রাজা রামমোহন রায় – সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সৈনিক
‘সম্বাদ কৌমুদী’-কে হাতিয়ার করে তিনি শিক্ষার আধুনিকীকরণ, নারীশিক্ষার প্রসার, সতীদাহ রদ, কৌলিন্য প্রথা ও বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে লাগলেন। চতুর্দিক থেকে শত কুৎসা ধেয়ে এল। কিন্তু রামমোহন অবিচল।

সালটা ১৭৬৮। বক্সারের বিজয়ের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর বছর তিনেক অতিক্রান্ত। কলকাতা কাউন্সিল হাউজের দরজায় হঠাৎ দেখা গেল একটি বিজ্ঞাপন। সরকারি আধিকারিক উইলিয়াম বোল্ট সেই বিজ্ঞাপনে লিখেছেন সরকারি কাজকর্মের জন্য একটা মুদ্রণযন্ত্র প্রয়োজন। কলকাতায় আপাতত এমন কোনো যন্ত্র নেই। কোনো ব্যক্তি যদি একটি মুদ্রণযন্ত্রের ব্যবস্থা করে ছাপাখানা চালাতে রাজি থাকেন, সরকার তার সকল ব্যবস্থা করবে। বিজ্ঞাপনটি আকারে ছোট হলেও তার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মার্কস ভারতে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত মূল্যায়নে লিখেছিলেন এই শাসন বর্বর ও ক্ষতিকারক হলেও এমন কিছু প্রযুক্তিগত উন্নতি ঔপনিবেশিক কাঠামোর স্বার্থেই ভারতে ব্রিটিশরা নিয়ে আসছে যা পরবর্তীকালে ভারতীয়দের উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামে কাজে লাগবে। মার্কস এর মধ্যে প্রথমেই নাম করেছিলেন রেল ব্যবস্থার। মুদ্রণযন্ত্রকেও তার পাশেই রাখা যেতে পারে। ব্রিটিশ শাসকরা কিন্তু মুদ্রণযন্ত্রের এই বিস্ফোরক ক্ষমতা সম্পর্কে অচেতন ছিল না। সূচনালগ্ন থেকেই এই প্রযুক্তির উপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েমে তারা সচেষ্ট হয়। হায়দ্রাবাদের নিজামের কাছে একটি মুদ্রণযন্ত্র আছে এই খবর কলকাতায় রীতিমত আশঙ্কার জন্ম দিয়েছিল। নিজাম আদৌ মুদ্রণযন্ত্র নিয়ে বিশেষ উৎসাহী নন এবং সেটা এক কোনে পড়েই আছে এই খবর না আসা পর্যন্ত কোম্পানির উপর মহল যথেষ্টই উদ্বেগে ছিল।
বলাই বাহুল্য, এইরকম পরিস্থিতিতে কলকাতায় ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রণযন্ত্রের আবির্ভাব হলে তা মূলতঃ শাসকপন্থী বক্তব্য, মত বা আদর্শের বাহক হবে, এমনই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু কোম্পানির এই আশা পূরণ হয়নি। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় জেমস অগাস্টাস হিকির বিখ্যাত ‘বেঙ্গল গেজেট’। শুরু থেকেই এই পত্রিকা নিশানা করে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ও তাঁর আমলাতন্ত্রকে। হেস্টিংস প্রথম রাতেই বেড়াল মারতে আগ্রহী ছিলেন। তিনি ডাক মারফৎ ‘বেঙ্গল গেজেট’ বিলি করার উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেন। ‘ইন্ডিয়া গেজেট’ নামে একটি সরকারপন্থী কাগজ খাড়া করা হয় (এখনকার সময় বহুল প্রচলিত ‘গোদি মিডিয়া’ কথাটি ব্যবহার করা যেতে পারে)। এই কাগজ বিনা শুল্কে ডাক বিভাগ বিলি করতে শুরু করে। হিকি দমে তো গেলেনই না, বরং তাঁর সমালোচনার ধার বাড়িয়ে দিলেন। রাষ্ট্রশক্তি আরও কোঠর হল। হিকির জেল হলো, জরিমানার টাকা না দিতে পারায় তার ছাপাখানার সমস্ত জিনিস বাজেয়াপ্ত হল। ১৭৮২ সালের মার্চ মাস ছিল সেটা। আধুনিক ভারতে প্রথম সংবাদপত্রের কন্ঠরোধ হল। হিকি বনাম হেস্টিংস দ্বৈরথ ভবিষ্যৎ শাসক ও সৎ সাংবাদিক – উভয়ের জন্যই উদাহরণ হয়ে থাকল। শাসকদের জন্য হেস্টিংসের কূটকৌশল আর সাংবাদিকদের জন্য হিকির নিষ্ঠা ও সাহস।
হিকির গেজেটের কন্ঠরোধ অবশ্য সংবাদপত্রের জয়যাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। ‘ইন্ডিয়া গেজেট’ থেকে ‘ক্যালকাটা ক্রনিকল’-এর মতো নানা কাগজ প্রকাশিত হতে থাকল। কিন্তু হিকি বনাম হেস্টিংস সংঘাতের যে ধাঁচ সাংবাদিকতার জন্মলগ্নে সৃষ্টি হয়েছিল, তা রয়েই গেল। এর পুনরাবৃত্তি হল গভর্নর জেনারেল স্যার জন শোর বনাম ‘বেঙ্গল জার্নাল’ ও ‘ওয়াল্ড’-এর সম্পাদক উইলিয়াম ডুয়ানির বিবাদে। ডুয়ানিকে প্রথমে বন্দি ও পরে নির্বাসন দেওয়া হয়। বাজেয়াপ্ত করা হয় তাঁর লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ছাপাখানা। কেন, এই উত্তর দেওয়ারও সরকার প্রয়োজন বোধ করেনি। লর্ড ওয়েলেসলি ১৭৯৯ সালের ১৩-ই মে ‘রেগুলেশন ফর দ্য পাবলিক প্রেস’ প্রণয়ন করে সংবাদপত্রের উপর নিয়ন্ত্রণকে একটি প্রশাসনিক কাঠামো দিলেন। ফতোয়া দেওয়া হল সমস্ত সংবাদপত্রকে প্রকাশিতব্য খবর চিফ সেক্রেটারির কাছে পাঠাতে হবে। তিনি অনুমতি দিলে তবেই সেই খবর প্রকাশ করা হবে। এছাড়া সরকারি নমিনেশন ছাড়া কেউ সংবাদপত্র প্রকাশ করতে পারবে না। এর অন্যথা হলে কাগজ বাতিল হয়ে যাবে। ১৮১৩ সালে ওয়েলেসলির আমলে এই আইনকে সামনে রেখেই সরকারি সেন্সরের ক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়। বলা হয় সাধারণ প্রতিবেদন তো বটেই এমনকি সাপ্লিমেন্ট, কাগজে প্রকাশিত নোটিস বা তার সঙ্গে বিলি করা হ্যান্ডবিলের প্রুফ কপিও সরকারের কাছে আগে পাঠাতে হবে। আর্ল অফ ময়রা গভর্নর জেনারেল পদে আসীন হলে এই কড়কড়ি কিছুটা কমে। তিনি ছিলেন ব্যক্তিগত বিশ্বাসে উদারপন্থী। তাই পূর্বসূরিদের আরোপিত নিয়ন্ত্রণগুলি প্রত্যাহার করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। লাইসেন্স নেওয়া আর সম্পাদক ও মুদ্রকের নাম প্রকাশ – এই দুই শর্তই কেবল পড়ে থাকে।
আর্ল অফ ময়রার উদারপন্থী নীতির কারণে এই সময় বহু সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয়। শ্রীরামপুরের মিশনারীরা দীর্ঘকাল সরকারের বিষ নজরে পড়ার ভয় থেকে সংবাদপত্র প্রকাশের কাজে অগ্রসর হচ্ছিলেন না। তাঁরা এই সময় প্রথমে সন্তর্পণে সাময়িকপত্র ‘দিগ্দর্শন’, তারপর প্রশাসনিক দমনপীড়নের অনুপস্থিতিতে কিছুটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে সংবাদপত্র ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশ করেন। বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান আছে, এমন ব্যক্তিমাত্রই জানেন এই দুই পত্রিকা ও সংবাদপত্রের গুরুত্ব কী ছিল। ঠিক এই সময়েই প্রকাশিত হয় হরচন্দ্র রায় ও গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের ‘বেঙ্গল গেজেটি’। এর সূত্র ধরেই সংবাদপত্রের জগতে পদার্পণ করেন রাজা রামমোহন রায়।
রামমোহন রংপুরে ডিগবীর অধীনে কর্মরত থাকা অবস্থাতেই নিয়মিত একাধিক খবরের কাগজের একনিষ্ঠ পাঠক ছিলেন। কলকাতায় চলে আসার পর তাঁর সেই অভ্যাসের বদল হয়নি। তিনি সমাজ সংস্কারের যে ব্রত নিয়েছিলেন, তার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য সংবাদপত্র যে অপরিহার্য তা তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন। ‘বেঙ্গল গেজেটি’-তেই প্রথম ‘সহমরণ বিষয়ে প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ’ প্রকাশিত হয়। ‘সমাচার দর্পণ’-এর সঙ্গে যুক্ত ক্লার্ক মার্শম্যানের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ছিল। শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের সঙ্গে আসলে ডিগবীর অধীনে কাজ করার সময় থেকেই রামমোহনের পরিচয়। কিন্তু এই সুসম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হল না। ১৮২১ সালে রামমোহন রচনা করেন ‘প্রিসেপ্ট অফ জিসাস’, যেখানে সকল অলৌকিক ঘটনা বর্জন করে খ্রিস্টের নৈতিক গুণসম্পন্ন মানবিক চিত্র আঁকেন তিনি। স্বাভাবিক ভাবেই মিশনারীরা এতে ক্ষুব্ধ হন। ‘সমাচার দর্পণ’ ও ‘ফ্রেন্ডস্ অফ ইন্ডিয়া’-তে বিবিধ হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের সমালোচনা প্রকাশিত হয়। রামমোহন সেই সমালোচনার জবাব লিখে পাঠান। তিনি হিন্দু ধর্মের কু-আচারের পক্ষে কলম ধরতে আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু শাস্ত্র সমূহের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা এবং উন্নত দার্শনিক ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার প্রচেষ্টারও বিরোধী ছিলেন। তাঁর ভারসাম্যপূর্ণ ও যুক্তিবাদী উত্তর কিন্তু প্রকাশিত হল না। বিক্ষুব্ধ রামমোহন ১৮২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশ করলেন ‘ব্রাহ্মনিকাল ম্যাগাজিন’ যা বাংলায় ‘ব্রাহ্মণ সেবধি’ নামে প্রকাশিত হত। অবশ্য পূর্বোক্ত বিতর্কে উত্তর প্রদানই ছিল ‘ব্রাহ্মণ সেবধি’-র উদ্দেশ্য। উত্তর দেওয়া হয়ে গেলে রামমোহন তা বন্ধ করে দেন। তিনি নিয়মিত এরপর প্রকাশ করতে শুরু করেন ‘সম্বাদ কৌমুদী’। এর সঙ্গে প্রথমে ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায় ও তারাচাঁদ দত্ত যুক্ত ছিলেন। কিন্তু রামমোহনের প্রখর প্রগতিশীল অভিমুখ ভবানীচরণ সহ্য করতে পারেননি। তিনি মতে ছিলেন প্রাচীনপন্থী। ‘সম্বাদ কৌমুদী’ ত্যাগ করে তিনি হিন্দু রক্ষণশীলদের কাগজ ‘সমাচার চন্দ্রিকা’-র মধ্যমণি হয়ে বসলেন। রামমোহন কিন্তু তাঁর আদর্শিক লড়াই থামালেন না। ‘সম্বাদ কৌমুদী’-কে হাতিয়ার করে তিনি শিক্ষার আধুনিকীকরণ, নারীশিক্ষার প্রসার, সতীদাহ রদ, কৌলিন্য প্রথা ও বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে লাগলেন। চতুর্দিক থেকে শত কুৎসা ধেয়ে এল। কিন্তু রামমোহন অবিচল। ১৩ বছর ‘সম্বাদ কৌমুদী বাংলার নবজাগরণের প্রগতিশীলতার আদর্শের বর্শাফলক হিসেবে তার ভূমিকা পালন করে। ‘সম্বাদ কৌমুদী’-র পাশাপাশি রামমোহন ১৮২২ সালে প্রকাশ করা শুরু করেন ফার্সি সংবাদপত্র ‘মিরাৎ-উল-আখবার’। মিরাৎ-এর সম্পাদকীয় রামমোহন নিজে লিখতেন। এই কাগজে প্রকাশিত বিষয় বস্তুর বৈচিত্র্য দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। রামমোহন রায়ের প্রখর আন্তর্জাতিকতাবোধের প্রমাণও এই সংবাদপত্র বহন করে। গ্রিস, চিন, রাশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা, ফ্রান্স – পৃথিবীর প্রত্যেক প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ খবর এই কাগজে থাকত। আর প্রতিবেদন যে প্রান্তেরই ঘটনাকে ঘিরে হোক, সম্পাদকের টিপন্নি সবসময় থাকত শোষিতের পক্ষে শোষকের বিরুদ্ধে। আয়ারল্যান্ডের দুঃখে রামমোহন কাতর হতেন (মিরাৎ-এর মাধ্যমে আইরিশ দুর্ভিক্ষের জন্য চাঁদা তুলে সাহায্য পাঠানোরও ব্যবস্থা করে),ল্যাটিন আমেরিকার বিপ্লবের সাফল্যে উৎফুল্ল। রামমোহন এই ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার তথাকথিত নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি সব সময় পক্ষ নিতেন। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করায় সংবাদপত্রের ভূমিকা ও সাংবাদিকের দায় কী তা যদি হিকি দেখিয়ে থাকেন, সমাজ পরিবর্তনে সংবাদপত্রের ভূমিকা ও সাংবাদিকের দায় কী তা দেখিয়েছিলেন রামমোহন।
স্মরণে রাখতে হবে, রাজা রামমোহন রায়ের এই সাংবাদিকতার সূচনার বছরগুলিতে গভর্নর জেনারেল ছিলেন উদারপন্থী আর্ল অফ ময়রা। তাই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরিমন্ডলেই প্রাথমিক ভাবে রামমোহন সম্পাদকের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। কিন্তু এই অনুকূল পরিবেশ চিরস্থায়ী হল না। আর্ল অফ ময়রার বিদেশে প্রত্যাবর্তনের পর গভর্নর জেনারেল জন অ্যাডাম পূর্বতন সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন ফিরিয়ে আনেন। রামমোহনের ঘনিষ্ঠ সুহৃদ জেমস সিল্ক বাকিংহাম-এর ‘দ্য ক্যালকাটা জার্নাল’-এর বিরুদ্ধে কোঠর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোম্পানির নানা অপকীর্তি জনসমক্ষে আনার জন্য বাকিংহাম দীর্ঘদিন আমলাদের চক্ষুশূল ছিলেন। ময়রার প্রস্থানের সুযোগ নিয়ে তারা প্রতিশোধ নিল। বাকিংহামের কাগজ তো বন্ধ করে দেওয়া হলই, তাঁকে দুই মাসের মধ্যে ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়। রামমোহনের কাছে বাকিংহামের নির্বাসন শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি ছিল না। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে তিনি সংবাদপত্রের কন্ঠরোধের এক নয় অভিসন্ধির পদধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন। তিনি মনস্থির করেন এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫-ই মার্চ সুপ্রিম কোর্টে নতুন আইন পেশ করা হলে তার দুই দিনের মধ্যে রামমোহন এটি বাতিল করার জন্য আবেদন করেন। সুপ্রিম কোর্টে আবেদন গ্রাহ্য না হলে তিনি ইংল্যান্ডে সরাসরি রাজার কাছে আরেকটি ৫৫ অনুচ্ছেদমালা সম্বলিত আবেদন প্রেরণ করেন। তাঁর আবেদনের মূল বক্তব্য ছিল একটি দেশে শাসিতদের কন্ঠ যদি রোধ করা হয়, তাহলে শাসক জানতে পারে না তাদের মূল দাবি-দাওয়া ও চাহিদা কী। সরকার বিদ্রোহ ও বিক্ষোভের আশঙ্কায় সংবাদপত্রের মুখে লাগাম পরাতে চাইছে। কিন্তু মুক্ত ও নির্ভীক সাংবাদিকতা ব্যতীত জনগণের মূল সমস্যাগুলি সরকারের কাছে কখনই পৌঁছবে না আর সরকার তার সমাধানও করতে পারবে না। এমন পরিস্থিতি থেকেই বরং বিদ্রোহের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা অধিক। স্বৈরতান্ত্রিক সরকারই একমাত্র মুক্ত সংবাদমাধ্যমকে ভয় করে। এছাড়াও সম্পাদকের আদালতে হলফ করার শর্ত বিরুদ্ধেও তিনি সরব হন। এটি সাংবাদিকতার মূল নীতি ও মর্যাদার বিরোধী বলে মত দেন। এই শর্তটি যেন অন্ততঃ বাতিল করা হয়, তার পক্ষে তিনি জোরালো সওয়াল করেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। ১৮২৩ সালের আইনটি কোনো সংশোধন বা ছাড় ব্যতীতই বহাল হল। রামমোহন প্রতিবাদে ১৮২৩ সালের ৪-ঠা এপ্রিল বন্ধ করে দিলেন ‘মিরাৎ-উল-আখবার’।
রামমোহন তাঁর জীবদ্দশায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু এই লড়াই ছিল তাঁর হৃদয়ের খুব কাছের। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত নির্মাণে দেশে ও বিদেশে তিনি অনেক সময় ও শক্তি ব্যয় করেছেন। এই কারণেই ১৮৩৮ সালে যখন স্যার চার্লস মেটকাফ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণকারী আইন বাতিল করেন তখন কলকাতায় তাঁকে সংবর্ধনা জানিয়ে অনুষ্ঠিত ভোজসভায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় রামমোহনের সংগ্রামের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার লড়াই নিছক ইতিহাসের কাহিনি নয়। আজকের ভারতেও তা প্রাসঙ্গিক। শাসক ভেদে কখনও এই স্বাধীনতায় জোয়ার এসেছে, কখনও বা ভাটার টান। কিন্তু লড়াই সব সময়ই চলেছে। কখনও ঢিমে তালে, কখনও তীব্র ভাবে। কখনও পরোক্ষে, কখনও সামনাসামনি। বর্তমানে ভারতবর্ষের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার যে শোচনীয় অবস্থা, তা আলাদা ভাবে বলার প্রয়োজন নেই। হেস্টিংস ও অ্যাডামের উত্তরসূরীরা সরকারপন্থী ‘ইন্ডিয়া গেজেট’-এ দিস্তা দিস্তা ছাপিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে সর্বত্র। হিকি, ডূয়ানি আর বাকিংহামদের অহরহ কাগজ কেড়ে নিয়ে পাঠানো হচ্ছে নির্বাসনে। এরই মধ্যে রামমোহনের স্মৃতি আহ্বান জানাচ্ছে সংগ্রামের। এই নিবন্ধ শেষ করা যেতে পারে ‘মিরাৎ-উল-আখবার’-এর শেষ সংখ্যায় প্রকাশিত রামমোহনের উদ্ধৃত একটি ফার্সি বয়াৎ দিয়ে –
রামমোহন এই বয়াৎটি ব্যবহার করেছিলেন প্রত্যহ কোন প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে তার খসড়া নিয়ে অথবা পত্রিকা প্রকাশের অনুমতির জন্য সচিবের দরজায় চৌকিদার বা দারোয়ানের কাছে অনুনয় বিনয়ের যে অসম্মান তা বোঝাতে। বর্তমানে অন্য আরেকটি অর্থেও পাঠ করা যেতে পারে। সংবাদপত্রের তথা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য যে সিংহের মত সাহস ও আত্মমর্যাদা নিয়ে রাজা রামমোহন রায় লড়েছিলেন, তাঁর জন্মদিনে কণামাত্র হলেও অনুকরণ করার অঙ্গীকার থাক।
প্রকাশ: ২২-মে-২০২৬
শেষ এডিট:: 22-May-26 08:18 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/raja-rammohan-roy---torchbearer-of-journalists-and-press-rights
Categories: Fact & Figures
Tags: historyofindia, pressfreedom, rammohanroy
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (157)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (142)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (79)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)




