ডলার: বিনিময় মাধ্যম থেকে মারণাস্ত্রে

Author
প্রভাত পট্টনায়ক

সংক্ষেপে, ডলার এখন প্রকাশ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের সাথে মুখামুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তবে তারা জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়াই সেই দেশের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় এবং ‘করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই দেশের ডলার মজুত হস্তগত করে।

The Weaponisation of The Dollar

ব্রেটন উডস চুক্তি মার্কিন ডলারকে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এর মূল শর্ত ছিল, প্রতি আউন্স সোনার বিনিময়ে ৩৫ ডলারের স্থির হারে বিদেশি সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির কাছ থেকে সোনা কেনা এবং বিক্রি করার প্রতিশ্রুতি। ডলারের এই রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদা একটি প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করেই টিকে ছিল, তা হলো—ডলারের বিনিময়ে সোনার হারে কোনো ধস নামবে না। অর্থাৎ, পণ্যের বাজারে ডলারের মূল্যস্থিতিশীলতা (স্বল্পমেয়াদী ওঠানামা বাদ দিয়ে) বজায় থাকবে বলেই সকলে বিশ্বাস করত। যত দিন এই বিশ্বাস অটুট ছিল, তত দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারত; কারণ বিশ্বের বাকি অংশ সর্বদাই ডলার এবং ডলার-ভিত্তিক সম্পদ মজুত করতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধের জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখন মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিল, তখন এই বিশ্বাসের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং ব্রেটন উডস ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

তবে এক রূপান্তরকাল পর্বের পর ডলার আবার তার আধিপত্য ফিরে পায়। সোনার বিনিময়ে ডলারের স্থির হার আর না থাকলেও, এটি কার্যত বিশ্বমুদ্রার ভূমিকায় ফিরে আসে। বিশ্ববাণিজ্যে, বিশেষ করে তেল বাণিজ্যে ডলারের সর্বব্যাপী ব্যবহার এবং সম্পদ সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা, এই ভূমিকাটিও মূলত পণ্যের সাপেক্ষে ডলারের মূল্যস্থিতিশীলতার প্রত্যাশার ওপরই নির্ভরশীল ছিল। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশেষ সুবিধা ভোগ করতে থাকে; তারা বিশ্বের বাকি অংশের কাছ থেকে ধার নিয়ে ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারে। আর দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বের বাকি অংশের প্রতিক্রিয়া ছিল এক কথায় - “তা-ই হোক” বা বিষয়টি মেনে নেওয়া।

কিন্তু কালক্রমে ডলারের এই ভূমিকা ‘অস্ত্রীভূত’ হয়ে ওঠে। বিশ্বের বাকি অংশ যে ডলার ও ডলার-ভিত্তিক সম্পদ ধরে রেখেছে, সেই সুযোগ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর নিজের একতরফা ফরমান চাপিয়ে দিতে শুরু করে। তখন থেকে এটি আর কেবল মার্কিন অর্থনীতির সুবিধা বয়ে আনা একটি রিজার্ভ মুদ্রা হয়ে রইল না; বরং সম্পূর্ণ স্বার্থান্বেষী উপায়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করার একটি বিপজ্জনক ও শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়।

এর সূত্রপাত হয় ১৯৭৯ সালে, যখন রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টার বিখ্যাত ইরানি ‘পণবন্দী সংকট’-এর জেরে ইরানের ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আটক (impounded) করেন, যদিও তিনি তা পুরোপুরি বাজেয়াপ্ত করেননি। এটি ছিল আন্তর্জাতিক লুণ্ঠনের এক প্রকাশ্য নজির, যা এর পর বহু বার পুনরাবৃত্ত হয়েছে। বিশ্বের বাকি অংশ তাদের সম্পদ ডলারে মজুত রাখে বলেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাদের ইচ্ছেমতো এই সম্পদ আটকে রাখার কোনো আইনগত বা নৈতিক অধিকার নেই। ঠিক যেমন, কোনো দেশের অভ্যন্তরে প্রচলিত মুদ্রাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়বদ্ধতা (liability) হওয়া সত্ত্বেও, সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন কোনো অধিকার নেই যে তারা যখন-তখন যেকোনো ব্যক্তির নগদ অর্থ আটকে রাখবে। কিন্তু বাস্তব হলো, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরে বা বাইরে, যাবতীয় ডলার লেনদেন মার্কিন ‘করেসপন্ডেন্ট’ বা অনুসঙ্গী ব্যাংকগুলির মাধ্যমেই করতে হয়। এই সুযোগ নিয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি ডলার সম্পদ আটকে রাখার এবং অনৈতিকভাবে অর্জিত এই দাপটের বলে দেশগুলিকে তাদের কথা মানাতে বাধ্য করার অধিকার নিজেরাই আরোপ করে নিয়েছে।

সংক্ষেপে, ডলার এখন প্রকাশ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের সাথে মুখামুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তবে তারা জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়াই সেই দেশের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় এবং ‘করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই দেশের ডলার মজুত হস্তগত করে। সাম্প্রতিককালে রাশিয়া এর শিকার হয়েছে: ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিত্ররা রাশিয়ার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আটকে রেখেছে। একইভাবে, ইরানের ১০০ থেকে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক রিজার্ভও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আটক করেছে; ইসরাইলের সাথে মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। অথচ, বিড়ম্বনাক্রমে, এই বিশাল অংকের টাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের ব্যাংকে, এমনকি ভারত ও চিনের ব্যাংকগুলিতেই মজুত ছিল।

রিজার্ভ মুদ্রা থেকে ডলারের এই রূপান্তর, যা এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একটি প্রকাশ্য মারণাস্ত্র, যা মার্কিন নির্দেশ না মানা যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার জন্য ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা ডলার-বর্জনের ডাককে অত্যন্ত জরুরি করে তুলেছে। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনে এর প্রতিফলন ঘটে। রাশিয়া, চিন এবং ইরান, প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং বিকল্প বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে প্রাধান্য দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকস-ভুক্ত দেশগুলির নিজেদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের ডাক তোলা হয়, এবং স্বীকার করা হয় যে এই বাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।

এটি কেবল গ্লোবাল সাউথের সুবিধার্থে একটি ন্যায্য ব্যবস্থার ডাক ছিল না; বরং এটি সুস্পষ্টভাবে মার্কিন একতরফা নিষেধাজ্ঞার এই দুরারোগ্য অভিশাপের বিরুদ্ধে এবং সেই সব দেশের ডলার সম্পদ আটকে রাখার বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি আন্দোলন ছিল, যারা মার্কিন ইশারায় চলে না। ভারত, ব্রিকস-এর মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার সাথে একমত হলেও, দুঃখের বিষয়, ডলার সম্পদ আটকে রাখার প্রতিবাদে তারা নীরব দর্শক হয়ে থাকে। সামগ্রিকভাবে, এনডিএ সরকার, একতরফা নিষেধাজ্ঞার (যা জাতিসংঘ সমর্থিত নয়) বিরোধিতা করলেও, নিষেধাজ্ঞা কবলিত দেশগুলির ডলার সম্পদ আটকে রাখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করে না; বরং বিদেশমন্ত্রী তো ‘ডি-ডলারাইজেশন’-এর বিরুদ্ধেই নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন!

অবশ্য ব্রিকস-ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের সাথে জড়িত অসুবিধাগুলিকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। যদি এই বাণিজ্য একাধিক মুদ্রার ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে হয়, তবে ফাটকাবৃত্তি (speculation) এড়াতে প্রয়োজন মুদ্রাগুলির বিনিময় হার একে অপরের সাপেক্ষে কমবেশি স্থির রাখা। আর দীর্ঘমিয়াদে এই স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার তুলনায় ব্রিকস-এর অভ্যন্তরে পরিশোধন ভারসাম্যের ঘাটতি ও উদ্বৃত্ত (balance of payments deficits and surpluses) দূর করার নিয়মকানুন হতে হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় দেখা যায়, বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা দূর করতে ঘাটতি দেশগুলিকেই তাদের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ কমিয়ে সমন্বয় সাধন করতে বাধ্য করা হয়; ফলে বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলিকে কঠোর সাশ্রয়নীতি (austerity) মেনে চলতে হয়। একটি অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত ও মানবিক ব্যবস্থা হতো যদি উদ্বৃত্ত দেশগুলিকেই সমন্বয় সাধন করতে বাধ্য করা হতো; তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়লে তাদের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমে যাবে, এবং তার সাথে সাথে ঘাটতি দেশগুলির বাণিজ্য ঘাটতিও কমে আসবে। অতএব, স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহারের ওপর ব্রিকস-এর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য সম্প্রসারিত করতে হলে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ‘ খেলার নিয়ম’ বর্তমান ব্যবস্থার চেয়ে ভিন্ন হতে হবে। শুধুমাত্র স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ালে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লেনদেন ব্যবস্থার জটিলতাগুলিই ব্রিকস-এর অভ্যন্তরে পুনরায় প্রকট হয়ে উঠবে।

এই প্রেক্ষাপটে, স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলিতে ভারতের সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি ছিল, তা পুনরায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন এবং এই মডেলটি অনুকরণযোগ্য। সেই বাণিজ্য মূলত উভয় পক্ষের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির মাধ্যমেই পরিচালিত হতো। বর্তমানে যদি এই পদ্ধতিটি ব্যাপকভাবে অনুশীলন করা যায়, তবে তা মুদ্রা ফাটকাবৃত্তির সুযোগকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে। এছাড়াও, যেহেতু অমীমাংসিত উদ্বৃত্ত ও ঘাটতি পরবর্তী সময়ের জন্য স্থানান্তরিত (carry over) করা হতো, তাই এটি ছিল অনেকটা উদ্বৃত্ত দেশ থেকে ঘাটতি দেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণ সরবরাহের মতো। এবং যেহেতু উপযুক্ত পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে সময়ের সাথে সাথে এই উদ্বৃত্ত ও ঘাটতি দূর করা হতো, তাই ঘাটতি দেশটিকে একাই তার ঘাটতি মেটাতে ‘কঠোর সাশ্রয়নীতি’ মেনে চলতে হতো না। ফলে, ভারত-সোভিয়েত বাণিজ্য চুক্তি আজকের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির যে সমস্যাগুলির সম্মুখীন হতে হয়, তাতে ভুগত না। স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহারের ওপর ব্রিকস-এর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, ভারত-সোভিয়েত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আদলে সদস্য দেশগুলির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমেই প্রাথমিকভাবে শুরু হতে পারে।

এখানে লক্ষণীয় যে, ব্রিকস সম্মেলনে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহারের ওপর ব্রিকস-এর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টি, যা বাণিজ্যে মাধ্যম হিসেবে ডলারের ভূমিকা খর্ব করে একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যথেষ্ট আলোচিত হয়েছিল, কিন্তু এর সাথে জড়িত বাস্তবসম্মত সমস্যাগুলি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এ থেকেই বোঝা যায়, বৈশ্বিক মঞ্চে একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে ব্রিকস-এর এখনও অনেক দূর যেতে বাকি। প্রকৃতপক্ষে, এর বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি এবং এর অভ্যন্তরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির প্রতি অনুগত দেশগুলির উপস্থিতি বিচার করলে, এটি শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যায়।

(পিপলস ডেমোক্রেসী ১৪-২০-সেপ্টেম্বর ২০২৬)




প্রকাশ: ২১-সেপ্টেম্বর-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 21-Sep-26 14:06 | by 4
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-weaponisation-of-the-dollar
Categories: Fact & Figures
Tags: brics, dollar, sovietunion
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড