সঙ্ঘ নারী সংগ্রাম ৫

Author
চন্দন দাস

ইংরেজ শাসনে সবদিক থেকে পিছিয়ে রইলো, পিছিয়ে পড়লো বাংলার মুসলমানরা। আর ইংরেজ শাসনের আগে অভিজাত মুসলমানদের যে অংশ ক্ষমতার আশেপাশে ছিলেন, তাদের রাগ হলো বেশি। তারাই মুসলমান সমাজকে ইংরেজ-বিরোধিতার প্রতিহিংসা থেকে পিছন দিকে টেনে রাখলেন বেশি। আগেও যাঁরা মার খেয়েছেন, গরিব থেকেছেন, সেই সিংহভাগ গ্রামবাসী মুসলমানরা এবার আরও বিপাকে পড়লেন। ক্রমশঃ প্রভাব বাড়লো ধর্মান্ধদের। তার প্রভাবে মুসলমান ধর্মাবলম্বী মহিলাদের অবস্থা হলো দুর্বিষহ।

Sangh Women's Struggle-5

পঞ্চম পর্ব 

 

১৯৩২-এর সেপ্টেম্বরে প্রীতিলতা শহীদ হলেন। ডিসেম্বরে প্রয়াত হলেন বেগম রোকেয়া।

দু’জনের মধ্যে সাদৃশ্য খোঁজার চেষ্টা কঠিন। দু’জনের সামাজিক অবস্থান আলাদা। প্রীতিলতা দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। বেগম রোকেয়ার জীবন পিছিয়ে থাকা সমাজ আর ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে নারীদের অধিকারের জন্য লড়াইয়ের এক মশাল। এখানে একটি সাদৃশ্য এবং প্রবল বৈপরিত্য দু’জনের মধ্যে বিরাজমান। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ব্রিটিশ শাসনে মাথা তোলা বাঙালি মধ্যবিত্তর বৈশিষ্ট্যের লক্ষণ। সেই মধ্যবিত্তর সিংহভাগ ছিলেন হিন্দু। আর সেই একই সময়কালে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে খুঁজেই পাওয়া যায় না। বেগম রোকেয়া সেই ‘প্রায় খুঁজে না পাওয়া’ মধ্যবিত্ত মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের বাইরে থাকা এক মহিলা, যাঁর স্বামী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি বেগম রোকেয়ার শিক্ষানুরাগের সহমর্মী ছিলেন।

ব্রিটিশরা এই দেশের শাসন ক্ষমতা দখল করেছিল ইসলাম ধর্মাবলম্বী শাসকদের পরাজিত করে। মুসলমান সমাজে এর তীব্র অভিঘাত হয়। তাঁরা ইংরেজ শাসন মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা কিছু বছর ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংগ্রাম সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। ১৮৫৭-র পর সেই প্রচেষ্টাও স্তিমিত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পলাশীতে জয়ী হওয়ার পরে ইংরেজদের দরকার হয়ে পড়েছিল প্রশাসনিক কাজ করতে পারে, তাদের শাসন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, এমন একটি অংশ। মুসলমানরা তখন প্রবল ইংরেজ বিরোধী। অন্যদিকে হিন্দুরা তার সুযোগ পূর্ন ব্যবহার করলো। উদ্ভব হলো বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত অংশ। ১৭৯৩-এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর পরেও নব্য, শহরের বাসিন্দা গ্রামের জমিদার যে অংশ মাথা তুললো, তাদেরও সিংহভাগ অভিজাত, ধনী হিন্দুরা। তবে এই সূত্রে একটি কথা বলে রাখা ভালো। বাংলায় আলিবর্দী খাঁ কিংবা সিরাজউদ্দৌল্লাহ— শাসন যারই হোক, প্রশাসনের শীর্ষে হিন্দু অভিজাতরাই সংখ্যাগরিষ্ট ছিলেন। যেমন আলিবর্দী খাঁর শাসনকালে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদের ছটিতে ছিলেন হিন্দুরা। একমাত্র মুসলমান বকসী ছিলেন মীরজাফর। দরবারে মুসলমানরা ছিলেন সংখ্যালঘিষ্ট। যে মুসলমানরা ছিলেন তাদের প্রায় সবাই ছিলেন উত্তর ভারতীয়। উত্তর ভারতীয় মুসলমান এবং বাংলার হিন্দু প্রশাসকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বিশেষ ছিল না।

ইংরেজ শাসনে সবদিক থেকে পিছিয়ে রইলো, পিছিয়ে পড়লো বাংলার মুসলমানরা। আর ইংরেজ শাসনের আগে অভিজাত মুসলমানদের যে অংশ ক্ষমতার আশেপাশে ছিলেন, তাদের রাগ হলো বেশি। তারাই মুসলমান সমাজকে ইংরেজ-বিরোধিতার প্রতিহিংসা থেকে পিছন দিকে টেনে রাখলেন বেশি। আগেও যাঁরা মার খেয়েছেন, গরিব থেকেছেন, সেই সিংহভাগ গ্রামবাসী মুসলমানরা এবার আরও বিপাকে পড়লেন। ক্রমশঃ প্রভাব বাড়লো ধর্মান্ধদের। তার প্রভাবে মুসলমান ধর্মাবলম্বী মহিলাদের অবস্থা হলো দুর্বিষহ।

১৯০৪-এ ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’ প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া লেখেন,‘‘আমরা সমাজেরই অঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কি রূপে? কোন ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে?’’ স্বাভাবিক প্রশ্ন। রংপুরের এক ধনী পরিবারের সন্তান রোকেয়া। বাড়িতে কোনও মহিলা এলেও শিশু রোকেয়াকে চিলেকোঠার ঘরে আটকে রাখা হতো। কিন্তু রোকেয়ার দাদাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা হয়েছিল কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। কেন এই ভাবে মহিলাদের আটকে রাখার প্রচেষ্টা? মূলত বাইরের প্রভাব যাতে নারীদের স্পর্শ করতে না পারে, এই লক্ষ্যেই আটকে রাখা, পর্দানসীন রাখার উদ্যোগ।

অর্থাৎ জামাত-ই-ইসলামী তৈরির করার আগেই মৌদুদীর মৌলবাদের উপাদান সমাজে বপন হয়ে যাচ্ছিল।

বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী আনোয়ার হোসেন ‘মুসলিম নারীশিক্ষার অগ্রগতি’ আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন,‘‘মুসলিম মেয়েদের শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসাবে আরও বলা হয় যে, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারটি মুসলমানদের কাছে উৎসাহজনক ছিল না। কারণ তারা জানত যে, মেয়েদের যেহেতু আয়-উপার্জন করতে দেওয়া এবং জীবিকা নির্বাহ করতে দেওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু মধ্যবিত্ত মুসলমানরা তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে উৎসাহিত বোধ করত না। তারা মেয়েদের গৃহের কাজে নিয়োজিত রেখে ছেলেদের শিক্ষার পেছনে অর্থব্যয় করাকে শ্রেয় বলে মনে করত। সুগৃহিনী ও সুমাতা হবার জন্য যতটুকু শিক্ষার প্রয়োজন তার বাইরে তৎকালীন রক্ষণশীল মুসলিমরা যেতে চাইত না। অধিকাংশ মুসলিম পরিবারের অসহনীয় দারিদ্র্যও তাদেরকে মেয়েদের শিক্ষিত করা থেকে বিরত রাখে।...মুসলমানরা আশঙ্কা করত যে, মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত করলে সমশিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন পাত্র যোগাড় করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হবে এবং বিয়ের সময় প্রচুর বরপণ দিতে হবে।’’

বাধা ছিল আরও অনেক। শুধু ভিতরের নয়, বাইরেরও।

ব্রিটিশের উদ্যোগের আগে বাংলায় বেসরকারি উদ্যোগে নারীশিক্ষার প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল। কলকাতার গৌরিবাড়িতে প্রথম ‘জুভেনাইল স্কুল।’ উদ্যোক্তা ‘ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি।’ এটি ছিল খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী মহিলাদের একটি সংগঠন। আশ্চর্যের হলো যিনি বাল্য বিবাহ বজায় রাখার ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রতিক্রিয়ার প্রধান ছিলেন, সেই রাধাকান্ত দেবের বাড়িতে ১৮২১ এবং ১৮২২ সালে ‘জুভেনাইল স্কুল’-এর পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। ১৮২৩-এ ৮টি ‘জুভেনাইল স্কুল’ ছিল। সেখানে মুসলমান পরিবারের মেয়েরাও পড়তেন।

সরকারি উদ্যোগে মেয়েদের প্রথম স্কুল ১৮৪৯-এ। বেথুন গার্লস স্কুল। কিন্তু সেই স্কুলে ১৮৯৭ সালের আগে পর্যন্ত মুসলমান ছাত্রীদের পড়ার অধিকার ছিল না। এই কারণে ১৮৭৮-এ ঢাকায় তৈরি হলো ইডেন গার্লস স্কুল। সেখানে সব ধর্মের ছাত্রীরা পড়াশোনা করতে পারত।

কিন্তু লাভ হয়েছিল কিছু? ‘বামাবোধিনী পত্রিকা’য় ১৮৮০ সালের মার্চের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সে বছর ইডেন গার্লস স্কুলে ১৫৩জন ছাত্রী ছিল। মুসলমান ধর্মাবলম্বী পরিবারের ছিল মাত্র ১জন! ১৯১১-তে তা বেড়ে হয় ১১, তখন হিন্দু ছাত্রী ছিল ২০৯জন, খ্রীষ্টান ছাত্রী ৮জন।

ইতিহাসের এক প্রহসন ঘটলো ১৯০৫-এ। ব্রিটিশ বঙ্গভঙ্গের চক্রান্ত করলো। এবং বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে মুসলমান ধনী, অভিজাতদের দূরে রেখে মুসলমান সমাজকেই তা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার কৌশল নিয়েছিল। সেই কৌশলের অংশ ছিল বিভিন্ন কর্মসূচি। তার অন্যতম মুসলমান পরিবারের মেয়েদের শিক্ষা। মুসলমান অভিজাতরাও বুঝতে পারেন ব্রিটিশের ঘনিষ্ট হওয়ার এই সুযোগ গ্রহণ না করা মূর্খামি হবে। তাই তারাও পর্দা সরাতে শুরু করেন। ১৯০৫ থেকে ১৯১১— সাম্রাজ্যবাদী সরকার প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ ইংরাজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলিতে পড়াশোনার জন্য মুসলমানদের কিছু সুবিধা দিতে শুরু করে। মাদ্রাসার সংখ্যাও বাড়িয়ে দেয়। ১৯০৬-এ বিদ্যালয়গুলিতে মুসলমান ছাত্রী ছিল ৩শতাংশ। ১৯১১-তে তা ১০শতাংশ হয়। শীলা বসুর ‘রাজনৈতিক পটভূমিকায় বাংলার মুসলিম নারীশিক্ষার বিকাশ’ জানাচ্ছে, ১৯১০ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোন মুসলমান ছাত্রী বিএ পাশ করেনি। ১৯১৪ সালে মুসলমান ছাত্রীদের জন্য ৩০৩১টি স্কুল খোলা হয় বাংলায়।

প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় অগ্রগতি ঘটলেও উচ্চশিক্ষায় মুসলমান পরিবারের নারীদের বিশেষ দেখা যায়নি সেই সময়ে। তবে নারী শিক্ষার এই পর্বের প্রভাব দেখা গেলো মূল্যবোধ, সমাজচেতনায়। একাংশের মুসলমান নারী শিক্ষাকে জীবিকা করার পথেও এগিয়ে যান। সুফিয়া কামাল, শামসুন্নাহার মাহমুদ, রাজিয়া খাতুন চৌধুরী, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার মতো নারীরা হয়ে ওঠেন নারী প্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক।

কিন্তু পুরুষতন্ত্র, ধর্মীয় গোঁড়ামি, মৌলবাদের বিরুদ্ধে লাগাতার লড়তে হয়েছে মুসলমান মহিলাদের। যার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেলো ভোটাধিকার অর্জনের লড়াইয়ে।

 

 

সম্পূর্ণ লেখাটি ১০ টি পর্বে প্রকাশিত হবে।


প্রকাশ: ৩০-আগস্ট-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 30-Aug-25 12:31 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/sangh-womens-struggle-5
Categories: Fact & Figures
Tags: britishindia, rss-bjp, mushlim woman, education of muslim woman
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড