সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মন্দা বলে কিছু নেই, কীভাবে?

Author
প্রভাত পট্টনায়ক

অতি উৎপাদনের অবস্থা তখন সৃষ্টি হয় যখন উপলব্ধ মূলধনের সম্পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করে সর্বোচ্চ উৎপাদন ঐ সময়ের চাহিদার চেয়ে বেশি হয়। সেই উৎপাদনের ফলে অপ্রয়োজনীয় স্টক জমা হয় এবং উৎপাদন কমানো হয় যতক্ষণ না অনুযায়ী মাত্রার উৎপাদন হয় যা চাহিদার সাথে মিলে যায়।

How Does Socialism Avoid Depressions?

উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামের সময়, ভারতে অনেকেই সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন কারণ পুঁজিবাদী বিশ্ব যখন অর্থনৈতিক মহামন্দা ও ব্যাপক বেকারীত্বের শিকার হয়, তখন ঐ রোগ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন’কে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত বলে মনে হয়েছিল। কমরেড ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ ছিলেন এমনই একজন, এ সম্পর্কে তাঁর লেখাও রয়েছে। তারা বুঝেছিলেন সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির মধ্যে এমন কিছু অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা পুঁজিবাদ থেকে ভিন্নভাবে অতি-উৎপাদনের যে সাধারণ পরিস্থিতি তাকে এড়িয়ে চলতে সাহায্য করে। প্রশ্ন হলো, এই পার্থক্য কোথায় নিহিত থাকে?

অতি উৎপাদনের অবস্থা তখন সৃষ্টি হয় যখন উপলব্ধ মূলধনের সম্পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করে সর্বোচ্চ উৎপাদন ঐ সময়ের চাহিদার চেয়ে বেশি হয়। সেই উৎপাদনের ফলে অপ্রয়োজনীয় স্টক জমা হয় এবং উৎপাদন কমানো হয় যতক্ষণ না অনুযায়ী মাত্রার উৎপাদন হয় যা চাহিদার সাথে মিলে যায়।

বুর্জোয়া অর্থনীতিতে মনে করা হয় যে, যদি মজুরি এবং মূল্য নমনীয় হয় তবে অতিপ্রোডাকশনের সমস্যা দূর করা যায়। ধরুন অতি উৎপাদনের কারণে উৎপাদন কমেছে, তখন মজুরি এবং মূল্য হ্রাস পাবে, যা মানুষের হাতে থাকা নগদের প্রকৃত মূল্য বাড়িয়ে দেবে, ফলে তারা বেশি খরচ করবে এবং চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে পূর্ণক্ষমতার উৎপাদন পুনরায় শুরু হবে। তাই, যদি উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান কম থাকে, তাহলে এর কারণ হলো মজুরি ও মূল্য নমনীয় নয়, অর্থাৎ বাজার সঠিকভাবে কাজ করছে না। এর পেছনে রয়েছে ট্রেড ইউনিয়নের অস্তিত্ব। তারা একটি নির্দিষ্ট মজুরি বজায় রাখে এবং সেটি কমতে দেয় না। মজুরির এহেন স্থিতিস্থাপকতাই অতি উৎপাদন ও ব্যাপক বেকারতার কারণ; এ জন্যই ট্রেড ইউনিয়ন ভেঙে বাজারকে সঠিকভাবে কাজ করতে দিতে হবে। মার্গারেট থ্যাচার সহ অন্য অনেকেরই অর্থনীতি সম্পর্কে এমনই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।

তবে বুর্জোয়া অর্থনীতির ঐ যুক্তি কার্যত সম্পূর্ণ এক প্রবঞ্চনা। যদি মজুরি ও মূল্য কমিয়ে অতি-উৎপাদন মোকাবিলা করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ার বদলে একপ্রকার ধস দেখা দেবে। কোম্পানিগুলোর ঋণশোধ করার দায় বহন করার ক্ষমতা কমে যাবে, ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হবে। ফলে মজুরি ও মূল্য কমানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বেড়ে না গিয়ে কমবে।

অন্যদিকে, যদি দাম কমে যায় কিন্তু মজুরি অপরিবর্তিত থাকে, তখন প্রকৃত মজুরি বাড়বে এবং চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু লাভের হার পড়ে যাবে। এতে কিছু কোম্পানি লোকসানে পড়ে যাবে এবং বাজার থেকে বেরিয়ে যাবে, তাই উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পূর্ণক্ষমতার নিচে থাকবে। এর মানে, পুঁজিবাদে বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে অতি-উৎপাদন মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে উৎপাদনের মাধ্যমগুলি সামাজিক মালিকানাধীন, অর্থাৎ রাষ্ট্রের। সব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা রাষ্ট্রের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত, তাই কোনও এক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বা ক্ষতি রাষ্ট্রের জন্য বড় সমস্যা নয়; গুরুত্বপূর্ণ হল মোট মিলিয়ে মুনাফা ইতিবাচক থাকা। আর্থিক ক্ষতিতে চলা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয় না। রাষ্ট্র আদেশ দিতে পারে, মজুরি অপরিবর্তিত রেখে, সব প্রতিষ্ঠান পূর্ণক্ষমতা ব্যবহার করে উৎপাদন করবে এবং বাজার পরিষ্কার করবে (সব পণ্য বিক্রি হয়ে যাবে) এমন একটি দামে পণ্যের মূল্যকে ধরে রাখবে। এমন মূল্যে কিছু প্রতিষ্ঠান মুনাফাবান হবে আর কিছু লোকসানে থাকবে, রাষ্ট্র, মুনাফাবান প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করবে। ফলে উৎপাদন সর্বদা পূর্ণক্ষমতায় থাকবে এবং মুনাফাবান প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা সবসময় লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতির চেয়ে বেশি থাকবে, ফলে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

এই শেষ দাবীটির কারণ, যতক্ষণ ইতিবাচক বিনিয়োগ থাকে অর্থনীতিতে ইতিবাচক সঞ্চয় থাকতেই হবে (আমরা বিদেশী বিনিয়োগ ধরছি না)। সহজ কথায় ধরে নেওয়া যায় যে সব মজুরীই ব্যয় করা হয়, সঞ্চয় হয় মুনাফাজনক প্রতিষ্ঠানগুলির মুনাফা থেকে (পুরানো সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাস্তবতার সঙ্গে এমনটি ঘটা সাযুজ্যপূর্ণও বটে)। অর্থনীতিতে ইতিবাচক বিনিয়োগের মানে ইতিবাচক সঞ্চয়, এরই ফল ইতিবাচক মুনাফা। এমনটা ততক্ষণই সম্ভব, যতক্ষণ অবধি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ইতিবাচক বিনিয়োগ করে। সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক মুনাফা থাকবেই; অর্থাৎ, যে প্রতিষ্ঠানগুলি মুনাফা করছে তাদের লাভের পরিমাণ, যে প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসান করছে তার ক্ষতির পরিমান-কে ছাড়িয়ে যাবে। তাই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সবসময়ই সব প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে বলতে পারে এবং বাজেট থেকে লোকসানে চলা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ক্রস-ভর্তুকির নিয়মে সহায়তা দিতে সক্ষম হয়।

সহজভাবে বোঝার জন্য ধরে নেওয়া যাক যে সমস্ত মজুরি খরচ করা হয় এবং সমস্ত সঞ্চয় আসে লাভে চলা  সংস্থাগুলির মুনাফা থেকে (যা পুরোনো সমাজতন্ত্রের বাস্তবতার সাথে ব্যাপকভাবে মিলে যায়), অর্থনীতিতে ইতিবাচক বিনিয়োগের অর্থ অবশ্যই ইতিবাচক সঞ্চয় এবং তাই ইতিবাচক মুনাফা। এর অর্থ হল যতক্ষণ সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ইতিবাচক বিনিয়োগ করবে, ততক্ষণ সামগ্রিকভাবে সর্বদা ইতিবাচক মুনাফা থাকবে; অর্থাৎ, মুনাফাজনক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা, লোকসানকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির চেয়ে বেশি হবে। তাই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সর্বদা সমস্ত উদ্যোগকে পূর্ণ ক্ষমতায় উত্পাদন করতে বলতে পারে এবং তবুও বাজেট থেকে লোকসানকারী উদ্যোগগুলিকে ক্রস-ভর্তুকি দিতে সক্ষম হতে পারে।

এসমস্ত কিছু, কেবলমাত্র সোশ্যালিস্ট অর্থনীতির বিমূর্ত তত্ত্ব নয়; বাস্তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলিতে এইরকমই ঘটেছিল, যেখানে বিনিয়োগের ওঠানামা পুঁজিবাদের মত মোট উৎপাদনের ওঠানামায় রূপ নেয়নি, যা ‘মাল্টিপ্লায়ার’ নামে পরিচিত; সেখানে শুধু বিনিয়োগের ওঠানামা ছিল, যেখানে ভোক্তার চাহিদা ঐ ওঠানামাকে বিপরীতভাবে সামঞ্জস্য করে অর্থনীতিকে সবসময় পূর্ণ ক্ষমতায় চালিত রাখে।

অন্যভাবে বলতে গেলে, একটি পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ওঠানামা ভোগে একই দিকের ওঠানামা সৃষ্টি করে এবং ফলস্বরূপ মোট উৎপাদনে ওঠানামা আসে (মুল্যের কিছু পরিবর্তনের সঙ্গে বা ছাড়া)। কিন্তু সোশ্যালিস্ট অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ওঠানামা ভোগ-চাহিদার বিপরীত দিকের ওঠানামা সৃষ্টি করে, যাতে সব সময় পূর্ণ ক্ষমতার উৎপাদন নিশ্চিত হয়। এটা সম্ভব যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদনের মালিকানা ব্যক্তিগত এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, তাই চাহিদা কমলে যদি মূল্য কমেও যায় (কিছু ক্ষেত্রে তা উৎপাদন হ্রাস করতে পারে - যেমন অলিগোপলিস্ট পরিবেশে যেখানে মূল্য নিচে সহজে নামেনা), তাহলে কিছু উৎপাদক লোকসান করবে এবং উৎপাদন কমাবে। তাই পুঁজিবাদের অধীনে চাহিদা হ্রাস মানে উৎপাদন হ্রাস। অথচ সোশ্যালিজমে চাহিদা হ্রাস সম্পূর্ণরূপে মূল্যের পতনের মাধ্যমে শোষিত হয়, উৎপাদনে কোনো পরিবর্তন হয় না।

মিখায়েল কালেস্কি (বিখ্যাত পোলিশ মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ) দাবি-সঙ্কুচিত ব্যবস্থার এবং সরবরাহ-সংকুচিত ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য সূচনা করেছিলেন, যা পরে হাঙ্গেরিয়ান অর্থনীতিবিদ জেমস করনাই দ্বারা ব্যবহার করা হয়। কালেস্কি পুঁজিবাদকে দাবি-সঙ্কুচিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখেছিলেন আর সোশ্যালিজমকে সরবরাহ-সংকুচিত ব্যবস্থা হিসেবে। প্রথমটি সেই ধরনের যেখানে সামগ্রিক চাহিদা বাড়লে উৎপাদন বাড়ে, আর দ্বিতীয়টি যেখানে তা হয় না। সোশ্যালিজমে সামগ্রিক চাহিদা বাড়লে উৎপাদন নয়, বরং মূল্য বাড়ে, কারণ উৎপাদন সর্বদা সর্বোচ্চ স্তরে থাকে। একইভাবে সোশ্যালিজমে অনিচ্ছাকৃত বেকারত্ব নেই, অর্থাৎ এমন কোনও ‘অব্যবহৃত শ্রম’ নেই যা পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা বাড়লে ব্যবহৃত হতে পারত।

‘অনিচ্ছাকৃত বেকারত্বের অভাব’ ছিল পুরানো সোশ্যালিজমের এক মহান অর্জন। এটা আধুনিক ইতিহাসে এক অনন্য কৃতিত্ব এবং আজও তা অপরাজেয় হয়ে আছে।


পিপলস ডেমোক্রেসি পত্রিকায় ৮-১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত

বাংলায় অনুবাদঃ অঞ্জন মুখোপাধ্যায়


প্রকাশ: ১৩-সেপ্টেম্বর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 13-Sep-25 02:58 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/how-does-socialism-avoid-depressions
Categories: International
Tags: economiccrisis, scientificsocialism
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড