ঘটনা গদর বিপ্লবীদের পরিকল্পনায় গভীর ধাক্কা দেয়। তারা অনুধাবন করে সংগঠনকে দৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপন করতে হলে এবং সংগ্রামকে নতুন সূচিমুখ দিতে হলে সারা দেশের বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা প্রয়োজন। বিষ্ণু গনেশ পিল্লে দুবার বাংলায় সফর করেন সাহায্যের জন্য। কর্তার সিংও একবার বাংলায় আসেন এবং অনুশীলন সমিতি ,যুগান্তর গোষ্ঠীর বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। রাসবিহারী বসু তাদের সরাসরি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। প্রধানত তার পরামর্শেই শচীন্দ্রনাথ সান্যাল দুবার পাঞ্জাবে আসেন এবং গদর দলের তরুণ সদস্যদের অস্ত্র তৈরির কৌশল,সংগঠন পরিচালনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। ১৯১৫ সালের জানুয়ারি মাসে রাসবিহারী বসু লাহোরে আসার পর আবার গদর দলের কার্যকলাপ তীব্রতা পায়। অস্ত্র এবং অর্থের সংস্থান জন্য তারা একাধিক লুঠের পরিকল্পনা করেন। তাদের প্রধান লক্ষ ছিল গ্রামের জমিদাররা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা গ্রামবাসীদের জানান দিয়েই এই পরিকল্পনা করেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মানবিকতার খাতিরে তারা লুঠের পর জিনিস ফিরিয়েও দেওয়ার নিদর্শন রাখেন। এর মধ্যে দুটি ঘটনায় কর্তার সিং সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তবে ৩ রা ফেব্রুয়ারি চুব্বা গ্রামে লুঠের সময় সংঘর্ষে কয়েকজন বিপ্লবী নিহত হন এবং অনেকে ধরা পরে যান।

এই সময়েই ব্রিটিশ বাহিনীর ভারতীয় সৈন্যদের সাহায্যে বড়সড় অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন গদর দলের সদস্যরা। নির্দিষ্ট হয় ২১ শে ফেব্রুয়ারি মিয়ানমির ( লাহোর), ফিরোজপুর,আম্বালা,রাওয়ালপিন্ডি, মিরাট,পেশোয়ার রেজিমেন্টের ভারতীয় সিপাহীরা গদর দলের সদস্যদের সহচর্যে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করবে। কিন্তু চুব্বা গ্রামের ঘটনায় কালা সিং নামক এক সদস্য ধরার পরার পর তিনি অনেক পরিকল্পনা ফাঁস করে দেন। পাশাপাশি দলের কার্যালয়ের অন্যতম দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃপাল সিং ছিলেন পুলিশের এজেন্ট। তার মাধ্যমেই খবর পুলিশের কাছে পৌঁছে যায়। নিধন সিং বিষয়টি আঁচ করতে পেরে বাকিদের জানালে অভ্যুত্থানের দিন ১৯ ফেব্রুয়ারি নির্দিষ্ট হয়। সেই খবরও পুলিশের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। মিয়ানমিরে দাফেদার লক্ষণ সিং সহ বিদ্রোহীদের সেনাদের গ্রেপ্তার করে ফাঁসি দেওয়া হয়। এরপর গোটা পাঞ্জাব জুড়ে ব্যাপক তল্লাশি শুরু হয় এবং বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করা হয়। রাসবিহারী বসু লাহোর থেকে ফিরে আসেন। কর্তার সিং,জগৎ সিং,হারনাম সিং তুন্ডিলাত পেশোয়ার হয়ে প্রায় আফগানিস্তান সীমান্তের কাছে আত্মগোপন করেন। কয়েকদিন পর থেকেই তারা আবার সংগঠিত হওয়ার পরিকল্পনা করেন। জগৎ সিংয়ের বন্ধু রাজিন্দর সিংয়ের থেকে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য তারা ২ রা মার্চ সারগোদায় যান। সেখানে উল্লিখিত ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতায় তারা ধরা পরেন। 

গদর বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে শুরু হয় প্রথম লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। রাসবিহারী বসু, রাও সহ ৮২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে ৬১ জন ধরা পরেন। লাহোর সেন্ট্রাল জেলের বিশেষ আদালতে ২৬ শে এপ্রিল শুরু হয় বিচার প্রক্রিয়া। প্রহসনের বিচারে ১৩ ই সেপ্টেম্বর বিচারক ২৪ জনের মৃত্যুদণ্ড,১৭ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গদর বিপ্লবীদের হয়ে মতিলাল নেহেরুর কাছে আবেদন করা হয়। তিনি ভাইসরয় কাউন্সিলের সদস্য মদন মোহন মালব্য, আলি ইমামদের সাথে কথা বলেন। বিচারের রায় ভাইসরয় কাউন্সিলের তরফে আইন বিভাগের প্রতিনিধি আলি ইমামের কাছে পাঠানো হয়। তিনি সব কিছু খতিয়ে দেখে ৬ জন ছাড়া বাকিদের মৃত্যুদণ্ড রোধ করার কথা বলেন। এর মধ্যে কর্তার সিং সারাভাও ছিলেন। কিন্তু লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তার সিং সারাভার মৃত্যুদণ্ড রোধে অসম্মত হন। ভাইসরয় কাউন্সিলের অন্যান্য ব্রিটিশ সদস্যরা কর্তার সিংহকে গোটা মামলার সর্বাপেক্ষা বিপজ্জনক চরিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে। বিচারের রায়ে তার বিরুদ্ধে আট পাতার রিপোর্ট দেওয়া হয়। ১৬ ই নভেম্বর লাহোর সেন্ট্রাল জেলে কর্তার সিংহ সারাভা,বিষ্ণু গনেশ পিল্লে, সুরেন সিং, জগৎ সিং,সুরেন সিং,বখশিশ সিং,হরনাম সিংকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

বিপ্লবী কর্তার সিং সারাভা ছিলেন যৌবনের এক বাঙ্ময় প্রতিনিধি। একদিকে দিলখোলা স্বভাব আরেকদিকে তীক্ষ্ণ যুক্তির মাধ্যমে তিনি অতি সহজেই মানুষের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন। এভাবেই লুধিয়ানার স্কুল গেট বা ফিরোজপুরের সেনা ছাউনি সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াতেন তিনি। একবার তাকে খুঁজতে গ্রামে পুলিশ তল্লাশি চালায় । নিজেকে রুরকির কলেজের পরিচয় দিয়ে দিব্যি পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল কর্তার সিং। সা রগোদায় ধরা পরার আগের মুহূর্তেও পুলিশের সামনেই তিনি কবিতা বলেছিলেন,' বিপদে সিংহ কখনও পিছন ফিরে পালায় না।' বিচারের সময়েও তার এই প্রাণবন্ত স্পিরিটের পরিচয় পাওয়া যায়। জেলে বন্দিদশায় তার ওজন প্রায় ১০ পাউন্ড বেড়ে গিয়েছিল। ফাঁসির আদেশ শুনেও ব্রিটিশের কাছে মকুবের আর্জিতে গররাজি ছিলেন তিনি। কোর্টে শুনানি চলাকালীন বিচারকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্রিটিশকে উৎখাত করে দেশকে স্বাধীন করার জন্যই তারা সমস্ত কার্যক্রম করেছেন। তিনি জানেন তার কি পরিণতি হতে পারে। কিন্তু সব ঠিক থাকলে তারাও ব্রিটিশদের উচিত শিক্ষা দিতেন। বিচারক তাকে  দ্বিতীয়বার ভাববার জন্য বলেন। কিন্তু তারপর আরও বলিষ্ঠ প্রত্যাঘাত আসে তার পক্ষ থেকে। তিনি বলেন আমি চাই আমার মৃত্যুদণ্ড হোক যাতে পুনর্জন্মের মাধ্যমে আবারও দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে পারি। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও এমন সোচ্চার প্রতিবাদ,প্রতিবাদেই জীবনের উদযাপন কর্তার সিংকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তার বাড়ির লোকেরা তার কম বয়সের জন্য বারবার আফশোস করতে থাকেন। তিনি তাদের বলেন কেউ রোগে মরে,কেউ বয়সের জন্য মরে। কিন্তু তার মৃত্যু দেশের জন্য। পরিবারের উচিত তার জন্য গর্ব করা। একদিকে যখন সাভারকাররা ব্রিটিশের কাছে মুচলেকা দিতে ব্যস্ত ছিলেন, শ্যামাপ্রসাদরা যখন বিভাজনে উদ্যত, আরএসএসের হেডগেওয়ার, গোলওয়ালকাররা যখন ব্রিটিশের সাথে যুদ্ধকে অপচয় বলছেন তখন কর্তার সিং সারাভারা দেশের জন্য আত্মত্যাগের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। বিকৃত ইতিহাসের যুগে কর্তার সিংদের স্মরণ করা তাই  অত্যাবশ্যক।

গদর দলের বিপ্লবীরা সংগঠিত হওয়ার কাজ শুরু করেছিলেন আমেরিকায় বসবাসকারী শ্রমিক,কৃষকদের নিয়ে। নিজের দেশে উন্নত জীবনের সংস্থান না পেয়ে তারা মার্কিন মুলুকে পারি দিয়েছিলেন জীবিকা এবং জীবনের টানে। সেখানেই তাদের উপর নেমে আসে বৈষম্য। নিজ দেশে কাজ না পেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে আক্রান্ত হওয়া ভারতীয় যুবকের অসহায়তার সাথে কি কোনো মিল নেই এই মানুষগুলোর? দিল্লিতে গিয়ে পুশব্যাকের শিকার হয়ে ভিটেমাটি হারা অন্তঃসত্ত্বা  সোনালী বিবির পরিযায়ী স্বত্ত্বা কি খুব ভিন্ন তাদের থেকে?গদর দলের সভাপতি সোহন সিং ভাকনা লিখেছিলেন তাদের লড়াই ছিল সমস্ত ধরনের রাজনৈতিক,সামাজিক অসাম্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে। অথচ তাদের স্বপ্নের দেশেই আজ কেবলমাত্র মুষ্টিমেয় বিলিওনেয়ারের হাতে গচ্ছিত ৬২% সম্পদ। যে দেশে স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও কেবলমাত্র কিছু নির্দিষ্ট নথিপত্র সঠিকভাবে না থাকার কারণে ভোটার তালিকায় নাম রাখতে হেনস্থা হতে হয় সাধারণ মানুষকে তা কি কর্তারদের চেতনায় পুষ্ট? সাহেনওয়ালে এক ভুস্বামীর বাড়িতে লুঠের সময় গদর দলের এক সদস্য বাড়ির মেয়ের সাথে অশালীন আচরণ করেন। কর্তার সিং তাকে সেখানেই গুলি করতে উদ্যত হন। পরে মেয়েটি এবং তার মায়ের কাছে ক্ষমা চাইলে কর্তার মাফ করেন সহকর্মীকে। কর্তার সিংয়ের কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদা জিরো টলারেন্স। কর্তার সিংয়ের দেশের বর্তমান শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায়  ব্রিজভূষণ সিং,কুলদীপ সেঙ্গারদের মতন ধর্ষকরা ঘুরে বেড়ায় অবাধে। ঘটনার কি অদ্ভুত পট পরিবর্তন! গদর দলের সদস্যরা বরাবর সোচ্চার হয়েছেন বিভাজন,সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। গদর কি গুঞ্জে সেই বিষয়ে কবিতাও রয়েছে। আজ ভারত জুড়ে আবারো বিভাজনের কারবারিদের রমরমা। অথচ কর্তার সিংয়ের ফাঁসি মকুবের জন্য সওয়াল করেছিলেন ভাইসরয় কাউন্সিলের দুই সদস্য আলি ইমাম এবং শঙ্করন নায়ার। বিভাজনের মাঝেও  ভিন ধর্মের মানুষকে মিলনের সুরে বেঁধেছিলেন কর্তার সিং সারাভা।

জেলে থাকাকালীন কর্তার সিং তার সেলের দেওয়ালে লিখে রেখেছিলেন,' শহীদের রক্ত ব্যর্থ হবে না। ' সোহন সিং ভাকনা একদিন লেখা দেখতে পেয়ে তাকে বলেন জেলের বাইরে কোনো খবর যায়না। কিভাবে বাকিরা শহীদদের কথা জানবে? কর্তারের উত্তর ছিল,আজ না হয় কাল ঠিক খবর বাইরে যাবে। তারপরই এর ফল দেখা যাবে। বাস্তবে হয়েছিল তাই। গদর দলের আন্দোলনই পরবর্তী সময়ে অকালি আন্দোলনের পথ খুলে দিয়েছিল। পাশাপাশি মাত্র উনিশ বছরের দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা কর্তার সিং সারাভা হয়ে ওঠেন তরুণ প্রজন্মের কাছে আইকন। তার শহীদিবরণ হাজার হাজার তরুণের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। বিপ্লবী ভগৎ সিং তার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। পরবর্তী সময়ে তার একাধিক কাজে কর্তাররের ছাপ লক্ষ করা যায়। ভগৎ সিং, কর্তার সিং সারাভাকে গুরু হিসেবে চিহ্নিত করতেন এবং  পকেটে সবসময় তার ছবি থাকতো। প্রবল দমন পীড়নের পরও গদর আন্দোলনকে শেষ করা যায়নি। স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত তারা নিজস্ব সংগঠন ধরে রাখে। তাদের বিরুদ্ধে এরপরও একাধিক ষড়যন্ত্র মামলা রুজু হয়। ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট মতাদর্শের উপর তাদের গভীর আস্থা লক্ষ করা যায়। স্বাধীনতার পর তাদের বেশিরভাগ সদস্যই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়। গদর দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ভাই রতন সিং,ভাই সন্তোখ সিং লেনিনের আহ্বানে কমিন্টার্নে যোগ দেন। রতন সিংয়ের উদ্যোগেই সোভিয়েত কমিউনিস্ট ইউনিভার্সিটি অফ ইস্টার্ন লেবার্সে গদর দলের একাধিক সদস্যকে প্রশিক্ষণ নিতে পাঠানো হয়।

জেলে থাকাকালীন কর্তার সিং একাধিকবার বলতেন কেউ যদি আমাকে স্মরণ করে সে আমাকে বিদ্রোহী কর্তার সিং বলেই মনে করবে। প্রকৃত অর্থেই পরাধীন দেশে হতাশাগ্রস্ত যৌবনের সামনে বিদ্রোহের আগুন আঁচ নিয়ে আসার অন্যতম কারিগর ছিলেন কর্তার সিং। পরবর্তী সময়ে ভগৎ সিং লেখেন, কর্তার সিংয়ের জীবনে বিপ্লবই ছিল একমাত্র অভিপ্রায়,একমাত্র লক্ষ এবং একমাত্র আশা। বিপ্লবের জন্যই তার জন্ম,বিপ্লবের জন্যই তার জীবন বিসর্জন দেওয়া।

প্রকাশ: ১৬-নভেম্বর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 16-Nov-25 16:49 | by 6
Permalink: https://cpimwestbengal.org/born-revolutionary
Categories: Campaigns & Struggle
Tags: cpimwestbengal, , kartar singh
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড