বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চা

Author
বদরুদ্দিন উমর

তখনকার দুর্দিনেও এই কাটাকাটি-খুনাখুনিই যে ভারতবর্ষের প্রধানতম ব্যাপার তাহা নহে। ঝড়ের দিনে যে ঝড়ই সর্বপ্রধান ঘটনা, তাহা তাহার গর্জন সত্ত্বেও স্বীকার করা যায় না-সেদিনও সেই ধূলিসমাচ্ছন্ন আকাশের মধ্যে পল্লীর গৃহে গৃহে যে জন্মমৃত্যু-সুখ দুঃখের প্রবাহ চলিতে থাকে, তাহা ঢাকা পড়িলেও, মানুষের পক্ষে তাহাই প্রধান।

Exercising History

ভূমিকা

বাংলাদেশ, তথা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম এক মার্কসবাদী চিন্তক বদরুদ্দিন উমর প্রয়াত হয়েছেন। ২০০৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ আয়োজিত ‘হাবিবুল্লাহ স্মারক বক্তৃতা’য় তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন আজকের প্রতিবেদনে তারই একাংশ প্রকাশিত হল। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাস চর্চা বলতে কি বোঝায় ঐ বক্তৃতা তার এক অনন্য উদাহরণ। এ প্রতিবেদন তাঁর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাও।

বদরুদ্দিন উমর

আজ ডক্টর আবু মহামেদ হাবিবুল্লাহ স্মারক বক্তৃতায় বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চা সম্পর্কে আমি ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের ইতিহাস চর্চার ওপর আলোচনা করতে চাই না, যদিও প্রসঙ্গত এ বিষয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন হবে। আমি এখানে ইতিহাস চর্চা বলতে সাধারণভাবে সংস্কৃতি চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ইতিহাসের সাথে জনগণের শিক্ষিত অংশের ও ছাত্রদের পরিচিতি ও ইতিহাস বিষয়ে তাদের ধ্যান ধারণা, চিন্তাভাবনা ও সচেতনতা প্রসঙ্গে সংক্ষেপে কিছু কথা বলব।

ইতিহাসে রাজা বাদশার একটা ভূমিকা অবশ্যই আছে, কারণ আধুনিক গণতন্ত্রের উদ্ভবের আগে তাঁরাই সমাজে শোষক-শ্রেণীর পক্ষে শাসন নীতি নির্ধারণ করতেন, শাসন কাজ পরিচালনা করতেন, এবং বিপুল অধিকাংশের ওপর অল্প সংখ্যকের শোষণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ভারতবর্ষেও এরকমই ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানব সমাজে যে প্রক্রিয়ায় মৌলিক জীবন ধারা প্রবাহিত হয় সে প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রাজা বাদশাদের শাসন কাজ ও সে কাজের সাথে সম্পর্কিত হাজার রকম জৌলুসের থেকে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে প্রবহমান জনজীবনের এই প্রক্রিয়াই হলো ইতিহাসের আসল রূপ।

এ বিষয়টিকে নিজের চিন্তাধারা অনুযায়ী উপস্থিত করতে গিয়ে 'ভারতবর্ষের ইতিহাস' নামক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আমাদের লিখিত ইতিহাসে রাজা বাদশা ও জনগণের স্থান সম্পর্কে বলেন, "তখনকার দুর্দিনেও এই কাটাকাটি-খুনাখুনিই যে ভারতবর্ষের প্রধানতম ব্যাপার তাহা নহে। ঝড়ের দিনে যে ঝড়ই সর্বপ্রধান ঘটনা, তাহা তাহার গর্জন সত্ত্বেও স্বীকার করা যায় না-সেদিনও সেই ধূলিসমাচ্ছন্ন আকাশের মধ্যে পল্লীর গৃহে গৃহে যে জন্মমৃত্যু-সুখ দুঃখের প্রবাহ চলিতে থাকে, তাহা ঢাকা পড়িলেও, মানুষের পক্ষে তাহাই প্রধান। কিন্তু বিদেশী পথিকের কাছে এই ঝড়টাই প্রধান, এই ধূলিজালই তাহার পক্ষে আর সমস্তই গ্রাস করে; কারণ সে ঘরের ভিতরে নাই, সে ঘরের বাহিরে। সেইজন্য বিদেশীর ইতিহাসে এই ধূলির কথা ঝড়ের কথাই পাই, ঘরের কথা কিছুমাত্র পাই না।"

ভারতবর্ষের লিখিত ইতিহাস চর্চা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যখন একথা বলেছিলেন তখন জনগণের কথা ইতিহাসে কোন উল্লেখযোগ্য স্থান না পেলেও ইতিহাসের অনেক কিছুর সাথেই ছাত্র ও জনগণের শিক্ষিত অংশের পরিচয় হতো। শত সহস্র বছর ধরে মানুষের জীবনযাত্রা বিভিন্ন পর্যায়ে কেমন ছিল সে বিষয়ে জানার একটা আগ্রহ ঐতিহাসিকদের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ, শিলালিপি, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, সাহিত্য ইত্যাদি থেকে উপাদান সংগ্রহ করে মানুষের প্রবহমান জীবনের প্রক্রিয়া ও তার নানা দিক উদ্ঘাটনে একটা চেষ্টার সূত্রপাত হয়েছিল। সামাজিক ইতিহাস নামে ইতিহাসের এক বিশেষ ধরনের চর্চার মাধ্যমে উৎপাদন সম্পর্ক, সমাজের বিন্যাস, বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় মানুষে মানুষে সম্পর্ক বিষয়ে এমন অনেক তথ্যের সাথে পরিচয় ঘটতে শুরু করে, যা সাধারণ মানুষের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনের ওপর আলোকসম্পাত করে।

এই আলোকের দেখা আমাদের স্কুলপাঠ্য ইতিহাসের বইয়ে তেমন না মিললেও তখনকার দিনে ক্লাসরুমের ইতিহাস চর্চা যে একেবারে মূল্যহীন ছিল এমন বলার উপায় নেই। রাজা মহারাজা, নবাব বাদশা ও ব্রিটিশ শাসকদের কথা এই ইতিহাসে লিখিত থাকলেও তাতে দেশের পরিস্থিতি, জনগণের অবস্থা, মানব সমাজের বিকাশ ইত্যাদি বিষয়ে অনেক কিছুর সাথেই পরিচয় ঘটত। একজন ছাত্র প্রাচীন, মধ্য এবং আধুনিক যুগের ভারতবর্ষের ইতিহাস, ইংল্যান্ড ও ইউরোপের ইতিহাসের নানা ঘটনাবলীর সাথে, অনেক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন ও পরিবর্তনের সাথে কিছুটা পরিচিত হতো। কাজেই লিখিত ইতিহাস, বিশেষত স্কুল ও কলেজ পাঠ্য ইতিহাসের বই পড়ে, একজন ছাত্র যখন ম্যাট্রিক্যুলেশন এবং ইন্টারমিডিয়েট (এখনকার এসএসসি ও এইচএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতো তখন শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ইতিহাসের সাথে তাদের এক প্রকার পরিচয় ঘটত। এই পরিচয় খুব সন্তোষজনক না হলেও একে উপেক্ষণীয় বলা যেত না।

ইতিহাস যেমন শুধু রাজা বাদশাদের কীর্তিকলাপ নয়, তেমনি তা কতকগুলি প্রতিভাধর ব্যক্তির কীর্তিও নয়, যদিও তাঁদের কার্যকলাপের একটা ভূমিকা ইতিহাসে অবশ্যই থাকে। ইতিহাসে দেখা যায় এক পর্যায়ে এক ধরনের সমাজ, শ্রেণী, উৎপাদন ব্যবস্থা, মানুষে মানুষে সম্পর্ক, আইন কানুন, এমনকি এক এক ধরনের চরিত্রসম্পন্ন মানুষ। এ সব কোন আকস্মিক অথবা বিস্ময়কর ব্যাপার নয়। মানব সমাজের ইতিহাসে যে পরিবর্তন লোকচক্ষুর সামনে ও লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘটে চলেছে তারই অভিব্যক্তি ও প্রতিফলন ঘটে এক এক পর্যায়ে এক এক দেশে ও সমাজে নানা পরিবর্তনের মধ্যে, নানা শক্তি ও ব্যক্তির উদ্ভব ও আবির্ভাবের মধ্যে। বাস্তব পরিস্থিতির এই সব পরিবর্তনের ধারা অনুধাবন, ব্যাখ্যা ও বর্ণনাই হলো ইতিহাসের প্রকৃত উপজীব্য।

উৎপাদন পদ্ধতি অর্থাৎ উৎপাদনের শক্তি এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে সম্পর্কই মূলত সমাজে কতকগুলি বাস্তব শর্ত সৃষ্টি করে যার অধীনেই সমাজের জনজীবন, আইন ও শাসনব্যবস্থা, শিক্ষা সংস্কৃতি, রাজনীতি নির্ধারিত হয়। কাজেই যে কোন সমাজে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে যে সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে তাঁরাও এই একই শর্তের অধীন। এই শর্তই নির্ধারণ করে তাঁদের আবির্ভাবের সময়, তাঁদের চরিত্র, তাঁদের কাজের ধারা ও পরিধি, তাঁদের সাফল্য ও ব্যর্থতা, আগমন, এমনকি পলায়ন।

এ বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে অধ্যয়ন, বিশ্লেষণ এবং উপলব্ধি করা ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে সব সময়েই গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চার নামে যা ঘটছে সেই পরিপ্রেক্ষিতে এদিকে দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজন এখন অপরিহার্য হয়েছে।

বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে যে অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যায় তা হলো, প্রকৃত ইতিহাস চর্চা বলতে যা বোঝায় তার পরিবর্তে ইতিহাসের বিকৃতি নিয়ে মাতামাতি। শাসকশ্রেণীর দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল এখন বাঙলাদেশের ইতিহাস রচনার নামে ক্ষমতায় থাকাকালে পর্যায়ক্রমে ইতিহাসের দলীয়করণ ঘটায়, পাঠ্যপুস্তকে দলীয় স্বার্থে নানা ভুল তথ্য ঢুকিয়ে এই সব বিকৃত তথ্যের মাধ্যমে ইতিহাস বলতে আসলে কি বোঝায় তার ধারণা থেকেও ছাত্রদের বঞ্চিত করে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে অল্পবিস্তর একাজ করা হলেও বাঙলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে এই কাজ খুব বেশী করেই শুরু হয়েছে। ১৯৮০ ও '৯০-এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত বাঙলাদেশের ইতিহাসের দলীয়করণ যত নির্লজ্জ ও বেপরোয়াভাবে এবং মূর্খতার সাথে চলছে এর কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। এক্ষেত্রে সব থেকে লক্ষণীয় ব্যাপার, ইতিহাস চর্চার থেকে ইতিহাস বিকৃতকরণ নিয়ে দুই দলের এই মাতামাতিতে বুদ্ধিজীবীদের সব থেকে সোচ্চার অংশ, এমনকি এঁদের মধ্য যাঁরা ঐতিহাসিক এবং ইতিহাসের শিক্ষক তাঁরাও, এমনভাবে একাজে অংশগ্রহণ করছেন যার সাথে শাসকশ্রেণীর দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের লোকজন কর্তৃক মূল ইতিহাস বিকৃতকরণ বিতর্কের কোন পার্থক্য নেই। শুধু স্কুল কলেজ ছাত্র নয়, সাধারণ শিক্ষিত মানুষদের ওপরও এর প্রভাব কত সুদূরপ্রসারী ক্ষতির কারণ হচ্ছে এ নিয়ে কোন চিন্তাভাবনা ও বিবেচনা দলীয় লোকদের মতো দলীয় আনুগত্যপরায়ণ এই সব বুদ্ধিজীবী এবং ঐতিহাসিকদেরও নেই।

ইতিহাসকে দলীয় স্বার্থ ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা ও বর্ণনার সব থেকে স্থল ও সহজ পথ হলো সংবাদপত্রে এ নিয়ে লেখালেখি এবং স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকে এই ব্যাখ্যা ও বর্ণনা ঢুকিয়ে দেয়া। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই দুই দলের স্বার্থে তাদের অনুগত বুদ্ধিজীবী এবং ঐতিহাসিকরা একাজই প্রথম থেকে করে এসেছেন এবং এখনো করছেন, এবং অন্য পক্ষের এই একই কাজের সমালোচনা করতেও এঁদের অসুবিধে হচ্ছে না। এসবই সম্ভব হচ্ছে এ কারণে যে, ইতিহাস বলতে প্রকৃতপক্ষে কি বোঝায়, ইতিহাসের চালিকাশক্তি কি, ইতিহাসের নায়ক বলতে কি বোঝায়, বিশেষত ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকার তাৎপর্য কি এসব বিষয়ে কোন আলোচনার ধারে-কাছেও এঁরা যান না। এঁরা নিজেদের দলীয় নেতাদের বাহাদুরীকেই বস্তুতপক্ষে ইতিহাস হিসেবে উপস্থিত করেন এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে পাঠ্যপুস্তকে ও প্রচার মাধ্যমে এক দলের নেতার বাহাদুরী কীর্তনের পরিবর্তে শুরু হয় অন্য দলের নেতার বাহাদুরী কীর্তন। এই দলীয় বাহাদুরদেরকে ইতিহাসের স্রষ্টা হিসেবে উপস্থিত করবার খেলায় শাসকশ্রেণীর নীতি নির্ধারকেরা মত্ত থাকায় বাঙলাদেশে সাধারণভাবে ইতিহাস চর্চা বলতে কার্যত কিছু দেখা যায় না। সামান্য ইতিহাস চর্চা, অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে থাকলেও এই চর্চার সাথে সাধারণ মানুষের কোন সম্পর্ক নেই, তাঁদের চেতনায় ইতিহাসের নায়ক নিয়ে টানাটানি এবং ইতিহাস বিকৃতকরণের কতকগুলি দলীয় কথাবার্তা ছাড়া আর কিছুই থাকে না। ইতিহাস সম্পর্কে সেখানে বিরাজ করে এক বিরাট শূন্যতা। বাঙলাদেশের ইতিহাস চর্চায় যে সংকট দেখা দিয়েছে এই পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে কিছু আলোচনার প্রয়োজন। তত্ত্ব নির্মাণ থেকে নিয়ে বাস্তব রাজনীতিতে নেতৃত্ব পর্যন্ত যে কোন ক্ষেত্রে ব্যক্তির ভূমিকা বলতে যথার্থ অর্থে কী বোঝায় সেটা দেখা দরকার। তত্ত্ব নির্মাণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়ে ফরাসী ভাববাদী দার্শনিক প্রুধোঁর মতের সমালোচনা প্রসঙ্গে কার্ল মার্কস আনেনকভের কাছে লেখা এক চিঠিতে যা বলেন সেটা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য:

"মানুষের দ্বারা ইতিমধ্যে অর্জিত উৎপাদনের শক্তিসমূহ এবং এই শক্তিসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন সব সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেকার সংঘাত থেকে উদ্ভূত বিশাল ঐতিহাসিক আন্দোলনের পরিবর্তে; প্রতিটি জাতির অভ্যন্তরে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে যে সব ভয়াবহ যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে সেগুলির পরিবর্তে; জনগণের বাস্তব ও প্রচণ্ড সক্রিয়তা, একমাত্র যার দ্বারা এই সব সংঘাতের মীমাংসা হতে পারে, তাদের পরিবর্তে-এই বিশাল দীর্ঘকালীন ও জটিল আন্দোলনের পরিবর্তে, মসিয়ে প্রুধোঁ সরবরাহ করেন নিজের মস্তিষ্কের খামখেয়ালী গতিবেগ। সুতরাং ইতিহাস সৃষ্টি করেন পাণ্ডিত্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা, সেই ব্যক্তিরা, যাঁরা জানেন ঈশ্বরের গোপন চিন্তাভাবনা কিভাবে চুরি করতে হয়। সাধারণ মানুষের কাজ হচ্ছে শুধু তাঁদের দ্বারা অতিপ্রাকৃতিক উপায়ে লব্ধ জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ। আপনারা এখন বুঝতে পারবেন, কেন মসিয়ে প্রুধোঁ একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘোষিত শত্রু। তাঁর কাছে বর্তমান সমস্যাবলীর সমাধান নিহিত আছে তাঁর নিজের মনের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মধ্যে; জনগণের কার্যপ্রক্রিয়ার মধ্যে নয়। যেহেতু তাঁর কাছে বর্গগুলিই (category) হলো চালিকাশক্তি সেজন্য বর্গগুলি পরিবর্তনের জন্য বাস্তব জীবনকে পরিবর্তনের কোন প্রয়োজন নেই। ঠিক এর উল্টো। বর্গগুলিকেই পরিবর্তন করতে হবে এবং তার ফলেই বিদ্যমান সমাজের মধ্যে একটা পরিবর্তন ঘটবে।

(Marx to P.V Annenkov, Poverty of Philosophy, Progress Publishers, Moscow 1966, P. 165)

রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে বিভিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তিরা যে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারেন না এবং সম্ভবত করেন না, ইতিহাস যে সামাজিক বিকাশের কতকগুলি অমোঘ নিয়মের অধীনেই সৃষ্টি হয়-এই কথাটিই মার্কস এখানে বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, যারা মনে করেন পণ্ডিত ব্যক্তিরাই ইতিহাসের স্রষ্টা এবং সাধারণ লোকদের কাজ হলো তাঁদের লেজুড়বৃত্তি করা-তারা সকল প্রকার রাজনৈতিক সংগ্রামের ঘোষিত শত্রু।

মার্কস এখানে রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে যা বলেছেন সেটা মূলত যে কোন উচ্চমার্গের রাজনৈতিক ব্যক্তি ও নেতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রত্যেকেই বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে বিদ্যমান বা বিকাশমান কতকগুলি শর্তের সৃষ্টি। এই শর্তগুলির মধ্যেই তাঁদের উৎপত্তি এবং উদ্ভব। কাজেই এগুলি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কোন পণ্ডিত অথবা রাজনীতিক ব্যক্তির ভূমিকাই বোঝা ও নির্ধারণ সম্ভব নয়। কিন্তু তার অর্থ আবার এই নয় যে, ইতিহাসে ব্যক্তির কোন গুরুত্ব ও প্রভাব নেই অর্থাৎ ব্যক্তি ঘটনাসমূহের বিশেষ বিশেষ দিককে কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে না। তা নিশ্চয়ই পারে। এ প্রসঙ্গে রুশ দার্শনিক ও মার্কসবাদী রাজনৈতিক নেতা প্লেখানভের বিখ্যাত বক্তব্য উল্লেখযোগ্য, “এটা দেখা গেছে যে, মহান প্রতিভাধর ব্যক্তিদের আবির্ভাব ঘটেছে সেখানেই যখন তাঁদের বিকাশের পক্ষে সহায়ক সামাজিক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে প্রত্যেক প্রতিভাধর ব্যক্তি যাঁরই যথার্থ আবির্ভাব ঘটেছে, প্রত্যেক প্রতিভাধর ব্যক্তি যিনিই একটি সামাজিক শক্তি হয়ে উঠেছেন, তিনি হলেন সমাজ সম্পর্কের মূর্ত প্রকাশ। এই যখন হলো ঘটনাটা, এটা তাহলে পরিষ্কার, প্রতিভাধর ব্যক্তিরা, আমরা যেমনটি বলছি, শুধু ঘটনাসমূহের বিশেষ কিছু দিককেই বদলাতে পারেন কিন্তু তাদের সাধারণ ধারাকে বদলে দিতে পারেন না; তাঁরা নিজেরাই হলেন এই ধারার মূর্ত প্রকাশ; এই ধারাটি না থাকলে এঁরা নিজেরাই সম্ভাবনা থেকে বাস্তবের আঙ্গিনায় উপনীত হতে পারতেন না।"

(উদ্ধৃতিতে গুরুত্ব চিহ্ন প্লেখানভের নিজের; প্লেখানভ: ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা, প্রগতি প্রকাশনী, কলকাতা। পৃ.৫)

প্রতিভাধর ব্যক্তিদের সম্পর্কে এখানে যা বলা হয়েছে সেটা ক্রমওয়েল, ডানটন, রোবেসপীয়র, নেপোলিয়ন, বিসমার্ক, আব্রাহাম লিঙ্কন, গান্ধী, জিন্নাহ, মার্কস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও-এর সম্পর্কেও প্রযোজ্য। তাঁদের ভূমিকার অর্থ এই নয় যে, তাঁরা ইতিহাসের ধারা নির্ধারণ অথবা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। এর অর্থ হলো, তাঁরা যে ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে জন্মলাভ করেছিলেন এবং সক্রিয় ছিলেন সেই পরিস্থিতির বিকাশ ধারার তাঁরা ছিলেন মূর্ত প্রকাশ। অর্থাৎ ইতিহাস কিভাবে নিয়ন্ত্রিত ও পরিবর্তিত হবে সেটা তাঁরা নির্ধারণ করেননি। ইতিহাসই তাঁদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট প্রভাবশালী ভূমিকাকে নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

ইতিহাসে এক একজন প্রতিভাধর ব্যক্তির ভূমিকা দেখে এক ধরনের বিভ্রান্তি অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। এ বিভ্রান্তিটি হলো এই যে, এই বিশেষ ব্যক্তির জন্ম না হলে তিনি যে ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন করেছেন সেটা অসম্পন্নই থেকে যেত। এ বিভ্রান্তির বিষয়ে প্লেখানভ বলেন, 'ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করলে, আমরা প্রায় সব সময়েই এক ধরনের যে দৃষ্টিবিভ্রমে পড়ে থাকি তার প্রতি পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করা মঙ্গলজনক হবে মনে করি।

"জনজীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য 'জবরদস্ত তরবারি'ধারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নেপোলিয়ন অন্যান্য জেনারেলদের এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াকে প্রতিহত করলেন-অথচ এদের মধ্যে কেউ কেউ ঐ একইভাবে বা তাঁর মতো প্রায় একইভাবে তা সম্পাদন করতে পারতেন। একবার যখন জনসাধারণের দিক থেক্ে উদ্যমশীল সামরিক শাসনের প্রয়োজন মিটে গেল, তখন সামাজিক সংগঠনগুলো অন্যান্য প্রতিভাবান সৈন্যদের পক্ষে সামরিক শাসনের অবস্থান গ্রহণের পথ রোধ করেছিল। এই শক্তিটি এমন একটি শক্তি হয়ে দাঁড়ালো যে ঐ একই ধরনের অন্যান্য প্রতিভাবানদের আবির্ভূত হওয়ার পক্ষে তা প্রতিকূল হয়ে উঠল। আমরা যার কথা বলেছি সেই দৃষ্টিবিভ্রমের এই হলো কারণ। নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত ক্ষমতা আমাদের কাছে হয়েছে চূড়ান্ত রকমের বিপুল আকারের কারণ আমরা তাঁর দিকে ধরে নিয়েছি সেই সামাজিক শক্তির যা তাঁকে সামনে এগিয়ে নিয়ে এসেছিল, মদদ দিয়েছিল। নেপোলিয়নের শক্তি আমাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে বেশ একটা অভাবনীয়তা নিয়ে কারণ তাঁর মতো অন্যান্য সমান শক্তিমানেরা সম্ভাব্যতার স্তর থেকে বাস্তবতায় রূপ পরিগ্রহ করতেই পারেননি। আর তাই যখন আমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'যদি নেপোলিয়ন বলে কেউ না থাকতেন তাহলে কী হতো?' আমাদের কল্পনাশক্তি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং আমাদের মনে হয় তিনি না থাকলে যে সামাজিক আন্দোলনের ওপর তাঁর শক্তি ও প্রভাব গড়ে উঠেছে তা সম্ভব হতো না।

"মানুষের মননশীলতার বিকাশের ইতিহাসে কতিপয় ব্যক্তির সাফল্য অন্য একজনের সাফল্যকে প্রতিহত করার ঘটনা অনেক বিরল। কিন্তু এখানেও আমরা উপরের উল্লিখিত দৃষ্টিবিভ্রমের হাত থেকে মুক্ত নই। যখন কোন একটা সামাজিক অবস্থান ঐ সমাজের মননশীলতার মুখপাত্রদের শাসনে কিছু কিছু সমস্যা এনে হাজির করে তখন মুখ্য চিন্তাবিদদের দৃষ্টি ওইগুলির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাতেই নিবন্ধ থাকে। যখনই তাঁরা তার সমাধান করে ফেলেন-তখন অন্যতম বিষয়ের প্রতি তাঁদের মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। কিন্তু একটা সমস্যা সমাধানের মধ্যে দিয়ে একজন বিশেষ প্রতিভাধর ক. অন্যতম প্রতিভাধর খ. এর মনোযোগকে সমাধান হয়ে যাওয়া সমস্যা থেকে অন্য সমস্যার দিকে ঘুরিয়ে দেন। আর যখন আমাদের জিজ্ঞেস করা হয়-'সমস্যার স-এর সমাধান করার আগেই যদি ক মারা যেতেন তাহলে কী হতো?'-আমরা ভাবি তাহলে মানবজাতির মননশীলতার বিকাশের সূত্রটিই ছিন্ন হয়ে যেত। আমরা ভুলে যাই ক মরে গেলেও খ অথবা গ অথবা ঘ ঐ সমস্যার মোকাবেলা করতে পারতেন এবং ক এর অকাল মৃত্যু সত্ত্বেও মননশীলতার বিকাশের সূত্রটি অব্যাহত থাকত।” (ঐ, পৃ. ৪৭-৪৮)।

জগৎ যে সকল প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে বিজ্ঞানীরা সেগুলি আবিষ্কার করে থাকেন। তাঁদের এক একজনের ক্ষেত্র থাকে ভিন্ন ভিন্ন। কেউ পদার্থবিদ্যা, কেউ রসায়ন, কেউ ভূগোল, কেউ মৃত্তিকাবিজ্ঞান, কেউ অর্থনীতি ক্ষেত্রে নোতুন নোতুন সূত্র আবিষ্কার করেন। বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার সমাজকে এগিয়ে নেয়, মানুষের জ্ঞানের রাজ্য বিস্তার করে এবং প্রকৃতির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে থাকে। অ্যারিস্টটল, গ্যালেন, কোপারনিকাস, গ্যালিলিও, আর্কিমিডিস, নিউটন, ডালটন, ডারউইন, আইনস্টাইন প্রভৃতি বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীরা ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরে নোতুন নোতুন আবিষ্কার করে সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। সমাজের ওপর তাঁদের প্রভাব অনস্বীকার্য। কিন্তু তাই বলে কি আমরা বলতে পারি তাঁদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ভূমিকা সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে নির্ধারক? মোটেই তা নয়।

উপরোক্ত বিজ্ঞানীরা যদি ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত নাও হতেন তাহলে অন্য ব্যক্তিরা সমাজ বিকাশের এক নির্দিষ্ট পর্যায়ে আবির্ভূত হতেন এবং সমাজের অগ্রগতি সাধন করতেন। অর্থাৎ বিশেষ কোন ব্যক্তির আবির্ভাব হওয়া না হওয়ার ওপর সমাজ বিকাশ অথবা ইতিহাসের সাধারণ ধারা মোটেই নির্ভরশীল নয়। বরং সমাজ বিকাশের এক একটি পর্যায়ের সাধারণ ধারার ওপর বিশেষ ধরনের প্রতিভাশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আবির্ভাব সর্বতোভাবে নির্ভরশীল। যাঁরা বিদ্যুৎ, বাষ্পীয় যান, রেডিও, টেলিফোন অথবা অন্য যা কিছু আবিষ্কার করেছেন সেটা তাঁদের জন্ম না হলে, অন্য কেউ এগুলির আবিষ্কার করতেন। তাঁদের অবর্তমানে সমাজের অগ্রগতির ধারায় এগুলি অনাবিষ্কৃত থাকত এটা মনে করার থেকে অবাস্তব ইতিহাস বিষয়ক চিন্তা আর কী হতে পারে?

বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে যা সত্য, সাধারণভাবে সামাজিক অগ্রগতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সেটা একই রকম সত্য। প্লেখানভ নেপোলিয়ন সম্পর্কে ওপরে উদ্ধৃত অংশে যা বলেছেন সেটা অন্য দেশে, অন্য সময়ে অন্যদের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য।

কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস সমাজ বিকাশের যে যুগান্তকারী তত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন সেটা ইউরোপের তৎকালীন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতেই সম্ভব হয়েছিল। লক্ষ করার বিষয় যে, প্রায় সমান প্রতিভার অধিকারী এই দুই ব্যক্তির সামগ্রিক কাজ পরস্পরের সাথে এমনভাবে সম্পর্কিত যাকে বিচ্ছিন্ন করার উপায় নেই এবং তাঁরা উভয়েই জন্মেছিলেন একই সময়ে, ইউরোপে পুঁজিবাদের বিকাশের এক বিশেষ পর্যায়ে।

বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চা প্রসঙ্গে ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে এসব কথা সুনির্দিষ্ট কারণেই আলোচনার প্রয়োজন হলো। এই কারণটি হলো, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাত্রে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল সেই যুদ্ধের ঘোষণা, নেতৃত্ব ইত্যাদি নিয়ে তিরিশ বছরের ওপর যে বিতর্ক চলছে তাতে সেই যুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান ও পরে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে যেভাবে ঐতিহাসিক তথ্য বিকৃত করা হয়েছে সেটা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের চিন্তাকে বিরাটভাবে প্রভাবিত ও বিভ্রান্ত করছে এবং এই বিভ্রান্তি স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে সমাজের গভীরদেশেও বিস্তৃত হচ্ছে। এই দুই ব্যক্তির গৌরব কীর্তন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যাতে ইতিহাসের প্রকৃত নায়ক জনগণের ভূমিকা এই যুদ্ধে প্রায় সম্পূর্ণভাবেই অনুপস্থিত। যে মৌলিক সম্পর্কসমূহের ভিত্তিতে সমাজে পরিবর্তন ঘটে, সমাজে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ ও যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় সে বিষয়গুলিও ব্যক্তির গৌরব কীর্তনের মহিমায় ধামাচাপা থাকে। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির নামে কারণে-অকারণে অহরহ নানা ধরনের বাগাড়ম্বর চলা সত্ত্বেও এ যুদ্ধের প্রকৃত ঘটনাবলীর সাথে জনগণের ও ছাত্র সমাজের পরিচয়ের কোন সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, ব্যক্তির মহিমা কীর্তনের প্রয়োজন বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চা আজ যেভাবে উচ্ছেদ হয়ে গেছে একটি জাতির জীবনে তার থেকে ভয়াবহ ব্যাপার আর কী হতে পারে?

বস্তুতপক্ষে ১৯৭১ সালে বাঙলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর শিক্ষা ক্ষেত্রে চর্চার একটি বিষয় হিসেবে ইতিহাসই হয়ে দাঁড়ালো তৎকালীন শাসক দলের আক্রমণের ওপর লক্ষ্যবস্তু (target)। এর মূল কারণ, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, তার মধ্যে কোন ব্যক্তিকে নায়ক হিসেবে খাড়া করে তাঁর মহিমা কীর্তন সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সে ধরনের কোন নায়কই ছিল না। যদি নায়কের স্থানে কাউকে অধিষ্ঠিত করতেই হয় তাহলে সে গৌরব একমাত্র আমাদের দেশের জনগণের, অগণিত শ্রমজীবী মানুষের।

কিন্তু ২৬শে মার্চ ও ১৬ই ডিসেম্বর বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে সব সরকারী ও সাধারণভাবে শাসকশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা আয়োজিত অনুষ্ঠান হয় তাতে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের গৌরব কীর্তন করা ছাড়া আর কিছুই হয় না। এবং এই গৌরব কীর্তনের ক্ষেত্রে চলে কুৎসিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই ন্যক্কারজনক মহোৎসবই এখন বাঙলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের প্রধানতম ধরন।

১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রের শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার যে প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল এবং আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল সেটা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোন ব্যাপার ছিল না। জনগণের ওপর ১৯৪৭সাল থেকে পাকিস্তান সরকারের শোষণ ও নানা প্রকার নির্যাতন জনগণের চিন্তা চেতনায় পরিবর্তনের সূচনা করেছিল এবং তাঁদের মধ্যে প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছিল। সাংস্কৃতিক, ভাষাগত, রাজনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে সংগ্রামকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিচ্ছিল। এই ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের অনেক ব্যক্তিরই অল্পবিস্তর অবদান ছিল। অনেক সংগঠন ও দলের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে দলগতভাবে যেমন কমিউনিস্ট পার্টি, আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ইত্যাদি দলের ভূমিকা ছিল, অনেক দল ও শ্রেণী সংগঠনের ভূমিকা ছিল, তেমনি ব্যক্তিরও ভূমিকা ছিল। এই ব্যক্তিদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রভাবই ছিল সব থেকে বেশী। তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ভাসানীর জনপ্রিয়তাকেও উত্তীর্ণ করেছিল। এককথায় বলা চলে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে জনগণের ওপর শেখ মুজিবুর রহমানের প্রভাবই দাঁড়িয়েছিল সব থেকে বেশী। এই সত্যকে অস্বীকার করার অর্থ হলো, ইতিহাসের তৎকালীন বাস্তবতাকেই অস্বীকার করা।

শেখ মুজিবুর রহমানের এই অবস্থানের মূল কারণ ছিল অনেক রকম সুবিধাবাদ ও দোদুল্যমানতা সত্ত্বেও এই অঞ্চলে পাকিস্তানী রাষ্ট্রের শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সব থেকে সোচ্চার। এই শোষণ নির্যাতনের প্রকৃত চরিত্র তিনি কখনোই বিশ্লেষণ করতে যাননি, জনগণকে তার ভিত্তিতে শিক্ষা দেয়ার কোন চেষ্টাও তিনি করেননি। সে রকম চেষ্টা তাঁর দলের ও তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। এ কারণে সতর্কতার সাথে তিনি সেটা আড়ালও করতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মোটা দাগে তিনি পাকিস্তানী শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে যেভাবে বলতেন ও তার প্রতিকার হিসেবে স্বায়ত্তশাসনের দাবী করতেন সেটা জনগণের চিন্তার তন্ত্রীতে অনুরণন সৃষ্টি করত। তিনি যেভাবে এটা করতেন সেভাবে অন্য কারও পক্ষে সম্ভব হতো না। বিশেষত কমিউনিস্টরা জাতীয় নির্যাতনের প্রশ্নটি আড়ালে রেখে শ্রেণী সংগ্রাম নিয়ে যেসব অবাস্তব কথাবার্তা বলতেন ও কর্মসূচী নির্ধারণ করতেন সেটাও শেখ মুজিবের রাজনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে খুব সহায়ক হয়েছিল। কারণ তিনি তাঁর স্বায়ত্তশাসন দাবীর মাধ্যমে যেভাবে জনগণের পাকিস্তান সরকারবিরোধী চিন্তা চেতনাকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন সেটা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। এটাই ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের সব থেকে বড় কৃতিত্ব, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পরিস্থিতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর এক অনস্বীকার্য ব্যক্তিগত অবদান।

কিন্তু এসব সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের সীমাবদ্ধতা ছিল। শেখ মুজিব ছিলেন সংসদীয় পথে আন্দোলনের পথিক এবং তাঁর সংগ্রামের সর্বোচ্চ রূপ ছিল কারাগৃহে প্রবেশ। এর থেকে কঠোরতর সংগ্রাম তিনি কোন সময়েই করেননি এবং অন্য ধরনের সংগ্রাম, বিশেষত সশস্ত্র গণযুদ্ধ, তাঁর রাজনীতি ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কাজেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে তাঁর অবস্থা শোচনীয় হয়েছিল।

১৯৭১-এর ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের বক্তৃতায় 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' বললেও এবং দেশবাসীকে যার হাতে যা আছে সেটা নিয়ে তৈরী থাকতে বললেও তিনি আসলে স্বাধীনতা বলতে পাকিস্তানীদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সর্বোচ্চ আত্মনিয়ন্ত্রণই বুঝতেন। এজন্য ৭ই মার্চের বক্তৃতায় শেখ মুজিব জয় বাংলার পর বলেছিলেন জয় পাকিস্তান। এ কথাটি তৎকালীন রেডিওর আওয়ামী লীগ সমর্থক কর্তাব্যক্তিরা মুছে ফেলায় অনেকেই, বিশেষত আওয়ামী লীগাররা এটা অস্বীকার করে থাকেন। কোথাও এটা লিখিতভাবেও এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবং ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হাবিবুর রহমান 'বাংলাদেশের তারিখ' নামে সম্প্রতি তাঁর প্রকাশিত একটি বইয়ে শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের বক্তৃতা উদ্ধৃত করে লিখেছেন, "এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা! জিয়ে পাকিস্তান!!" (মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারী ২০০৩, পৃ. ৩৭)। জয় বাংলার পর সেই বক্তৃতায় তখন বলা দরকার ছিল 'পাকিস্তান ধ্বংস হোক'। কিন্তু মুজিব বলেছিলেন জিয়ে পাকিস্তান বা পাকিস্তান জিন্দাবাদ! একথা এখন হাবিবুর রহমান সাহেব লিখলেও তখন তাঁর বক্তৃতার শ্রোতারাও এটা শুনেছিলেন। পাকিস্তানী রাষ্ট্র উৎখাতের জন্য সেই বক্তৃতায় শেখ মুজিব প্রকৃত অর্থে কোন গণযুদ্ধের ডাক দেননি। সেটা ভালভাবে প্রমাণিত হয়েছিল তাঁর দুটি কাজের মাধ্যমে। প্রথমত, ৮ই মার্চ থেকে গান্ধীবাদী অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু করা এবং দ্বিতীয়ত, ২৫ শে মার্চ রাত্রে সকলে যখন আত্মগোপনের জন্য দৌড়াদৌড়ি করছে ও প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে তখন সেই যুদ্ধের সেনাপতি হিসেবে অবতীর্ণ না হয়ে শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করা।

এই আত্মসমর্পণের মূল কারণ ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল সে পরিস্থিতি সশস্ত্রভাবে মোকাবেলার কোন লাইন, কর্মসূচী ও সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের ছিল না। সশস্ত্র গণযুদ্ধ কিভাবে পরিচালনা করা যেতে পারে তার বিন্দুমাত্র ধারণাও শেখ মুজিবের থাকেনি। সেই পরিস্থিতিতে তাঁর নেতৃত্ব collapse করেছিল বা ধসে পড়েছিল। তাঁর নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতা নিঃশেষিত হয়েছিল। আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোন পথ তিনি দেখতে পাননি। কিন্তু তিনি এটাও উপলব্ধি করেছিলেন যে, ঠিক সেই মুহূর্তে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল তাতে জনগণ এগিয়ে আসবেন এবং প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হবে। কাজেই তিনি সকলকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন সরে গিয়ে শত্রুর চোখের আড়াল হতে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে। এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত অজয় রায়-এর 'বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলন' নামে একটি বইয়ে তিনি বলেছেন, "২৫শে মার্চ মধ্যরাতে যখন সেনা অভিযান শুরু হয় তার আগে পার্টির (মস্কোপন্থী নামে পরিচিত কমিউনিস্ট পার্টি-বঃউঃ) পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর বাড়ীতে যোগাযোগ করা হয়। ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন। তিনি অধ্যাপককে বলেন তোমরা আত্মগোপনে চলে গিয়ে সংগ্রামের প্রস্তুতি নাও। এখন একমাত্র স্বাধীনতার দাবীতেই সংগ্রাম হবে। তিনি আরো বলেন- আমি সবাইকে বলে দিয়েছি আত্মগোপনে চলে যেতে। তিনি জানান, তিনি নিজে ধরা দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

অজয় রায়: বাংলাদেশে বামপন্থী আন্দোলন, ১৯৪৭-১৯৭১, সাহিত্যিকা, পৃ. ১০১

আমি এ ব্যাপারে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ সাহেবকে জিজ্ঞেস করায় তিনি আমাকে বলেন যে, কথাগুলোর বিষয়বস্তু ঠিকই আছে তবে শেখ মুজিব তাঁর নিজের ভাষাতেই এটা বলেছিলেন।

ভূমিকাঃ ওয়েবডেস্ক


প্রকাশ: ০৭-সেপ্টেম্বর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image


অন্যান্য মতামত:

Excellent and informative
- Jawhar Sircar, ০৯-সেপ্টেম্বর-২০২৫



শেষ এডিট:: 07-Sep-25 18:16 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/exercising-history
Categories: International
Tags: history, howtowritehistory, marxism, marxism-leninism, scientificsocialism
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড