২০২৩ সালের নভেম্বরে GW231123 নামে একটি অভূতপূর্ব মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত হয়েছে LIGO-Virgo-KAGRA
[1] (সংক্ষেপে LVK) নামক পারস্পরিক সহযোগিতায়। এই ঘটনায় সংযুক্ত কৃষ্ণগহ্বরদ্বয়ের ভর ছিল সূর্যের থেকে যথাক্রমে ১৩৭ ও ১০৩ গুণ, যেটা ‘মাস গ্যাপ’ নামক একটি রহস্যময় পরিসরে পড়ে। এই আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত গবেষক দেবনন্দিনী মুখার্জি সহ একদল বিজ্ঞানীর নিরলস প্রচেষ্টা। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে ভারতীয় বিজ্ঞান গবেষণার কী চিত্র ফুটে উঠে? মহিলা গবেষকদের জন্য এই পথ কতটা বন্ধুর? আর কীভাবে গড়ে তুলতে পারি আরও কার্যকর গবেষণা ব্যবস্থা? দেবনন্দিনীর সাক্ষাৎকার থেকে উঠে এসেছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
GW231123: কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ?
GW231123 মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে ভারী কৃষ্ণগহ্বর সংযুক্তি। এখানে একটি কৃষ্ণগহ্বরের ভর সূর্যের ১৩৭ গুণ, অন্যটি ১০৩ গুণ। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই কৃষ্ণগহ্বরদ্বয়ের ভর ‘মাস গ্যাপ’-এর মধ্যে পড়ে, যেখানে সাধারণভাবে কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হওয়ার কথা নয়। এটি মহাবিশ্বের বিবর্তন সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণভাবে ৬০-১৩০ সৌরভরের মধ্যে কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হওয়ার কথা নয় (কারণ এই পরিসরে নক্ষত্রগুলি অতিকায় Supernova হিসাবে বিস্ফোরিত হয়)। GW231123 এই তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে Hierarchical Merge তত্ত্বকে সমর্থন করে (যেখানে ছোট কৃষ্ণগহ্বরগুলি বারবার সংযুক্ত হয়ে বড় হয়)। উভয় কৃষ্ণগহ্বরই প্রায় সর্বোচ্চ সম্ভাব্য গতিতে ঘুরছিল, যা তাদের উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে।
বড় বৈজ্ঞানিক দলে ব্যক্তির স্বীকৃতি: একটি চ্যালেঞ্জ
লিগো-ভার্গো-কাগ্রা (LVK) সহযোগিতায় গবেষণাপত্রের লেখকদের নাম বর্ণানুক্রমে তালিকাভুক্ত করা হয়। ফলে, কে কোন অংশে অবদান রেখেছেন তা বোঝা কঠিন। দেবনন্দিনী বলেন, “মহিলা ও প্রান্তিক গবেষকদের জন্য এটি আরও কঠিন। আমাদের অবদান প্রায়ই উপেক্ষিত হয়, যা চাকরি, গবেষণা তহবিল ও নেতৃত্বের সুযোগকে প্রভাবিত করে”।
ভারতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার বর্তমান অবস্থা
১. অর্থসংস্থান ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা:
ভারতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ বাজেট সীমিত। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় সুবিধা কম।
উচ্চমানের গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সুপারকম্পিউটার ও ডেটা অ্যানালাইসিস সেন্টারের অভাব রয়েছে।
|
বিষয়
|
বর্তমান অবস্থা
|
প্রয়োজনীয় উন্নয়ন
|
|
গবেষণা বাজেট
|
GDP-এর মাত্র ০.৭% (চীনের ২.৪%, আমেরিকা-র ৩.৫%)
|
কমপক্ষে ২% বরাদ্দ জরুরি
|
|
সুপারকম্পিউটার
|
PARAM সিরিজ সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন
|
এক্সাস্কেল কম্পিউটিং ব্যবস্থা নির্মাণ
|
|
ডেটা অ্যাক্সেস
|
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল
|
জাতীয় ডেটা সেন্টার স্থাপন
|
২. মানবসম্পদ সংকট:
প্রতি লাখে গবেষক: ভারতে ১৫৬ জন (ব্রাজিল ৭০০, ইসরায়েল ৮৩০০) ।
মেধা পাচার: প্রতি বছর ৩০% ট্যালেন্ট বিদেশে পাড়ি জমায়।
৩. মহিলা বিজ্ঞানীদের প্রতিবন্ধকতা:
পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে মহিলাদের অংশগ্রহণ এখনও কম। মাত্র ১৮% (আন্তর্জাতিক গড় ৩০%) ।
পিএইচডি স্তরে ৪০% মহিলা, কিন্তু স্থায়ী পদে মাত্র ১৪%।
(Motherhood Penalty): মাতৃত্বকালীন ছুটির পর ৬০% মহিলা গবেষক কাজে ফিরতে পারেন না।
দেবনন্দিনীর মতে, “মহিলাদের জন্য নেটওয়ার্কিং কঠিন, এবং জাতি বা সংস্কৃতিভেদে বৈষম্য দেখা যায়” ।
৪. স্বীকৃতির অভাব:
বড় গবেষণা দলে ব্যক্তির অবদান প্রায়ই অস্পষ্ট থাকে, যা ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলে।
উন্নতি সম্ভব কীভাবে?
১) গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি: সরকারি ও বেসরকারি খাতে আরও তহবিল বরাদ্দ প্রয়োজন।
২) GIAN (Global Initiative of Academic Networks) এর মতো প্রকল্পের সম্প্রসারণ।
৩) CSR তহবিলের ২০% গবেষণায় বরাদ্দ বাধ্যতামূলক করা।
৪) ডিএসটি-র CURIE প্রোগ্রাম: শুধুমাত্র মহিলা গবেষকদের জন্য ল্যাব স্থাপন।
৫) ইন্ডিয়া রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’: বার্ষিক স্বীকৃতি প্রদান।
মহিলা বিজ্ঞানীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ: মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম, লিঙ্গ সমতা প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। ফ্লেক্সি-
ওয়ার্ক পলিসি: শিশুযত্ন কেন্দ্রসহ নমনীয় কর্মঘণ্টা।
স্বীকৃতি ও স্বচ্ছতা: গবেষণাপত্রে স্বতন্ত্র অবদান উল্লেখ করা উচিত।
CRediT (Contributor Roles Taxonomy): গবেষণাপত্রে কে কোন ভূমিকা রেখেছে তা উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা।
পরিশেষে
GW231123-এর মতো আবিষ্কার প্রমাণ করে যে ভারতীয় গবেষকরাও বিশ্ব পর্যায়ে অবদান রাখতে সক্ষম। তবে, বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে এগিয়ে নিতে চাই সুষ্ঠু পরিকল্পনা, সমর্থন ও ন্যায্য সুযোগ। দেবনন্দিনীর কথায়, ‘আমরা যখন GW231123 বিশ্লেষণ করছিলাম, তখন আমার জ্বর ছিল ১০১ ডিগ্রি। কিন্তু আমিই প্রথম নয় - একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী হিসেবে সংগ্রাম আমাদের রক্তে। আমি ভারতের বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে চাই’-
১) গবেষণা বাজেট ৩ গুণ বাড়ানো,
২) মহিলা বিজ্ঞানীদের জন্য ৫০% সংরক্ষণ,
৩) LIGO-India কে হাব করে তোলা।
‘বিজ্ঞান কোনো ব্যক্তির খেলা নয় - একটি সভ্যতার সমষ্টিগত প্রচেষ্টা’, এ মন্ত্রেই এগিয়ে যাক ভারতীয় গবেষণা।
তথ্যসূত্র:
১. LIGO-India White Paper (2023)
২. DST Annual Report 2022-23
৩. Nature India, Interview with Debnandini Mukherjee
[1] LIGO (লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজারভেটরি): যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক একটি প্রকল্প যেখানে দুটি ডিটেক্টর রয়েছে, একটি ওয়াশিংটনের হ্যানফোর্ডে এবং অন্যটি লুইসিয়ানার লিভিংস্টনে।
VIRGO: ইতালির ক্যাসিনায় একটি ৩ কিলোমিটার ইন্টারফেরোমিটার, যা ইউরোপীয় গ্র্যাভিটেশনাল অবজারভেটরি দ্বারা পরিচালিত।
KAGRA: জাপানের কামিওকায় একটি ৩ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ ইন্টারফেরোমিটার, যা ICRR, KEK এবং NAOJ দ্বারা পরিচালিত।
প্রকাশ: ১০-আগস্ট-২০২৫
শেষ এডিট:: 10-Aug-25 01:30 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/“we-built-the-tools-that-found-the-signal”-a-report
Categories: International
Tags: indian scientists,
modern science,
scientifictemper