সঙ্ঘ নারী সংগ্রাম - ৯

Author
চন্দন দাস

১৯৭৫-এ রাজ্যে প্রথম মহিলা খেতমজুররা সম্মেলন করেন। তখন জরুরী অবস্থা। হাড়োয়ায় সেই সম্মেলনে ছিলেন ১০৪জন। সিপিআই(এম)-র ত্রয়োদশ রাজ্য সম্মেলনের রিপোর্ট জানাচ্ছে,‘‘তার মধ্যে কেবল আদিবাসী মেয়েরাই নয়, মুসলিম খেতমজুর মেয়েরাও থাকেন এবং বেশ কয়েকজন আলোচনায় শরিক হন। এ রকম সম্মেলন পশ্চিমবাংলায় প্রথম।’’

Sangh Women's Struggle-9

নবম পর্ব

স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিতে হয়েছে মহিলাদের। পশ্চিমবঙ্গে ক্রমশ প্রভাবহীন হয়ে পড়েছে হিন্দু মহাসভা। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ চেষ্টা করেছে প্রভাব বাড়ানোর। কিন্তু সফল হয়নি। 
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ কখনও খাদ্যের দাবিতে, কখনও গণতন্ত্রের দাবিতে লড়াই করেছে। সে সময় বামপন্থীদের বিকাশের সময়। স্বাধীনতার কুড়ি বছরে রাজ্যে অকংগ্রেসী সরকার গড়ে উঠেছে। ১৯৬৭-র পর ১৯৬৯—  আবার যুক্তফ্রন্ট সরকার হয়েছে। দুটি সরকারেই বামপন্থীরা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। মাঝে আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের মোকাবিলা করতে হয়েছে মানুষকে। ভিয়েতনাম তখন লড়ছে মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে রাজ্যে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ভাঙার চক্রান্ত শুরু হয়ে গেছে। আবার উত্তরবঙ্গের কৃষক সংগ্রামের ভুল ব্যাখ্যা করে শুরু হয়েছে নকশালবাড়ি আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য।
১৯৭৭-এর জুনে রাজ্যে গড়ে উঠেছে বামফ্রন্ট সরকার। কিন্তু কোনও পর্যায়েই মহিলাদের লড়াই থামেনি। তার চরিত্র বদলেছে। একসময় ‘কৃষির সাফল্যের ভিত্তিতে শিল্পে অগ্রগতি’ ছিল বামফ্রন্ট সরকারের কর্মসূচির প্রধান বিন্দু। তার পালটা মমতা ব্যানার্জি হাজির করেছিলেন ‘কৃষি বনাম শিল্প’-এর ভাষ্য। এই দুই মতের সংগ্রামে রাজ্যের মহিলাদের স্বার্থ জড়িত ছিল এবং আজও আছে। কারণ, কাজের দাবিতে ক্রমাগত সোচ্চার হতে থাকা মানুষের মধ্যে মহিলাদের অনেকে ছিলেন। ভূমিসংস্কারে মহিলারাও উপকৃত হয়েছেন। পঞ্চায়েত, পৌরসভায় পরিচালনায় তাঁরা যুক্ত হয়েছেন। তা গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে তাঁদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত করেছে। আবার কৃষির সাফল্যের উপর ভিত্তি করে শিল্পে অগ্রগতির সঙ্গে জড়িত ছিল ভূমিসংস্কার এবং পঞ্চায়েতের টিকে থাকার প্রশ্ন। পাশপাশি ছিল শিক্ষার অঙ্গনে এগিয়ে আসা নারীদের কাজের প্রশ্ন। ফলে শিল্পের জন্য সংগ্রাম ছিল মহিলাদের আরও এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রামের অংশ। উলটোটা ছিল প্রতিক্রিয়ার টান—  সমাজকে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়ার চক্রান্ত ছিল ‘কৃষি বনাম শিল্প’র স্লোগানের মধ্যে। যা সমাজে সঙ্ঘের দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্তের অনুসারী ছিল।
মোদ্দা কথা—  কাজের দাবি, কর্মসংস্থানের দাবি, চাকরির দাবি, স্বনির্ভরতার দাবি ছিল মহিলা আন্দোলনের প্রধান দাবি
দেখা যাবে, রাজ্যের মহিলা আন্দোলনে, মহিলাদের দাবির মধ্যে এই দাবিগুলি বরাবরই ছিল। তা কখনও সামনে এসে পড়েছে সময়ের দাবির সঙ্গে তাল মিলিয়ে। 
১৯৭৫-এ রাজ্যে প্রথম মহিলা খেতমজুররা সম্মেলন করেন। তখন জরুরী অবস্থা। হাড়োয়ায় সেই সম্মেলনে ছিলেন ১০৪জন। সিপিআই(এম)-র ত্রয়োদশ রাজ্য সম্মেলনের রিপোর্ট জানাচ্ছে,‘‘তার মধ্যে কেবল আদিবাসী মেয়েরাই নয়, মুসলিম খেতমজুর মেয়েরাও থাকেন এবং বেশ কয়েকজন আলোচনায় শরিক হন। এ রকম সম্মেলন পশ্চিমবাংলায় প্রথম।’’
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্যেই তখন রাজ্যে খেতমজুরদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন চলছিল। প্রায় ছ’ হাজার গ্রামে খেতমজুরদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। প্রভাব পড়েছিল আরও প্রায় পাঁচ-ছ’ হাজার গ্রামে। খেতমজুর ও গরিব কৃষকদের মধ্যে বিপুল উদ্দিপনা দেখা দেয়। সামগ্রিকভাবে এই অর্থনৈতিক আন্দোলন রাজ্যের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিল। সেই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন খেতমজুর, গরিব কৃষক পরিবারের মহিলারা।
হলোও তাই। সেই আন্দোলনগুলিই ভূমিসংস্কার এবং পঞ্চায়েত গড়ে তোলার পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করেছিল। একইসঙ্গে তা সামন্ততন্ত্রের লালন পালনে আধিপত্য কায়েম করে বসে থাকা লিঙ্গ বৈষম্যকে জোরালো আঘাত করেছিল। কৃষিপ্রধান দেশে জমির মালিকানার সঙ্গেই যুক্ত আছে মহিলাদের প্রকৃত অধিকারের প্রশ্ন। আর মহিলাদের হাতে জমির অধিকারের প্রশ্নে দেশে এখনো সবার আগে পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যে যত পাট্টা বিলি হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে তার মধ্যে ৬ লক্ষের বেশি যৌথ মালিকানার। অর্থাৎ পরিবারের জমিতে স্ত্রী-পুরুষ দুজনেরই সমান অধিকার। শুধু মহিলারা পাট্টা পেয়েছেন ১লক্ষ ৬২ হাজারের বেশি। মোট বন্টিত পাট্টার প্রায় ৩০শতাংশের অধিকারী রাজ্যের মহিলারা। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, কেরালা ছাড়া দেশে গরিব, ভূমিহীন কৃষকের হাতে জমির অধিকার তুলে দেওয়ার কাজ প্রায় হয়নি। ফলে গরিব, ভূমিহীন পরিবারের মহিলাদের জমির অধিকারী করে তোলার কাজ সারা দেশে প্রায় কল্পনার স্তরে আছে। এই ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে দুটি যুক্তফ্রন্ট এবং পরবর্তীকালে বামফ্রন্ট সরকার। 
ভূমিসংস্কারের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল পঞ্চায়েতের প্রয়োজনীয়তা। ১৯৭৮-এ প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন। মহিলাদের কোনও সংরক্ষণ ছাড়া নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতা প্রথম থেকেই দেখা গেছে। যেমন ১৯৮৮। পঞ্চায়েতে ৫৭০৫জন মহিলা নির্বাচিত হন। পঞ্চায়েত সমিতিতে ৪০৭জন এবং জেলা পরিষদে ২৪জন মহিলা জয়ী হয়েছিলেন। এই ধারা ক্রমাগত প্রসারিত হয়েছে।
চতুর্থ পঞ্চায়েত নির্বাচন ১৯৯৩-এ। তার আগে রাজ্যের পঞ্চায়েত আইন সংশোধন করে বামফ্রন্ট সরকার। চালু হয় পঞ্চায়েতে মহিলাদের এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ। সংবিধানে এই সংক্রান্ত সংশোধন তারপরে। রাজ্যে ১৯৯৩-র নির্বাচনে প্রায় ৫৬হাজার সদস্যের মধ্যে প্রায় ২২হাজার মহিলা সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৮-এ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ পদাধিকারীদের ক্ষেত্রেও চালু হল। অর্থাৎ প্রধান, উপপ্রধান থেকে সভাধিপতি, সহ-সভাধিপতি পদও মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হল। ৭জন সভাধিপতি মহিলা হলেন। উত্তর ২৪ পরগনায় অপর্ণা গুপ্ত, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় শোভা দত্ত, হাওড়ায় ছায়া সেন চৌধুরী, কোচবিহারে চৈতি বর্মন, জলপাইগুড়িতে দীপ্তি দত্ত, মালদহে শেফালি খাতুন এবং বাঁকুড়ায় তরুবালা বিশ্বাস।
ভূমিসংস্কার এবং পঞ্চায়েত, পৌরসভা গ্রাম-শহরে সামন্ততন্ত্রর প্রভাব দুর্বল করেছিল। কিন্তু সামন্ততন্ত্র মরেনি। লোকসভায় মহিলাদের আসন সংরক্ষণের পক্ষে মহিলাদের লড়তে হয়েছে। আবার ঘরে, বাইরে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধেও তাকে লাগাতার লড়তে হয়েছে। 
ওই সময়কালে মহিলাদের ১২লক্ষের বেশি স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। চাকরিতে, কাজে মহিলাদের অংশ গ্তরহণ বেড়েছে। বেড়েছে নারীশিক্ষা। সামগ্রিকভাবে সাক্ষরতার হারও বেড়েছে পুরুষ এবং নারীর। নারী নির্যাতনের প্রশ্নে সরকারের মনোভাব নিঃসন্দেহে আগের যে কোনও সময়ের থেকে বেশি কঠোর ছিল। 
কিন্তু সমাজ? ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নারীমুক্তির আন্দোলন’ শিরোনামের প্রবন্ধে অধ্যাপিকা, গবেষক মালিনী ভট্টাচার্য লিখেছেন,‘‘এদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও পরিচিতিসত্তার রাজনীতির সঙ্গে লিঙ্গ-অসাম্যের গভীর যোগ রয়েছে।  কমিউনিস্টরা যে এইসব সামাজিক রক্ষণশীলতার পারস্পরিক নাড়ির যোগকে চিহ্নিত করতে কখনো ভয় পাননি। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুজফ্‌ফর আহমদের ‘নারী নির্যাতন’ ও ‘আসল কথাটা কি?’ লেখাদুটিতে তার নজির আছে। সাম্প্রদায়িক হিংসা যখন নারী নির্যাতনের সমস্যাকে তীব্রতর করে তোলে তখন হিন্দু ভদ্রলোকদের পরিচালিত সংবাদমাধ্যমে তা আক্রান্ত হিন্দুনারী ও আক্রমণকারী মুসলমান পুরুষের সমস্যা হিসাবেই পরিবেশিত হয়। তার ফলে যেকোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে নারীকে ভোগ অথবা নির্যাতনের বস্তু মনে করার মূল প্রবণতা সাম্প্রদায়িক প্রচারের আড়ালে চলে যায়।’’
সমাজের এই প্রবণতায় লুকিয়ে ছিল সাম্প্রদায়িকতা। 
আর একটি সমস্যাও ছিল। পঞ্চায়েতে মহিলা সদস্য বাড়ছে। লড়াই সংগ্রামে নারীদের অংশ গ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু পঞ্চায়েত, পৌরসভায় নির্বাচিত মহিলা সদস্যদের পরিচালনা করার চেষ্টা করেছেন স্বামী অথবা প্রভাবশালী কোনও পুরুষ। মহিলাদের এসবের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে। 
কারণ—  জানিয়েছিল খোদ পার্লামেন্ট। 
১৯৯৬ সালে তৎকালীন সাংসদ গীতা মুখার্জি সংসদে ও জনপরিসরে ৩৩শতাংশ আসন সংরক্ষণের পক্ষে মুখর হন। তর্ক বিতর্কের মধ্য দিয়ে বিলটির খসড়া তৈরি হয়েছিল। তা সংসদের জয়েন্ট সিলেক্ট কমিটিতে যায়। সেই কমিটির সুপারিশ ছিল সংরক্ষণের মধ্যে সংরক্ষণের কথা—   যা সরকার গ্রহণ করেছিল। রাজ্যে রাজ্যে বিলটি যখন গ্রহণ করা হবে তখন বিশেষভাবে ওবিসি সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচিত হবে এই আশ্বাস দিয়েও প্রথম ইউপিএ সরকারের আমলেও সেই বিলটি পাশ করানো যায়নি। ২০১০-এ রাজ্যসভায় তা পাশ হয়েছিল। তার পিছনেও ছিল বামপন্থীদের ভূমিকা। কিন্তু লোকসভায় কয়েকটি আঞ্চলিক দল ধুয়ো তুললেন ওবিসি-সংরক্ষণ তখনই না হলে আম-মহিলা এ আইনের সুযোগ নিতে পারবেন না। শারদ যাদবের মতো সেই সাংসদদের অনুযোগের আড়ালে বিল আটকানোর অজুহাত ছিল— এর ফলে ‘চুলছাঁটা’ আধুনিক শহুরে মেয়েরাই সংসদে অগ্রাধিকার পাবে।
সেই বিলটিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০১৯ পর্যন্ত। মোদী তার সাফল্য দাবি করে বসেছেন। আর অমিত শাহ্‌ সাংসদদের অনুরোধ জানিয়েছিলেন ‘শ্রী গণেশ’-এর নামে বিলটি পাশ করিয়ে দিতে।
কিন্তু যাঁদের কথা অজুহাত হিসাবে খাড়া করে সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিল আটকানো হয়েছিল, সেই পিছিয়ে থাকা অংশের মহিলারা আজও সংসদে পৌঁছতে পারেননি। আগে হয়ে গেলে তাও কিছুটা সম্ভব হলেও হতে পারতো
প্রকাশ: ০৩-সেপ্টেম্বর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 03-Sep-25 20:31 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/sangh-womens-struggle-9
Categories: Fact & Figures
Tags: tribal woman, woman struggle, cpim state conference
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড