মোপল্লা বিদ্রোহ: একটি পুনরালোচনা

Author
পুলাপ্রে বালাকৃষ্ণন

কীভাবে তাঁরা ২৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পৌঁছলেন, তা অজানা। তাঁরা হয়তো বিদ্রোহীদের সাহায্যেই পথ পেরিয়ে বেঁচে ফিরেছিলেন, কারণ শ্বশুরপক্ষ পরবর্তীকালে বিদ্রোহে অভিযুক্ত কিছু মাপ্পিলার পক্ষে মাদ্রাজে গিয়ে সওয়াল করেছিলেন।

The Moplah revolt: A Retrospect

ভূমিকা

মোপল্লা বিদ্রোহ, কেউ কেউ বাংলায় মোপলা’ এভাবেও লিখেছেন।

১৯২১, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনাধীন ভারতবর্ষ। অসহযোগ আন্দোলনের জের চলছে সারা দেশ জুড়ে। দেশীয় রাজাদের আওতাধীন এলাকাগুলিকে এ আন্দোলনের বাইরে রাখা হলেও, মালাবারে দরিদ্র কৃষকদের বিদ্রোহ ঘটল, ইতিহাসে তাকেই মোপল্লা বা মোপলা বিদ্রোহ বলে চিহ্নিত করা হয়।

অনেকই এ বিদ্রোহের চরিত্রকে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন, নিজেদের মতো করে মতামতও জানিয়েছেন। সার্বিক দৃষ্টিতে এদের দুভাগে বিবেচনা করে চলে।

একদিকে রয়েছেন ব্রিটিশ শাসক ও উচ্চ-বর্ণজাত হিন্দুদের এক গোষ্ঠী। এদের বক্তব্য ঐ বিদ্রোহ একেবারেই সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনামাত্র, যার জন্য দায়ী মুসলমান’রাই। তথ্য জানলে অবশ্য কারোরই বুঝতে অসুবিধা হয় না, এরা সরাসরি একপেশে বিচার করেছেন এবং ইচ্ছা করেই করেছেন।

আরেকদিকে রয়েছেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো কয়েকজন। এরা সাম্প্রদায়িক বিষপ্রচারের পিছনে থাকা প্রকৃত আর্থ-রাজনৈতিক কারণকে খুঁজতে আন্তরিকভাবেই আগ্রহী ছিলেন। তারা চিহ্নিত করেছিলেন এ হল ব্রিটিশ শাসকের প্রত্যক্ষ সমর্থনপুষ্ট অত্যাচারী জমিদার- সামন্ত প্রভুদের বিরুদ্ধে দরিদ্র কৃষকসমাজের বিদ্রোহ। এরাও নিজেদের বক্তব্য ব্যতীত অন্য যেকোনো তথ্যকে এড়িয়ে গেছেন।

মহাত্মা গান্ধী এ দুই অবস্থানের মাঝে আটকে ছিলেন, জমিদারেরা কোন সম্প্রদায় আর কৃষকদের সামাজিক পরিচয় কি সেসব বিস্তারিত খোঁজ নিয়েই বুঝেছিলেন আসলে কি ঘটেছে, কেন ঘটেছে।

১৯২১ সাল, ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ তখন বারো বছরের ছেলে। বিদ্রোহের পরিস্থিতিতে নিজের পরিবারের সঙ্গে পাঁচ মাস এক আত্মীয়ের বাড়িতে কাটিয়েছিলেন। তার স্মৃতিকথায় পাওয়া যায় যাত্রাপথে রেল স্টেশন ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় ব্রিটিশ পুলিশের রীতিমত কড়া পাহারার ব্যবস্থা দেখে ঐ প্রথম তিনি উপলব্ধি করেন ব্রিটিশ শাসক আসলে কেমন।

কিন্তু এখানেই শেষ না, ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ শুধুই স্মৃতিকথা লেখেননি।

১৯৪৬, ঐ বিদ্রোহের ২৫ বছর পূর্তিতে দেশাভিমানি পত্রিকায় ই এম এস নাম্বুদিরিপাদের লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিল, ‘দ্য কল অ্যান্ড ওয়ার্নিং অফ ১৯২১’। এমন শিরোনাম বিশেষ মনোযোগ দাবী করে, একদিকে ‘দ্য কল’ আবার আরেকদিকে ‘দ্য ওয়ার্নিং’। এ প্রবন্ধেই মোপল্লা বিদ্রোহের এক নির্মোহ, সার্বিক ও মার্কসবাদী বিশ্লেষণ স্পষ্ট হয়। ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ স্পষ্ট করেন ঐ বিদ্রোহ অবশ্যই ঔপনিবেশিক ও জমিদারী শাসনের বিরোধী সংগ্রাম। আবার এ কথাও তুলে ধরেন দরিদ্র কৃষকদের ন্যায্য দাবীকে দমন করার উদ্দেশ্যে জমিদারেরা ব্রিটিশ প্রশাসনকে এমনই উত্যক্ত করেছিল আর তার সুবাদে ব্রিটিশ প্রশাসন যেরকম ভয়ানক অত্যাচার ও নিপীড়নের কৌশল নেয় সম্ভবত তারই সুযোগ নিয়ে বিদ্রোহের অভিমুখ পাল্টে দেওয়া যায়। অর্থাৎ এ ইতিহাসের দুটি পর্যায় রয়েছে।

এমন নিশ্ছিদ্র বিশ্লেষণ আমাদের দেশের ইতিহাস চর্চায় কিছুটা বিরল, সেদিনও, আজও।

আর এখানেই ই এম এস নাম্বুদিরিপাদের অনন্য কৃতিত্ব।

আজ মোপল্লা বিদ্রোহের ইতিহাসকে ফিরে দেখার উদ্দেশ্যে রাজ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সঙ্গে তাই ই এম এস নাম্বুদিরিপাদের লেখা সেই ঐতিহাসিক ইঙ্গিতকে যুক্ত করা হল।

তথ্য বিকৃতির বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মার্কসবাদীদের কিভাবে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চা করতে হয়, দৃঢ় থাকতে হয় তারই অন্যতম উদাহরণ ঐ শিরোনাম- ‘দ্য কল অ্যান্ড দ্য ওয়ার্নিং’।      

পুলাপ্রে বালাকৃষ্ণন

‘২০২১- আগস্ট মাসে মালয়ালম ভাষায় মাপ্পিলা লাহালা নামে পরিচিত এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নথিতে মপল্লা রেবেলিয়ন নামে উল্লেখিত ঘটনার শতবর্ষ পূর্ণ হল। ১৯২১ সালে মালাবারে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। যারা সে সময়ে বেঁচে ছিলেন তাঁদের জন্য এটি ছিল এক যুগান্তকারী সময়। এই ঘটনাগুলির অ্যাকাডেমিক ইতিহাস পাওয়া গেলেও ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা খুব বেশি নেই। যতটা সম্ভব স্মৃতিকথার কাছাকাছি পৌছনোর জন্য আমি ৯২ বছরের এক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম তিনি এ বিষয়ে কতদূর কী জানেন। তিনি তখনও জন্মাননি, কিন্তু ছোটবেলায় বড়দের কাছ থেকে যা শুনেছিলেন সেসবই আমাকে বলেন।’

যিনি আমায় স্মৃতি থেকে শুনিয়েছিলেন, তার পরিবার এরনাড় অঞ্চলের ভেলাকুলাম গ্রামে বাস করতো। তারা ছিলেন জমিদার শ্রেণির মানুষ, বেশিরভাগ মুসলমান চাষিদের কাছে জমি ইজারা দিয়ে রাখতেন, যাদের স্থানীয় ভাষায় মাপ্পিলা বলা হত। তাঁর বাবা ছিলেন গ্রামের অধিকারি, যিনি ঔপনিবেশিক শাসনের পক্ষ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করতেন- যেটা চাষিদের কাছে বিদেশি শাসকদের জুলুম বলে মনে হত।

সুরক্ষার আশ্বাস

বিদ্রোহ শুরু হলে স্থানীয় মাপ্পিলারা গভীর রাতে তাঁদের বাড়িতে আসেন অধিকারির সাথে কথা বলতে। তখন তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ, কিন্তু পরিবারের মাতৃকূলের জ্যেষ্ঠ পুরুষ ছিলেন। মহিলারা তাঁকে বাইরে যেতে মানা করেছিলেন, কিন্তু তিনি যান। তাঁরা তাঁকে ‘আচা’[1] বলে সম্বোধন করে বলেন তাঁরা তাঁর পরিবারকে রক্ষা করতে এসেছেন। তাঁর রাইফেলটি তাঁরা নিয়ে নেন - এটি তাঁকে নিরস্ত্র করার জন্য নাকি নিজেদের সুরক্ষার জন্য, তা অজানা। পরবর্তী কয়েকদিন তাঁরা বাড়ির সামনে অবস্থান নেন। পরে খবর পান, বাইরের অঞ্চল থেকে কিছু শত্রুভাবাপন্ন মাপ্পিলা আসছে, তাই তৎক্ষণাৎ পালাতে হবে।

মাপ্পিলারা তাঁদের কোত্তাক্কাল কোভিলাক্কাম (সমূথিরি রাজ্যের প্রাচ্য প্রান্তের রাজপ্রাসাদ)-এ নিরাপদে পৌঁছে দেন। ভবিষ্যদ্বাণীর মতোই তাঁদের সতর্কবার্তা সঠিক প্রমাণিত হয়- ফিরে এসে সেই পরিবার দেখে, থেকে যাওয়া এক শ্রমিকের হাত কেটে ফেলা হয়েছে।

অন্য পরিবারের কাহিনী

বর্ণনাকারীর শ্বশুরের পরিবার পারাপ্পনাঙ্গাদিতে বাস করত। শ্বশুর ছিলেন মুনসিফ কোর্টের আইনজীবী। তাঁদের স্থানীয় সমর্থন ছিল না, তবে তাঁরাও কোত্তাক্কাল কোভিলাক্কামে আশ্রয় নেন। কীভাবে তাঁরা ২৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পৌঁছলেন, তা অজানা। তাঁরা হয়তো বিদ্রোহীদের সাহায্যেই পথ পেরিয়ে বেঁচে ফিরেছিলেন, কারণ শ্বশুরপক্ষ পরবর্তীকালে বিদ্রোহে অভিযুক্ত কিছু মাপ্পিলার পক্ষে মাদ্রাজে গিয়ে সওয়াল করেছিলেন।

নির্জনে বসবাসরত প্রপিতামহী

বর্ণনাকারীর মাতামহী পবিত্রতার জীবনে গ্রামীণ এস্টেটে থাকতেন। তখন স্থানীয় মাপ্পিলারা তাঁর সুরক্ষায় এগিয়ে আসেন। তিনি নাকি হেসে বলেছিলেন, “আমাকে শুধু গোপালনের কাছে নিয়ে চলো”। তাঁকে সম্ভবত পালকিতে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনিও বেঁচে ফিরে আসেন।

কোন বিদ্বেষ নেই

আমাকে এখন প্রকাশ করতে হবে যে বর্ণনাকারী আমার মা (যদিও তা গুরুত্বপূর্ণ নয়)। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম যে কীভাবে তাঁর বড়রা ১৯২১ সালের সেই সর্বনাশা ঘটনাবলী তাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছিলেন। তারা তাঁকে মানুষের ভাষায়- সহজ গল্প বলেছিলেন, তাদের মাপ্পিলা ভাড়াটেয়াদের বীরত্বের গল্প, যারা তাদের বাঁচাতে নিজেদের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করেছিল, এবং তাদের পরিবারের কারানাভানের লড়াইয়ের উপর তাদের গর্ব। এই বর্ণনায় কোনো তিক্ততা নেই, নেই কোনও প্রতিশোধের আহ্বান, নেই নিপীড়নমূলক জমিদারিত্বের কলঙ্ক মোছার চেষ্টা।

অন্যদিকে, আমার পরিবারেরর বড়রা স্পষ্টভাবে দেখেছিলেন যে শেষ পর্যন্ত যে অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা ছিল তাদের অঞ্চলের সকল মানুষের জন্যই একটা বিয়োগান্তক ঘটনা। সেই মাপ্পিলাদের জন্য, যারা- নিপীড়নমূলক কৃষি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল এবং পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছিল, তারা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল। ব্রিটিশরা পরাজিতদের মালাবার থেকে একটি মালবাহী গাড়ী দিয়ে রেল করে বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের অনেকেই মারা গিয়েছিলেন। সেই হিন্দুদের জন্য যাদের জমিদারী প্রথার সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু তবুও তাদের উপর আরেকটি ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার অপমান সহ্য করতে হয়েছিল। এবং শেষ পর্যন্ত, তাদের জন্যও যারা ঐ দুঃস্বপ্নের থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন, কিন্তু তাদের উপাসনালয়গুলিকে অসম্মানিত হতে দেখতে হয়েছিল। যেমন ১৯৯২ সালে কিছু উন্মত্ত দুষ্কৃতিদের দ্বারা বাবরি মসজিদকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখতে হয়েছিল।

১৯২১ সালে মালাবারে সংঘটিত ঘটনাবলী সম্পর্কে আমি পরিবারের বড়দের থেকে যে সমস্ত গল্প শুনেছি, তাতে মানবিকতা এবং সুন্দর সমাপ্তি ছিল। কিন্তু সব গল্পের বেলায় তেমনটি হয়েছিল বলা যায় না। আমাদেরকে এমন সব গল্পই এমনকি অসুবিধাজনক গল্পগুলিকেও শেষ অবধি মেনেই নিতে হবে। কারণ এসবই আমাদের একত্রে বসবাসের অতীত দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এক সাধারণ সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য আরও ভালভাবে প্রস্তুত করতেও সাহায্য করে।

 

মূল লেখাটি ‘দ্য হিন্দু’তে ২৭ আগস্ট, ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত

লেখক অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক

বাংলা ভাষান্তরঃ অঞ্জন মুখোপাধ্যায়

ওয়েবডেস্কের পক্ষে ভূমিকাঃ সৌভিক ঘোষ

 

[1] মালায়ালম ভাষায়, ‘আচা’ শব্দের অর্থ ‘বাবা’। এটি একটি সাধারণ শব্দ যা বাবাকে সম্বোধন করার জন্য ব্যবহৃত হয়, ঠিক যেমন ইংরেজিতে ‘ফাদার’ বা ‘পাপা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। কিছু প্রসঙ্গে, এটি একজন বয়স্ক, সম্মানিত পুরুষ ব্যক্তিত্বকে বোঝাতেও ব্যবহার করা যেতে পারে।


প্রকাশ: ২০-আগস্ট-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 20-Aug-25 04:30 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-moplah-revolt-a-retrospect
Categories: Fact & Figures
Tags: colonialhistroy, ems namboodiripad, historianscraft, histroyofindia
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড