জনপ্রিয় সিনেমায় জাতপাত, সংরক্ষণ ও সমতা

Author
শৌনক সরকার

সংরক্ষণ কোনও দয়া নয়, কোনও অনুগ্রহ নয়। এটি ঐতিহাসিক অবিচারের প্রতিকার। নিম্নবর্ণের মানুষরা হাজার হাজার বছর ধরে শিক্ষা ও সামাজিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের শ্রম শোষণ করা হয়েছে, অথচ তারা কোনও মর্যাদা পায়নি।

Popular Cinema & Social Questions

ভারতীয় সমাজব্যবস্থার অন্যতম গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকট হল জাতপাত। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে যায়। কে কোন পরিবারে জন্ম নেবে, কোন জাতের অন্তর্গত হবে, ইত্যাদি প্রশ্নই নির্ধারণ করে তার জীবনের সুযোগ, অধিকার ও মর্যাদা। এভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমাজে চলেছে বিভাজন, বঞ্চনা এবং নিপীড়ন। স্বাধীনতার এত বছর পরও জাতপাত আজও বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এ প্রসঙ্গে বলতেই হয় সাম্প্রতিক হিন্দি সিনেমা শাজিয়া ইকবাল পরিচালিত ‘ধড়ক ২’-এর কথা, যেখানে প্রেম ও মানবিক সম্পর্কের কাহিনির আড়ালে উঠে এসেছে জাতপাতের অমানবিক চেহারা।

এই ছবির গল্পে দুই তরুণ-তরুণী,নীলেশ আহিরওয়ার (অভিনয়ে সিদ্ধান্ত চতুর্বেদী) এবং বিধি ভরদ্বাজ (অভিনয়ে তৃপ্তি ডিমরি) একে অপরকে ভালোবাসে। তাদের সম্পর্ককে যদি সাধারণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, তবে সেটি সুন্দর, স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য। কিন্তু সমাজের চোখে এই সম্পর্ক অপরাধ, কারণ তারা আলাদা জাতের। আজও ভারতে জাতিগত ভেদাভেদ মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে হত্যা করছে। প্রেমের সম্পর্ককে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, এমনকি বহুক্ষেত্রে হত্যা পর্যন্ত ঘটছে, শুধুমাত্র জাতের দোহাই দিয়ে। ‘ধড়ক ২’ সেই নির্মম বাস্তবতাকে দর্শকদের চোখের সামনে তুলে ধরে।

ভারতের সংবিধান স্বাধীনতার পর সকল নাগরিককে সমান অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই সমতা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। গ্রাম হোক বা শহর, জাতপাত আজও দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রভাব বিস্তার করছে। কাজের সুযোগ, শিক্ষা, এমনকি প্রেম-ভালোবাসা সবেতেই  জাতের শিকল শক্ত করে বাঁধা। এ সিনেমা সেই শৃঙ্খলকে চ্যালেঞ্জ করে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সংরক্ষণের প্রসঙ্গ। বহু মানুষই সংরক্ষণ নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। তারা বলে ‘এটি নাকি মেধার বিরুদ্ধে অন্যায়।’ কিন্তু সত্যিই কি সংরক্ষণ অন্যায়?

না, সংরক্ষণ কোনও দয়া নয়, কোনও অনুগ্রহ নয়। এটি ঐতিহাসিক অবিচারের প্রতিকার। নিম্নবর্ণের মানুষরা হাজার হাজার বছর ধরে শিক্ষা ও সামাজিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের শ্রম শোষণ করা হয়েছে, অথচ তারা কোনও মর্যাদা পায়নি। সংরক্ষণ সেই বঞ্চনার বিরুদ্ধে একটি সুরক্ষা কবচ, যা অন্তত কিছুটা হলেও সুযোগের ভারসাম্য ফিরিয়ে দেয়।

ধড়ক ২ দেখায় যখন নিম্নবর্ণের তরুণ-তরুণীরা নিজেদের শিক্ষার মাধ্যমে বা পরিশ্রমের মাধ্যমে সমাজে উঠে আসতে চায়, তখনই জন্ম নেয় উচ্চবর্ণ সমাজের মধ্যে ক্ষোভ ও হিংসা। তারা তাদের আধিপত্য হারানোর ভয় পায়। এই ভয় থেকেই জন্ম নেয় জাতপাতভিত্তিক হিংসা, যা শেষপর্যন্ত প্রেমিক-প্রেমিকার জীবনে মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনে।

এই সিনেমা আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়, গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাক কতটা গভীর। সংবিধান কাগজে কলমে বলছে সমতা, কিন্তু বাস্তবে বৈষম্যই নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষের জীবন। ধড়ক ২ সেই দ্বন্দ্বকেই সামনে আনে। দর্শক বাধ্য হয় ভাবতে যে ভারতীয় সমাজে সত্যিই কি সমানাধিকারের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে? নাকি জাতপাত এখনও আমাদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করছে?

প্রেমকে হত্যা করা, সম্পর্ককে ধ্বংস করা, তরুণ প্রজন্মকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া, এই সব কিছুই জাতপাত নামক অভিশাপের ফল। আজ আলোচনার প্রসঙ্গ সেই অভিশাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। ছবিটি দর্শকদের সামনে কেবল প্রেমের গল্প নয়, বরং এক বৃহত্তর প্রশ্ন তুলে ধরে: জাতপাতের অবসান ছাড়া কি কখনও প্রকৃত গণতন্ত্র গড়ে উঠতে পারে?

এভাবেই সিনেমার কাহিনি একটি সাধারণ প্রেমকাহিনির সীমা অতিক্রম করে। এটি আসলে ভারতের সামাজিক কাঠামো ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি নগ্ন প্রতিচ্ছবি। জাতপাত কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্ককে হত্যা করে না, এটি গোটা সমাজকে বিভক্ত করে দেয়। জাতের নামে মানুষকে ছোট-বড় করে দেখা হয়, কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, কারও সম্ভাবনা দমন করা হয়। এই অবস্থায় গণতন্ত্র কেবল আড়ম্বরপূর্ণ শব্দ হয়ে দাঁড়ায়।

ভারতের সংবিধান যে তিনটি মূলনীতি ঘোষণা করেছে—স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব—জাতপাত তার প্রতিটি স্তম্ভকে ভেঙে দিতে চায়। স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ মুক্তভাবে নিজের জীবন যাপন করতে পারে। কিন্তু জাতপাতের কারণে আজও অসংখ্য তরুণ-তরুণী নিজেদের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে পারে না। সমতা তখনই বাস্তব হয়, যখন প্রত্যেক নাগরিক সমান সুযোগ পায়। কিন্তু জাতপাত সুযোগকে নির্ধারণ করে দেয় জন্মের ভিত্তিতে। ভ্রাতৃত্ব তখনই সত্যি হয়, যখন সমাজে সকলকে সমানভাবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু জাতপাত মানুষের মধ্যে ঘৃণা ও বিভেদ তৈরি করে।

এখানেই সংরক্ষণের গুরুত্ব আবারও সামনে আসে। অনেকেই বলে থাকেন, সংরক্ষণ থাকলে নাকি মেধাবীরা বঞ্চিত হয়। কিন্তু তারা ভুলে যায় যে মেধা জন্মগত নয়, মেধা বিকশিত হয় সুযোগ পেলে। নিম্নবর্ণের মানুষদের থেকে সেই সুযোগ বহু যুগ ধরে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সংরক্ষণ অন্তত সেই সুযোগ ফিরিয়ে দেয়। এটি কোনও ‘অন্যায় সুবিধা’ নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচারের অপরিহার্য হাতিয়ার।

এ ফিল্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জাতপাতের বিরুদ্ধে লড়াই শুধুমাত্র আইনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। আইনের প্রয়োজন অবশ্যই আছে, কিন্তু সমাজের গভীরে গেঁথে থাকা এই কুসংস্কার ভাঙতে হলে দরকার রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক সংগঠন এবং শ্রেণিভিত্তিক ঐক্য। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক সবাইকে একত্রিত হয়ে এই অভিশাপের বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তুলতে হবে।

বামপন্থীরা বরাবরই স্পষ্টভাবে বলেছে, জাতপাত সমাজতন্ত্রের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ জাতপাত শ্রমিকশ্রেণিকে ভেঙে দেয়। একজন শ্রমিক যদি আরেক শ্রমিককে তার জাতের কারণে ঘৃণা করে, তবে শোষকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম সম্ভব নয়। তাই জাতপাত ভাঙা মানেই প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ গড়া, সমাজতন্ত্রের পথে এগোনো।

আজকের ভারতে দেখা যাচ্ছে, প্রেমের নামে, বিয়ের নামে, জাতের নামে মানুষ খুন হচ্ছে। গণমাধ্যমে এটিকে প্রায়ই ‘অপরাধ’ বলে দেখানো হয়, কিন্তু এর গভীরে রয়েছে সামাজিক শ্রেণি আধিপত্য ও জাতপাতের শৃঙ্খল। ধড়ক ২ সেই নির্মম সত্যকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। এটি আমাদের সতর্ক করে দেয়—যদি আমরা প্রতিরোধ না করি, তবে সমানাধিকারের স্বপ্ন কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।

এই সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, এটি এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা। এটি বলছে—প্রেম, মানবতা ও সমতা একই সূত্রে বাঁধা। এগুলিকে রক্ষা করতে হলে সংগ্রাম ছাড়া উপায় নেই। আর সেই সংগ্রাম ব্যক্তিগত নয়, রাজনৈতিক।

‘ধড়ক ২’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—সমাজ যদি জাতপাতের অভিশাপ থেকে মুক্ত না হয়, তবে গণতন্ত্র শুধু কাগজে লেখা থাকবে, বাস্তবে নয়। তাই আজ প্রয়োজন জাতপাতবিরোধী আন্দোলনকে আরও জোরদার করা, সংরক্ষণ নীতিকে আরও শক্তিশালী করা এবং বামপন্থী সংগ্রামের পথ ধরে সমতার সমাজ গড়ে তোলা।


প্রকাশ: ০৬-সেপ্টেম্বর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 05-Sep-25 23:06 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/popular-cinema-social-questions
Categories: Current Affairs
Tags: constitutionofindia, democraticright, humanity, humanrights, racism, scientificsocialism
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড