অসংগঠিত শ্রমিক: অন্ধকারের রোজনামচা (৭ - পর্ব)

চন্দন মুখোপাধ্যায়
গিগ কর্মীদের বিরুদ্ধে কমপ্লেন করার জায়গা আছে,কিন্তু ওরা কোথাও বিচার পাবে না। ওদের শুধু চ্যাট বট (chat bot)এ মেসেজ ইউ পাঠাতে পারে।কিন্তু এখন প্রায় সব কোম্পানি মানুষের জায়গায় এআই, এলগরিদম এবং ডিজিটাল সিস্টেমের ওপর সব যোগাযোগ ব্যবস্থা ছেড়ে দিয়েছে। তাই বিপদে পড়লে সাহায্য করার বা কোন নির্দেশ দেবার মতো কোন মানুষ নেই।

গিগ কর্মী :-
গিগ অর্থনীতি নিয়ে খুব ভালো ভালো কথা বলা হয় প্রতিদিন। নিয়োগকর্তা এবং গিগ কর্মী দু দিক থেকেই নাকি খুব ভালো ব্যবস্থা।যেমন, নিয়োগ কোম্পানি, যখন খুশি তাদের কাজে নিতে পারে আবার প্রয়োজন না থাকলে বাদ দিতে পারে, কোন দায় বা দায়িত্ব নিতে হয় না। নিয়ম মেনে কাজ করবে, হিসাবের টাকা বুঝিয়ে দেবে, সম্পর্ক শেষ। তাই কোম্পানির পক্ষে ভালো। আবার গিগ কর্মীদের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট কাজের দিন বা সময় নেই, যেখান থেকে খুশি,যে কোন সময় তার ইচ্ছেমতো কাজ করতে পারে।অফিস যাবার দরকার নেই,যে কোনো কোম্পানি, প্রয়োজনে একাধিক কোম্পানিতে একসাথেও কাজ করতে পারে। বাড়তি রোজগারের জন্যে পার্ট টাইম কাজ হিসাবেও করতে পারে । সত্যি এমন রাজার মতো চাকরি আর হয়না! কিন্তু নির্মম সত্যটা এর থেকে লক্ষ মাইল দূরে থাকে। নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলছে, "এই সময় কালে সব থেকে বুমিং অর্থনীতি হলো গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি।অতিমারির আগে সারা দেশে গিগ কর্মী ছিল 30লাখ। আর তার পর 2020- 2021সালেই এই সংখ্যা 77 লাখ হয়ে গেছে। সামনের তিন চার বছরের মধ্যে এটা 2.35 কোটি অর্থাৎ প্রায় আড়াই কোটি কর্মী বাহিনী হবে।" বিভিন্ন সার্ভে রিপোর্ট বলছে,"বর্তমানেই প্রায় 2কোটি এবং 10 বছরে এই সংখ্যা 9কোটি ছাড়িয়ে যাবে।বর্তমানে কম দক্ষ গিগ কর্মী 31%,মাঝারি দক্ষ কর্মী 47% এবং উচ্চ দক্ষ কর্মী 22%।" ২০২০সালে ভারত সরকার একটা সোশ্যাল সিকিউরিটি কোড পাস করে,এতে গিগ কর্মীর সংজ্ঞা লিখতে গিয়ে," চ্যাপ্টার 1,সেকশন 2(35) কোড অন সোশ্যাল সিকিউরিটি2020"তে বলা হয়," a person who participates in a work arrangement and earns from such activities outside of a traditional employer- employee relationship." (একজন ব্যক্তি যিনি কাজ করেন বা কাজের ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করেন এবং প্রথাগত নিয়োগকর্তা-কর্মচারী সম্পর্কের বাইরে এই ধরনের কার্যকলাপ থেকে উপার্জন করেন) ৷এই কোড এই গিগ কর্মীদের সোশ্যাল সিকিউরিটি বেনিফিট গুলো বাড়ানোর দিকে লক্ষ্য রাখবে, যেমন জীবন এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতা গুলোকে কভার করা, শরীর এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা, দুর্ঘটনা বীমা,এবং বার্ধক্য জীবনের সুযোগসুবিধার মতো বিষয়গুলো। এবং এই কোড অন্যান্য ( traditional employee) প্রথাগত কর্মীদের মতো আইনগত সুযোগগুলো দেবার কথা বলছে।
7The Oxford Internet institute online labour index রিপোর্টে দেখাচ্ছে ভারতে লেবার মার্কেট শেয়ারে গিগ কর্মী 24%, যেখানে বাংলাদেশে 16% আর আমেরিকায় 12%। ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর অ্যাপ্লাইড ইকোনমিক রিসার্চ( NCAER) এর রিপোর্ট অনুযায়ী গিগ কর্মীরা সপ্তাহে 69.3 প্রায় 70 ঘন্টা কাজ করে গড় রোজগার মাসে12- 18 হাজার টাকা।সাম্প্রতিক গবেষণার উঠে এসেছে, অ্যাপ-ভিত্তিক ক্যাব চালকদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ দিনে 14 ঘণ্টার বেশি কাজ করেন, যেখানে 83%-এর বেশি মানুষ 10 ঘণ্টার বেশি কাজ করেন এবং 60%, 12 ঘণ্টার বেশি কাজ করেন।সেন্টার ফর লেবার স্টাডি এবং ন্যাশনাল ল স্কুলের সাথে যৌথভাবে মন্টফোর্ট সোশ্যাল ইনস্টিটিউট (MSI) একটা সমীক্ষা চালায়, ট্রান্সপোর্ট গিগ কর্মীদের ওপর। দেখে 12 ঘন্টা কাজ করে যা রোজগার করে,তার বেশিরভাগই চলে যায় তেল,মেন্টিনেন্স, ইএমআই এই সবেতেই। তাই সংসার চালাতে বাড়তি সময় কাজ করতে হয়।অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট এর ফেয়ারওয়ার্ক রিসার্চ প্রজেক্ট 2022 এ 11টা ভারতীয় গিগ সংস্থার ওপর স্টাডি করে জানায়, একটাও কোম্পানি ঘণ্টা পিছু ন্যূনতম মজুরি তো দূর গাড়ির তেল, মেনটেনেন্স,ইন্সুরেন্স এর মতো জরুরি বিষয় গুলোর ক্ষেত্রেও কোন রকম দায় নেয় না।
গিগ কর্মীদের বিরুদ্ধে কমপ্লেন করার জায়গা আছে,কিন্তু ওরা কোথাও বিচার পাবে না। ওদের শুধু চ্যাট বট (chat bot)এ মেসেজ ইউ পাঠাতে পারে।কিন্তু এখন প্রায় সব কোম্পানি মানুষের জায়গায় এআই, এলগরিদম এবং ডিজিটাল সিস্টেমের ওপর সব যোগাযোগ ব্যবস্থা ছেড়ে দিয়েছে। তাই বিপদে পড়লে সাহায্য করার বা কোন নির্দেশ দেবার মতো কোন মানুষ নেই। কাস্টমারের জন্যে ভালো। অর্ডার দেওয়া সহজ, কোন কমপ্লেন থাকলে টাকাও ফেরত দেবার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কর্মীদের ক্ষেত্রে কোনো পথ নেই। তাই এখন নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে মাঝে মাঝেই ধর্মঘটের পথে যাচ্ছে। এই বিরাট অংশের কর্মীদের জীবন যন্ত্রনা থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে সরকার কোনোরকম উদ্যোগী নয়। দীর্ঘ দিন ধরে দাবি করে চলেছে সরকারের কাছে অসংগঠিত শ্রমিক হিসাবে স্বীকৃতি পেতে। কিন্তু সরকার মালিকদের এবং বোরো কোম্পানিগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে কিছুতেই রাজিনা হয়ে সব রকম প্রাপ্য সুযুগ থেকে বঞ্চিত করে চলেছে।
গিগ কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ নিয়ে তাই সুপ্রিম কোর্টে কেস চলছে ,ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অফ অ্যাপ বেসড ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স (IFAT) বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া, দীপঙ্কর দত্ত জে এবং মনমোহন জে-র এজলাসে।আবেদনকারী: ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অফ অ্যাপ বেসড ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স (আইএফএটি);
উত্তরদাতা: ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া; এএনআই টেকনোলজিস প্রাইভেট লিমিটেড; উবার ইন্ডিয়া সিস্টেমস প্রাইভেট লিমিটেড; বান্ডল টেকনোলজিস প্রাইভেট লিমিটেড; জোমাটো লিমিটেড( মামলা নম্বর:WP (C) 1068/2021) ।
মামলার বিবরণ :- জোরপূর্বক শ্রম , গিগ শ্রমিক , সমতার অধিকার , জীবনের অধিকার , জীবিকার অধিকার , সামাজিক নিরাপত্তা
মূল সমস্যাগুলি
১...২০০৮ সালের 'অসংগঠিত শ্রমিক সামাজিক নিরাপত্তা আইন'র অধীনে গিগ কর্মীরা কি 'অসংগঠিত শ্রমিক' হিসেবে বিবেচিত হবেন ?
২....'অসংগঠিত শ্রমিক' হিসেবে গিগ কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত না করা কি তাদের সমতার অধিকারের লঙ্ঘন?
৩....গিগ কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করা কি অনুচ্ছেদ ২১ এর অধীনে জীবনের অধিকার লঙ্ঘন এবং অনুচ্ছেদ ২৩ এর অধীনে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে শোষণের সমতুল্য?IFAT সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন দাখিল করে যেখানে যুক্তি দেওয়া হয় যে কোম্পানি এবং শ্রমিকদের মধ্যে বর্তমান চুক্তিগুলি ১৯৫০ সালের ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ২১ এবং ২৩ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে।
তারা আদালতের কাছে গিগ কর্মীদের 'অসংগঠিত কর্মী' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে তারা সামাজিক নিরাপত্তা আইনের আওতায় আসতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে শ্রমিক ক্ষতিপূরণ আইন, ১৯২৩ ; শিল্প বিরোধ আইন, ১৯৪৭ ; কর্মচারী রাষ্ট্রীয় বীমা আইন, ১৯৪৮ ; কর্মচারী ভবিষ্যনিধি ও বিবিধ বিধান আইন, ১৯৫২ ; মাতৃত্বকালীন সুবিধা আইন, ১৯৬১ ; গ্র্যাচুইটি প্রদান আইন, ১৯৭২ এবং 'অসংগঠিত শ্রমিক সামাজিক নিরাপত্তা আইন, ২০০৮ ।সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত নেবে যে গিগ কর্মীরা 'অসংগঠিত কর্মী'-এর আওতায় পড়েন কিনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার জন্য যোগ্য কিনা।
আজকের বিপদ শ্রমকোড
শ্রম আইনের মৌলিক নীতি হল শ্রম বাজারে দুর্বল পক্ষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যাতে তারা বেতন এবং কাজের পরিবেশ নিয়ে আলোচনার সময় ন্যায্য অবস্থানে থাকে। কিন্তু যখন অসংগঠিত ক্ষেত্রের কথা আসে, তখন শ্রম আইনের এই মৌলিক নীতিটিও মানা হয়না । সব বিরোধী দলকে অস্বীকার করে, সমস্ত ট্রেড ইউনিয়ন কে অন্ধকারে রেখে শুধু ক্ষমতার জোরে শ্রমিক, কর্মচারী মারার দানবীয় শ্রম কোড লাগু হয়ে গেল।এই শ্রমকোডের ফলে একদিকে অসংখ্য শ্রমিক নতুন করে অসংগঠিত তালিকায় ঢুকে যাবে, অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য নতুন নতুন বিপদও সামনে এসে হাজির হবে ।
সংক্ষেপে বললে,প্রধান বিপদগুলো হলো:
- চাকরির নিরাপত্তা হ্রাস: নতুন কোডগুলির ফলে ছাঁটাই করা সহজ হতে পারে, যা চাকরির নিরাপত্তাহীনতা বাড়াবে।
- চুক্তির ভিত্তিতে কাজ বৃদ্ধি: স্থায়ী কর্মসংস্থানের বদলে চুক্তির ভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োগের প্রবণতা বাড়তে পারে, যার ফলে শ্রমিকরা কম সুবিধা এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়বে।
- কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি: কাজের সময় বেড়ে যেতে পারে, যা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
- বেতন ও সামাজিক সুরক্ষা কমে যাওয়া: কর্মীদের হাতে পাওয়া বেতনের পরিমাণ কমে যেতে পারে এবং সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
- ট্রেড ইউনিয়নগুলির ক্ষমতা হ্রাস: ট্রেড ইউনিয়নগুলির ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে শ্রমিকরা সম্মিলিতভাবে তাদের অধিকার আদায়ে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
- শোষণ বৃদ্ধি: মালিকদের স্বার্থ বেশি সুরক্ষিত হওয়ার কারণে শ্রমিকদের শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
- নিরাপত্তাহীন কর্ম পরিবেশ: কোডের অধীনে কর্মপরিবেশ এবং সুরক্ষার নিয়ম শিথিল হতে পারে, যা শ্রমিকদের জন্য বিপদসংকুল কাজের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
- এই শ্রম কোডের বিপদ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও প্রতিরোধের আন্দোলন শুরু হয়েছে । এভাবেই বিজেপি সরকার গরিব, খেটেখাওয়া মানুষকে প্রতিদিন মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে সব অংশের শ্রমিকের রক্ত ঘামের বিনিময়ে বন্ধু পুঁজিপতিদের মুনাফার পাহাড় গড়ে দিতে সব রকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।এর বিরুদ্ধে আজ পথে নামার সময় শুধু নয়, সর্বাত্মক আন্দোলনের সময়। আজ দেশকে বাঁচাতে, সংগঠিত এবং অসংগঠিত ,সব অংশের মানুষকে বাঁচাতে হবে।
প্রতিবেদনটি সমাপ্ত হল।
বাকি পর্বের লিঙ্ক নিচে দেওয়া হলঃ
প্রথম পর্ব , দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব , পঞ্চম পর্ব , ষষ্ঠ পর্ব

প্রকাশ: ১৯-জানুয়ারি-২০২৬
শেষ এডিট:: 19-Jan-26 09:41 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/unorganized-workers-chronicle-of-darkness - exists in postID 32076
Categories: Fact & Figures
Tags: gig, labour, labour code, gig worker
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (171)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (155)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (82)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতি
- ওয়েবডেস্ক
মানুষের উপরেই ভরসা রাখার পথনির্দেশ
- প্রদোষকুমার বাগচী
পুঁজিবাদী উন্নয়নের ভ্রান্ত প্রতিশ্রুতি
- প্রভাত পট্টনায়ক





