সঙ্ঘ নারী সংগ্রাম-২

Author
চন্দন দাস

অভিজাতরা সামন্তপ্রভু হয়ে উঠেছিলেন, তারা বারাণসীতে মন্দির বানিয়ে দিয়েছেন, ধুমধাম করে ‘মাতৃরূপেন সংস্থিতা’ করেছেন, দেদার টাকা উড়িয়েছেন। আবার তাঁরাই বাল্য বিধবাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন সারা জীবন অপচয়ের জন্য।

Sangh, Women's Struggle-2

‘সতী দ্বেষী’ বনাম ধর্মসভা

বাংলা সাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ করে। তার সবচেয়ে বড় শিকার মহিলারা।

কিন্তু মহিলাদেরই বড় অংশ আবার ধর্মান্ধতার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বাহক। দেখা যাবে গোলওয়ালকার এবং মৌদুদী, দুজনেই নারীদের সাম্প্রদায়িকতার নিঃশব্দ বাহক, প্রচারক হিসাবে ব্যবহারের রোডম্যাপ লিখে গেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে সেই মহিলারাই হতে পারেন, বিভিন্ন সময়ে হয়ে উঠেছেন ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে পরীক্ষিত, তীক্ষ্ণতম হাতিয়ার।

সবচেয়ে শোষিত, অবদমিত অংশই সমাজ বিপ্লবে সবচেয়ে প্রবল শস্ত্র হতে পারেন। সমাজ তাঁদের মধ্যে সেই উপাদান বপন করেছে।

ধর্মান্ধতার পৃষ্ঠপোষক সামন্ততন্ত্র। আর সামন্ততন্ত্র প্রধানত পুরুষ-শাসিত। বাংলার সামাজিক ইতিহাস বলছে ১৭৯৩-এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সৌজন্যে শহরের বাসিন্দা যে অভিজাতরা সামন্তপ্রভু হয়ে উঠেছিলেন, তারা বারাণসীতে মন্দির বানিয়ে দিয়েছেন, ধুমধাম করে ‘মাতৃরূপেন সংস্থিতা’ করেছেন, দেদার টাকা উড়িয়েছেন। আবার তাঁরাই বাল্য বিধবাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন সারা জীবন অপচয়ের জন্য।

ইংরেজ বাংলার সমাজজীবনে প্রথম বড় আঘাত হানে সাগর দ্বীপে হিন্দুদের সন্তান বিসর্জন আইনত নিষিদ্ধ করে। তা ১৮০০ শতকের গোড়ায়। তাৎপর্যপূর্ণ হলো তা নিয়ে হিন্দু গোঁড়া সমাজপতিদের মধ্যে হাহাকারের তত প্রকাশ দেখা যায়নি। কিন্তু তারা রে রে করে উঠলেন সতীদাহ প্রথা রদ করার সময়। ১৮২৯-৩০ তা রদ হয়। কিন্তু গোঁড়া হিন্দুদের, বিশেষত হিন্দু জমিদার, অভিজাতদের প্রবল বাধার মুখে পড়তে হয়। প্রসঙ্গত, তার অন্তত এক যুগ আগে থেকে, ১৮১৮-১৯ থেকে রামমোহন রায় সতীদাহ-সহমরণের বিরোধিতায় প্রচার শুরু করেছিলেন। রামমোহনের সেই লড়াই ছিল যুগান্তকারী।

সতীদাহ-সহমরণের বয়স, জাতিগত ভেদাভেদ কেমন ছিল?

১৯১৯—এর একটি পরিসংখ্যান বলছে, সেই বছর ১৭৫ জন ব্রাহ্মণ মহিলার সতীদাহ হয়েছিল। বৈদ্য-কায়স্থদের মধ্যে সেই সংখ্যা ছিল ৯৮। আর সমাজের হিসাবে যাঁরা নিম্নবর্ণের, সেই পরিবারভুক্ত ২২৯জনের সহমরণ হয়েছিল। দশ বছরের কম বয়সী দুই শিশুর সহমরণ হয়েছিল। তারা ছিলেন ব্রাহ্মণ পরিবারের। দশ থেকে উনিশ বছরের কিশোরী-তরুণীদের এই ভাবে খুন করা হয়েছিল মোট ২০জনকে। তাঁদের মধ্যে ব্রাহ্মণ ছিলেন ৬জন, নিম্নবর্ণের ৯জন। ষাট বছরের বেশি বয়সের ১৮৪জন মহিলাকে মৃত স্বামীর চিতায় তুলে দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ব্রাহ্মণ পরিবারের ছিলেন ৭৪জন, নিম্ন বর্ণের ছিলেন ৮১জন।

সতীদাহ-সহমরণের নামে এই ‘কৌলিন্যপ্রথার’ পিছনে কারণ ছিল মূলত দুটি। প্রথমত, আর্থিক এবং সামাজিক। বিষয় সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং তাঁদের থাকা খাওয়া, কাপড়ের বন্দোবস্ত খরচ—যাকে অত্যন্ত ইতরভাবে ‘ভরণপোষণ’ বলা হয়। ব্রাহ্মণদের সিংহভাগ আদপেই ধনী ছিলেন না। ছিলেন অভিজাত, জমিদারদের উপর নির্ভরশীল। গ্রাম থেকে শহরে আসার প্রথম পর্যায়ে তাঁদের পরিবারের একাংশ ভৃত্যর কাজও করেছেন। কিন্তু পিছিয়ে থাকা, প্রায় থমকে থাকা একটি সমাজে নিজেদের সামাজিক মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার দৃষ্টান্ত হিসাবে তারা সতীদাহ-সহমরণে অগ্রণী থেকেছে। সমাজের অন্যান্য অংশেও তা তারা অনুপ্রবিষ্ট করেছেন ধর্মের নামে—আসলে ধর্মান্ধতার নামে।

সতীদাহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দরকার নেই। শুধু দুটি তথ্য উল্লেখ করবো। বাংলাদেশের কলকাতা, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ, পাটনা, বেরিলি এবং বারাণসীতে সতীদাহ’র হিসাব কিছুটা এমন— ১৮১৭ সালে ৭০৭জন, ১৮১৮ সালে ৮৯৩জন, ১৮১৯ সালে ৬৫০জন, ১৮২০ সালে ৫৯৭জন, ১৮২১সালে ৬৫৪জন, ১৮২২ সালে ৫৮৩জন, ১৮২৫ সালে ৬৩৯জন এবং ১৮২৬ সালে ৫১৮জন।

দ্বিতীয় বিষয় হলো তৎকালীন কলকাতা ডিভিশনের কোথায় কত সতীদাহ হয়েছিল। এই ক্ষেত্রে ১৮১৮১-১৯-এর হিসাব বলছে— বর্ধমানে ৭৫জন, কটক-পুরী-খুড়দা মিলিয়ে ৩৩জন, হুগলীতে ১১৫জন, যশোরে ১৬জন, জঙ্গলমহলে ৩১জন, মেদিনীপুরে ১৩জন, নদীয়ায় ৪৭জন, কলকাতা শহরতলী এলাকায় ৫২জন এবং ২৪পরগণায় ৩৯জন।

ভূগোল কিছু বলছে? হ্যাঁ, বিলক্ষণ বলছে।

১৮১৯-এর ২৭শে মার্চ ‘সমাচার দর্পন’ পত্রিকা বলছে,‘‘অধিক সহমরণ বাঙ্গালা দেশে হয়। পশ্চিম দেশে তাহার চতুর্থাংশও হয় না এবং বাঙ্গালার মধ্যে ও কলিকাতার কোর্ট আপীলের অধীন জিলাতে হয় আরো। হিন্দুস্থানে যত সহমরণ হয় তাহার সাত অংশের একাংশ কেবল জিলা হুগলিতে হয়।’’ ১৮১৭-তে শুধু হুগলীতে দুশোর বেশি সহমরণের ঘটনা ঘটেছিল। উল্লেখ্য, জমিদারী ব্যবস্থা সবচেয়ে প্রবল ছিল এই এলাকাগুলিতে।

সেই সতীদাহ বেআইনি ঘোষিত হয় ১৮২৯-এর ৪ঠা ডিসেম্বর। ভিমরুলের চাকে ঢিল পড়লো।

১৭ই জানুয়ারি, ১৮৩০। তৎকালীন সংস্কৃত কলেজে বাঙালি এবং অবাঙালি ধনী, অভিজাতরা একটি সভার আয়োজন করেন। সভার নামকরণও তাৎপর্যপূর্ণ—‘ধর্মসভা’। নেতৃত্বে ছিলেন রাধাকান্ত দেব, ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায়, আশুতোষ দে, গোপীমোহন দেব, রামগোপাল মল্লিক প্রমুখ ‘সমাজপতি’রা। তাঁরা দেদার টাকা তোলেন প্রিভি কাউন্সিলে সতীদাহ-রদ সংক্রান্ত আইনের বিরুদ্ধে আপীলের জন্য। ফেব্রুয়ারিতে তারা সিদ্ধান্ত করেন,‘‘যাঁহারা হিন্দুকুলোদ্ভব কিন্তু সতীর দ্বেষী তাঁহারদিগের সহিত কাহার আহার ব্যবহার থাকিবে না।’’ অর্থাৎ সীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে যাঁরা তাঁদের ‘সমাজচ্যূত’ করা হবে। কিন্তু ১১ই জুলাই, ১৮৩২— ‘ধর্মসভা’র আপীল খারিজ হয়ে যায় লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে। রামমোহন তখন লন্ডনে। তার কিছুদিন পর ১৮৩৩-এর ২৭শে সেপ্টেম্বর রামমোহন রায়ের মৃত্যু হয় ইংল্যান্ডেই।

পরের লড়াই বিধবা বিবাহ সংক্রান্ত। সহমরণ সমাজে ব্রাত্য হয়েছে। কিন্তু বিধবা বিবাহ রদ হলেও সমাজ আজও মহিলাদের এই অধিকার খোলা মনে মেনে নিতে পারেনি। এর সঙ্গেও যুক্ত আছে অর্থনৈতিক প্রশ্ন। আছে পুরুষতন্ত্র-সামন্ততন্ত্রের প্রবল প্রভাব। আর? এই লড়াই আসলে ধর্মের নামে গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ লড়াই—যা মূলত মহিলাদের লড়তে হচ্ছে আজও।

বিয়ে নাম সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিকতাকে কেন্দ্র করে বাংলার সমাজের লড়াই আসলে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ — গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এখনও মহিলাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আইনী সহায়তার প্রশ্ন।

কিন্তু লক্ষ্যনীয় হলো, সমাজ সংস্কারের এই আন্দোলনে মহিলাদের অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। কারণ, বাংলার মহিলারা তখনও মূলত স্বামীর নির্দেশে ঘর সামলানোর কাজ করছেন। অর্থনৈতিক প্রশ্নে তাঁরা তখনও যুক্ত হননি। এছাড়া আর একটি কারণ ছিল। তা হলো, সহমরণের ‘পবিত্র’ ধর্মাচরণ, ‘স্বামীর সঙ্গে স্বর্গলাভ’-এর ধারণা তাঁদের সিংহভাগকে গ্রাস করেছিল।

মহিলাদের কর্মসংস্থানের প্রশ্ন তখন অনেক দূরে। নারী-শিক্ষার ক্ষেত্রেই মারাত্মক ভাবে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইংরেজি শিক্ষার ‘আলোক প্রাপ্ত হিন্দু সমাজ।’ বাংলার মুসলমান সমাজ তখন আরও দূরে।


প্রকাশ: ২৭-আগস্ট-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image


অন্যান্য মতামত:

যদি পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়, বানানের দিকে বিশেষ নজর দিতে অনুরোধ করছি।
- samar chakraborty, ২৮-আগস্ট-২০২৫



শেষ এডিট:: 27-Aug-25 08:06 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/sangh-womens-struggle-2
Categories: Fact & Figures
Tags: democracy, democraticright, republic, secularism, violence against women, crimeagainstwomen
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড