হিন্দুত্ববাদী অর্থনীতিতে হিন্দুদের কী লাভ? (দ্বিতীয় পর্ব)

হিন্দুত্ববাদী অর্থনীতি মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং কর্পোরেট-বান্ধব। দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল, অথচ কৃষি ক্ষেত্রই চরম অবহেলার শিকার। ২০২২ সালের মধ্যে কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, production খরচ (উৎপাদন খরচ) বহুগুণ বেড়ে গেছে, সার, বীজ, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে। কিন্তু ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) আজও আইনি গ্যারান্টি পায়নি।

নিয়ম কানুনই যায় পাল্টে
অভিযোগ রয়েছে যে, এই পুঁজিপতিদের সুবিধা করে দিতে রাতারাতি টেন্ডারের নিয়ম বদলে দেওয়া হয়েছে, পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র শিথিল করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে এই ঋণের একটা বড় অংশ ‘নন-পারফর্মিং অ্যাসেট’ (NPA) বা মন্দ ঋণ হিসেবে মকুব (Rightoff) করে দেওয়া হয়েছে, যা আসলে সাধারণ করদাতাদের টাকা।
আমজনতার টাকা কর্পোরেটের পকেটে - ক্রোনি পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো — ‘লাভ হলে তা পুঁজিপতির ব্যক্তিগত সম্পত্তি, আর লোকসান হলে তার দায় সাধারণ জনগণের।’ ভারতীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় বিগত এক দশকে এটি রেকর্ড স্তরে পৌঁছেছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI)-এর দেওয়া তথ্য এবং সংসদে সরকারের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, বিগত ১০ বছরে ভারতের ব্যাঙ্কগুলো যার সিংহভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক, ১০.৫ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ ‘রাইট-অফ’ বা খাতা থেকে মুছে ফেলেছে। অল ইন্ডিয়া ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন (AIBEA)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই মকুব হওয়া ঋণের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৭০-৮০ শতাংশই গেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বড় বড় কর্পোরেট ও শিল্পপতিদের পকেটে। ছোট ব্যবসায়ী বা কৃষকদের ঋণ মকুবের হার এর তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
সরকার দাবি করে ‘রাইট-অফ’ মানে ঋণ সম্পূর্ণ মাফ নয়, তা উদ্ধারের চেষ্টা চলে। কিন্তু বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, ‘রাইট-অফ’ করা ঋণের মধ্যে মাত্র ১৩-১৫ শতাংশ টাকা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। বাকি ৮৫ শতাংশ টাকাই এই ধনকুবের কর্পোরেটরা হজম করে ফেলে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতার টাকা দিয়ে ব্যাঙ্কগুলোকে পুনর্বিনিয়োগ (Re- capitalisation) করে মেটাতে হয়।
২. পরিবেশ মন্ত্রকের (MoEFCC) নিয়মকানুন যেভাবে কর্পোরেটদের স্বার্থে পাল্টে এদের সুবিধা করে দেওয়া হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আদানি গ্রুপের বিভিন্ন প্রজেক্ট এবং বিতর্কিত ‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন’ (Environmental Impact Assessment) ২০২০-এর খসড়া। যেমন, পরিবেশবিদদের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও আদানি গ্রুপ ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে গ্রেট নিকোবরের মতো স্পর্শকাতর দ্বীপে মেগা-পোর্ট ও পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য প্রায় ১০ লাখ গাছ কাটার এবং আদিবাসীদের জমি অধিগ্রহণের ছাড়পত্র রাতারাতি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ছত্তিশগড়ের ‘হসদেও আরান্দ’ ভারতের অন্যতম প্রধান আদিবাসী অধ্যুষিত গভীর অরণ্য। আদানি গ্রুপের কয়লা খনির (PEKB block) সুবিধার জন্য পরিবেশ মন্ত্রক আদিবাসীদের গ্রামসভার আইনি সম্মতি ছাড়াই বনের বিশাল অংশে গাছ কাটার অনুমতি দিয়েছে।
সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (CSE)-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, বর্তমান শাসনকালে শিল্প ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার হার ৯২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ, পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখার চেয়ে শিল্পপতিদের দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়াটাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
৩. আদানি গ্রুপকে একচেটিয়া সুবিধা পাইয়ে দিতে কীভাবে সরকারি টেন্ডারের নিয়ম রাতারাতি বদলে দেওয়া হয়, তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো, ২০১৯ সালে ভারতের ৬টি বিমানবন্দর বেসরকারীকরণের ঘটনা। ২০১৯ সালে যখন আহমেদাবাদ, লখনউ, জয়পুর, গুয়াহাটি, তিরুবনন্তপুরম এবং ম্যাঙ্গালোর বিমানবন্দর বেসরকারীকরণের টেন্ডার ডাকা হয়, তখন নীতি আয়োগ এবং অর্থ মন্ত্রক লিখিতভাবে একটি নিয়ম চালুর সুপারিশ করেছিল, ‘কোনো একটি কোম্পানিকে যেন দুটির বেশি বিমানবন্দর না দেওয়া হয়। কারণ এতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকবে।’
এর আগে নিয়ম ছিল, বিমানবন্দর পরিচালনার টেন্ডারে অংশ নিতে গেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিমান চালনা বা পরিকাঠামো তৈরি এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সরকার, নীতি আয়োগের ‘সর্বোচ্চ ২টি বিমানবন্দর’ দেওয়ার নিয়মটি সম্পূর্ণ খারিজ করে দেয় এবং অভিজ্ঞতার বাধ্যবাধকতাও তুলে নেয়। ফলাফল? বিমানবন্দর পরিচালনার শূন্য অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও আদানি গ্রুপ এককভাবে ৬টি বিমানবন্দরেরই টেন্ডার জিতে নেয়। পরবর্তীতে, দেশের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে লাভজনক মুম্বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (MIAL) মালিকানা জিভিকে (GVK) গ্রুপের হাত থেকে ইডি (ED) ও সিবিআই (CBI) তদন্তের চাপ তৈরি করে আদানি গ্রুপের হাতে হস্তান্তর করার অভিযোগও রয়েছে।
ক্রোনিইজমের এই পরিসংখ্যান কী প্রমাণ করে? এই সমস্ত পরিসংখ্যান ও ঘটনাপ্রবাহ একটি সুনির্দিষ্ট ধাঁচ প্রমাণ করে যে এই দুর্নীতির মাধ্যমেই বৃহৎ পুঁজিপতিরা নামমাত্র মূল্যে সরকারের কাছ থেকে সস্তায় জমি ও খনি পায়। ব্যাঙ্কে থেকে সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা ঋণ নেয় আর সেই টাকায় বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। ব্যবসা লোকসানে চললে বা টাকা অন্য দেশে পাচার করে দিলে সরকার সেই ঋণ মকুব করে দেয়। এটিই হলো হিন্দুত্ববাদী অর্থনীতির অন্তরালে থাকা ‘আইনি লুণ্ঠন’-এর আসল চেহারা।
যখন একটি দেশের পরিকাঠামো কেবল ২-৩ জন মানুষের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন প্রতিযোগিতামূলক বাজার ধ্বংস হয়। এর ফলে উপভোক্তা (Consumer) বিশেষত যারা মূলত মধ্যবিত্ত ও গরিবদের বেশি দামে পরিষেবা কিনতে হয়, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ভারতের টেলিকম ও বিদ্যুৎ শুল্কের লাগামহীন বৃদ্ধি।
৩. ২০১৬ সালের নোটবন্দী (Demonetisation) এবং ২০১৭ সালের তড়িঘড়ি করে জিএসটি (GST) লাগু করা ছিল হিন্দুত্ববাদী অর্থনীতির দুটি বড় ‘শক্ থেরাপি’। এই দুই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থনীতিকে ‘ফরমাল’ বা সংগঠিত করা, কিন্তু এর ফল হয়েছে মারাত্মক। ভারতের কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০-৯০শতাংশ অংশ আসে অসংগঠিত ক্ষেত্র এবং ক্ষুদ্র শিল্প থেকে। নোটবন্দী এবং জটিল জিএসটি কাঠামোর কারণে কয়েক লক্ষ ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। কর্পোরেট কোম্পানিগুলো এই সুযোগে ছোট ব্যবসায়ীদের বাজার দখল করে নিয়েছে।
মধ্যবিত্তের উপার্জনের একটি বড় অংশ আকাশছোঁয়া জিএসটি-এর কারণে খরচ হয়ে যাচ্ছে। আটা, চাল, দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর কর বসানোয় গরিব ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জীবন ধারণ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ক্ষতগ্রস্ত হচ্ছেন কিন্তু সব ধর্মের মানুষ, হিন্দু বলে কেউ কিন্তু ছাড় পাচ্ছেন না।
বেকারত্ব এবং কর্মসংস্থান
হিন্দুত্ববাদী অর্থনীতিতে তথাকথিত ‘জিডিপি-র প্রবৃদ্ধি’ হলেও তা আসলে ‘কর্মহীন প্রবৃদ্ধি’ (Jobless Growth)। সেন্ট্রাল ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি (CMIE) এবং সরকারি পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি সমীক্ষা (PLFS) অনুযায়ী ভারতে বেকারত্বের হার গত সাড়ে চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, যা গড়ে প্রায় ৭-৮ শতাংশ। শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে এই বেকারত্বের হার আরও ভয়াবহ — প্রায় ২০-২৫ শতাংশ ।
মধ্যবিত্তের প্রধান ভরসা সরকারি চাকরি ও আইটি সেক্টর। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর যেমন রেল, বিএসএনএল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের বেসরকারীকরণ এবং শূন্যপদ পূরণ না করার নীতির কারণে মধ্যবিত্ত যুবকদের স্থায়ী চাকরির স্বপ্ন ভেঙে গেছে। যুবসমাজ আজ ডেলিভারি বয় বা ক্যাব চালকের মতো অস্থায়ী ও নিরাপত্তাহীন (Gig workers) কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে, যেখানে কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুবিধা নেই।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি ৩ টি পর্বে প্রকাশিত হবে
(দেশহিতৈষী পত্রিকায় প্রতিবেদনটি প্রকাশিত)
প্রকাশ: ২০-জুন-২০২৬
শেষ এডিট:: 20-Jun-26 16:14 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/whats-in-it-for-hindus-in-a-hindutva-driven-economy2
Categories: Fact & Figures
Tags: hindutva communalism, hindutwa, indianeconomy, hindus
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (164)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (148)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (81)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)




