কয়লা খনির অন্ধকারের গভীরে থাকে কত কথা

গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জী
কয়লা ক্ষেত্রে ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত এবং বেসরকারি সংস্থা এখানে মুনাফার তেমন কোন জায়গা পায়নি। কিন্তু ২০১৪–১৫ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে মনমোহন সিং সরকারের ২১৪ কোল ব্লক সুপ্রিম কোর্ট কতৃক বাতিল এবং পরবর্তী সময়ে প্রণীত Coal Mines (Special Provisions) Act, 2015 সমস্ত প্রেক্ষাপটকে বদলে দেয়।

১৭৭৪ সাল থেকে রাণীগঞ্জ কয়লাঞ্চল তার নিজের জঠরের আগুন থেকে গোটা ভারতের উত্তাপ ও শক্তির চাহিদার যোগানদার ছিল।এখন ২৪০ বছর পরও তার ক্ষমতা অটুট থাকলেও ভারত সরকারের আক্রমনে দেশী বিদেশী লুঠেরাদের আক্রমনে সে আজ ছিন্ন ভিন্ন -বেসরকারিকরণের ধাক্কাতে সে আজ বেসামাল। রাণীগঞ্জ কোল বেল্টের শ্রমিক শ্রেনীকে নুতন ধারার লড়ায়ে অভ্যস্ত হতে হচ্ছে। লড়াই চলছে এক সাথে বিজেপি ও তৃণমূলের সাঁড়াশি আক্রনের প্যাঁচের বিরুদ্ধে।
১৭৭৪ থেকে ১৯৭৩ দীর্ঘ পরিক্রমার পথে অনেক লড়াই আন্দোলন এবং আত্মত্যাগের পর ১৯৭৩ সালের ৩০ শে জানুয়ারি কোল মাইনস (ন্যাশনালাইজেশন) এক্ট ( ১৯৭৩) লোকসভাতে আইনের পরিনত হয়। সারা দেশের কয়লা খনি জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণের পর, প্রায় ৪১৪টি খনিকে ইসিএলের অধীনে আনা হয়। মজুরের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭২ হাজার এর পর বিংশ শতকের নয়ের দশকের প্রথম দিকে ইসিএলের শ্রমিক সংখ্যা পৌঁছে যায় ১,৮২,০০০ এ তার পর ১৯৯০- ৯১ সালে ইসিএলের শ্রমিক সংখ্যা একটু কমে হয় ১,৭৭,৮৮৯ জনে, ২০০০- ২০০১ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১,২৭,৪৫২,তে।
এবার শুরু হয় গানিতিক হারে মজুর সংখ্যা কমার পালা ২০১০ -১১ তে হয় ৮১,১২৮, ২০২০ -২১ এ হয় ৫৪,৮৬৬, ২০২৩-২৪ হয় ৪৮,৪৪৪, এবং এখন ২০২৫ সালে ইসিএলের কয়লা মজুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে শ্রমিক ও অফিসার মিলিয়ে ৪১,৯৪০ জন এবং অফিসার ২১১৪ জন ।ইসিএলের কর্মী সংখ্যা বিংশ শতকের আঠের দশক থেকে একবিংশ শতকের তিনের দশক পর্যন্ত অর্থাত মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে এক লক্ষের বেশি কমে গেল!কোন যাদু বলে এটা হল? কেউ বলবেন বিংশ শতকের নয়া অর্থনীতির এটা ফল। কেউ বলবেন লোকসান, ইত্যাদি নানা যুক্তির অবতারনা চলতেই থাকবে! কিন্ত এরকম একটা শ্রম নিবিড় প্রতিষ্ঠানে যেখানে প্রযুক্তির সাথে প্রয়োজন কঠোর কায়িক শ্রমের সেখানে এভাবে শ্রমিক সংখ্যা কমে যাওয়ারর একটাই অর্থ - ব্যক্তিমালিকার ফাঁদে ইসিএলকে ফেলে দেওয়া।তবুও যুক্তির খাতিরে ব্যক্তি মালিকদের প্রবক্তাদের কু যুক্তিকে মেনে নিলেও বাস্তবতা কিন্তু অন্য কথা বলছে।
আসলে ভারতে বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেনীর নেতৃত্বে বুর্জোয়া ও জমিদারদের যারা ধনতান্ত্রিক পথে বিকাশের লক্ষ্যে বেশি বেশি করে আন্তর্জাতিক ফিন্যান্স পুঁজির সঙ্গে সহযোগিতায় লিপ্ত তারা ১৯৭৩ এর কয়লা খনি জাতীয়করণ আইনকে কখনোই মেনে নিতে পারে নি এরা ক্রমাগত ভারত সরকারের উপর চাপ বজায় রেখেছিল ১৯৭৩ এর কয়লাখনি জাতীয়করণ আইনের রাশ আলগা করে নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে।
ফলে কয়লা খনি জাতীয়করণের মাত্র তিন বছরের মধ্যে অর্থাত ১৯৭৬ সালে প্রথমবার বিরাষ্ট্রীয়করণের প্রক্রিয়া শুরু হয় ‘ক্যাপটিভ মাইনস’-এর নাম করে- খানিকটা হাল্কা হল কয়লা খনি জাতীয়করণের চাপ।
১৯৭৬ সালে সংসদে ‘কয়লা খনি জাতীয়করণ আইন-১৯৭৩’-র উপর সংশোধনী আনা হয় এবং ইস্পাত শিল্পের জন্য ‘ক্যাপটিভ মাইনসের’ ছাড়পত্র দেওয়া হলো। কিন্তু বলা হয় রেলে এই কয়লা পরিবহণ করা যাবে না। এর ফলে দেশের সরকারি এবং বেসরকারি ইস্পাত শিল্পের পক্ষে সহজ হলো কয়লা খাদান লিজ নেওয়া। ফলে এরা নিজের খনি পেল। ইসিএলের কাছ থেকে কয়লা কেনা বন্ধ করল। অনেকে ভাবলেন সমুদ্রের এক ঘটি জল কমল না বাড়ল তাতে ইসিএল ব এবং কোল ইন্ডিয়ার কি এমন ক্ষতি বৃদ্ধি হবে?তখন তো ইসিএল এবং কোল ইন্ডিয়ার একচেটিয়া ব্যাবসা! সে কার তোয়াক্কা করবে? কিন্ত এই বিষবৃক্ষের ফল ফলতে দেরি হল না।
এর পর দ্বিতীয় বার ১৯৮৯ - ৯০ সাল থেকে বিশ্ব অর্থনীতির চালচিত্র বদলে যেতে থাকে, শুরু হয় উদারনীতির বৃহত্তর উল্লফন এবং সাম্রাজ্যবাদের চাপ। ভারতের উদিয়ান বুর্জোয়াশ্রেণী আবার উৎসাহিত হয় কয়লা খনি বেসরকারিকরণের জন্য। সরকারকে চাপ দিতে থাকে ইসিএল কে পুনর্গঠিত করার জন্য। নিয়ে আসা হয় ICICI কে ।(Industrial Credit and Investment Corporation of India) এরা ECL এর পুনর্গঠন/আর্থিক পুনর্বিন্যাস রিপোর্ট পেশ করে ইসিএল-এর কাছে তাতে ৬৪ টি কয়লা খনি বন্ধ করার সুপারিশ সহ নানা শ্রমিক বিরোধী সুপারিশ ছিল। এই রিপোর্টের বিরুদ্ধে সিটু সমস্ত ইউনিয়ন কে ঐক্যবদ্ধ করে - শুরু হয় প্রবল ঐক্যবদ্ধ আন্দেলন। ইসিএল বাধ্য হয় আই সি আই সি আই -এর রিপোর্ট প্রত্যাহার করতে। তবুও ইসিএলকে আর্থিক ভাবে পঙ্গু করে তার সম্পদ কব্জা করার চক্রান্তে বিরতি দেয় না শাষক শ্রেনি।
ততদিনে বিশ্ব অর্থনীতির চালচিত্র বদলে গেছে, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিরুদ্ধে লাগাতার চক্রান্ত এবং প্রচারে বিশ্ব উভ্রান্ত। এই সুয়োগে আবার আবার তৃতীয়বার ১৯৯৩ সালে ‘কয়লা খনি জাতীয়করণ আইন-১৯৭৩’ সংশোধন করে ব্যক্তি ও সরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ‘ক্যাপটিভ খনির’ অনুমতি দেওয়া হয়। এখানে এও বলা হয় সরকারি, বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের অভিজ্ঞতা নাও থাকে তারা সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানির সাথে যৌথ উদ্যোগে কয়লা উত্তোলন করতে পারবে। এবং রেলে কয়লা পরিবহণের যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে আরও কিছু কয়লা খনি চলে গেল বেসরকারি হাতে। এখানেই পুঁজিবাদীরা বিশ্রাম নিল না।
আবার চতুর্থবার ভারত সরকার ১৯৯৬ সালে ‘কয়লা খনি জাতীয়করণ আইন-১৯৭৩’-কে সংশোধন করে ব্যক্তি মালিকদের সিমেন্ট ও সার কারখানার জন্য ‘ক্যাপটিভ মাইনসের’ অনুমতি দিল। এর ফলে সিমেন্ট ও সার কারখানা গুলে ইসিএলের কাছ থেকে কয়লা কেনা বন্ধ করে নিজের প্রয়োজন মত নিজের খনি থেকে কয়লা উৎপাদন করতে লাগল। এই ক্যাপটিভ মাইনসের নিয়মের ফলে কোল ইন্ডিয়া এবং ইসিএলের কয়লা শিল্পের উপর ব্যাবসার ইকচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই খর্ব হলেও ভারতের অন্যান সেক্টরে কোল ইন্ডিয়ার অধিনস্থ ইসিএলের ব্যাবসা ভালোই চলছিল। কিন্ত ভারত সরকারের এই শ্রম নিবিড় সংস্থাটিকে বন্ধ করে ব্যক্তি মালিকানাধীন করার চেষ্টার অন্ত ছিলনা। অন্য দিকে বামপন্থি তথা সিটু কয়লা ক্ষেত্রে অন্য সব ইউনিয়নকে একত্রিত করে যে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তার ফলে ভারতের উঠতি বুর্জোয়াশ্রেণীর সাহস হচ্ছিল না কয়লা সেক্টরকে একেবারে বেসরকারিকরণ করার।
কিন্ত চক্রান্তের অন্ত ছিলনা ফলে আবার পঞ্চমবার ২০০০ সালে ইসিএল-কে রুগ্ন শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে দিয়ে ২০০০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিআইএফআর-এ পাঠানো হয়। (বিআইএফআর কেস নং ৫০১/২০০০) তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কমরেড জ্যোতি বসু। তিনি কয়লা খনির সিটু নেতৃত্ব কে বলেন আপনারা আন্দোলন করুন - বামফ্রন্ট সরকার থাকতে কোন কয়লা খনি বেসরকারিকরণ করতে দেওয়া হবে না। শুরু হল বি আই এফ আর - এর মাধ্যমে ইসিএল কে দেওলিয়া ঘোষনা করে লিকুইডেশনে পাঠানোর চক্রান্তের বিরুদ্ধে লড়াই। বার বার দিল্লীতে বি আই এফ আর এর সমন এবং তার বিরদ্ধে দিল্লীর ব্যাপার ভবনে বি আই এফ আর এর সামনে ইউনিয়নের তীক্ষ্ণ সওয়াল জবাব এবং বামফ্রন্ট সরকারের শিল্প দপ্তরের এই সওয়াল জবাবে সমর্থনে ফলে সিটু সহ সমস্ত ইউনিয়নের জয় লাভ, ব্যার্থ হয় ইসিলকে লিকুইডেশনে পাঠানোর চক্রান্ত। ২০১০ সালে ইসিএল বি আই এফ আর থেকে বার হয়ে আসে সামান্য কিছু সঝেতার মধ্যে। ইউনিয়ন গুলোকে মাত্র ১৩ টি কলিয়ারিতে ছোট আকারে আউট সোর্সিং পদ্ধতিতে ইসিএলকে উৎপাদন করার অনুমতি দিতে হয়।
কিন্তু বি আই এফ আর এ মামলা চলাকালীন আরও বড় চক্রান্ত শুরু করে তৎকালীন ইউ পি এ - ১ পরিচালিত কংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী ড: মনমোহন সিং সরকার। ২০০৮ সালে শেষ দিক থেকে ২০১৩ পর্যন্ত আবার ষষ্ঠবার ‘ক্যাপটিভ মাইন’ নাম করে কয়লা ব্লক বণ্টনের প্রক্রিয়া চলতে থাকে কংগ্রেসের ইউপিএ -১ সরকার। ২০০৮-২০১৩ পর্যন্ত ২১৪-টি কোল ব্লক ‘ক্যাপটিভ মাইনের’ নামে বণ্টন করা হয়। এক্ষেত্রে স্মরণ রাখা দরকার ২০০৩-২০০৮ পর্যন্ত ইউপিএ-০১ সরকারের সমর্থনে ছিল বামপন্থীরা যার ফলে নতুন করে কয়লা শিল্প বেসরকারিকরণের কোনো পদক্ষেপ তারা এই সময় নিতে পারেনি।
২০০৮ সালের জুলাই মাসে ইউপিএ-০১ সরকার থেকে সাম্রাজ্যবাদের কৌশলের সাথে কংগ্রেস সরকারের সমঝোতার বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান নিয়ে বামপন্থীরা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর সরকার থেকে সমর্থন তুলে নেন। তখন কংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী স্বশ্তির নিশ্বাস ফেলে ২১৪ টি কয়লা ব্লক প্রাইভেট মালিক দের দেবার ব্যবস্থা করেন। এটা হল কয়লা শিল্প কে বেসরকারিকরণ করার পঞ্চম প্রচেষ্টা।
পর্বরতী কালে বিজেপি সরকারও ২০১৪ সালে কয়লা শিল্প কে বেসরকারিকরণ করতে উঠেপড়ে লাগে কিন্ত কয়লা শ্রমিকদের লাগাতার আন্দোলনের এবং জনগণের চাপে করা ২০১৯ পর্যন্ত সেটা বিজেপি পেরে ওঠেনি। এত সব চক্রান্তের বিরুদ্ধে কয়লা খনির শ্রমিকরা বার বার লড়াই আন্দোলন হড়তালে গিয়েছেন। কয়লা কতৃপক্ষও সরকারী মদতদার দের দিয়ে কম অত্যাচার করেনি মজুরদের উপর। তা সত্বেও কয়লা মজুররা লাগাতার প্রচার আন্দোলনে গিয়েছেন। সাথে নিয়েছেন এই কয়লাঞ্চলের গ্রাম শহরের নানা পেশার সাথে যুক্ত জনতাকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন তথ্য বলছে ১৯৯১ সালে নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত কয়লা শ্রমিকরা ৩২ বারের বেশি হরতাল করেছেন। লেখকের ৪০ ,বছর ধরে কয়লা খনির শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে যতটকু নিজের কাছে তথ্য আছে তার সুত্র ধরেই এই ৩১ বার হরতালের তথ্য পেশ করা হল - সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
১) ২৯ নভেম্বর ১৯৯১ সালে ১৬ জুন
২) ১৯৯২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর
৩) ১৯৯৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ৪) ১৯৯৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ৫)১৯৯৮ সালের ১১ মে
৬) ২০০০ সালের ১৬ এপ্রিল
৭ ) ২০০২ সালে ৫ ই আগষ্ট
৮) ২১ মে, ২০০৩
৯ ) ২০০৪ সালে ২৩ থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি,
১০) ২০০৪ সালে ৫ থেকে ৭ মে ১১) ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৫,
১২) ২০০৬ সালে ১৪ ডিসেম্বর ১৩) ২০০৭ সালে ৩০ শে অক্টোবর ১৪) ২০০৮ সালে ৭ই মে
১৫) ২০০৮ সালে ২০ শে আগষ্ট ১৬) ২০১০ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি ১৭) ২০১০ সালে ৫ ই মে
১৮) ২০১০ সালে ৭ ই সেপ্টেম্বর ১৯) ২০১১ সালে ১০ অক্টোবর
২০) ২০১১ সালে ২২ জুন
২১) ২০১২ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২২) ২০১২ সালে ২০ শে সেপ্টেম্বর,
২৩) ২০১৩ সালে ২১ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি
২৪) ২০১৫ সালে ৬ থেকে ৭ জানুয়ারি
২৫) ২০১৫ সালে ২ রা সেপ্টেম্বর ২৬) ২০১৬ সালে ২ রা সেপ্টেম্বর ২৭) ২০১৯ সালে ৮ থেকে ৯ জানুয়ারি
২৮) ২০১৯ সালে ২৫ সেপ্টেম্বর ২৯) ২০২০ সালে ২ থেকে ৪ জুলাই
৩০) ২০২২ সালে ২৮ থেকে ২৯ মার্চ
৩১) ২০২৫ সালে ৯ জুলাই এই ৩১ বারে মোট ৪৩ দিন কয়লা খনি বেসরকারিকরণে বিরুদ্ধে হরতালে গিয়েছেন।
কয়লা মজদুরদের সমস্ত লড়াই আন্দোলন কে দমন করার জন্য গুন্ডাবাহীনিকে সামনে রেখে সরকারের পুলিশ, সি আই, এস এফ, মাফিয়াতন্ত্র , কয়লা শ্রমিকদের উপর চরম নির্যাতন চালিয়েছে। তবুও এ ধরনের গুন্ডা রাজ নিকেশ করার ক্ষমতা এবং অভিজ্ঞতা কয়লা শ্রমিকদের ১৯৪০ বা তার আগের থেকে লড়াইয়ের থেকে উপলব্ধ। তা সত্বেও বর্তমান তৃণমলী পুলিশের নির্যাতন ও ভুয়ো মামলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা কয়লা খনির শ্রমিকদের নুতন করে নতন করে শিখতে হচ্ছে। এই লড়াই আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন কম: জগবন্ধু মন্ডল, ভরত সিং, আনারুল হক, তপন ব্যানার্জী ,বিরধা গোপ, রাজদেও সিং এর মত লড়াকু আগোয়ান কয়লা শ্রমিক নেতৃত্ব।
জীবন প্রাণ লড়াই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ইসিএলের সি আই টি ইউ নেতৃত্ব কয়লা খনির শ্রমিক সংখ্যা কম করে দেবার চক্রান্ত, বেসরকারিকরণ এখনো ঠেকিয়ে রেখেছেন। এ সব সত্বেও ইসিএলের কিন্ত কেন্দ্রের বিজেপি আর রাজ্যের তৃণমূল সরকার যে হেতু একই নৌকার যাত্রী তাই দুই সরকারই ইসিএলের বারটা বাজাবার কাজে সমান ওস্তাদ। দিল্লী ওয়ালা বিজেপি কয়লা শিল্প কে বেসরকারি - করণের জন্য আইন তৈরী করছে আর সেই আইনের ফাঁক দিয়ে আদানি-আম্বানীদের হাত ধরে বিজেপির যজম ভাই তৃণমূলের মাফিয়ারা কয়লা ক্ষেত্রে পুঁজি নিবেশ সহ মাফিয়াবাজীকে শিল্পে পর্যায়ে নিয়ে চলছে।পর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৭৩ সাল জাতীয়- করণের সময় ইসিএলের মোট কয়লানির সংখ্যা ছিল ৪১০টি, কিন্ত এখন কয়লা থাকা সত্বে ও নানা ওজর আপত্তি দেখিয়ে সরকার এবং ইসিএল কতৃপক্ষ অর্দ্ধেকের বেশি খাদান কতৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছে এর উদ্দেশ্য এর এই বন্ধ কলিয়ারী গুলোকে ব্যক্তি মালিকদের হাতে তুলে দেওয়া কারণ বিজেপি সরকার কয়লা খনি জাতীয়করণ আইন ১৯৭৩ কে সংশোধন করে সেই হাতিয়ার কতৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছে। মোদির বিজেপি সরকার Coal Mines (Special Provisions) 2015 বিলটি ৩০ মার্চ ২০১৫-তে পাস হয়। মজার কথা বিল যেদিন লোক সভাতে আনা হয় সে দিন সিপিআই ( এম ) সিপিআই, কংগ্রেস তার বিরোধিতা করলেও তৃণমূলের সাংসদরা লোক সভা থেকে ওয়াক আউট করে - মোদির ভালোই হল। বাংলাতে একটা কথা আছে " বাবা ম'ল ভালোই হল দুটো হুঁকো আমার হল।" ওয়াক আউট আর সমর্থন একই ব্যাপার। মোদি বুঝল তৃণমূল "Coal Mines (Special Provisions) 2015" তৃণমূল সমর্থন করল। ফলে অচিরেই Coal Mines (Special Provisions) Act 2015" লাগু হল ২১ অক্টোবর ২০১৪ থেকে। কারন এই বিলটি যে দিন লোক সভাতে আনা হয় তখন তাতে লেখা ছিল বিলটি আইনে পরিনত হলে এটা কার্যকর হবে ২০১৪ থেকে। ফলে মনমোহন সিং সরকারের যে ২১৪ টি কোল ব্লক অনিয়ম হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছিলেন। সে গুলো ব্যক্তি মালিকদের বরাদ্দ করতে আর কোন বাধা রইল না। বুঝতেই পারছেন সেই ব্লকগুলোকে স্বচ্ছ ই-নিলাম ও সরকারি - বেসরকারী সংস্থাকে সরাসরি বরাদ্দ করার অজুহাতে দুইভাবে আবার বণ্টন করার জন্যই এই আইন আনা হয়।
দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না মোদি আর বিজেপি যুক্তি দেখাচ্ছে কয়লা বণ্টনকে পরিষ্কার ও প্রতিযোগিতামূলক করা, বিদ্যুৎ–ইস্পাত–সিমেন্টের মতো শিল্পে নিয়মিত কয়লা পৌঁছানো, বেসরকারি সংস্থাকে খনি খনন ও বিক্রিতে সুযোগ দেওয়া এবং সরকারের আয় বাড়ানোর জন্য এই আইন করা হয়েছে।আইনে বলা হয়েছে—নিলাম পরিচালনার জন্য একটি Nominated Authority থাকবে, যে দ্রুত খনি হস্তান্তর করবে এবং আগের বরাদ্দপ্রাপ্তদের বকেয়া নির্ধারণ করবে। কোন কোন কোম্পানি নিলামে অংশ নিতে পারবে, নিলাম কীভাবে হবে, আগের allottee-দের কী কী দায়িত্ব আছে—এসব বিষয়ও ধারাগুলোতে পরিষ্কার বলা আছে। পুরনো লিজ বাতিল হওয়ার পরে নতুন নিলামজয়ী সংস্থা সহজে mining lease পাবে এবং আগের স্থাপনা বা জমির জন্য prior allottee ক্ষতিপূরণও পাবে। প্রথমে কিছু খনিতে “end-use” মানে নির্দিষ্ট শিল্পে ব্যবহারের শর্ত ছিল, পরে আইন সংশোধন করে বাণিজ্যিক মাইনিং-এর অনুমতিও দেওয়া হয়।
কিন্তু ১৯৭৩ সালের কয়লাখনি জাতীয়করণ আইনের উদ্দেশ্য ছিল কয়লা সম্পদকে সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা। লক্ষ্য ছিল জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, শিল্পক্ষেত্রে জ্বালানির স্থায়ী যোগান নিশ্চিত করা, এবং নিরাপত্তা–পরিবেশ রক্ষায় সরকারি কঠোর নজরদারি বজায় রাখা। এই আইনের ফলে কয়লা উৎপাদন ও বাণিজ্য মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা—বিশেষত কোল ইন্ডিয়ার কয়লা ক্ষেত্র একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় ।অর্থাৎ কয়লা ক্ষেত্রে ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত এবং বেসরকারি সংস্থা এখানে মুনাফার তেমন কোন জায়গা পায়নি।
কিন্তু ২০১৪–১৫ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে মনমোহন সিং সরকারের ২১৪ কোল ব্লক সুপ্রিম কোর্ট কতৃক বাতিল এবং পরবর্তী সময়ে প্রণীত Coal Mines (Special Provisions) Act, 2015 সমস্ত প্রেক্ষাপটকে বদলে দেয়। পুরনো বরাদ্দ বাতিলের পর সরকার ই–নিলামের ব্যবস্থা চালু করে এবং বেসরকারি সংস্থাকে বাণিজ্যিক খননের অনুমতি দেয়। End-use restriction শিথিল হয়, প্রতিযোগিতা বাড়ে, এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে কয়লা বিক্রি করে লাভ করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। এতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে যায়, যা জাতীয়করণের মূল আদর্শের বিপরীত। যদিও আইনগতভাবে জাতীয়করণ আইন এখনও আছে, কিন্তু তার কার্যকর স্পিরিট এখন অনেকটাই ক্ষীণ। কারণ মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে থাকলেও ব্যবহারের অধিকার, উৎপাদন ও মুনাফার বড় অংশ আজ বেসরকারি সংস্থার কাছে উন্মুক্ত। ফলে বলা যায়—২০১৫ সালের আইন জাতীয়করণ পুরোপুরি বাতিল না করলেও এর মূল নীতি, অর্থাৎ রাষ্ট্রায়ত্ত একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি, বাস্তবে প্রায় ভেঙে দিয়েছে।
ফল স্বরুপ ই সিএল - এ বর্তমানে চালু খনির সংখ্যা সংখ্যা ৬৬ টি এর মধ্যে টি ভূগর্ভস্থ খনি ৫০ টি এবং খোলা মুখ খনি ১৬টি। শুধু ২০১১ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ টি ভূগর্ভস্থ খাদান ইসি এল বন্ধ করে দিয়েছে। ইসিএলের বর্তমান শ্রমিক সংখ্যা ৪১৯৪০ এর মধ্যে মহিলা শ্রমিক মাত্র ৩৭০০ জন। এ ছাড়াও অফিসার ২১১৪ জন তা প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে। এখন বিজেপি সরকারের কয়লা খনি সংক্রান্ত নুতন আইন "কোল মাইনস স্পেশ্যাল প্রভিশন এক্ট ২০১৫" কার্যকর হওয়ার পর থেকে কয়লা শিল্পে বেসরকারী করনের ব্যপক প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। এবং দ্রুত গতিতে কয়লাখনির অনেক গুলোকে বেসরকারী মালিকদের মাধ্যমে বহুজাতিকদের হাতে তুলে দেবার কাজ কেন্দ্রীয় সরকার শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই ইসিএলের ৪ টি কলিয়ারী বেসরকারী মালিকদের হাতে তুলে দিয়েছে। আরও ২৪টা খাদান তুলে দেবার কথা চলছে। এ সবের বিরুদ্ধে আমাদের সিটু পরিচালিত ভারতের কলিয়ারী মজদুর সভার নেতৃত্বে কয়লা শিল্পের শ্রমিকরা অন্যান্য ইউনিয়ন গুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে লড়াই শুরু করেছেন। এছাড়াও আউট সোর্সিং এর মাধ্যমে বেসরকারী কোম্পানি গুলোকে দিয়ে যে কয়লা উৎপাদন হচ্ছে সেই কলিয়ারী গুলোতেও শ্রমিকদের উপর তৃণমূল সরকারের গুন্ডাবাহীনির মদতে মধ্যযুগীয় কায়দায় শোষন নির্যাতন চলছে। এসবের বিরুদ্ধেও লড়াই আন্দোলন চলছে।
এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে একটা কয়লা খনিতে দুই ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থা চলছে। একই কলিয়ারীতে স্থায়ী শ্রমিকরা কাজ করছেন আবার ঐ কলিয়ারীতে ঠিকাদারের মাধ্যমে আধুনিক পালন মেশিন বসিয়ে উৎপাদন চলছে। এদের বেতন কম আর এদের আলাদা রাখা হয়, স্থায়ী শ্রমিকদের সাথে এদের মেলামেশা নাই আসে মেশিন নিয়ে মেশিনের মত কাজ করে প্রচুর উৎপাদন করে কাজ শেষে নিজের কোম্পানির ডেরাতে চলে যায়। এরা কলিয়ারীতে ঠিকাদারের কনটিনিউয়াস মাইনার্স নামে হাঙ্গুরে মেশিনের মাধ্যমে মাটির নিচে থেকে অবিশ্বাস্য হারে কয়লা উপরে তুলে আনছে। যখন ইউনিয়ন গুলো হরতাল ডাকে তখন এরা কাজ করে। এদের জোর করে বাধা দেওয়াও যাবে না কারন এই কোম্পানি গুলোর সাথে সরাসরি দিল্লীর যোগা যোগ সামান্য সমস্যা হলে এরা দিল্লীতে ফোন করে সেখান থেকে ইসিএল এ ফোন ! সোজা সি আই এস এফ এবং পুলিশ সহ রকমারী প্রশাষনের হামলা শুরু হয় মজুর দের উপর।এখন কার্যত উৎপাদন নামক হাতিয়ার যা স্থায়ি মজদুরদের বড় হাতিয়ার সেটাই কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
যখন ইউনিয়ন গুলো হরতাল ডাকে এই সব ঠিকাদারদের শ্রমিকরা হরতালের বাইরে থেকে উৎপাদন করে।আসলে শ্রমিক শ্রেণির লড়াইয়ের মুল হাতিয়ার উৎপাদনের রাশ নিজের হাতে রাখা। বিজেপি সরকার Coal Mines (Special Provisions) Act, 2015 র মাধ্যমে কয়লা শিল্প ব্যাপক বেসরকারিকরণ এবং দেশী ও বিদেশী ফিন্যান্স ক্যাপিটালের হাতে ভারতের কয়লা শিল্পকে তুলে দিয়ে স্থায়ী মজুর শুন্য কয়লা শিল্প গড়ে তুলতে চাইছে। মেকানাইজেশন ও মাল্টিনাইজেশনের, ও প্রাইভেটাইজশনের বিরুদ্ধে আবার ভারতের কয়লা শ্রমিকদের লড়াইয়ে নুতন ধরনের কোশল রপ্ত করতে হচ্ছে।
কারন Coal Mines (Special Provisions) Act, 2015 লাগু হওয়ার ফলে গত কয়েক বছরে তীব্র গতিতে সারা দেশের কয়লা ক্ষেত্রে ১) মাইন ডেভলপার এন্ড অপারেটার (Mine Developer and Operator) বা (MDO) সিস্টেম - সংক্ষেপে যার অর্থ এরা চুড়ান্ত আধুনিক প্রথাতে অস্থায়ী কয়লা মজদুরদের মাধ্যমে কয়লা উৎপাদন করবে। এবং ইসিএল কে ঐ কয়লা দেবে ইসিএল বা কোল ইন্ডিয়া এই বাবদ MDO সিস্টেমের মালিকদের চুক্তি অনুসারে টন প্রতি টাকা দেবে ২) রেভিনিউ শেয়ারিং সিস্টেম (Revenue Sharing system) সংক্ষেপে যার অর্থ, কিছু ঠিকা কোম্পানি নিজেরা চুড়ান্ত আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অস্থায়ী মজদুর দিয়ে কয়লা তুলবে এবং নিজের ইচ্ছে মত দামে বিক্রি করবে। আর তার পর লাভ হলে টন প্রতি ৪ থেকে ৮ % লাভের অঙ্ক থেকে ইসিএল বা কোল ইন্ডিয়াকে দেবে ৩) আউট সোর্সিং পদ্ধতি : কোল কোম্পানি এবং ইসিএল ঠিকাদারের মাধ্যমে কয়লা তুলে নিজের ঘরে রাখবে এবং বেচবে। ৪) ক্যাপটিভ মাইনস তথা কোল ব্লক বন্টন , কোল ইন্ডিয়া এবং ইসিএল বিভিন্ন দেশী, বিদেশী কোম্পানী যাদের পন্য উৎপাদন করতে কয়লার দরকার হয়। তাদের অর্থের বিনিময়ে বড় বড় কয়লা খনি দেবে এবং এরা এখান থেকে কয়লা তুলে নিজ কোম্পানির উৎপাদনের কাজে সেই কয়লা ব্যবহার করবে। যেমন সরকারী ও বেসরকারী ইস্পাত, বিদ্যুত, এন টি পি সি বা এরকম আরও অনেক কারখানা। ৫) এবং কোন কোম্পানি যদি মনে করে নিজের কারখানার জন্য বিদেশ থেকে কয়লা আমদানী করলে লাভ হবে তাহলে সেটাও করতে পারবে।
এখন কয়লা শিল্পে কোল ইন্ডিয়ার এবং ইসিএলের নিজস্ব উৎপাদন ব্যাবস্থা ছাড়াও
১) মাইন ডেভলপার এন্ড অপারেটার সিস্টেম - Mine Developer and Operator) বা (MDO
২) Revenue Sharing system
৩) আউট সোর্সিং পদ্ধতি
৪) ক্যাপটিভ মাইনস সিস্টেমে পুরোদমে চালু হয়ে গিয়েছে।
তার সাথে বিদেশ থেকেও কয়লা আমদানী হচ্ছে। এর ফলে কয়লা উৎপাদন এবং বিপননের ক্ষেত্রে কোল ইন্ডিয়া এবং ইসিএলের যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল তা ভেঙ্গে গিয়েছে। ইসিএলের অনেক কয়লা খনি বন্ধ হয়ে গিয়েছে তা পুর্বের দেওয়া হিসাব থেকেই বুঝতে পারছেন। এবং শ্রমিক সংখ্যাও তলানিতে ঠেকে গিয়েছে। শুধু তাই নয় যে কোল ইন্ডিয়ার শ্রমিক সংখ্যা এক সময় ৬ লক্ষের বেশী ছিল তা এখন ২ লক্ষ ২০ হাজারের কাছাকাছি হয়ে গিয়েছে।
ফলে আমাদের রাজ্যে ইসিএলের মোটামুটি খাটিয়া খাড়া। ইসিএলের মোটামুটি খাটিয়া খাড়া গত এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রাইভেটাইজেশনের ফল ফলতে শুরু করেছে - ব্যপক হারে আউট সোর্সিং, ক্যাপটিভ মাইনস, এম ডি ও, রেভিনিউ শেয়ারিং, এর ফলে দেশে চালু ১৯৭৩ এর কয়লা খনি জাতীয়করণ আইন কার্যত বাতিল হয়ে নুতন ২০১৫ সালের আইনের কারনে এসব হচ্ছে। তার পর এন টি পি সি কয়লা কেনা কমিয়ে দিয়েছে তারা বলছে বিদ্যুতের চাহিদা নাই। এ ছাড়াও তাদের নিজেদের ক্যাপটিভ খনি থেকে নিজেরা কয়লা তুলে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে নিচ্ছে। ভারতের সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার পাওয়ার প্লান্ট গুলো বিদেশ থেকে কয়লা আনছে। কারন সমুদ্র পথে ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া থেকে কম দামে ভাল মানের কয়লা তারা পেয়ে যাচ্ছে। দেশের ছোট বড় ইস্পাত কারখানা গুলো, ডব্লু,বি পি ডি সি এল, ডি পি এল সহ বিভিন্ন বিদ্যুত কারখানা ও অন্যান্য কারখানা যারা ক্যাপটিভ মাইনস পেয়েছে তারাও নিজেদের প্রয়োজন মত নিজেরা কয়লা নিজেদের ক্যাপটিভ মাইনস থেকে তুলে তাদের চাহিদা মিটিয়ে নিচ্ছে। এখন ইসিএলের কয়লা কেনার এখন কেউ নেই।
তার পরেও যারা ইসিএল থেকে কয়লা কিনতে আসছে তাদের কাছে বিশেষ ট্রাকে করে যারা কয়লা কিনতে আসছে সেই ট্রাক গুলোর থেকে থেকে গুন্ডাদের ট্রাক প্রতি ৬০০ থেকে ১২০০ টাকা দাদা ট্যাকস, আবার সাইডিং যে মাল গাড়ি গুলো আসছে বিভিন্ন কোম্পানির থেকে কয়লা কিনতে তাদের কাছেও ৫,০০,০০০, টাকা থেকে ১০,০০,০০০ টাকা দাদা ট্যাক্স! দাদাদের না এই ট্যাক্স না দিলে মাল গাড়ি সাইডিং থেকে বার হতে দেওয়া হচ্ছে না। মাফিয়াতন্ত্রের এত অত্যাচারের ফলে ই সি এলের কয়লা আর কেউ কিনতে আসছে না। ফলে ইসিএলের কয়লা বিক্রি হচ্ছে না। তার পর গোদের উপর বিষ ফোঁড়া ইসিএলের সাইডিং গুলোতে কয়লার সাথে ব্যপক পাথর মাটি মেশান হচ্ছে। কে আর পাথর মাটি দেওয়া কয়লা পয়সা দিয়ে কিনবে? ইসিএলের আফিসার থেকে রাজ্য সরকারের পুলিশের একাংশ মাফিয়াতন্ত্রের চাপে ভয়ে কিছু বলতে পারছে না। এ এক অদ্ভুত অবস্থা! এলাকার বসদের ও তাদের চ্যালাদের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ - সাত মহলা প্রাসাদ! বিরাট প্রাচীর! দামি দামি গাড়ি - সুন্দর বাগান বাড়ি। ফুটের দোকানদার এখন এক একটা এলাকার অর্দ্ধেক জমির মালিক।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে ই সিএলের ব্যাপক মিস ম্যানেজমেন্টে। এই মিস ম্যানেজমেন্টের জন্য কয়লা উৎপাদন হলেও কয়লার খদ্দের নাই। এ যেন এক অতি উৎপাদনের সংকট!এখনি ইসিএলের প্রায় ১৫০০০ কোটি টাকার সর্টেজ। গত ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালে অক্টোবর পর্যন্ত ইসিএলের লোকসানের পরিমান ৫৫০% - অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটা ঘটনা। গত দুই মাস ধরে শ্রমিকদের বেতন সময়ে হচ্ছে ।না যা অবস্থা চলছে তাতে ইসিএলের অবস্থা ভয়াবহ। ব্যক্তি মালিকানাতে ইসিএল এর চলে যাওয়া শুধু সময়ের অপক্ষা। ইসিএল খতম মানে পশ্চিম বর্ধমান জেলা তথা রাজ্যের এক ভয়ানক অবস্থা। রাজ্যর গৌরব খতম!
তবে ঘটনা তো ঘটনাই তাকে লুকনোর কোন জায়গা নেই। সে জন্যই এসব বিষয়ের অবতারনা করা হল। আর আমাদের কয়লা শিল্পের আজকের এই অবস্থার জন্য দায়ী দিল্লীর দাদা আর পশ্চিমবঙ্গের দিদির পুঁজিবাদী তোষন এবং মাফিয়া রাজের সরকার। কিন্তু গত ২৫০ বছরের অধিক কাল ধরে কয়লা শ্রমিকদের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইকে আজ পর্যন্ত কেউ খাটো করতে পারেনি। নয়া উদারবাদী নীতির ফলে গত ১৫/ ২০ বছর ধরে পুঁজিবাদের নয়া কৌশলের ভ্রান্তি ধীরে ধীরে হলেও কাটিয়ে উঠছে কয়লাঞ্চলের শ্রমিক শ্রেনী।নিজের অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে লাল ঝান্ডা নিয়ে পুঁজিবাদের মুখ ভেঙ্গে দেওয়ার মত ক্ষমতা তারা দেখাবেই - অপেক্ষা শধু সময়ের।

প্রকাশ: ১৭-ডিসেম্বর-২০২৫
শেষ এডিট:: 17-Dec-25 08:42 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/there-are-so-many-stories-hidden-in-the-darkness-of-the-coal-mine
Categories: Fact & Figures
Tags: coal india, coalsectorindia, coa
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (155)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (141)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
আমরা তিমির বিলাসী নই, তিমির বিনাশী হতে চাই
- শমীক লাহিড়ী
রবীন্দ্রনাথ, ফ্যাসিবাদ ও লাল পার্টি
- ময়ূখ বিশ্বাস
ভারতে বৃটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ফলাফল
- কার্ল মার্কস
বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে: পলিট ব্যুরো বিবৃতি
- পলিট ব্যুরো
মহম্মদ সেলিমের বিবৃতি
- মহম্মদ সেলিম

.jpg)



