ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের ভূমিকা (৬ষ্ঠ পর্ব)

১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বোম্বাই, করাচি ও মাদ্রাজে ভারতীয় নৌবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহের অভুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি এক চরম রূপ ধারণ করল। জাহাজগুলির মাস্তুল থেকে ব্রিটিশ পতাকা ‘ইউনিয়ন জ্যাক’ অপসারিত করে তার পরিবর্তে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের পতাকা উত্তোলন করা হলো। বোম্বাই শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ মিছিলে নৌবাহিনীর শিক্ষার্থীরা ঐ পতাকা দুটির পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাও বহন করেছিল এবং ‘জয় হিন্দ’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘হিন্দু-মুসলিম এক হও’, ‘আইএনএ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’, ‘আমাদের দাবি মানতে হবে’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়েছিল।

৬ষ্ঠ পর্ব
'করেঙ্গে-ইয়া-মরেঙ্গে': আপসের জন্য সংগ্রাম
১৯৪২ সালের ঘটনায় ফিরে আসা যাক। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে যে পরিবর্তন, সেটা যে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বের গোচরে আসেনি, একথাটা বলা সঠিক হবে না। কংগ্রেসের প্রস্তাবে চিন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধশেষে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় যে প্রচণ্ড একটা সঙ্কটের বিস্ফোরণ ঘটবে এবং তার সূত্র ধরে আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহের পারস্পরিক বিন্যাস যে ভারতের অনুকূলে আসবে, বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি তা দেখতে ব্যর্থ হয়েছিল। তারা ভেবেছিল যে, আপস করতে হলে সেটা যুদ্ধ চলতে থাকাকালেই করতে হবে, নচেৎ সে সুযোগ একেবারেই হারাতে হবে। অতএব, তারা এক ক্ষিপ্র ও স্বল্পায়ু সংগ্রামের ডাক দিল এবং গান্ধীজী আহ্বান জানালেন ‘করেঙ্গে-ইয়া-মরেঙ্গে’।
ব্রিটিশ সরকার একটা প্ররোচনামূলক পন্থায় গান্ধীজী সমেত সমস্ত জাতীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করে বসল। এতে জনসাধারণ ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল এবং সমস্ত দেশজুড়ে জায়গায় জায়গায় সংঘর্ষ ঘটতে লাগল। এই সমস্ত সংঘর্ষ ঠেকাতে পুলিস ও সামরিক বাহিনী হিংসাত্মক ও বর্বর দমনপীড়ন চালিয়েছিল। ফলে বহু লোক মারা গেল, বহুজন আহত হলো।
সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, ১৯৪২ সালের আগস্ট মাস থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬০,২২৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছিল, ভারতরক্ষা আইনে আটক করা হয়েছিল ১৮,০০০ ব্যক্তিকে, পুলিশ বা সেনাবাহিনীর গুলিতে ৯৪০ জন খুন ও ১,৬৫০ জন আহত হয়েছিল। কংগ্রেসের বেশ কিছু সংখ্যক বামপন্থী নেতা সে সময়ে আত্মগোপন করেছিল এবং সেখান থেকেই তাদের সংগ্রাম চালানো হতো। তবে কোন রকম কর্মসূচি না থাকায় ধারাবাহিক ও সুদৃঢ় সংগ্রামের পথে জনগণকে পরিচালিত করতে তারা অক্ষম ছিল।
এই সংগ্রাম ও তার পরিণতি ব্রিটিশ সরকার অনুসৃত নীতির উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। গান্ধীজীকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল ১৯৪৪ সালে; কিন্তু তারপর তাঁর দিক থেকে আর কোন সংগ্রামের কথা শোনা যায়নি। 'করেঙ্গে-ইয়া-মরেঙ্গে' কর্মসূচি যুদ্ধের মধ্যে চালু করা সত্ত্বেও সেই সংগ্রাম ব্যর্থ হলো কেন? প্রথম কারণ, এটা ছিল শুধুমাত্র একটা আপসে পৌঁছানোর জন্য সংগ্রাম। এটা যদি বাস্তবে 'করেঙ্গে-ইয়া-মরেঙ্গে' সংগ্রাম হতো তাহলে একটা রেলওয়ে ধর্মঘটের ডাক দিয়েই কংগ্রেস গোটা প্রশাসনকে অচল করে দিত পারত সেখানে শ্রমিকরাও দ্রুত সাড়া দিতে পারত। এটা যে কোন আন্তরিক সংগ্রাম ছিল না তা পরবর্তীকালে বোঝা গিয়েছিল, যখন দেখা গেল, এই সংগ্রাম যে কংগ্রেস-ই শুরু করেছিল সেই দাবিকে একের পর এক কংগ্রেস নেতা অস্বীকার করছে। ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে প্রকাশিত নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল ও জি বি পন্থ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল যে, “এআইসিসি বা গান্ধীজীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন আন্দোলনই শুরু করা হয়নি”। তার আগে, ১৯৪৩ সালে ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে লেখা এক চিঠিতে গান্ধীজীও কার্যত একই কথা জানিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, সারা ভারত জুড়ে গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকলাপ এতটাই হিংসাত্মক 'ছিল যে, কংগ্রেসের প্রতি সহানুভূতিশীল জনগণ আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। তাদের এই আন্ত-নিয়ন্ত্রণ হারানোর ব্যাপারটির অর্থ এটা নয় যে কংগ্রেস এর সাথে যুক্ত।
আগস্ট আন্দোলনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হলে তবেই আলাপ-আলোচনা শুরু করা হবে বলে ব্রিটিশরা যে চাপ সৃষ্টি করেছিল, তারই পরিণাম ছিল এই দু'ধরনের কথাবার্তা। বহির্বিশ্বের প্রগতিশীল শক্তির সহানুভূতি থেকে তাদের যে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এই আগস্ট আন্দোলন, তারই উপলব্ধি সম্ভবত এর আর একটা কারণ।
তীব্র গণরোষের সেই সময়ে কমিউনিস্টদের আওয়াজ স্বাভাবিকভাবেই জনগণের কানে পৌঁছাল না। কমিউনিস্টরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল, যা ইতোপূর্বে কখনও ঘটেনি। যদিও বা জাতীয় নেতাদের গ্রেপ্তারকে কমিউনিস্টরা ধিক্কার জানিয়েছিল এবং তাদের মুক্তির দাবি করেছিল; যদিও বা জাতীয় ঐক্যের পক্ষে তারা আহ্বান জানিয়েছিল এবং কংগ্রেস-লিগ সরকারের কথা বলেছিল তথাপি হিন্দু-মুসলিম সমস্যা প্রসঙ্গে কংগ্রেসি নীতির সমালোচনার কারণে জনগণ ও তাদের মাঝে একটা প্রাচীর গড়ে উঠেছিল। বুর্জোয়া নেতৃত্ব যেটা চাইছিল, এর ফলে সেটাই ঘটল। যুদ্ধ পরবর্তী অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব কমিউনিস্টরা ধরে রাখতে সক্ষম হলো না, ব্রিটিশদের সাথে আপস আলোচনায় বুর্জোয়া নেতৃত্ব অবারিত সুযোগ পেয়ে গেল।
আগস্ট আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণের কাছে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে, নির্যাতন ভোগের অতিলৌকিক মহিমায় আলোকিত হয়ে এবং জনগণের মধ্যে নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধির দৌলতে বুর্জোয়া নেতারা এমন একটা অবস্থানে পৌঁছে গেল যে, তারা সেই নয়া গণ-অভ্যুত্থানকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে পারল।
যুদ্ধোত্তর আলাপ-আলোচনা কংগ্রেস এবং লিগের মধ্যে থাকা এক অলঙ্ঘনীয় ব্যবধান উদঘাটিত করে দিল। ভারতের স্বাধীনতার দাবিকে সঙ্কুচিত করতে ও তাকে আপসে পর্যবসিত করতে ব্রিটিশ সরকার এই সুযোগের সম্পূর্ণ ব্যবহার করেছিল।
ব্রিটিশ শাসকগণও ঐ সময়ে অবশ্য খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। জনসাধারণের গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ঐক্য গড়ে ওঠার ব্যাপারটা তারা লক্ষ্য করছিল। কংগ্রেস ও লিগ এই উভয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দও এই ঐক্যকে এক বিপদ মনে করে ভীত হয়ে উঠেছিল। তাছাড়া, যেসব এলাকায় কমিউনিস্ট পার্টি সক্রিয় ছিল এবং কৃষকদের উপর তাদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল, সেইসব জায়গায় এই গণ-অভ্যুত্থান কৃষি-বিপ্লবের অভিমুখে গতিশীল হয়ে উঠতেও শুরু করেছিল।
কমিউনিস্টরা এই বিকাশোন্মুখ অভ্যুত্থানকে লক্ষ্য করেছিল এবং নিজেদের অবস্থা দুর্বল থাকা সত্ত্বেও তাতে অংশগ্রহণ করার জন্য তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। এ কাজের দ্রুত সমন্বয়সাধনে ও তাকে একটা ব্যাপক জাতীয় চরিত্র দিতে এই দুর্বলতাই অবশ্য তাদের সম্মুখে একটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তা সত্ত্বেও কমিউনিস্ট পার্টিই ছিল একমাত্র পার্টি, যে পার্টি এতে সচেতনভাবে অংশগ্রহণ করতে সচেষ্ট ছিল এবং জনগণের রোষের এই অভিব্যক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।
সংগ্রামে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য
কংগ্রেস ও লিগ নেতৃবৃন্দের মধ্যে অনতিক্রম্য বাধা সত্ত্বেও যুদ্ধোত্তর অভুত্থানের মধ্য দিয়ে হিন্দু-মুসলিম জনগণ পরস্পরের খুব কাছাকাছি এসেছিল। বহুস্থানে বিক্ষোভকারীরা, কংগ্রেস ও লিগের পতাকা নিয়ে উপস্থিত ছিল এবং অন্যান্য অনেক জায়গায় তারা কংগ্রেস, লিগ ও কমিউনিস্ট পার্টি, এই তিন পতাকাই কাঁধে তুলে নিয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী ঘৃণা সাম্প্রদায়িক বাধাকে ভেঙেচুরে ক্রমাগত বেশি বেশি সংখ্যক মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তুলেছিল। কলকাতা, বোম্বাই এবং দেশের প্রধান প্রধান শহরে এই সময়ে বিক্ষোভকারীরা বহু উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে এই তিন দলের পতাকাই বহন করত।
শাহ্ নওয়াজ, সেহগল এবং ধীলনের মতো আইএনএ-র বীর অফিসারদের বিচারের কাঠগড়ায় তুলতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় জনগণের মনোভাব সম্পর্কে আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল। হিন্দু ও মুসলমানের মিলিত বিশাল বিশাল মিছিল সমস্ত দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ঐ ধৃত অফিসারদের মুক্তি দিতে তারা বাধ্য হয়েছিল।
আন্দোলনের ঢেউ অতঃপর শুধুমাত্র অসামরিক জনগণকেই ভাসিয়ে নিয়ে এগিয়ে চলল না, তা সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যেও বিস্তৃতি লাভ করল। সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে, বিশেষ করে বিমান ও নৌবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক আকারের ধর্মঘট দেখিয়ে করে দিল যে, ব্রিটিশ কর্তৃত্ব এবং তাদের শক্তির প্রধান অবলম্বনগুলি ভেঙেচুরে কতখানি খান খান হয়ে পড়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর এই মানুষগুলি ধর্মঘটে নেমে পড়েছিল এবং বোম্বাই শহরে বহুবার তিনটি দলের পতাকা কাঁধে মিছিল করে বের হয়েছিল।
বীরত্বপূর্ণ নৌবিদ্রোহ
১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বোম্বাই, করাচি ও মাদ্রাজে ভারতীয় নৌবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহের অভুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি এক চরম রূপ ধারণ করল। জাহাজগুলির মাস্তুল থেকে ব্রিটিশ পতাকা ‘ইউনিয়ন জ্যাক’ অপসারিত করে তার পরিবর্তে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের পতাকা উত্তোলন করা হলো। বোম্বাই শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ মিছিলে নৌবাহিনীর শিক্ষার্থীরা ঐ পতাকা দুটির পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাও বহন করেছিল এবং ‘জয় হিন্দ’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘হিন্দু-মুসলিম এক হও’, ‘আইএনএ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’, ‘আমাদের দাবি মানতে হবে’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়েছিল।
ভারতীয় নৌবাহিনীর এই বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম জনগণের সমর্থন লাভ করল। নৌবাহিনীর এই অভ্যুত্থানের প্রতি সংহতি জ্ঞাপনে বোম্বাইয়ে কমিউনিস্ট পার্টি এক সাধারণ শ্রমিক ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়ে এর সমর্থনে নেতৃত্ব দিয়েছিল। তিনদিন ধরে ঐ শহরে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর গুলিগোলা চলেছিল এবং রাস্তায় রাস্তায় এর প্রতিরোধে জনগণ ব্যারিকেড গড়ে তোলে। এই তিন দিনে সেখানে আড়াইশো মানুষ প্রাণ দিয়েছিল এবং কতজন যে আহত হয়েছিল, সেকথা কেউ জানে না।
“ভারতে, ১৯৪৬ সালের শুরুতে বিকাশোন্মুখ বিস্ফোরক পরিস্থিতিতে শক্তির বিন্যাস কী ধরনের ছিল তা অবিসম্বাদী স্পষ্টতা নিয়ে উদ্ঘাটিত করে দিয়েছিল বোম্বাইয়ের এই নৌবাহিনীর অভ্যুত্থান ও জনপ্রিয় সংগ্রামে পূর্ণ ফেব্রুয়ারি মাসের দিনগুলি। এই সমস্ত ঘটনাবলী এক এক দিক দিয়ে তৎকালীন আন্দোলনের উচ্চতার পরিমাপ, জনগণের সাহস ও সংকল্পের দৃঢ়তা এবং কংগ্রেস-লিগ ঐক্য ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতি ব্যাপক গণসমর্থনের বিষয়টা সুস্পষ্ট করে তুলেছিল। সুস্পষ্ট করে তুলেছিল যে, এই আন্দোলন সম্প্রসারিত হয়েছিল সশস্ত্র বাহিনী পর্যন্ত, সেই কারণে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিও আর নিরাপদ ছিল না। তেমন-ই তৎকালীন জাতীয় নেতৃত্বের মধ্যে অনৈক্য ও প্রস্তুতির অভাব এবং তৎপ্রসূত জাতীয় সংগ্রামে তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার অক্ষমতাও এর থেকে উদ্ঘাটিত হয়।
ঠিক যে সময়ে জনগণ প্রকৃতই আন্দোলনে নেমে পড়েছিল, যখন হিন্দু-মুসলিম ঐক্য গড়ে উঠেছিল ও কার্যত পরিলক্ষিত হচ্ছিল, যখন এক সাধারণ জাতীয় আন্দোলনের অঙ্গনে এসে সশস্ত্র বাহিনী ও অসামরিক জনগণ সম্মিলিত হয়েছিল এবং যে সময়ে স্বাধীনতা অর্জনে সকলে দরজা ঠেলে এগিয়ে এসেছিল সেই সময়েই জাতীয় আন্দোলনের উচ্চতর নেতৃত্বের মনোভাবে একটা সুস্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের উচ্চতর নেতৃত্ব গণ-আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করল এবং জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে আইন ও শৃঙ্খলার প্রতিভূস্বরূপ নিজেরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পাশে এসে দাঁড়াল।”
[আর পি দত্ত লিখিত “ইণ্ডিয়া টু ডে” পুস্তক থেকে]
নৌবাহিনীতে শৃঙ্খলা রক্ষার নাম করে সর্দার প্যাটেল এই নৌবিদ্রোহের বিরুদ্ধে নিন্দা করলেন। সেই সময়ে গান্ধীজীও হিংসাত্মক আচরণ-এর জন্য জনসাধারণের নিন্দা করেছিলেন।
কংগ্রেসের বুর্জোয়া নেতৃত্ব নিজ শ্রেণির প্রতি অবশ্যই নিমকহারামি করেনি। জাতীয় স্বাধীনতার দাবি ছাড়া কস্মিনকালেও তারা কৃষিবিপ্লবের সপক্ষে প্রতিশ্রুতির কোনও উল্লেখ করেনি। তখন সমাজতন্ত্রের কথাও কখনও তারা বলত না। তখন জমিদারদের সঙ্গে তাদের মৈত্রীর সম্পর্ক ক্ষুন্ন না করেই ক্ষমতায় আসবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে দুর্বল করে দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বিকাশ যেভাবে ঘটল তার জন্য এবং প্রতিরোধের পথে জনগণ যাতে আর অগ্রসর না হয় তা সুনিশ্চিত করতে জনগণের উপর তাদের নেতৃত্বের প্রভাবের কারণে তাদের লাভই হলো। যে যুদ্ধকে সমর্থন করতে তারা অস্বীকার করেছিল, সেই যুদ্ধে অর্জিত জয়-ই এখন তাদের অক্লেশে ক্ষমতা অর্জনের সহায়ক হয়ে উঠেছিল। তবে হাজার হাজার মানুষকে এজন্য অল্প কিছুদিনের মধ্যে মূল্য দিতে হয়েছিল দেশভাগ-জনিত ভ্রাতৃঘাতী হত্যার আকারে এবং বছরের পর বছর ধরে জনগণকে তার মূল্য দিতে হচ্ছে দারিদ্র্য ও দুর্ভোগের আকারে।
কৃষকদের জঙ্গি লড়াই
বুর্জোয়া নেতৃবৃন্দ এবং সাম্রাজ্যবাদ, উভয়েই ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। তার কারণ, ১৯৪৬ সালে যে শুধুমাত্র নৌবিদ্রোহই ঘটেছিল তাই-ই নয়। ঐ সময়ে গ্রামাঞ্চলেও জঙ্গি লড়াই বিস্তৃতি লাভ করেছিল এবং অনেক জায়গাতেই তার পুরোভাগে ছিল কমিউনিস্ট পার্টি। ত্রিবান্ধুর রাজ্যে সশস্ত্র ভায়ালার ও পুন্নাপ্রা সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টি-ই নেতৃত্ব দিয়েছিল। বাংলায় কৃষকদের জঙ্গি তেভাগার লড়াইয়েও তারাই নেতৃত্ব দিয়েছিল। আর, তেলেঙ্গানায় এই সংগ্রাম তখন সবেমাত্র এক সশস্ত্র সংগ্রামে বিকশিত হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। এ সশস্ত্র সংগ্রাম কৃষিবিপ্লবের দাবি নিয়ে একটা বিপুল শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারত। শ্রমিকশ্রেণির পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত কৃষক সংগ্রাম যে কত উচ্চ পর্যায় অবধি উঠতে পারে, এতে তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল।
এই সংগ্রামে কী অর্জিত হয়েছিল? পি সুন্দরাইয়ার কথায়, এই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রধানত নালাগোণ্ডা, ওয়ারাঙ্গাল এবং খাম্মাম, এই তিনটি জেলার ১১ হাজার বর্গমাইল এলাকার ৩ হাজার গ্রামের প্রায় ৩০ লক্ষ কৃষক সংগ্রামী গ্রাম-পঞ্চায়েতের ভিত্তিতে 'গ্রাম-রাজ' প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছিল।
এই গ্রামগুলিতে নিজামের স্বৈরাচারের গ্রামাঞ্চলস্থিত স্তম্ভস্বরুপ ঘৃণ্য জমিদাররা তাদের দুর্গম 'গদিগুলি' থেকে বিতাড়িত হয়েছিল এবং কৃষকরা তাদের জমিগুলি বাজেয়াপ্ত করেছিল। গণ-কমিটির নেতৃত্বে ১০ লক্ষ একর জমির পুনর্বণ্টন কৃষকদের মধ্যে করা হয়েছিল। জমি থেকে সমস্ত রকমের উচ্ছেদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং জবরদস্তি খাটানোর ব্যবস্থার অবসান করা হয়েছিল। মহাজনী সুদের অত্যধিক হার এবং লুণ্ঠনব্যবস্থাকে খর্ব করা হয়েছিল। অত্যাচারী বনবিভাগীয় পদস্থ কর্মচারীদের সমগ্র বনাঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং উপজাতি ও বনসংলগ্ন এলাকার জনগণ তাদের শ্রম-অর্জিত ফল উপভোগ করতে সমর্থ হয়েছিল। তেরো থেকে আঠারো মাস সময় ধরে এইসব এলাকায় সমগ্র প্রশাসন গ্রামের কৃষি কমিটিগুলি কর্তৃক পরিচালিত হয়েছিল। নিজামের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই সংগ্রামের কালে রাজাকার বাহিনী ও নিজামের পুলিসের সশস্ত্র আক্রমণ থেকে কৃষকদের রক্ষার প্রয়োজনে দশ হাজার গ্রাম্য স্কোয়াড-সদস্য-সম্বলিত শক্তিশালী একটি সশস্ত্র বাহিনী এবং ২ হাজার স্থায়ী গেরিলা বাহিনী জনগণ সংগঠিত করে তুলেছিল। লক্ষ লক্ষ কৃষক তাদের জীবনে এই প্রথম দিনে দুই বেলা নিয়মিত আহারের ব্যবস্থা করতে পেরেছিল।
এটা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক ও কৃষকের সংগ্রামী মৈত্রী এবং কৃষি বিপ্লবের অভিজ্ঞতার একটা পূর্বাভাস।
ব্যাহত না হলে এই আন্দোলন ঐ নির্দিষ্ট অভিমুখেই অগ্রসর হতো। তথাপি পরিণামে দেশ বিভাগ ঘটে গেলেও মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনার ভিত্তিতেই যে মীমাংসাটা হয়ে গেল, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
লক্ষ্য করলে এটা দেখা যাবে যে, জনগণের প্রতি নিষ্ঠায় এবং পশ্চাদপদতা, বেকারত্ব ও সুদীর্ঘ দারিদ্র্যের অবসান ঘটাতে ভারতীয় জনসাধারণের সামনে একটা নতুন পথ যাতে উন্মুক্ত হতে পারে তার জন্যে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম ও কৃষি বিপ্লবের প্রয়োজনবোধের প্রতি কমিউনিস্ট পার্টি অটল ছিল। জনগণের উপর কংগ্রেস নেতৃত্বের যে প্রভাব তা কাটিয়ে তোলার উপযুক্ত যথেষ্ট শক্তি তাদের ছিল না বলেই তাদের লক্ষ্য অর্জিত হতে পারেনি।
প্রকাশ: ০৩-আগস্ট-২০২৬
শেষ এডিট:: 31-Jul-26 11:52 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/role-of-communists-in-indias-freedom-struggle-part-–-vi
Categories: Fact & Figures
Tags:
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (172)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (155)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (82)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
