দুনিয়ার মুক্তি আন্দোলনে সোভিয়েত বিপ্লবের ভূমিকা:
সংগ্রাম চ্যাটার্জি
বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের উপরেই চরম আঘাত এনেছিল সোভিয়েত বিপ্লব, এই বিপ্লবের আগের পর্বে বিশ্ব পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের যে ভারসাম্য ও সুস্থিতি ছিল, তা সে কখনোই ফিরে পাবে না।

"বিংশ শতাব্দী প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিবর্তন। এই শতাব্দী ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের শতাব্দী। এই শতাব্দী দেখেছে বিরাট বিরাট বৈপ্লবিক ঘটনা, যার সূচনা ১৯১৭ সালের অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে।"
[সিপিআই(এম) পার্টি কর্মসূচীর ২.১ প্যারা থেকে]
যে ব্যবস্থায় উৎপাদন করলেও ফল পাওয়া যায় না উৎপাদনের অনুপাতে, ফল ভোগ করে অল্প কিছু মানুষ (যারা হাতিয়ারের মালিক)— এহেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার প্রথম বৈজ্ঞানিক ফর্মুলেশন দুনিয়া দেখলো ১৮৪৮ সালে, মার্কস-এঙ্গেলসের মুসাবিদায় তৈরি সর্বহারা বিপ্লবের ঘোষণাপত্র, কমিউনিস্ট ইস্তেহারে। উৎপাদন-সম্পর্কের শৃঙ্খল ছাড়া হারানোর কিছু নেই যাদের, সেই সর্বহারা শ্রেণীর আসন্ন বিশ্বজয়ের প্রত্যয়ে শেষ হচ্ছে ঐ ঘোষণাপত্র।
এর প্রায় আড়াই দশকের মধ্যেই পৃথিবী অস্থায়ীভাবে হলেও প্রথমবারের জন্য প্রত্যক্ষ করলো শ্রমিক রাষ্ট্র, প্যারি কমিউন। মাত্র ৭২ দিন আয়ূ ছিল তার, কিন্তু সেই স্বল্প সময়েই গভীর ছাপ রাখতে পারল সেই ব্যবস্থা। আর, প্যারি কমিউনের ৪৬ বছরের মাথায় ১৯১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী থেকে ৩ মার্চ (নতুন ক্যালেন্ডারে ৮ থেকে ১৬ মার্চ) রাশিয়াতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হয়, রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। প্রাথমিকভাবে লভভ্, এবং পরবর্তীতে কেরেনস্কির নেতৃত্বে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হয়। মাত্র ৮ মাসের মাথায় ঐ বছরেরই ৭ নভেম্বর (পুরাতন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর) থেকে ১৭ নভেম্বর লেনিনের রুশ সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির (বলশেভিক) নেতৃত্বে সংগঠিত হল প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, অক্টোবর (নভেম্বর) বিপ্লব।
গঠিত হল পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র— সোভিয়েত ইউনিয়ন।
"আমরা শুরুটা করেছি। কবে, কতদিনের মধ্যে, কোন দেশের প্রলেতারিয়েতরা এই কাজটি শেষ করবে, সেই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই যে, বরফ ভেঙেছে, রাস্তা খুলেছে, পথ দেখানো গেছে।"
[লেনিন: অক্টোবর বিপ্লবের চতুর্থ বার্ষিকী উপলক্ষ্যে বক্তৃতা; ১৯২১]
এই বিপ্লব নিছকই একটি নির্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ছিল না, এটি ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড়। এক শোষকের বদলে আরেক শোষককে প্রতিস্থাপন করা নয়, এই বিপ্লবের লক্ষ্য মানুষের দ্বারা মানুষের সবরকমের শোষণকেই বিলুপ্ত করা— সমস্ত শোষক শ্রেণীকেই সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করা। এই বিপ্লব সমগ্র পৃথিবীর শোষিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত এবং সাম্রাজ্যবাদের নাগপাশে আবদ্ধ মানুষের কাছে মুক্তির এক নতুন বার্তা নিয়ে এসেছিল। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মুক্তি আন্দোলনে এই বিপ্লব এক অভূতপূর্ব শক্তির জোগান দিয়েছিল। কমরেড স্তালিনের কথায়: "অক্টোবর বিপ্লবকে শুধুমাত্র 'জাতীয় চৌহদ্দির অভ্যন্তরে' একটি বিপ্লব হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে না। প্রধানতঃ এই বিপ্লব একটি আন্তর্জাতিক, বিশ্ব পদ্ধতির একটি বিপ্লব; কারণ এটি মানব ইতিহাসে একটি মূলগত মোড়কে সূচিত করে— পুরাতন পুঁজিবাদী জগৎ থেকে নতুন সমাজতান্ত্রিক জগতের অভিমুখী একটি মোড়।"
(স্তালিন: অক্টোবর বিপ্লবের আন্তর্জাতিক চরিত্র)
প্যারি কমিউনকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল ৭২ দিন, আর অক্টোবর বিপ্লবের ফসল পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকেছিল ৭ দশকের কিছু বেশি সময়! এত দিন চলবার পরে কেন এই বিপর্যয়, তা নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে, চলছে এবং আগামীদিনেও চলবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন আর না থাকলেও ইতিহাসে অক্টোবর বিপ্লবের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব এবং এর সামগ্রিক ঐতিহ্যের নানান উপাদান চিরকালের জন্যেই স্থায়ী হয়ে রয়েছে:
১) পুঁজিবাদের বিকাশের প্রশ্নে মার্কস-এঙ্গেলসের মূল বোঝাপড়াকে সাম্রাজ্যবাদের স্তরে প্রয়োগের ক্ষেত্রে লেনিনের ভূমিকা চিরস্মরণীয়। তিনি দেখালেন, পুঁজির চরম কেন্দ্রীভবনের পর্বে অবাধ প্রতিযোগিতার মুখোশ সরিয়ে পুঁজিবাদের একচেটিয়াপনায় উত্তরণ সম্পন্ন হয়, যখন পুঁজি কেবলমাত্র পণ্য উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, যখন শিল্প পুঁজির সাথে ব্যাঙ্ক পুঁজির মিলনে সৃষ্টি হয় ফিনান্স পুঁজির, আর ক্রমশই সে বিশালাকার ধারণ করে অবাধে ছুটতে চায় বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, সে প্রবেশ করে তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে (সাম্রাজ্যবাদ)। সমগ্র বিশ্বকে শোষণের এক বিস্তৃত ছাতার নিচে আনে। যার পরিণতিতে একদিকে বিশ্ব বাজারকে ভাগবাটোয়ারা করা এবং আরও মুনাফার তাগিদে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জন্ম হয় ও তীব্রতা লাভ করে, অন্যদিকে এই বিস্তৃত পরিসীমায় দূর্বল গ্রন্থি থাকা এবং এই দূর্বলতম গ্রন্থিতে আঘাত হেনে সাম্রাজ্যবাদের শেকল ভাঙার অবশ্যম্ভাবী সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়। এই তত্বগত ফর্মুলেশনের বাস্তব প্রয়োগ রুশ বিপ্লব।
দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী পর্বে সাম্রাজ্যবাদের দূর্বলতম গ্রন্থি ছিল রাশিয়া। আন্তঃ সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বকে সে দেশের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পরিণত করার কাজটাই ছিল ওখানকার শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক দায়িত্ব। তা তাঁরা পালন করেছিলেন।
আজকের সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের যুগে সোভিয়েত বিপ্লবের এই শিক্ষা আরও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
২) তখনও পর্যন্ত মনে করা হত, উন্নত পুঁজিবাদী দেশেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সম্ভাবনার কথা। তার প্রায় উল্টোদিকে হেঁটে তুলনামূলকভাবে পশ্চাৎপদ দেশ রাশিয়ার বুকে সেই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছিল ওখানকার শ্রমিকশ্রেণী, অবশ্যই কৃষকসমাজের সাথে দৃঢ় মৈত্রীর মধ্য দিয়ে। মনে রাখা দরকার, প্যারি কমিউন পতনের অন্যতম বড় কারণ সেখানে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর প্রশ্নে ব্যর্থতা। শুধু তাইই না, সেখানে শাসকরা তাদের পক্ষেই কৃষকদের অবস্থান সম্ভব করতে পেরেছিল। আর, রাশিয়ার পরিস্থিতি ছিল ঠিক বিপরীত।
আজকের সময়ে সোভিয়েত বিপ্লবের এই শিক্ষাও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
৩) যে অগ্রগতি অর্জনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার লেগেছিল কয়েক শতক, মাত্র তিন দশকের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বিপুল অগ্রগতি সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরিণত করে প্রথম সারির এক উন্নত দেশে। বিপ্লবের আগে রাশিয়া ছিল অর্থনৈতিক দিক একটি পিছিয়ে পড়া দেশ, বলা হতো 'ইউরোপর উঠোন'! দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দায় যখন ধুঁকছে পৃথিবীর তাবড় তাবড় দেশ, ঠিক সেই একই সময় পর্বে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।
৪) এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সোভিয়েত বিপ্লবের প্রভাবে বিশ্ব জুড়ে এমনকি পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিও গণতান্ত্রিক অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা, নারী সহ সার্বজনীন ভোটাধিকার চালু করতে বাধ্য হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নেই সবার আগে চালু করে সার্বজনীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা সহ নানাবিধ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এরই প্রভাব ঠেকাতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চালু হয় তথাকথিত 'কল্যাণকামী অর্থনীতি'।
"বিংশ শতাব্দীর সমাজতন্ত্রের অনুপ্রেরণা বিশ্বজোড়া জনগণের সংগ্রামের একটি অনপনেয় প্রভাব হলো গণতান্ত্রিক অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতা শক্তিশালী হওয়া (যেমন অন্য অনেক কিছুর মতো নারীদের ভোটাধিকার)। একইসঙ্গে শ্রমিকশ্রেণী এবং শ্রমজীবী জনগণ সামাজিক সুরক্ষা এবং কল্যাণমূলক এমন অনেক সুবিধা পায় যা আগে ভাবাই যেত না। ধনতন্ত্র এইসব অধিকার মেনে নিতে বাধ্য হয়। সুতরাং এইসব অধিকার যাকে আজ 'সর্বজনীন' বলে বিবেচনা করা হয়, তা জনগণের সংগ্রামের ফসল, 'বুর্জোয়াদের দয়ার দান' নয়।"
[২০১২ সালে সিপিআই(এম) এর বিংশতিতম পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত 'কয়েকটি মতাদর্শগত বিষয় সম্পর্কে প্রস্তাব' দলিলের ৫.৮ নং প্যারা]
৫) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত লালফৌজের হাতেই মানবতার চরম শত্রু ফ্যাসিবাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন গোটা বিশ্বকে ভয়াবহতম বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল তার মতাদর্শগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির সম্মিলিত কারণে। যা অবশ্যই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বড় অবদান।
৬) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লালফৌজের অসামান্য জয় পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, চেকস্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মানি সহ বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা নেয়। ইউরোপ জুড়ে বামপন্থী আন্দোলনের তীব্রতা বহুলাংশে বৃদ্ধি ঘটে।
৭) সোভিয়েত বিপ্লব এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লালফৌজের অসামান্য বিজয় গোটা দুনিয়ার উপনিবেশ বিরোধী স্বাধীনতার লড়াইকে শক্তি দিয়েছিল। লেনিনের জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্নে থিসিস এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার উপনিবেশগুলির অগণিত জনগণের স্বাধীনতার দাবিতে এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মুক্তি সংগ্রামের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছিল ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের উপর, খোদ কমরেড হো চি মিন্-এর লেখা থেকেই তা জানা যায়।

১৯১৭'র রুশ বিপ্লবের প্রভাব আমাদের দেশের স্বাধীনতার লড়াইকে সরাসরি প্রভাবিত করে, জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে গড়ে ওঠে কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টি। এই রুশ বিপ্লবের পথ ধরেই আমাদের দেশে কমিউনিস্ট ভাবধারার প্রসার হয়, পরবর্তীতে কমিউনিস্ট পার্টিও তৈরি হয়। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা সহ এশিয়ার একাধিক দেশে সোভিয়েত বিপ্লবের সরাসরি প্রভাব দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তো আমাদের সবারই জানাবোঝার মধ্যে আছে।
পেরু, চিলি, গুয়াতেমালা, নিকারোগুয়া ও অবশ্যই কিউবা সহ লাতিন আমেরিকার বহু দেশ এবং ঘানা, তানজানিয়া, অ্যাঙ্গোলা, আলজিরিয়া, সুদান, কঙ্গো, মিশর, গুয়েনা, ইথিওপিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা সহ আফ্রিকা মহাদেশের বহু দেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন সরাসরি প্রভাবিত হয় সোভিয়েত বিপ্লবের দ্বারা, এবং বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে দেশগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলের ফলশ্রুতিতে পূর্ব ইউরোপের বহু দেশ সহ চীন, ভিয়েতনাম, লাওস, কিউবায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। আমাদের দেশ সহ বহু দেশ স্বাধীনতার স্বাদ পায়। ঘৃণ্য উপনিবেশ প্রথা বিশ্ব জুড়েই চরমভাবে ধাক্কা খায়।
মনে রাখতে হবে, সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার স্লোগানের ফ্রান্সও তার কলোনিকে যে পরাধীন রেখেছিল শুধু না, সেখানে এমনকি দাসপ্রথাও চালু ছিল! আর এর বিপরীতে সোভিয়েত বিপ্লবের ফসল যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা, তা' শ্রেণীবৈষম্য তো বটেই, তার সাথে যুগ যুগ ধরে চলে আসা বর্ণবৈষম্য, লিঙ্গবৈষম্য সহ সবরকম বৈষম্যের অবসানে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিল। এ' যেন আমরা কখনোই ভুলে না যাই...
বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের উপরেই চরম আঘাত এনেছিল সোভিয়েত বিপ্লব, এই বিপ্লবের আগের পর্বে বিশ্ব পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের যে ভারসাম্য ও সুস্থিতি ছিল, তা সে কখনোই ফিরে পাবে না। সোভিয়েত বিপ্লব চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল যে পৃথিবীকে বদলানো সম্ভব। এই বিপ্লব যদি দুনিয়াকে পাল্টে দিতে পারে, তাহলে আমার দেশে সম্ভব নয় কেন?
এদিকে ইতিহাস তো অনড় থাকে না! ফলে সোভিয়েত বিপ্লবের প্রায় ১১০ বছরের মাথায় এখনকার পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবে অনেকটাই আলাদা। লেনিন ফিন্যান্স পুঁজি দেখেছিলেন, আর এখন সেই অর্থে বলা যায় ফিন্যান্স পুঁজিরই ফিন্যান্সালাইজেশন হয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পর্বে প্রবেশ করেছে, পণ্য উৎপাদনকে ক্রমাগত পিছনে ফেলে পুঁজি ক্রমশই আরও বিমূর্ত রূপে সামনে আসছে। কিন্তু ক্রমাগত উপুর্যুপরি সংকটের আবর্ত থেকে পুঁজিবাদ বেরোতে পারছে না।
আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, উৎপাদনের পদ্ধতির মধ্যেই পুঁজিবাদের মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এ' তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ— উৎপাদনের সামাজিক চরিত্র বনাম ব্যক্তিগত ভোগ-মালিকানার বেসিক
অভ্যন্তরীণ ধর্ম। এই ধর্ম অনুযায়ী পুঁজিবাদ বারেবারে সংকটে পড়েছে, এবং আবার সেই সংকট থেকে বেরিয়েও এসেছে। উৎপাদনের উপকরণের মালিক হিসাবে বিজ্ঞান প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সব সুফল কুক্ষিগত করে বারেবারেই নিজেকে পাল্টাচ্ছে সে। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের চেহারা, তার শোষণ ও মুনাফা অর্জনের চরিত্রেরও পরিবর্তন হয়েছে, হয়ে চলেছে। এখন সে আরও বেশি আগ্রাসী, আরও অনেক বেশি সে ব্যপ্ত! মুনাফার চরম নেশায় এখন তার হস্তক্ষেপে প্রকৃতি-পরিবেশও এমন সংকটের মুখে, যা মানবসভ্যতার অস্তিত্বকেই চরম প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে! শক্তিশালী বিকল্পের আপাত অনুপস্থিতি আপাততঃ পুঁজিবাদকে সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করছে ঠিকই, কিন্তু আবারও মনে রাখতে হবে এতদ্সত্ত্বেও সে সংকট থেকে মুক্ত নয়— কারণ ঐ সংকটটাই তার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
একইসাথে এটাও মনে রাখতে হবে— যতই সংকটে পড়ুক না কেন, পুঁজিবাদ আপনাআপনি ভেঙে পড়ে না। পড়বে না। তাকে ভাঙতে হয়। উৎখাত করতে হয়। সঙ্কটের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি (অবজেক্টিভ কন্ডিশন) যতই বিপ্লবের পক্ষে থাকুক, যদি তার জন্য বস্তুগত উপাদান অর্থাৎ, শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে বিপ্লবী গণআন্দোলনকে শক্তিশালী না করা যায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
সোভিয়েত বিপ্লবের বর্ষপূর্তি পর্বে ঐতিহাসিক 'কী করতে হবে?'— এই প্রশ্নের এটাই নির্দিষ্ট উত্তর।
সোভিয়েত বিপ্লব যদি দুনিয়াকে পাল্টে দিতে পারে, তাহলে আমার দেশেও তা অবশ্যই সম্ভব। এই সম্ভাবনাকে দেশে দেশে বাস্তবায়িত করার লড়াইটা ছড়িয়ে দেওয়াটাই সোভিয়েত বিপ্লবের সবচেয়ে বড় অবদান।
নয় কি?
প্রকাশ: ০৭-নভেম্বর-২০২৬
শেষ এডিট:: 07-Nov-26 02:45 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-role-of-the-soviet-revolution-in-the-worlds-liberation-movement
Categories: Fact & Figures
Tags: november revolution, octoberrevolution
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (5)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (184)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (168)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (92)
- Highlight - হাইলাইট (103)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (156)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (19)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
দুনিয়ার মুক্তি আন্দোলনে সোভিয়েত বিপ্লবের ভূমিকা:
- সংগ্রাম চ্যাটার্জি
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নভেম্বর বিপ্লব
- ডঃ নুরুল ইসলাম
আলো দিয়ে মস্তিষ্কের সুইচ: অপটোজেনেটিক্সের গল্প
- বাবান নন্দ
আলো দিয়ে মস্তিষ্কের সুইচ: অপটোজেনেটিক্সের গল্প
- বাবান নন্দ
ভোটাধিকার বনাম চীন-জুজু: নজর ঘোরানোর কৌশল?
- সাম্য পাল




