নবজীবনের পথে (৩য় পর্ব)

Author
আব্দুল হালিম

এডাম স্মিথ হইতে শুরু করিয়া রেকার্ডো ও মার্কসের অর্থনীতি ও দর্শনের পুস্তক তাঁহার বাড়িতে ছিল। তাঁহার নিজস্ব একটা লাইব্রেরী ছিল। তাঁহার লাইব্রেরীতেই আমি মার্কসীয় ও অন্যান্য সাহিত্য, পড়িবার সুযোগ পাই।

On the Path to a New Life (Part III)
(শ্রমজীবী থেকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস)

৩য় পর্ব

ভূমিকাঃ কমরেড আব্দুল হালিম স্বাধীনতা পূর্ব বাংলা তথা ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার অন্যতম ব্যক্তিত্ব। গ্রামের স্কুলে পাঠ অসমাপ্ত রেখেই তরুণ বয়সে চাকরীর সন্ধানে কলকাতায় আসেন। জাহাজ কোম্পানিতে ঠিকা শ্রমিকের কাজ পান। সেভাবেই শ্রমজীবীদের জীবন-সংগ্রামের উপলব্ধি, দেশের পরিস্থিতি, লড়াই আন্দোলনের আঁচ তাঁকে কাছে টেনে নিয়েছিল, সেভাবেই ক্রমশ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। পরিচিত হন মুজফফর আহমদের সঙ্গে, হয়ে ওঠেন তাঁর একান্ত সহযোগী। বাংলা ক্যালেন্ডারের হিসাবে ১৩৯১ সালে, মুখপত্র পত্রিকার শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা দীর্ঘ প্রবন্ধ ‘নবজীবনের পথে’। সেই প্রবন্ধই চার পর্বে প্রকাশিত হল। শিরোনামের সঙ্গে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ‘শ্রমজীবী থেকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস’ ওয়েবডেস্কের তরফে সংযোজন। যে উপলব্ধির প্রভাবে তিনি নিজের পথচলাকে ‘নবজীবনের পথে’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, কমিউনিস্ট হয়ে ওঠার সংগ্রামে সেই শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। মূল লেখার বানানই যতদূর সম্ভব বজায় রাখা হয়েছে। মূল লেখার বানানই যতদূর সম্ভব বজায় রাখা হয়েছে।

আমরা সোশ্যালিস্ট তত্ত্ব প্রচারে ব্রতী হইলাম বটে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা, সোশ্যালিস্ট তত্ত্ব ও মতবাদ বিষয়ে আমাদের কোনো পরিষ্কার ধারণা বা চেতনা ছিল না। কংগ্রেস যে ভারতের শ্রমিক-কৃষক ও নিপীড়িত শ্রেণীর জন্য স্বাধীনতা চায়না, এই কথাটাই বেশি করিয়া উপলব্ধি করিয়াছিলাম। কংগ্রেস ভারতের শতকরা ১৮ জন অধিবাসীর প্রতিনিধি নহে এবং তাহাদের জন্য স্বরাজ চায় না; কংগ্রেস ধনিক-বনিক-বড়লোক-বুর্জোয়াদের প্রতিষ্ঠান; জনগণের জন্য স্বরাজ, শতকরা ৯৮ জনের জন্য স্বরাজ চাই; কংগ্রেস চৌরিচৌরাতে জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে, ইংরাজের বিরুদ্ধে জনগণের বিপ্লবে ভীত হইয়া আপস করিয়াছে, সুতরাং গণ-আন্দোলন ও গণ-সংগঠন মারফত শ্রমিক-কৃষকদের সাহায্যে স্বাধীনতা আনিতে হইবে; ইত্যাদি বক্তব্যে পূর্ণ বিভিন্ন প্রবন্ধ মানবেন্দ্রনাথ রায় কর্তৃক সম্পাদিত ‘ভ্যানগার্ড’-এ ছাপা হইত। মানবেন্দ্রনাথ রায়ের লেখা ‘ইণ্ডিয়া ইন ট্র্যানজিশন’ পুস্তকে মোগল আমল হইতে শুরু করিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ও ব্রিটিশ আমলের সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও বিশ্লেষণ এবং ভারতে ইংরাজ শাসন ও সাম্রাজ্যবাদের ঔপনিবেশিক অত্যাচারের কাহিনী লিখিত হইয়াছিল। তা ছাড়া মানবেন্দ্রনাথের ‘হোয়াট ডু উই ওয়ান্ট’, ‘রাজনৈতিক চিঠি’, ‘ওয়ান ইয়ার অব নন কো-অপারেশন মুভমেন্ট’ প্রভৃতি পুস্তকে কংগ্রেসের নীতির তীব্র সমালোচনা করা হইয়াছিল এবং ভাবতে শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হইয়াছিল। আমরা এই বইগুলি বিভিন্ন জায়গায় প্রচার করিতাম।

এই সমস্ত পুস্তক এবং ইন্টার ন্যাশনাল প্রেস করেস্পন্ডেন্স মারফত জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতার স্বরূপ কি হইবে, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কি এবং রুশ দেশের শ্রমিকদের গবর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠার কথা আমরা জানিতে পারি। কিন্তু রাশিয়ার বলশেভিক পার্টির নীতি, প্রোগ্রাম, কর্মাদর্শ এবং কিভাবে সেখানে শ্রমিক-কৃষকেরা ক্ষমতা দখল করিয়া-ছিলেন, সে বিষয়ে আমাদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না।

কমরেড মুজফ্ফরের থাকিবার কোনো নির্দিষ্ট স্থান ছিল না। ক্ষীণদেহ ও ভগ্নস্বাস্থ্য লইয়া অধিকাংশ সময় তিনি অনাহারে দিনাতিপাত করিতেন। আমার নিজেরও থাকার কোনো নির্দিষ্ট স্থান ছিল না। আমি মাঝে মাঝে আমার পুরাতন বাসা নীলমাধব সেন লেন এবং ১১০ নম্বর হ্যারিসন রোডে থাকিতাম। কমরেড মুজফ্ফর এই শেষোক্ত বাসায় আমার সঙ্গে দেখা করিতে আসিতেন। কিন্তু এখানেও আর আমার পক্ষে বেশি দিন থাকা সম্ভব হইল না। অবশেষে নিরুদ্দেশের পথে গা ভাসাইয়া দিয়া মুজফ্ফরের সঙ্গে জুটিয়া গেলাম। দিনের বেলায় আমরা যত্রযত্র ঘুরিয়া বেড়াইতাম; পরিচিত বন্ধু মহলে, মেসে ও বাসায় গিয়া আলাপ, আলোচনা করিতাম, হোটেলে খাইতাম এবং সুবিধামত কোথাও রাত্রি যাপন করিতাম। ‘ধূমকেতু’ অফিসে রোজই যাইতাম। ঐ সময়ে চাঁদনীর নিকট গুমঘর লেনের এক বাড়িতে আমরা অনেকদিন রাত্রিতে থাকিতাম। ঐখানেই এক সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারে এককালে কমরেড মুজফ্ফর গৃহ-শিক্ষক ছিলেন এবং সেই সূত্রে তাঁহাদের সহিত মুজফ্ফরের খুব ঘনিষ্ঠতাও হইয়াছিল। মুজফ্ফরকে তাঁহারা অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতেন। ঐ বাড়ির দরজা আমাদের নিকট অবারিত ছিল।

মুজফ্ফর আমাকে একদিন কুতবুদ্দীন সাহেবের বাড়ি লইয়া গেলেন। মুজফ্ফ্ফরের সহিত আগেই তাঁহার আন্তরিক বন্ধুত্ব হইয়াছিল। আমাদের এই বিশিষ্ট বন্ধু শ্রদ্ধেয় কৃতবুদ্দীন আহমদের বাড়ি ৭ নম্বর মওলভী লেন ছিল আমাদের একটি প্রধান আড্ডা। এই বাড়ি ভবিষ্যতে বহুদিন পর্যন্ত আমাদের কাজকর্মের উৎসাহ ও প্রেরণা জুগাইয়াছিল। এই বাড়িতে ঐ যুগে আমরা বহুদিন অতিবাহিত করিতাম। একটি ছোট ঘরে আমরা থাকিতাম। আমাদের বিছানা-বালিশের কোনো বালাই ছিল না। আমাদের পোশাকের মধ্যে সম্বল ছিল ধুতি ও শার্ট। কুতবুদ্দীন সাহেব আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করিতেন। আমরা অনেকদিন তাঁহার বাড়িতেই খাইতাম।

ভারতের শ্রমিক-আন্দোলন সংগঠনে, কমিউনিস্ট তত্ত্ব ও মার্কসবাদী সাহিত্যের প্রচারে কুতবুদ্দীন সাহেবের যথেষ্ট অবদান রহিয়াছে। তাঁহার সহানুভূতি ও অর্থসাহায্য না পাইলে সম্ভবত আমরা ভবিষ্যৎ কর্মপথে অগ্রসর হইতে পারিতাম না। কুতবুদ্দীন সাহেব প্রথম অবস্থায় মিলিটারী একাউন্টস্ বিভাগে অডিটরের কাজ করিতেন। তিনি ছিলেন সহৃদয় ব্যক্তি, খুব মিশুক ও সদালাপী। আমরা চিরকাল তাঁহার সস্নেহ ভালোবাসা পাইয়াছি। বাংলা দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের সহিত তাঁহার যোগাযোগ ছিল। কুতবুদ্দীন সাহেব মওলানা আবুল কালাম আজাদের সহকর্মী এবং তাঁহার সম্পাদিত উর্দু ‘আল-হিলাল’ পত্রিকার ম্যানেজার ছিলেন। তিনি অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলনে যোগদান করিয়াছিলেন, এবং তাঁহার বাড়ির একটা বৃহৎ অংশ ‘খিলাফৎ তাঁতশিল্প ও বয়ন-বিদ্যালয়ে’র জন্য ভাড়া দিয়াছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় যে-সব স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক-আন্দোলন হইয়াছিল তিনি তাহাতে যোগ দিতেন। কলিকাতার খানসামা ইউনিয়নের তিনি ছিলেন জেনারেল সেক্রেটারী। কটকের সিরাজুদ্দীন, নামক একজন খানসামা ঐ ইউনিয়নের সেক্রেটারী ও ফিদা হোসেন নামে অপর এক ব্যক্তি ছিলেন সহকারী সেক্রেটারী। খানসামা ইউনিয়নের নেতৃত্বে কলিকাতার সমস্ত খানসামা-বয়-বাবুর্চিরা ধর্মঘট করিয়া কলিকাতা গ্র্যান্ড হোটেল, কন্টিনেন্টাল প্রভৃতি হোটেলের কাজ অচল করিয়া দিয়াছিল। ধর্মঘটকারীরা কলিকাতার ইংরেজদের নাজেহাল করিয়া তাহাদের ঔদ্ধত্যের জবাব দিয়াছিল। রাজদ্রোহের অপরাধে সিরাজুদ্দীনের ১৮ মাস সশ্রম কারাদণ্ড হইয়াছিল। ঐ ইউনিয়নেই শ্রমিক-আন্দোলনের ব্যাপারে আমার হাতেখড়ি হইয়াছিল। কুতবুদ্দীন সাহেব চটকল-শ্রমিকদের মধ্যেও যাইতেন। তিনি কাঁকিনাড়ায় অনেক শ্রমিক মিটিং-এ বক্তৃতা দিয়াছেন ও শ্রমিক-আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করিয়াছেন। কমরেড মুজফ্ফরের প্রভাবেই তিনি কংগ্রেসের নীতি পরিত্যাগ করিয়া শ্রমিক শ্রেণীর বৈপ্লবিক আন্তর্জাতিক মতবাদ এবং সোশ্যালিজমের দিকে আকৃষ্ট হইয়াছিলেন। মার্কসীয় সাহিত্য তাঁহার যথেষ্ট পড়াশুনা ছিল। মার্কসীয় তত্ত্ব, সাহিত্য ও শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতির প্রতি তাঁহার যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। বই কেনার উপরও তাহার অত্যন্ত ঝোঁক ছিল। মার্কসীয় তত্ত্ব, সাম্যবাদ, আন্তর্জাতিক শ্রমিক মতবাদ, শ্রমিক আন্দোলন, মার্কসীয় অর্থনীতি বিষয়ে অনেক বই তিনি কিনিয়াছিলেন। এডাম স্মিথ হইতে শুরু করিয়া রেকার্ডো ও মার্কসের অর্থনীতি ও দর্শনের পুস্তক তাঁহার বাড়িতে ছিল। তাঁহার নিজস্ব একটা লাইব্রেরী ছিল। তাঁহার লাইব্রেরীতেই আমি মার্কসীয় ও অন্যান্য সাহিত্য, পড়িবার সুযোগ পাই। বিদেশ হইতে রুশিয়া ও মার্কসবাদ সম্পর্কে কোনো নূতন বই আসিলেই তিনি কিনিতেন। সে-যুগে ‘বুক কোম্পানী’ মারফত এই জাতীয় বই কিছু কিছু আমদানী হইত। বুক কোম্পানীতে গিয়া আমরা অনেক সময় বই পড়িতাম।


প্রকাশ: ১০-আগস্ট-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 10-Aug-26 10:00 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/on-the-path-to-a-new-life-part-iii
Categories: Fact & Figures
Tags:
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড