কোভিড-১৯ মহামারীতেও ঘৃণ্য রাজনীতি করতে ছাড়ছেননা মোদী সরকার - মৃদুল দে

Author
ওয়েবডেস্ক প্রতিবেদন

কোভিড-১৯ মহামারীতেও ঘৃণ্য রাজনীতি  করতে ছাড়ছেননা মোদী সরকার - মৃদুল দে
২৩ জুন ,২০২১ (বুধবার)

ডেথ সার্টিফিকেট মৃত্যুর কারণ বলে দিচ্ছে ফুসফুস এবং হূদযন্ত্রের সমস্যা । মৃতদের পরিবারগুলিকে দরজায় দরজায় ছুটে বেড়াতে হচ্ছে । করোনায় মৃত্যুর ডেথ সার্টিফিকেট দিতে সমনীতি বলে কোন কিছু কি আছে ?"-- সুপ্রিম কোর্ট এ প্রশ্ন করেছে কেন্দ্রীয় সরকারকে । বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষত ছটি রাজ্য থেকে মৃত্যুর সংখ্যা বিষয়টিতে বিরাট হেরফের লক্ষ্য করা যাচ্ছে । মিডিয়াতে এই নিয়ে হইচই চলেছে । বিদেশেও এই খবরটা ফলাও করে প্রচারিত । এসবের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার হলফনামা দিয়ে কোর্টকে বলেছে যে সব করোণা মৃত্যুকে করোনাজনিত মৃত্যু বলে গণ্য করে সার্টিফিকেট দিতে হবে , এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।


কর্নাটকে কোভিড -১৯ সংক্রমণে ২০০০ এপ্রিল থেকে ২০২১ মে পর্যন্ত অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে ১,৬৭, ৭৮৮ যা সরকারি হিসেবে ওই সময়ে ২৯০৯০ মৃত্যুর চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি । এই হিসেব পেশ করেছে সিভিক রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম । এছাড়া অন্ধ্র, তামিলনাডু, মধ্যপ্রদেশ থেকেও মৃত্যুর সংখ্যা কম করে দেখানোর বহু তথ্য প্রকাশিত হয়েছে ।


এখন হাসপাতালে মৃত্যু হলে একমাত্র সার্টিফিকেট দেওয়া হয় । গত ১৫ মাসে মধ্যপ্রদেশ কর্ণাটক তামিলনাড়ু অন্ধ্রপ্রদেশে ও দিল্লিতেই চার লক্ষ আশি হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে । এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই বিহারে ৭৫০০ জনের অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু হয়েছে । এটা সরকারি তথ্য'র চেয়ে ১০ গুণ বেশি . এ কারণে পাটনা হাইকোর্টের তিরস্কার ভোগ করতে হয়েছে বিহারের বিজেপি নীতিশ কুমার সরকারকে । শীর্ষ আদালত দেখিয়েছে ১৯৭৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট একটি রায়ে বলেছিল, সাধারণ রুটিন কাজে গোপনীয়তার নামে তথ্য আড়াল করা জনস্বার্থকর নয়, এই ধরনের গোপনীয়তা আইনসংগতও নয় । কেন্দ্রীয় সরকার বারবার দাবি করে এসেছে ভারতে মৃত্যুহার খুবই কম । পশ্চিমবঙ্গসহ রাজ্যগুলিও একই ধারা অনুসরণ করেছে । সরকারি ঘোষণা মত এখনো পর্যন্ত ৩ লক্ষ ৬৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে করোনাভইরাসে । এটা বাড়বে দ্বিতীয় তরঙ্গে, কারণ শ্মশান কবরখানা মৃতদেহে উপচে পড়ছে, গঙ্গাতীরে বালিতে পুঁতে দেওয়া হচ্ছে অসংখ্য মৃতদেহ, নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার মৃতদেহ । গত এপ্রিল মে মাসে সারা দুনিয়ার সংবাদ শিরোনামেও এই দৃশ্য ও তথ্য উঠে এসেছে । এতে সরকারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর সংখ্যা কম দেখানোর অভিযোগ আরো প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, সরকারি তথ্য সম্পর্কে সন্দেহ বেড়েছে । কোভিড -১৯ এর আগে যা মৃত্যু হতো তার ৮৫% মাত্র রেজিস্ট্রিকৃত হতো । তার মধ্যে এক চতুর্থাংশে মৃত্যুর কারণ সার্টিফিকেটে থাকতো । মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে এবং মোট মৃত্যু সম্পর্কে সার্বিক কোনো তথ্য না থাকার ফলে সরকার নির্ভর করে একটা আনুমানিক হিসেবের উপরে ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে পৃথিবীতে সরকারের ঘোষিত মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে প্রকৃত মৃত্যু দুই থেকে তিনগুণ বেশি । জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রোগ নির্ণয় করার সংস্থা এবং গবেষণা সংস্থাগুলির যারা মৃত্যুর নানা রকম কারণ ও তথ্যাদি নিয়ে গবেষণা করে তাদের হিসেবে ভারতে কোভিড -১৯ মৃত্যু সরকারের ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি হবে । বড় বড় অনেকগুলো শহর এবং অনেকগুলো রাজ্যের প্রকৃত মৃত্যুর খবর বাইরে মিডিয়ায় ছড়িয়ে যাচ্ছে । এসব শহরের প্রত্যেকটিতে রাজ্যগুলিকে কোভিড সময়ের চেয়ে আগের দু'বছরের একই সময়ের তথ্য দিয়ে দেখাতে উদগ্রীব হয়ে উঠতে দেখা যায় যে কোভিড সময়ের চেয়ে তখন মৃত্যু সংখ্যা আরো বেশি ছিল ।

গ্রামীণ ভারতে মৃত্যু রেজিস্ট্রি করার ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল । ফলে সেখানকার মৃত্যু সরকারি হিসেবের মধ্যে প্রায়ই হিসাব হয়ে আসে না । কোভিড দ্বিতীয় তরঙ্গে গ্রামাঞ্চলে দু'মাসে মৃত্যুহার সরকারি ঘোষণার চেয়ে অনেক বেশি । কেন্দ্র ও রাজ্য একযোগে প্ৰকৃত বেশি মৃত্যুর কথা বললে তারা সেটা অস্বীকার করবে, এতেই তারা বিপদ আড়ালে অভ্যস্ত । শহর থেকে মৃত্যুর খবরটা বেশি আসে কারণ এখানে রেজিস্ট্রেশন করার ব্যবস্থা আছে । গ্রামাঞ্চলে কোভিডজনিত বিধিনিষেধ, যানবাহন ,এম্বুলেন্স এর অভাব, আর্থিক দুরবস্থা ইত্যাদি কারণে হাসপাতালে চিকিৎসা কেন্দ্রে রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয় না । শহরে বা গ্রামে কোভডজনিত মৃত্যু কিংবা অন্য সমস্ত মৃত্যুর কারণ ইত্যাদি সব তথ্য সরকারের হাতে পুরোপুরি থাকলে তাহলে সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি, চিকিৎসার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা সুবিধা হয় । যেহেতু স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিশেষত প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছে । লকডাউন চলাকালীন সময়ে কি কেন্দ্রীয় সরকার কি রাজ্য সরকার এই প্রশ্নে একদম নীরব ।এক মাস পেরিয়ে প্রায় দেড় মাস হতে চলল পশ্চিমবঙ্গে লকডাউন চলছে । সাধারণ মানুষের ভয়াবহ অবস্থা । আয় নেই, ভয়ংকর কমে গেছে । কর্মহীনতা মারাত্মক আকার নিয়েছে । কিন্তু সরকার স্বাস্থ্য পরিকাঠামো বৃদ্ধির জন্য এই সময়ে যে ব্যবস্থা নিতে পারত সেদিকে নজর দেয়নি । এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ অথচ হাজার হাজার অসহায় পরিবার এখনো রোগীকে নিয়ে প্রচন্ড অসুবিধার মধ্যে পড়েছে । না আসে সরকারি কোন সাহায্য । মাসে পরিবারপিছু ৩৫ কিলো চাল বা কর্মহীনদের যাদের আয়কর দিতে হয় না এরকম সব পরিবারকে মাসে ৭০০০ টাকা করে দিলে তাহলে জীবনটুকু বাঁচাতে যে স্বস্তি পাওয়া যেত সেটা একেবারেই নেই । এইজন্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোও অর্থনীতিবিদদের কথায় সে দিয়ে এখন বলতে শুরু করেছে যে তাদের ব্যবসায় ভয়ঙ্কর মন্দা কারণ মানুষের হাতে কোন সঙ্গতি নেই, কোনো আয় নেই , তারাও চায় সরকার এই বিপর্যয়ের সময় মানুষকে অন্তত আর্থিক সহায়তা করুক, মন্দার বসায় একটু গতি আসবে ।

সরকার বলছে অর্থ নেই । অর্থ আছে, নেই কেবল সদিচ্ছা ।কারণ বিপর্যয় মোকাবিলার স্থায়ী ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের আছে । রাজ্যেরও আছে । এ জন্য অর্থ বরাদ্দ করা থাকে বরাবর । এই বিপর্যয় মোকাবিলার ব্যবস্থা থেকে এ সহায়তা অনায়াসে করা যায় । কিন্তু এদিকে সরকার ভ্রুক্ষেপই করছে না, ধনীদের স্বার্থ ঠিক থাকলে সরকার নিশ্চিন্ত ।


"না-জেতা পর্যন্ত এই কোভিড-১৯ সংক্রমনের বিরুদ্ধে ভারতের লড়াই" শীর্ষক বইতে ভাইরাস, সংক্রমন ও অতিমারী ইত্যাদি বিষয়ে শীর্ষ তিনজন ভারতীয় বিশেষজ্ঞ লিখেছেন যে ,এই অতিমারী দেখিয়ে দিয়েছে দেশের গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করার আশু প্রয়োজনীতার কথা; তথ্য ও নির্ভুল প্রমাণভিত্তিক প্রতিকারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে; এই গুরুতর সংকট গোটা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবার,স্বাস্থ্যের জন্য বাজেট বরাদ্দ পর্যাপ্ত বাড়ানোর এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যরক্ষার ওপর জোর দেওয়ার; এজন্য অনেক উদ্ভাবন আছে আরও করা যায় এবং পথনির্দেশ রয়েছে ।

সরকার এসব মূল্যবান পরামর্শের ধারেকাছে যেতেও অনিচ্ছুক । গোটা দুনিয়ায় এই ভাইরাস নির্মূল না হলে বিপদ থেকেই যাবে, কবে এর অবসান ঘটতে পারে রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ কেই বলতে পারছে না । কারন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে কেউ কাউকে বাধ্য করতে পারে না । যেমন প্রায় ১৪০ লোকের দেশ ভারত, ক্রেডিট নিতেই কেবল তৎপর, দায়িত্ব পালনে নয় ।

কোভিড সংক্রমণ একটু কমলেও আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে যে দ্বিতীয় তরঙ্গ থেকে তৃতীয় তরঙ্গ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়ে দেখা দেবে । এবার শিশুদের বিপদ বেশী । অথচ সেই প্রস্তুতিও নেই । পৃথিবীর মধ্যে টিকা উৎপাদনে ভারতের সেরা স্থান । এই অবস্থা সত্ত্বেও বিনামূল্যে সমস্ত মানুষকে দ্রুত টিকাকরনের কোন কার্যকরী ব্যবস্থা সরকার হাতে নেয়নি । ফলে গোটা ভারতবর্ষের সাধারণ সমস্ত পরিবার প্রচন্ড উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা এবং আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে । এটা অনিবার্য ছিল না । কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারের ব্যর্থতার ফলে জীবন জীবিকার অবর্ণনীয় হাল, দুরবস্থা উর্ধগামী এবং যেটুকু অর্থ ও আয় কুড়িয়ে বাড়িয়ে মানুষের সঞ্চিত ছিল তা নিঃশেষ বলা চলে । নিঃস্ব হয়ে ধার করে সব খরচ করে তাদের প্রিয়জনকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে । যারা মৃত হয়েছে কোভিড সংক্রমণে, এই মৃতদের অসহায় পরিবারগুলিকে চার লক্ষ টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে । কেন্দ্রীয় সরকার এ প্রস্তাব মানতে অস্বীকার করেছে অর্থের অভাবের অজুহাতে । অথচ বেহিসেবি খরচ সরকার যথেচ্ছ করে চলেছে এবং এক কোভিড সংক্রমনের সময় আদানি আম্বানি সহ বৃহৎ কর্পোরেটদের মুনাফা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে । এদের স্বার্থ সরকার মানুষের জীবনের বিনিময়ে রক্ষা করতে প্রাণপাত করছে । বিপদগ্রস্ত মানুষকে বাঁচানোর ন্যূনতম চেষ্টা না করে সমস্ত জিনিসের দাম বাড়ানোর ব্যবস্থা সরকার পাকাপোক্ত করছে । পেট্রোল ডিজেল খাদ্যশস্য থেকে ওষুধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অস্বাভাবিক বেশি যখন মানুষের পকেটে কোন অর্থ নেই । এবং অল্প কিছু মানুষ মাত্র মাসিক আয় থেকে নিজেদের সামাল দিচ্ছে । বেশিরভাগ মানুষের কোন কাজ নেই । উপায়ও অত্যন্ত সঙ্কুচিত ।


এ অবস্থার প্রতিকারে মানুষকে যেমন সহায়তা করতে হবে, তেমনি তাদের সচেতন করতে হবে,গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জাতীয় দাবিসহ তাদের এই জরুরী জীবন বাঁচার দাবিগুলো নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে -- যাতে তারা অভিন্ন দাবি ও চাহিদার ভিত্তিতে একজোট হতে পারে, দয়া নয় তাদের ন্যায়সঙ্গত হক আদায় করতে পারেন ।


প্রকাশ: ২৩-জুন-২০২১

ডেথ সার্টিফিকেট মৃত্যুর কারণ বলে দিচ্ছে ফুসফুস এবং হূদযন্ত্রের সমস্যা । মৃতদের পরিবারগুলিকে দরজায় দরজায় ছুটে বেড়াতে হচ্ছে । করোণায় মৃত্যুর ডেথ সার্টিফিকেট দিতে সমনীতি বলে কোন কিছু কি আছে ?"-- সুপ্রিম কোর্ট এ প্রশ্ন করেছে কেন্দ্রীয় সরকারকে । বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষত ছটি রাজ্য থেকে মৃত্যুর সংখ্যা বিষয়টিতে বিরাট হেরফের লক্ষ্য করা যাচ্ছে । মিডি

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 23-Jun-21 20:48 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/modi-government-is-not-giving-up-doing-hateful-politics-even-in-the-epidemic-of-covid-19-mridul-dey
Categories: Uncategorized
Tags: covid-19, modi govt 2.0
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড