যে কসুর মাফ হবে না

বাবিন ঘোষ

যে ‘সিস্টেম’ তিনি ও তার অনুগামীরা গড়ে তুলতে দিয়েছেন, সে সিস্টেমে এমন সমস্ত পরিশ্রমী, খেটে খাওয়া শ্রমজীবি মানুষের কোনও সংকুলান হওয়ার উপায় নেই।

The Migrants of WB: The March

ইতিহাসবিদ, নৃতাত্ত্বিকেরা মনে করেন যে মানুষের সভ্যতার ইতিহাস আদতে পরিযানের ইতিহাস। আবহমান কাল ধরে মানুষের এই পরিযান চলছে। এক জায়গায় জন্ম নিয়ে, বড় হয়ে, আরেক জায়গায় গিয়ে থিতু হওয়া, নতুন কিছু নয়। মানুষের সাথে সাথেই তাদের ভাষা, সংস্কৃতিও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাত্রা করতে থাকে। নদীর ধার ধরে এক সময় গ’ড়ে ওঠা সভ্যতা তার নিজের মত এক নদী বানিয়ে এভাবেই বয়ে চলে রাজ্য, দেশ, মহাদেশ পেরিয়ে। এ প্রক্রিয়া চলে প্রতিনিয়ত, কখনো খুব দ্রুত গতিতে, কখনো বা অন্তঃসলিলা হয়ে। বলার দরকার হয় না, যে এমন পরিযানের অন্যতম বা সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে অর্থনৈতিক। সেই যে এক কথা ছিল- ভিক্ষার্থী, শিক্ষার্থী আর চাকরিপ্রার্থীর কোনো দেশ হয় না!

কাজেই এ রাজ্যের মানুষ অন্য রাজ্যে গিয়ে কাজ করছেন বা অন্য রাজ্যের মানুষ পশ্চিম বাংলায় আসছেন তাদের রুটি রুজির প্রয়োজনে, এর মধ্যে রাজ্য সরকারের একান্ত দায় ব্যতীত নতুন করে সমস্যার কিছু নেই। ভারতের মত একটি সাংবিধানিক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ‘যে যার নিজের নিজের রাজ্যেই শুধুমাত্র কাজ করবে’, এমন কথা শুধু অবাস্তব না, আমাদের দেশের জাতীয় সংহতির পক্ষে ক্ষতিকারকও। কিন্তু সমস্যা হল যখন সেই পরিযানের কারণ ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটি অমানবিক হয়, যেমনটি আজকের পশ্চিমবাংলায় ঘটে চলেছে।

তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের কাছে এ রাজ্যের বিশিল্পায়ন এক নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা। এমনটা কেবলমাত্র মমতা ব্যানার্জী বা তার তোষামুদে মন্ত্রীসভার কোনও ‘ব্যর্থতা’র ফল নয়। আসলে এমন পরিস্থতি হল তাদের এক স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা। গ্রাম এলাকার সামন্ততান্ত্রিক বদ্‌বাবু, যারা বামপন্থীদের নেতৃত্বে গ’ড়ে ওঠা দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকার ও ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের আমলে নিজেদের সামাজিক প্রতিপত্তি অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছিল’, তারাই তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের মূল শ্রেণী-নেতৃত্ব। প্রশাসনিক ক্ষমতাসম্পন্ন এমনসব সামন্তবাদী মানসিকতার নেতৃত্ব কল-কারখানা বন্ধ করে, কর্মসংস্থানের যাবতীয় সুযোগ’কে পরিকল্পিতভাবে নষ্ট করে আসলে দুটি অ্যাজেন্ডা পূরণ করতে চায়।

প্রথমতঃ, তারা চায় না এ রাজ্যে শিল্পায়নের মাধ্যমে কাজের একটা পরিবেশ গ’ড়ে উঠুক। কারণ, সে জায়গা তৈরি হলে মানুষকে শাসকদলের উপর সর্বক্ষণ নির্ভরশীল করে রাখা মুশকিল। গরিব, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের এমন অসহায় নির্ভরশীলতা আসলে তৃণমূল কংগ্রেসের খুব বড় রাজনৈতিক পুঁজি। সেই অসহায়তার সুযোগে একদিকে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা আরেকদিকে লম্পট-লুম্পেনদের সামনে রেখে ভয় দেখিয়ে এ রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের “ভোট করায়”। ২০২৩ এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জী’র বিভিন্ন সময়ে বলে ফেলা নানা কথাবার্তাই সে প্রমাণ রেখেছে।

দ্বিতীয়তঃ ২০১১ সালে সরকারে এসেই প্রথম বাণিজ্য সম্মেলনে মমতা ব্যানার্জী বলেছিলেন এ রাজ্যে “সস্তায়” শ্রমিক পাওয়া যায়। মনে রাখা ভাল’ যে “দক্ষ” না বলে “সস্তা” শ্রমিক বলা হয়। শ্রম তখনই সস্তা যখন মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে গরিব রাখা যায়। সংগঠিত হতে তাদের সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারকে গায়ের জোরে দমিয়ে রাখা যায়। কিন্তু কিছু পেটোয়া শিল্পপতিকে পাশে বসিয়ে সেই অসংগঠিত গরিব মানুষের সাপ্লাই-লাইনের “গ্যারান্টি” দেওয়ার পরেও এ রাজ্যে বলার মত চার আনার লগ্নিও হয়নি। এ কথা আজ তৃণমূল কংগ্রেস এমনকি তোষামুদে কোনো খবরের কাগজ বা চ্যানেলও অস্বীকার করতে পারছে না। বরং যেটা তারা করতে পেরেছে, তা হল’ এ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলার অসহায় শ্রমজীবি মানুষকে সবচেয়ে সস্তার শ্রমিক হিসাবে পাঠানো। এক সময় “বম্বে প্ল্যান”-এর আওতায় পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিকে নেট লেবর সাপ্লাই’র (net labour supply) জায়গা হিসাবে ধরা হয়েছিল। বামপন্থীরা সহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তির বহু লড়াই-সংগ্রামের ফলে যে অবস্থান পরিবর্তন হচ্ছিল, সেই চাকাকে আবারও পিছন দিকে ঠেলে দেওয়ার কাজটা করছে মমতা ব্যানার্জীর সরকার। এতে কার লাভ? অন্যান্য রাজ্যের পুঁজিপতিদের লাভ। না হলে কি আর বিজেপি’র পরেই সবচেয়ে বেশি ইলেক্টোরাল বন্ডের টাকা পায় তৃণমূল কংগ্রেস? এমনই ইলেক্টোরাল বণ্ডের মাধ্যমে বিজেপি আর তৃণমূল কংগ্রেস’কে টাকা দেওয়া কোম্পানীর তালিকায় এতগুলি নাম ‘কমন’ হয়ে যায়[1]?

লোকসান কার? লোকসান হল’ এ রাজ্যের গরিব, মধ্যবিত্ত মানুষের, যারা মাথা উঁচু করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতে চান। না হ’লে স্রেফ চুনকাম করার কাজের জন্য দুই দিনাজপুর, কোচবিহারের মানুষকে মুম্বই-পুনে-আমেদাবাদ-দিল্লী-গুরগাঁও গিয়ে বস্তিবাসীর সংখ্যা বাড়াতে হয়? পান থেকে চুন খসলে বিজেপি পরিচালিত সেসব রাজ্যের সরকারের পাঠানো ‘বুলডোজার-জাস্টিসের[2]’ বলি হতে হয়? ‘বাংলাদেশি’ তকমায় দিনের পর দিন অসম্মানিত হয়ে, পুলিশ-গুন্ডা-দালালদের হাতে অত্যাচারিত হয়েও পেটের ভাতের দায়ে সেসব জায়গায় পড়ে থাকতে হয়? কোভিড অতিমারির সময় প্রাণের দায়ে তারা নিজেদের রাজ্যে ফিরতে চাইলে মমতা ব্যানার্জী তাদের “করোনা এক্সপ্রেস” বলে যেমন নির্লজ্জের ন্যায় অপমান করেছিলেন। এর কারন ছিল তার নিজের রাজনীতির সুবাদে মাথায় চেপে বসা ভয়। তিনি তো জানেন বিশিল্পায়নের মডেল, ১০০ দিনের কাজে বল্গাহীন চুরিচামারির যে ‘সিস্টেম’ তিনি ও তার অনুগামীরা গড়ে তুলতে দিয়েছেন, সে সিস্টেমে এমন সমস্ত পরিশ্রমী, খেটে খাওয়া শ্রমজীবি মানুষের কোনও সংকুলান হওয়ার উপায় নেই।

তাই বাংলা বাঁচাও যাত্রা। সেই সমস্ত শ্রমিকের জন্য, যাঁদের পরিযানের নেপথ্যে গোটা কাহিনীটাই অত্যন্ত মর্মান্তিক। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘মহেশ’ গল্পের গফুর-আমীনা’রা সাধ করে চটকলে কাজ করতে যেতে চায়নি। বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ’ই নিজেদের পরিবার-সন্তান সব ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা অন্য রাজ্যে যাচ্ছেন কারণ এ রাজ্যে বেঁচে থাকার জন্য ন্যুনতম প্রয়োজনীয় রোজগারের সুযোগটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কেড়ে নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে রাজ্যের ঘাড়ে চেপে বসা এক সুসংগঠিত অপরাধ চক্র। গফুরের মতো আজকের পরিযায়ী শ্রমিকরাও চোখের জল ফেলে বলছেন “তার কসুর তুমি কখনো মাপ ক’রো না”।

এ কথা নিছক প্রার্থনা নয়, তারা আসলে দাবি জানাচ্ছেন।

বাংলা বাঁচাও যাত্রা এই মুহুর্তে এ রাজ্যের একমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্য।

শিল্পায়নের স্পষ্ট দাবি রাখা হয়েছে, পরিযায়ী শ্রমিকের দুঃস্বপ্নের শেষের কথা বলা হয়েছে।    

 

[1] সঞ্জীব গোয়েঙ্কা মালিকানাধীন হলদিয়া এনার্জি লিমিটেড, বেদান্ত গ্রুপ (যাদের এখনো অবধি বাংলায় বলার মত কোনো কল কারখানা বা ব্যবসাই নেই), ডিয়ার লটারির মালিক সংস্থা ‘ফিউচার গেমিং এন্ড হোটেল সার্ভিসেস’, কেভেন্টার গ্রুপ (মাঝেরহাট রেল স্টেশনের পাশেই রেলের জমি যারা রাজ্য সরকারের সাহায্যে নিতান্ত কম টাকায় পেয়েছে) ইত্যাদি।


প্রকাশ: ২৬-নভেম্বর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 26-Nov-25 01:19 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-migrants-of-wb-the-march
Categories: Current Affairs
Tags: migrantworkers, banglabachaoyatra
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড