সাধারণতন্ত্র দিবস, সংবিধান ও আম্বেদকর
খসড়া দলিলকে দীর্ঘ আলোচনা, বিতর্ক শেষে সংবিধানের গৃহীত চেহারা দিতে নিরলস পরিশ্রম করে যেতে হয়েছে আম্বেদকরকে। আম্বেদকরের জায়গায় রাউ কে এনে বসানোর প্রচেষ্টা অতীব হাস্যকর এবং উগ্র দক্ষিণপন্থীদের নির্লজ্জতার নিদর্শন।

আজ ২৬শে জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবস। সংবিধান দিবস ও বলা চলে। ১৯৫০ সালে আজকের দিনেই ভারতের সংবিধান তার পথচলা শুরু করে। যে কোন দেশের সংবিধান একসাথে দুটি ভূমিকা পালন করে। এক, সেটি সে রাষ্ট্রব্যবস্থার বুনিয়াদ এবং রাষ্ট্রের সকল সিদ্ধান্ত এবং সে সকল সিদ্ধান্ত রূপায়ণের ক্ষেত্রে লেজিটিমেসির কষ্ঠিপাথরের কাজ করে। দুই, সংবিধান রাষ্ট্রব্যবস্থার অভিমুখ নির্মাণ করে দেয়। রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্দেশ্য এবং বিধেয়, এই দুই ব্যাকরণ তৈরি করে দেয় সংবিধান। এই দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি নি:সন্দেহে 'রাজনৈতিক' যা কিনা প্রথমটির বুনিয়াদ হিসাবে কাজ করে। সোজা কথায় রাষ্ট্র পরিচালনার বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সে রাষ্ট্রব্যবস্থার আইন, প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থাকে নির্মাণ করে। যে কোন’ দেশের সংবিধান সে কারণেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল। ভারতের ক্ষেত্রে সংবিধান রচয়িতাদের (কোনো একজন ব্যক্তির দ্বারা এই ঐতিহাসিক দলিল লেখা হয়নি, হওয়া সম্ভব ও ছিল না) মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন ভীমরাও রামজী আম্বেদকর।
এ বিষয়ে ‘নব্য হিন্দুত্ববাদী’দের তরফে একটা উটকো বিতর্ক প্রতি বছর উস্কে দেওয়া হয় যে আদতে সংবিধান লেখালিখির মূল কাজটা করেছিলেন বেনেগাল নরসিং রাউ বা বি এন রাউ। ‘নব্য হিন্দুত্ববাদী’ বলা হল’ এই কারণে যে স্বাধীন ভারতের গোড়ার দিকের হিন্দুত্ববাদীরা এরকম ডাহা মিথ্যে খুব একটা বলেন নি। সংবিধান পরিষদের (কন্সটিটুয়েন্ট এসেম্বলি) হিন্দু রক্ষণশীল অংশের প্রতিনিধি পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন বা খোদ সভাপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ (পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি), সকলেই দেখেছিলেন কী অসামান্য আন্তরিকতা, পরিশ্রম আর বৈদগ্ধ্য একসাথে প্রয়োগ করেছিলেন আম্বেদকর সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে। সংবিধান পরিষদের বিতর্কসভায় (কন্সটিটুয়েন্ট এসেম্বলি ডিবেটস) বাম বা দক্ষিণ, সকল দিক থেকে ধেয়ে আসা তীক্ষ্ণ সব প্রশ্ন, সমালোচনা, সংশোধনীর প্রস্তাবকে কীভাবে সামলেছিলেন তিনি। আমাদের মহাকাব্যের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের মত প্রায় একা হাতে সংশপ্তকদের মতই প্রবল শক্তিশালী সকল সামাজিক/রাজনৈতিক স্বার্থের সাথে কখনো সঙ্ঘাত, কখনো বা বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে ভারতের সংবিধান রচনা’র মূল কারিগর ছিলেন আম্বেদকর। রাজনৈতিক মত নির্বিশেষে তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন এই যুগান্তকারী সংবিধান রচনার জন্য। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী গেইল অমভেট যে আম্বেদকরের এই কীর্তিকে গ্রীক মহাকাব্যে বর্ণিত প্রমিথিউসের আগুন আহরণের সমান বলেছেন, তাতে বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জন নেই। নব্য হিন্দুত্ববাদীরা আসলে দলিত/ ‘নীচু জাত’ থেকে উঠে আসা এই মহামানবের এই অতুল কীর্তিকে নিজেদের মজ্জাগত মনুবাদী মানসিকতার কারনেই ভাল চোখে দেখতে পারে না। কাজেই নিয়ে আস’ বি এন রাউ কে। এই রাউ সাহেব ছিলেন ম্যাঙ্গালোর অঞ্চলের ধনাঢ্য, নৈকষ্যকুলীন সারস্বত ব্রাহ্মণ পরিবারের বিদেশে শিক্ষিত ‘গুড বয়’, যিনি তাঁর জীবনের বড় অংশই ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের বড় অফিসার হিসাবে ভারতে ব্রিটিশরাজের প্রচুর সেবা করেছেন। এমন কী, সেই কুখ্যাত সাইমন কমিশন কে কেন্দ্র করে যখন দেশজুড়ে গণ আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছেছিল, এই রাউ সাহেব বিরাট সওয়াল করেছিলেন লন্ডনের ‘হোম অফিসের’ কাছে যাতে সাইমন কমিশনের যাবতীয় খরচ ভারতের প্রাদেশিক সরকারগুলিকে বহন করতে বলা হয় এবং যাতে ব্রিটিশ নাগরিকদের করের টাকা এ কাজে খরচ না করা হয়! এই দুর্দান্ত রাজভক্তির কারণে পরবর্তীতে তিনি “স্যার” উপাধি পান। সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে রাউয়ের ভূমিকা ছিল একজন ‘টেকনিক্যাল এডভাইসরের’, সংবিধান পরিষদের সদস্য তিনি ছিলেন না। সংবিধানের প্রথম ‘টেকনিক্যাল’ খসড়াটি রাউ করেন। সে খসড়ার সাথে গৃহীত সংবিধানের ফারাক প্রচুর। সেই টেক্নিক্যাল ড্রাফটে মৌলিক অধিকারগুলিকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি এবং সেগুলির সাংবিধানিক নিরাপত্তাও প্রদান করা হয়নি। সামাজিক ন্যায় প্রসঙ্গে সামান্য কিছু বক্তব্য ছিল। দলিত জনজাতি আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলির আর্থসামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ কিছুই বলা ছিল না। এই খসড়া দলিলকে দীর্ঘ আলোচনা, বিতর্ক শেষে সংবিধানের গৃহীত চেহারা দিতে নিরলস পরিশ্রম করে যেতে হয়েছে আম্বেদকরকে। আম্বেদকরের জায়গায় রাউ কে এনে বসানোর প্রচেষ্টা অতীব হাস্যকর এবং উগ্র দক্ষিণপন্থীদের নির্লজ্জতার নিদর্শন।
এ লেখার উদ্দেশ্য আম্বেদকরের স্তুতি গাওয়া নয়। বরং, এই মুহূর্তে সংবিধানকে শিখন্ডি হিসাবে খাড়া করে সংবিধানেরই মূল উদ্দেশ্যগুলিকে যেভাবে ভোঁতা করার চেষ্টা চলছে, তার উল্টো দিকে আম্বেডকরের সংবিধান ভাবনা কে juxtapose করা। এই উদ্দেশ্যে আম্বেডকরের রাজনৈতিক মত এবং কাজের কিছু আলোচনা জরুরি, কারণ আগেই বলা হয়েছে যে সংবিধান একটি রাজনৈতিক দলিল এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাঁর/তাঁদের রাজনৈতিক মত সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে 'নিরপেক্ষ' হতে পারেনা।
রাজনৈতিক আম্বেদকর
মহারাষ্ট্রে সারা ভারত কিসান সভার নেতৃত্বে নাসিক-পালঘর কিসান পদযাত্রা এই সবেমাত্র শেষ হল’। সরকারি তরফে কিসানদের অধিকাংশ দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতির পরেই এই যাত্রা আপাততঃ ঘরে ফিরে চলল’। মহারাষ্ট্রের বুকে কিসানদের এমন পদযাত্রা নতুন নয়। কিছু বছর আগে নাসিক-মুম্বই কিসান লংমার্চ তাবৎ জাতীয় মিডিয়ার নজর কেড়ে বহুলভাবে সম্প্রচারিত হয়েছিল। এসবের ও মহু আগে সেই ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভীমরাও আম্বেডকরের নেতৃত্বে, ইন্দুলাল যাজ্ঞিক, শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে, শ্যামরাও পারুলেকর’দের সক্রিয় অংশগ্রহণে এক বিশাল কিসান পদযাত্রা তদানীন্তন বম্বে প্রদেশের কোঙ্কণ অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে বম্বে শহরে এসে শেষ হয়। এই পদযাত্রার সমর্থনে কমিউনিস্ট নেতা ভালচন্দ্র ত্রিম্বক রনদিভে এবং জি এস সরদেশাই ১৭ই অক্টোবর ১৯৩৭ এ ৩০০০ এর বেশি লালঝান্ডাধারী কিসানদের নিয়ে সমাবেশও সংগঠিত করেন। পদযাত্রা থেকে স্লোগান উঠেছিল “আদি পোটবা, মাগ ভিঠোবা”, মানে, ‘আগে পেট পরে ঈশ্বর”। সেই যুগে এমন সোচ্চার বস্তুবাদী স্লোগান উঠেছিল সেই ১৫ হাজারের ও বেশি মানুষের সভা সমাবেশ থেকে। আম্বেডকরের যথেষ্ট উৎসাহ ছিল নিপীড়িত দলিত জাতিসত্ত্বা কে শ্রেণী পরিচিতির সাথে মিলিতভাবে রাজনৈতিক mobilization এর মাধ্যম হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার। স্বাধীনতার এক দশক আগে, যে সময় ভারতে বামপন্থী গণ আন্দোলনের বলা চলে শৈশবাবস্থা (কমিউনিস্ট পার্টির অফিশিয়াল কর্মসূচী তখনো তৈরি হয়নি), সেই সময় মূলতঃ আম্বেডকরের নেতৃত্বে এবং অনেকখানি তাঁরই ক্যারিশ্মায় ভর করে এমন একটি সাড়া জাগানো আন্দোলন ঘটেছিল প্রথম প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচনের অল্প কিছুদিন বাদেই। অবশ্য কমিউনিস্ট পার্টির সগঠকরাও যোগ্য সঙ্গত দিয়েছিলেন তাঁর সাথে। আন্দোলনের দাবি ছিল মূলতঃ কোঙ্কন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত “খোতি” নামের এক অতীব বদখত জমিদারি প্রথার বিলোপ সাধন। আন্দোলনের উল্টো দিকে ছিল জাতীয় কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা। জাতের পরিচয়ে কোঙ্কন অঞ্চলের জমিদাররা ছিল বেশিরভাগ চিৎপাবন ব্রাহ্মণ আর রায়ত/কিসানরা ছিল মাহাঁর, মাং, কুনবি জাতিভুক্ত দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। কাস্ট-ক্লাস মিলে যাওয়ার একটি কপিবুক উদাহরণ। এই পদযাত্রা এসে পৌছেছিল বোম্বাইয়ের আইনসভার কৌন্সিল হলে তাদের দাবি নিয়ে। ১৯৩৬ সালের জাতীয় কংগ্রেসের ফৈজপুর অধিবেশন উপলক্ষ্যে যে কিসান কংগ্রেস পদযাত্রা হয়েছিল’ তার চেয়েও বহু বেশি মানুষ ১৯৩৭ এর এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে সে সময়ের জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বম্বে প্রদেশের আইনসভায় এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। এই পদযাত্রার শেষে আম্বেডকরের সম্পাদনায় প্রকাশিত “জনতা” পত্রিকার সম্পাদকীয়তে (১৯৩৮ সালের ১৫ই জানুয়ারি সংখ্যা) লেখা হয়েছিল’ “প্রকৃত প্রস্তাবে দুনিয়ায় দুটো মাত্র জাত আছে। ধনী আর দরিদ্র। অবশ্য আরেকটি জাত আছে এদের মাঝখানে, যাদের কাজই হল’ দায়িত্ব নিয়ে সকল গণ আন্দোলনের ক্ষতি করা।“ এই সম্পাদকীয়তে এ কথাও আম্বেডকর লেখেন যে শ্রেণী সংগ্রামের দর্শনের সাথে তিনি একাত্ম বোধ করেন। এই সম্পাদকীয়র এক মাস বাদেই ১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মহারাষ্ট্রের মনমাড অঞ্চলে তিনি দলিত রেল শ্রমিকদের নিয়ে সভা করেন। সেই সভায় তিনি সোচ্চারে ঘোষণা করেন যে এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের দুটি প্রধান শত্রু হল’ ব্রাহ্মণ্যবাদ আর পুঁজিবাদ।
আম্বেডকরের স্নাতোকোত্তর শিক্ষা ঘটে কলাম্বিয়া বিশবিদ্যালয় এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে। এই দুই প্রতিষ্ঠানেই ওঁর গবেষণার বিষয় ছিল’ অর্থনীতি। পরবর্তীতে যুক্ত হয় আইন। দেশের অর্থব্যবস্থা নিয়ে ওঁর অধীত জ্ঞান যথেষ্ট পরিমাণে ছিল’। এ প্রসঙ্গে একটি উল্লেখ্যোগ্য ঘটনা হল' যে আম্বেডকর যে থিসিস জমা দেন লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে The Problem of the Rupee নামে, সেই থিসিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালণ করে ১৯৩৪ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। এর পাশাপাশি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন বর্ণাশ্রম প্রথার বর্বরতা। দেশীয় দুই রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় বিদেশে পড়াশোনা করেও ভারতে জাতি-শ্রেণী সম্বন্ধে স্পষ্ট বোঝাপড়া এবং মমত্ববোধে কখনো কোনো ঘাটতি ঘটেনি তাঁর। সেই কারণেই ১৯৩৮ সালে বম্বে প্রদেশে সদ্যপ্রতিষ্ঠিত কংগ্রেস প্রাদেশিক সরকারের আনা শ্রমিক-স্বার্থবিরোধী ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিস্পিউটস বিলের বিরুদ্ধে একেবারে মাঠে ময়দানে নেমে কমিউনিস্টদের সাথে সম্মিলিতভাবে মানুষকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মাহার জনজাতির ‘ওয়াতান’ জমির দাবিতে আন্দোলন, বম্বে প্রদেশের পুরসভার সাফাই কর্মচারীদের নিয়ে সংগঠন, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে অসবর্ণ জাতিসমূহের বিভিন্ন সংঠনের সাথে মিলিতভাবে আন্দোলনের প্রচেষ্টা, এক কথায়, ১৯৩৯ সালের পর থেকে আম্বেডকর তদানীন্তন জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং পুঁজিবাদী নেতৃত্বের উলটো দিকে একটি সর্বভারতীয় বিভিন্ন জনজাতি-শ্রমিক-কিসানদের নিয়ে রাজনৈতিক মঞ্চ গড়তে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কমিউনিস্টদের সাথে আম্বেডকরের সম্পর্কের মধ্যে মতাদর্শগত কারণে বহু টানাপোড়েন ঘটে। কিছু তিক্ততার ও জন্ম হয়। কিন্তু তাতে আম্বেডকরের পুঁজিবাদ বিরোধীতার স্পষ্ট ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যায়না যেটা দীর্ঘ বেশ কয়েক দশক ধরে এ দেশের দক্ষিণপন্থীরা প্রচার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ কথা বলার উদ্দেশ্য আম্বেডকর কে কমিউনিস্ট ঘোষণা করা নয়। কমিউনিস্ট তথা বৃহত্তর বামপন্থীদের সাথে মতাদর্শগত প্রশ্নে আম্বেডকরের মতের মিলটাই বেশি অমিলের চেয়ে।
ফিলিপ স্প্রাটের মামলা, আম্বেডকরের সওয়াল
ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির তরফে ফিলিপ স্প্রাট কে এ দেশে পাঠানো হয় কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রচারে। তিনি তাঁর লেখা এক পুস্তিকা (‘চায়না অ্যান্ড ইন্ডিয়া’)-য় সে সময়ের চীনের জাপানী দখলদারির বিরুদ্ধে সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কে সমর্থন করেন এবং সেই পথ যে ভারতের মুক্তিকামী জনতার ও পথ হতে পারে, এ কথা লেখেন। 'সিডিশন', মানে রাজদ্রোহের চার্জে ফৌজদারী মামলা করা হয় সরকারের তরফে স্প্রাটের বিরুদ্ধে। তাঁর পক্ষে কৌঁশুলি হ'ন আম্বেডকর। আদালতে আম্বেডকর মূলত: যে ক'টি সওয়াল করেন, তা হল: এক, স্প্রাট সাধারণভাবে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে কোনো দেশেরই দেশপ্রেমিক মুক্তিকামী মানুষের আকাঙ্খার কথা ব্যক্ত করেছেন, যে দেশপ্রেম ব্রিটিশ সংবিধানে সমাদৃত একটি বিষয়; দুই, স্প্রাট ভারত সরকারবকে বলপূর্বক উচ্ছেদের কথা বলেন নি, অবশ্য ভারত সরকারের বহু ত্রুটি বিচ্যুতির তীব্র সমালোচনা করে সরকারকে সতর্ক করে দিতে চেয়েছেন যে চীনের জনগণ যে পথ বেছে নিয়েছেন সেই একই পথ যাতে এ দেশের মানুষকে যেন না নিতে হয়, অর্থাৎ সরকারবিরোধী সশস্ত্র রাজনীতির পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, তা চেয়েছেন; তিন, সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধীতা মাত্রেই তা রাজদ্রোহ হয়ে যায়না, বরং তা সরকারের কাজকর্মের সংস্কার সাধন ও ঘটাতে পারে। আম্বেডকর একটি বড় প্রশ্ন রাখেন আদালতের কাছে: ভারতের ব্রিটিশ সরকার কি এমনটা মনে করছে যে তারা জাপানী দখলদারীদের মতই এ দেশের মানুষের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে, নয়ত' জাপান আর চীনের উদাহরণ ব্রিটেন আর ভারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে সরকার মনে করছে কেন?! এই কৌশলী সওয়ালের মুখে খানিকটা ঢোঁক গিলতে বাধ্য হয় সরকার। ফৌজদারী মামলা থেকে নিষ্কৃতি পান স্প্রাট। মনে রাখা প্রয়োজন, যে সে সময়ে ভারতের সরকার কোনো জনাদেশ পাওয়া, ভোটে জেতা শাসক ছিলনা। এ দেশের মানুষের কাছে সেই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা তার বিচার বিভাগের কোন বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন ও ছিলনা। তা সত্ত্বেও এই সওয়াল গ্রহণযোগ্য হয়েছিল সেদিন আদালতের কাছে।
১৯২৭ এর সেই বিচারের পর কেটে গেছে প্রায় ৯৯ বছর। ২০২৬ এর ৫ই জানুয়ারি মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট উমর খালিদের জামিনের মামলায় রায় দিল' যে জামিন দেওয়া যাবে না। গ্রেপ্তারির পর ৫ বছর কেটে যাওয়ার পরেও, মূল মামলা প্রসিকিউশন মানে, সরকারের তরফে বিশেষ এগোতে না পারা সত্ত্বেও জামিনের আবেদন খারিজ করে দেওয়া হল। Unlawful Activities Prevention Act এর সংজ্ঞা বাড়ানো হয় ২০০৮ এর ২৬শে নভেম্বর মুম্বইয়ে পাক-মদতপুষ্ট ইস্লামিক সন্ত্রাসবাদীদের বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের পরে। সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা কে বাড়িয়ে বহু অহিংস রাজনৈতিক কার্যকলাপকেও এর মধ্যে জুড়ে দেওয়া হয় যেগুলো অতীতের TADA, POTA' র বহু মানবাধিকার বিরোধী আইনি ক্ষমতাকে আবার ফিরিয়ে আনে নবকলেবরে। উল্লেখ্যোগ্য বিষয় হল' যে বাজপেয়ী আমলে পাশ করা POTA প্রবলভাবে নিন্দিত হয় এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন UPA সরকার এটিকে ২০০৪ এ সরকার গঠনের কিছুদিন বাদেই খারিজ করে দেয়। ২০০৮ এর ১৫ই ডিসেম্বর সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে এই সংশোধনী আনা হয় এবং প্রায় বিনা বিতর্কেই পরের দিনই পাশ করানো হয়। মনে রাখা দরকার যে বামপন্থী সাংসদরা তত দিনে UPA জোট সরকারের থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এবং চিদাম্বরম, মন্টেক সিং'দের হাত ধরে UPA সরকার তার দ্রুত 'দক্ষিণায়নের' প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল'। সুপ্রীম কোর্ট এইসব আইনি ধারার বিশ্লেষণ করে উমর খালিদ ও শার্জিল ইমাম ৫ বছর ধরে বিনা বিচারে বন্দি থাকা সত্ত্বেও, NIA তাদের তদন্তে এই দুজনের বিরুদ্ধে কোনো একটিও পোক্ত প্রমাণ না দিতে পারা সত্ত্বেও, তাদের বন্দিদশা থেকে জামিনে মুক্তি দিতে নারাজ হয় যেখানে খোদ NIA'r তরফে এদের দু'জনের কোনো ধরনের সহিংস আচরণের বা কোনো ধরনের 'হেট স্পীচের' অবধি কোনো প্রমাণ পেশ করা যায়নি। কোনো 'প্রাইমা ফেসি' প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও জামিনের আবেদন খারিজ করে সুপ্রীম কোর্ট তাদের ১৪২ পৃষ্ঠার রায়ে৷ সরকারিপক্ষের আনা বিবিধ "অভিযোগের গুরুত্ব" কে মান্যতা দিয়ে 'প্রাথমিকভাবে' সেসব অভিযোগ সারবত্তাহীন নয়, এমনটা মনে করা হয়েছে মহামান্য সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়ে। উলটো দিকে যে তিনজন বিজেপি নেতা প্রকাশ্যে ২০২০ সালের দিল্লীতে দাঙ্গার উদ্দেশ্যে বিদ্বেষমূলক ভাষণ দেয়, তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়নি স্বত:প্রণোদিত ভাবে। ৫ই জানুয়ারির এই রায়ের পরে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড় 'গভীর উদবেগ' ব্যক্ত করেছেন বিচারাধীন বন্দির দীর্ঘ কারাবাসের যৌক্তিকতা নিয়েও। আম্বেডকরের সামাজিক ন্যায়ের দর্শনে অনুপ্রাণিত জাস্টিস কৃষ্ণ আয়ারের দ্বারা বিচারাধীন বন্দিদের ক্ষেত্রে “bail is the rule, jail is the exception” এর যে দীর্ঘ এবং দরদী দর্শনের সূত্রপাত ঘটেছিল স্বাধীন ভারতের ক্রিমিনাল জুরিস্প্রুডেন্সে, তা বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে৷ কিন্তু এই রায়ের মূল সমস্যার জায়গাটা শুধু উমর খালিদ আর শার্জিল ইমামের দীর্ঘ দিন বিনা বিচারে কারাবাস নয়।
সংবিধানের ১৪১ ধারা অনুযায়ী সুপ্রীম কোর্টের যে কোন রায় সংশ্লিষ্ট আইনের ক্ষেত্রে "ল' অফ দ্যা ল্যান্ড" যা কিনা সকল নিম্নতর আদালত মেনে চলতে বাধ্য। অতএব, যে কোনো রাজ্যের পুলিশ বা কেন্দ্রীয় স্তরে NIA'র তরফে কাওকে UAPA আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করা হলে সুপ্রীম কোর্টের এই রায় অবধারিতভাবেই অলঙ্ঘনীয় নজির (বাইন্ডিং প্রিসিডেন্ট) হিসাবে মেনে চলতে হবে বিভিন্ন ক্রিমিনাল কোর্টকে। বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন শাসক দলের ইচ্ছামত পুলিশ প্রশাসন যদি এর ফলে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে UAPA আইনে মামলা দেওয়া শুরু করে, নিম্নতর আদালত উপযুক্ত মামলায় জামিন দিতে ইচ্ছুক হলেও সরকারিপক্ষের জামিনের বিরোধীতাকেই অধিক মান্যতা দিতে বাধ্য হবে। সোজা কথায় রাজ্য বা কেন্দ্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্বে বা ক্ষমতায় থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিজেপি) এর ফলে অনেক বেশি আইনিভাবে ক্ষমিতাপ্রাপ্ত হল' রাজনৈতিক বিরোধীতাকে প্রশাসনিকভাবে চুপ করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা মনে পড়ে: মাইক্রোফোনের সামনেই সকলের চোখ এবং কানের সামনে বীরভূমের তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা সভাপতি অনুব্রত মন্ডল জেলা পুলিশ সুপারকে পাশে বসিয়ে বামপন্থী গণ আন্দোলনের কর্মীদের “গাঁজা কেস” (NDPS Act) দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল! গাঁজা কেস থেকে UAPA অবধি পৌছতে এ ধরনের লুম্পেন রাজনৈতিক শক্তির খুব বেশিদিন সময় না'ও লাগতে পারে। হাজার হোক, দুর্বৃত্তদের রাজনীতির সাথে ফ্যাসিবাদের তো বিশেষ কোন বিরোধ নেই।
১৯২৭ সালে সিডিশন আইনের আক্ষরিক ব্যখ্যা না করে তার 'বিষয়গত' যে ব্যখ্যার (purposive interpretation) পক্ষে আম্বেডকরের সওয়াল গৃহীত হয়েছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের আদালতে, তার ৯৯ বছর বাদে স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে তার থেকে পশ্চাদপসরণ ঘটছে না তো? মৌলিক অধিকারের (fundamental rights) যে গোটা অধ্যায়টি আম্বেডকর অন্তর্ভুক্ত করাতে পেরেছিলেন সংবিধানে (বি এন রাউয়ের খসড়ায় যা অত্যন্ত ভাসাভাসা ভাবে ছিল) এবং যেটিকে কেশবানন্দ ভারতী মামলায় সুপ্রীম কোর্ট সংবিধানের অলঙ্ঘনীয় ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বলে ঘোষণা করে, সেই গোটা সাংবিধানিক নৈতিকতা (constitutional morality) কে অমান্য করা হচ্ছে কিনা, এ প্রশ্ন হয়ত’ উঠতে পারে।
৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবস
কোন সাধারণতন্ত্র আর্থসামাজিক ন্যায়ের সাংবিধানিক গ্যারান্টি ব্যতীত টিকে থাকতে পারেনা। বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থাতেও মেনে নেওয়া হয়েছে যে এই গ্যারান্টির জন্য প্রশাসনের কাছে ভিক্ষাপ্রার্থী হয়ে বসে থাকলে চলেনা, আইনের শাসন থাকতে হয়৷ এই গ্যারান্টির জায়গায় দুটি অতন্দ্র প্রহরীর প্রয়োজন। এক, সচেতন গণ আন্দোলন আর দুই, বিচার ব্যবস্থা। প্রথমটিকে রাজনৈতিক দল বিহীন NGO বা শহুরে মধ্যবিত্ত নেতৃত্বাধীন সিভিল সোসায়টি'র হাতে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতী একমেরুর এই বিশ্বব্যবস্থা। এ বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলির উদীয়মান মধ্যবিত্তের একটা অংশের উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে। আদালত প্রসঙ্গে একটি বিষয় আজকাল লক্ষ্যণীয় যে যতক্ষণ বিভিন্ন রায়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করা হচ্ছে এবং কর্পোরেট সংস্থাদের পক্ষে বিভিন্ন মামলায় রায় দেওয়া হচ্ছে ততক্ষণ কেন্দ্রে বিজেপি বা রাজ্যে তৃণমূলের সরকার শুধু নয়, বর্তমানে উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের ও একটা ভাল অংশ সন্তুষ্ট থাকছে। যে সকল মামলায় রাষ্ট্রের তরফে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আসছে, তাতে শিক্ষিত মানুষের তরফেও বেশ খানিকটা ঔদাসিন্য লক্ষ্যণীয়। সম্প্রতি দেশের প্রধান বিচারপতি NJAC মামলার রায়ের পুনর্বিবেচনা নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তাতে বিচারব্যবস্থায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নাগরিকত্ব নিয়ে সঙ্ঘ পরিবারের কুৎসিত রাজনীতি এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশের হয়রানি মানুষের ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। এই বোধ ও ক্রমবর্ধ্বমান যে রাস্তায়, মাঠে ময়দানের প্রত্যক্ষ গণ আন্দোলনের বিকল্প আদালতে পাওয়া সম্ভব নয়। আইনি লড়াই সাধারণ মানুষের গণ আন্দোলনের সহযোগী হতে পারে, তার বিকল্প নয়। এই কথা বর্তমান ফ্যাসিবাদী মনভাবাপন্ন কেন্দ্রীয় শাসক দল এবং পশ্চিম বাংলায় প্রচ্ছন্নভাবে তাদেরই সহযোগী যে দুর্বৃত্ত তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার, এই দুইয়েরই আক্রমণের থেকে সংবিধান এবং জাতীয় সংহতির মূল ভাবনাকে রক্ষা করার ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য। মহাভারতের অনুশাসন পর্বে একটি শ্লোক রয়েছে: “ধর্ম: রক্ষতি রক্ষিতা:”। ধর্মকে রক্ষা করলে তবেই ধর্ম রক্ষা করে। এখানে অবশ্যই ধর্ম বলতে কোনো সম্প্রদায় কে বোঝানো হচ্ছে না বরং ন্যায়, নৈতিকতাকে বোঝানো হচ্ছে। এ দেশের সাংবিধানিক নৈতিকতার যে পথচলা শুরু হয়েছিল আম্বেদকরদের হাত ধরে, ভারতের সাধারণতন্ত্রের সেই নৈতিকতাকে রক্ষা করার দায়িত্ব দেশের সাধারণ মানুষকেই বুঝে নিতে হবে।
প্রকাশ: ২৬-জানুয়ারি-২০২৬
শেষ এডিট:: 26-Jan-26 10:03 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-republic-day-the-constituiton-and-ambedkar
Categories: Fact & Figures
Tags: b r ambedkar, constitutionofindia, reclaimtherepublic, republic day
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (159)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (144)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (79)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





