মীরাট মামলার যৎকিঞ্চিৎ

মুজফ্ফর আহমদ
মজুরদের এই সংগ্রাম ভারত গবর্নমেন্টকে সর্বাধিক বিচলিত করেছিল। তার পরিচয় পাওয়া গেল ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় আইনসভায় "পাবলিক সেফটি (জন নিরাপত্তা) বিল” নামক একটি আইনের খসড়া উপস্থিত করা হতে। তাতে ছিল যে অ-ভারতবাসী ব্রিটিশ প্রজারা তাঁদের সঙ্গে ইউরোপীয় ব্রিটিশ প্রজারাও শামিল হবেন ভারতে রাষ্ট্র-বিরোধী কাজ করলে তাঁদের ভারতবর্ষ হতে বের করে দেওয়া যাবে।

১৯২৯ সালের ১৪ই মার্চ তারিখে স-কাউন্সিল ভারতের গবর্নর জেনারেল একটি মোকদ্দমার মঞ্জুরিতে সই দিলেন। ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনের (ইণ্ডিয়ান পেনাল কোডের) কয়েকটি ধারায় মোকদ্দমা দায়ের করতে হলে তার আগে গবর্নমেন্টের নিকট হতে মঞ্জুরি গ্রহণ করতে হয়। স-কাউন্সিল গবর্নর জেনারেলের ১৪ই মার্চ তারিখের মঞ্জুরির বলে ১৫ই মার্চ তারিখে মীরাটের জিলা ম্যাজিস্ট্রেটের খাস কামরায় ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনের ১২১-এ ধারা অনুসারে গোপনে একটি মামলা দায়ের করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গেই গোপনে আসামীদের বিরুদ্ধে গিরেফতারী পরওয়ানাও বার হয়ে যায়। মীরাট শহরের নাগরিকেরা জানতেই পেলেন না কী ঘটতে যাচ্ছে তাঁদের শহরে।
যাঁরা এই সব উদ্যোগ-আয়োজন করছিলেন তাঁরা ছিলেন ভারত গবর্নমেন্টের হোম ডিপার্টমেন্টের অধীন সেন্ট্রাল ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর লোক। আসলে তাঁরা পুলিশ অফিসার, কিন্তু তাঁদের পুলিশ অফিসার বললে তাঁরা চটে যান এবং তীব্র প্রতিবাদ করে বলেন, "আমরা ভারত গবর্নমেন্টের হোম ডিপার্টমেন্টের অফিসার, পুলিশ নই।"
এই সোনার পাথর-বাটিদের ভিতর হতে যিনি মোকদ্দমায় ফরিয়াদী হয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে দরখাস্ত দাখিল করলেন তাঁর নাম ছিল মিস্টার বার-এ-হর্টন। তিনি আগ্রা ও অযোধ্যা প্রদেশে (এখনকার উত্তরপ্রদেশ) পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল ছিলেন। সেই সময়ে তিনি ভারত গবর্নমেন্টের হোম ডিপার্টমেন্টের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। সেখানে তার পদের নাম ছিল সেন্ট্রাল ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর এসিস্টান্ট ডিরেক্টর। কিন্তু দরখাস্তে তিনি নিজের আত্ম-পরিচয় দিয়েছিলেন যে তিনি ভারত গবর্নমেন্টের হোম ডিপার্টমেন্টের অধীন সেন্ট্রাল ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর বিশেষ কর্তব্যরত অফিসার। মোটের ওপরে, মোকদ্দমাটি দায়ের করা হয়েছিল ভারত গবর্নমেন্টের তরফ হতে। এই মোকদ্দমা "মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা (১৯২৯-১৯৩৩)” নামে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছিল। এর আগেও দু'টি কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা হয়ে গিয়েছিল: (১) পেশোয়ার কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা (১৯২২-১৯২৩); এই মোকদ্দমাকে মস্কো ষড়যন্ত্র মোকদ্দমাও বলা হয়েছে; (২) কানপুর কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা (১৯২৪)। আন্তর্জাতিক কারণে এই তিনটি মোকদ্দমার পরিচালনাই ভারত গবর্নমেন্ট করেছিলেন। স-কাউন্সিল ভারতের গবর্নর জেনারেল যখন এই মোকদ্দমাগুলি চালাবার মঞ্জুরি দিয়েছিলেন তখন তাঁর হাতেও ছিল ব্রিটিশ বৈদেশিক আফিসের মঞ্জুরি। মোকদ্দমাগুলির একটি উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত সরকারের ওপরে চাপ সৃষ্টি করা।
ব্রিটিশ বৈদেশিক আফিসের নীতির প্রয়োজনেই শুধু মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা দায়ের করা সম্ভব হতো না যদি দেশের ভিতরেও এই মোকদ্দমার অজুহাত সৃষ্টি না হতো। অবশ্য, কানপুর কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা (১৯২৪) ব্রিটিশ ফরেন আফিসের নীতির প্রয়োজনে দায়ের হয়েছিল। তখন লর্ড কার্জন বেঁচেছিলেন; তাঁর ছিল সর্বদা গেল গেল মনোভাব। তিনি ভারতবর্ষে বড়লাটগিরি করে গিয়েছিলেন কিনা! কিন্তু ১৯২৪ সাল আর ১৯২৯ সাল এক কথা ছিল না।
ইতোমধ্যে দেশের নানা স্থানে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস্ পার্টিসমূহ গঠিত হয়েছিল। এই সকল পার্টিতে কমিউনিস্টদের নেতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। ১৯২৭সাল হতে সারা ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসে কমিউনিস্টরা একটি বিশেষ শক্তি হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন। এই বছরেই শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে সারা ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের প্রথম কমিউনিস্ট এসিস্টান্ট সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটিতেও কমিউনিস্টরা ক্রমশ বেশী সংখ্যায় প্রবেশ করতে থাকেন। কমিউনিস্ট আর-এস-নিম্বকর বোম্বে প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সেক্রেটারি হন। পাঞ্জাবে "নওজয়ান ভারত সভা" নামক যুব সংগঠন গঠিত হয় এবং তার প্রভাব পাঞ্জাবের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। এই সংগঠনের স্থাপনা ও পরিচালনায়ও কমিউনিস্টদের হাত ছিল। সত্য বটে শহীদ ভগৎ সিং "নওজয়ান ভারত সভা"র প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন। কিন্তু তিনি সন্ত্রাসবাদমুখী হয়ে সভা হতে ক্রমশ দূরে সরে যান। পরে তিনি হিন্দুস্তান প্রভাবে হিন্দুস্থান সোসালিস্ট রিপাবলিকান আর্মি হয়ে যায়। মীরাট মামলা রিপাবলিকান আর্মির সঙ্গে যুক্ত হন। এই রিপাবলিকান আর্মিও কমিউনিস্ট দায়ের করার এই সবই নিশ্চয় অজুহাত ছিল, কিন্তু মোক্ষম অজুহাতের কথা এখনো বলা হয়নি। সেটা ছিল ১৯২৭ সাল হতে, বিশেষ করে ১৯২৭ সালের শেষার্ধ হতে ভারতে মজুরদের তীব্র সংগ্রাম। পুরো ১৯২৮ সাল এই সংগ্রাম চলতে থাকে। বোম্বে ও বাংলায় মজুরদের এক একটি ধর্মঘট চলে মাসের পর মাস। এই সকল সংগ্রামেই কমিউনিস্ট পার্টি ও ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস্ পার্টি একান্তভাবে যোগ দেয়। তার ফলে ভারতের মজুর আন্দোলন সংগ্রামশীল রূপ ধারণ করে। তার আগে আন্দোলনের এই রূপ ছিল না। ১৯২৮ সালে বোম্বেতে সুতোকলের মজুরেরা বহু মাস ধর্মঘট করে থাকে, এই ধর্মঘটের পরিচালনার সঙ্গে কমিউনিস্টরা একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। ধর্মঘট শেষ হওয়ার পরে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে সুতোকল মজুরদের বিরাট "গিরনি কামগার ইউনিয়ন” (লাল ঝাণ্ডা) গড়ে ওঠে।
মজুরদের এই সংগ্রাম ভারত গবর্নমেন্টকে সর্বাধিক বিচলিত করেছিল। তার পরিচয় পাওয়া গেল ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় আইনসভায় "পাবলিক সেফটি (জন নিরাপত্তা) বিল” নামক একটি আইনের খসড়া উপস্থিত করা হতে। তাতে ছিল যে অ-ভারতবাসী ব্রিটিশ প্রজারা তাঁদের সঙ্গে ইউরোপীয় ব্রিটিশ প্রজারাও শামিল হবেন ভারতে রাষ্ট্র-বিরোধী কাজ করলে তাঁদের ভারতবর্ষ হতে বের করে দেওয়া যাবে। আইনের এই খসড়ার আসল লক্ষ্য ছিল দু'জন ইংরেজ একজন বেন ব্রাডলে আর অন্যজন ফিলিপ স্প্রাট। তাঁরা গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য ছিলেন। ভারতের মজুর সংগ্রামগুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে তাঁরা কাজ করছিলেন। তাঁদের কাজে ভারতের ব্রিটিশ গবর্নমেন্ট বিব্রত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের দেশ হতে বের দেওয়ার মতো কোনো আইন ছিল না।
কেন্দ্রীয় আইনসভার ভিতরে পণ্ডিত মোতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস পার্টি স্থির করলেন যে এই আইন পাস করায় বাধা দিবেন। তাঁরা বললেন যে কমিউনিস্টদের সম্বন্ধে তাঁদের কোনো দুর্বলতা নেই। তবে, কমিউনিস্টরা যে দেশের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছেন সেটা গবর্নমেন্ট দেশকে বোঝাতে পারেননি। অন্যান্য পার্টির লোকেরাও এই ব্যাপারে কংগ্রেস পার্টির সঙ্গে যোগ দিলেন। পণ্ডিত মতিলালের ইচ্ছা ছিল যে কলকাতা কংগ্রেসের আগে দেশকে খানিকটা গরম করে তুলবেন। হলোও তাই। দেশের নানাস্থানে বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-সভা হতে লাগল। এই সকল সভার মোদ্দা কথা ছিল এই যে অকারণে গবর্নমেন্ট দেশকে বলশেভিক জুজুর ভয় দেখাচ্ছেন। দিনের পর দিন এই বিল নিয়ে আইনসভায় আলোচনা চলল। অবশেষে একদিন বিলের ওপরে ভোট নেওয়া হলো। গবর্নমেন্ট এক ভোটে হেরে গেলেন। এর পরে আইনসভার হেমন্তকালীন অধিবেশন বন্ধ হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই বড়লাট পাবলিক সেফটি বিলকে অর্ডিনান্সরূপে পাস করে দিলেন।
কেন্দ্রীয় আইনসভার পরের অধিবেশন যখন শুরু হলো তখন মীরাট মামলার আসামীরা গিরেস্তার হয়ে মীরাটে এসে গেছেন। আগেকার পাবলিক সেফটি বিলে কিছু কিছু ধারা নতুন যোগ করে গবর্নমেন্ট আবার তা আইনসভায় উপস্থিত করলেন। মিস্টার বিঠল ভাই পাটেল তখন কেন্দ্রীয় আইনসভার সভাপতি ছিলেন। তিনি গবর্নমেন্টকে উপদেশ দিলেন যে গবর্নমেন্ট এখন একটিই কাজ করতে পারেন। তা হচ্ছে মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা তুলে নিয়ে এই বিলটি আইনে পরিণত করিয়ে নেওয়া, কিংবা এই বিলটি তুলে নিয়ে মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু গবর্নমেন্ট আইনসভার সভাপতির উপদেশে কান দিলেন না। শেষে যখন বিলের ওপরে আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছিল তখন মিস্টার বিঠল ভাই পাটেল আইনসভায় সভাপতি হিসাবে মত দিলেন যে এই বিলটি মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার বিষয়ীভূত হয়েছে। কাজেই, আইনসভায় এই বিলের ওপরে কোনো আলোচনা আর চলতে পারে না। এখানেই পাবলিক সেটি বিলের পরিসমাপ্তি ঘটল।
এবার মোকদ্দমার কথায় আসা যাক। মোকদ্দমা দায়ের করার দীর্ঘকাল আগে হতে ভারত গবর্নমেন্ট মোকদ্দমার তোড়জোড় শুরু করেছিলেন। অনেক আগে হতে আইনজীবীরা কাগজপত্র পড়ায়ও লেগে গিয়েছিলেন। কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার মিস্টার ল্যাংফোর্ড জেস্কে ভারত গবর্নমেন্ট দৈনিক কলকাতা হাইকোর্টের আশি গিনি ফিসে নিযুক্ত করলেন। কলকাতা হাইকোর্টে গিনির স্থির মূল্যও সতের টাকা। মিস্টার ল্যাংফোর্ড জেমস এই হাইকোর্টেরই মিস্টার যশোপ্রকাশ মিত্রকে তাঁর জুনিয়ার হিসাবে বেছে নিলেন। তাঁর ফিস ধার্য হলো দৈনিক পাঁচ গিনি। মোকদ্দমা চলুক আর না চলুক, আদালত রন্ধ থাক আর খোলা থাক, এই ফিস চলতেই থাকবে। তা ছাড়া, তাঁরা সরকার হতে বাড়ি পাবেন এবং আরো অনেক কিছু পাবেন। মিস্টার মিত্র মোকদ্দমা দায়ের হওয়ার দীর্ঘকাল আগে হতে কাগজপত্র পড়ছিলেন।
তার জন্যে তিনি মোটা টাকা পেয়েছিলেন। মিস্টার জেমসও প্রাথমিক মতামত দেওয়ার জন্যে মোটা টাকা নিয়েছিলেন। কি রকম মোটা খরচে মোকদ্দমাটি শুরু হয়েছিল তা বোঝাবার জন্যে ব্যারিস্টারদের ফিসের কথাটাই শুধু এখানে উল্লেখ করা হলো।
মোকদ্দমায় প্রথমে আসামীর সংখ্যা ছিল ৩১ জন। কয়েক দিন পরে ভারত গবর্নমেন্ট হিউ লেস্টার হচিল্সন ও আমীর হায়দর খানের নাম তাতে যোগ করলেন। হচিন্সন ইংরেজ ছিলেন কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য ছিলেন না। তেত্রিশ নম্বরের আসামী আমীর হায়দর খানকে পুলিশ কখনো গিরেস্তার করতে পারেনি। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য ছিলেন। মোকদ্দমা চলাকালে তিনি ইউরোপে গিয়ে আবার ফিরে আসেন। তার পরে, তিনি গোপনে মাদ্রাজে কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। মাদ্রাজেই তিনি শেষে যখন গিরেস্তার হলেন তখন মীরাট মোকদ্দমা শেষ হয়। সেই সময়ে তাঁকে মীরাটে এনে আবার মোকদ্দমা শুরু হতে শুরু করা সম্ভব ছিল না। তাই মাদ্রাজেই অন্য একটি মোকদ্দমায় তিনি দু'বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। আমীর হায়দর খানকে বাদ দিলে আসামীদের মধ্যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য ছিলেন ১৩ জন ও গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য ছিলেন ২ জন। এমন অভিযুক্তরাও ছিলেন যাঁহারা পার্টি সভ্য না হয়েও কমিউনিস্ট মতবাদ সমর্থন করতেন। আবার পুলিশের কৃপায় এমন লোকেরাও অভিযুক্ত হয়েছিলেন যাঁরা কমিউনিস্ট-বিরোধী ছিলেন।
১৯২৭ সালে ইউরোপে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন গঠিত হয়েছিল। তার নাম ছিল "সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ও জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনকামী লীগ" (The League Against Imperialism and For National Independence). এই সংগঠনের ভিতরে প্রচুরসংখ্যক অ-কমিউনিস্ট ছিলেন, কিন্তু কমিউনিস্টরাও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। কমিউনিস্টদের প্রেরণা ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক সংগঠন তখনো গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না; এখন তো ভারত গভর্নমেন্টের তরফ থেকে কয়েকজন ব্যক্তি ও কয়েকটি সংগঠনের নাম এই হিসাবে আদালতে দাখিল করা হয়েছিল যে এই সকল ব্যক্তি ও সংগঠন আসামীদের সঙ্গে সহ-ষড়যন্ত্রকারী। 'সহ-ষড়যন্ত্রকারী নামের এই তালিকায় সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ও জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনকামী লীগের নামও ছিল সেলস্-এ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ও জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনকামী লীগের যে আনুষ্ঠানিক কংগ্রেসের অধিবেশন হয়েছিল তাতে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের তরফ হতে যোগ দিয়েছিলেন এবং তার কার্যকরী কমিটির সভ্যও তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁরই প্রস্তাবে কংগ্রেসের ১৯২৭ সালের মাদ্রাজ অধিবেশনে (তিনি তখন সবে ইউরোপ হতে ফিরেছিলেন) ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস উপর্যুক্ত লীগের সঙ্গে সংযুক্ত (affiliated) হয়। ভারত গবর্নমেন্ট ইচ্ছা করলে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে মীরাট মামলায় আসামী করতে পারতেন। তাঁর তুলনায় অত্যন্ত নিরীহ ধরমবীর সিংকে (শ্রীমহাবীর ত্যাগীর জ্যেষ্ঠাগ্রজ) মীরাট মামলায় আসামী করা হয়েছিল। এই ভদ্রলোক অঙ্কশাস্ত্র ও ধর্মশাস্ত্রই শুধু বুঝতেন। কিন্তু জওহরলাল নেহরু নিজে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন ও প্রভাবশালী ব্যক্তির পুত্র ছিলেন বলে মীরাট মামলায় অভিযুক্ত হননি। তবু বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতাদের মনে ভয় যে ছিল না তা নয়। তাই, তাঁরা মনে করলেন যে আসামীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা কিছু সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা আবশ্যক। তাছাড়া, কেন্দ্রীয় আইনসভায় যে জোরের সঙ্গে তাঁরা পাবলিক সেফটি বিলের বিরোধিতা করেছিলেন তাতেও মীরাট মোকদ্দমার জন্যে একটা কিছু না করলে তাঁদের মুখ রক্ষা হতো না। গান্ধীজীর খবরের কাগজের বিবৃতি আসামীদের অনুকূলে ছিল না। তা সত্ত্বেও কংগ্রেস নেতারা একটি ডিফেন্স কমিটি গঠন করেছিলেন। তাতে পণ্ডিত মোতিলাল নেহরু, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ও ডাক্তার মুখতার আহমদ আনসারী প্রমুখ ছিলেন। আমার যতটা মনে আছে, এতদিন পরে ভুলও হতে পারে, পণ্ডিত মোতিলাল নেহরু ও ডাক্তার আনসারী ছাড়া আর কোনো কংগ্রেস নেতা মীরাট ডিফেন্স কমিটিতে টাকা দেননি। আসামীদের বিভিন্ন
সংগঠন হতে যে সব টাকা উঠেছিল সে সবই ডিফেন্স কমিটিতে এসেছিল। ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে যেদিন মোকদ্দমার ইনকোয়ারি শুরু হলো সে দিন দেখা গেল যে আসামীদের তরফ হতে উকিল, ব্যারিস্টারে আদালতের ঘর ভর্তি। নিচের আদালতে এত বেশী আইনজীবীর প্রয়োজনীয়তা আসামীরা বোঝেননি, কিন্তু তাঁরা প্রতিবাদও করেননি। ডিফেন্স কমিটির কাজে কোনো বাধা সৃষ্টি হোক তা আসামীরা চাননি। এই সকল আইনজীবীর সকলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতেও শেষ পর্যন্ত থাকেননি। যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের ভিতরে মিস্টার এম. সি. চাগলা পরবর্তীকালে বোম্বে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। উত্তরপ্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শ্রীচন্দ্রভান গুপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে খুব অল্পদিনের জন্যে জুনিয়র উকিল হয়ে এসেছিলেন।
আসামীদের সেশনে সোপর্দ হওয়ার সময় যখন এল তখন ডিফেন্স কমিটি উঠে গেল এবং কোনও উকিল ব্যারিস্টারও আর থাকলেন না। কংগ্রেস নেতাদের তরফ হতে পণ্ডিত জওহরলালের মারফতে আসামীদের জানানো হলো যে সেশন আদালতে যেদিন মোকদ্দমা উঠবে সেদিন আসামীদের প্রত্যেকে অপরাধ মেনে নিলে সঙ্গে সঙ্গেই মোকদ্দমা শেষ হয়ে যাবে এবং খুব অল্প সাজা হবে আসামীদের। এই উপদেশ আসামীদের কংগ্রেসের তরফ হতে দেওয়ার অজুহাত ছিল এই যে কংগ্রেস সংগ্রামে নামতে যাচ্ছে। কমিউনিস্ট আসামীরা কংগ্রেস নেতাদের এই অশোভন প্রস্তাব তখনি প্রত্যাখ্যান করলেন। কংগ্রেস নেতারা বে-আইনীভাবে নুন বানাতে যাচ্ছিলেন, আর কমিউনিস্টদের দ্বারা অপরাধ স্বীকার করিয়ে তাঁদের সাগরের নোনা জলে ডুবিয়ে দিতে চাইছিলেন। তাঁরা জানতেন ভারতের রাজনীতিতে রাজনীতিক বন্দীদের অপরাধ স্বীকার করার মানে কি? অ-কমিউনিস্টদের ভিতরে অনেকে ইচ্ছা থাকলেও কংগ্রেসের উপদেশ মেনে নিতে পারলেন না, কারণ কমিউনিস্টরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
কমিউনিস্ট আসামীরা বললেন, তাঁরা নিজেরাই আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন। একথা শুনে মিস্টার জেম্স ভয় পেয়ে গেলেন, বললেন, এই আসামীরাই তাঁকে শেষ করবেন। তাঁর স্বাস্থ্য ভালো ছিল না। তিনি নিজে আসামীদের
নিকটে এসে সরকারী খরচে উকিল নিযুক্ত করতে বললেন। আসামীরা বললেন, মিস্টার জেন্সের সমকক্ষ কোনো ব্যারিস্টারের ফিস তো গবর্নমেন্ট আসামীদের জন্যে দিবেন না, কিন্তু তাঁর চেয়ে এক ধাপ নিচের কোনো ব্যারিস্টারের ফিস কি সরকার দেবেন? সে ব্যারিস্টারকেও আসামীরাই নির্বাচন করবেন। মিস্টার জেম্স পিছু হটলেন। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী কিন্তু ফলেছিল। সেশন মোকদ্দমা চলার অল্পদিনের ভিতরেই তিনি মারা যান। দু'জন অ-কমিউনিস্ট আসামী সরকারের টাকায় উকিল নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁদের উকিলরূপে মিস্টার ডি-পি-সিং গবর্নমেন্টের নিকট হতে মাসে ১৫০০ টাকা ফিস পেতেন।
কমিউনিস্ট আসামীরা মাসিক সামান্য ফিস দিয়ে মীরাট কোর্টের একজন জুনিয়র উকিলকে নিযুক্ত করে রেখেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল এই যে কোনো কমিউনিস্ট আসামী অসুস্থ হয়ে কোর্টে হাজির হতে না পারলে এই উকিলের নামে ওকালতনামা দেওয়া হবে যাতে আসামীর অনুপস্থিতির জন্যে কোর্ট না বন্ধ হয়ে যায়। সেশন কোর্টে এইভাবে মোকদ্দমা চলেছিল।
ধরা পড়ার পরে কমিউনিস্ট আসামীরা মীরাট জেলে যখন একত্র হলেন তখন তাঁরা আদালতে বিবৃতি কিভাবে দেবেন তা স্থির করে ফেলেছিলেন। মোকদ্দমা চলার সময় এমন একটি সময় আসে যখন জজ ১৮৯৮ সালের ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ৩৪২ ধারা অনুসারে আসামীকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন। এই সময়ে আসামীরা আদালতে বিবৃতি দিতে পারেন। কমিউনিস্ট আসামীরা সুদীর্ঘ বিবৃতি দেবেন স্থির করলেন, আর স্থির করলেন যে এই বিবৃতির মারফতে তাঁরা দেশময় কমিউনিস্ট ভাবধারা প্রচার করবেন। তাতে তাঁদের সাজা বেশী হবে, না কম হবে, সে-বিষয়ে তাঁরা ভাবলেন না। এই রকম বিবৃতিই কমিউনিস্ট আসামীরা দিয়েছিলেন। দেশের সর্বত্র সংবাদপত্রে তাঁদের বিবৃতি স্থানও পেয়েছিল। এখানে যদি এই সকল বিবৃতি হতে অংশবিশেষ তুলে দিতে পারতাম তাহলে পাঠকেরা আন্দাজ করতে পারতেন কি ধরনের বিবৃতি মীরাট বন্দীরা দিয়েছিলেন। প্রত্যেক বন্দী পৃথক পৃথক বিবৃতি দিয়েছিলেন। উনিশজন বন্দী তাঁদের প্রত্যেকের পৃথক পৃথক বিবৃতি ছাড়া একটি যুক্ত বিবৃতিও দিয়েছিলেন। এই যুক্ত বিবৃতির পুরো সূচীপত্রও এখানে দেওয়া সম্ভব নয়। বিবৃতি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। সে সবের শিরোনাম ও উপশিরোনামই আমি শুধু এখানে দিচ্ছি।
প্রথম ভাগের শিরোনাম হচ্ছে
আমাদের সমাজতত্ত্ব (Social Theory)
দ্বিতীয় ভাগের শিরোনাম ধনবাদ (Capitalism)
উপ-শিরোনাম
(১) বুর্জোয়া বিপ্লব, (২) মার্কসের দ্বারা ধনবাদের বিশ্লেষণ, (৩) ধনবাদকে সোশ্যালিজমের পরিণতিতে পৌঁছাতেই হবে, (৪) ইম্পিরিয়ালিজম, (৫) যুদ্ধপরবর্তী যুগ।
তৃতীয় ভাগ: সোসালিজম্ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন
উপ-শিরোনাম
(১) সমাজবাদী বিপ্লবরূপে রুশ বিপ্লব, (২) রুশ দেশে ধনিকবাদ, (৩) গণ-বিপ্লব, (৪) বিপ্লবের কার্যসাধন, (৫) পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, (৬) সোবিয়েত ইউনিয়ন একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, (৭) কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ও সোবিয়েত ইউনিয়ন, (৮) সোবিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আগামী যুদ্ধ।
চতুর্থ ভাগ: জাতীয় বিপ্লব
উপ-শিরোনাম
(১) ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, (২) ভারতীয় ধনিকশ্রেণী ও বিপ্লব, (৩) সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বৈপ্লবিক ফ্রন্ট গঠন, (৪) ব্রিটিশ মজুরশ্রেণী ও ভারতীয় বিপ্লব, (৫) সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ও জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনকামী লীগ, (৬) লেবর অ্যান্ড সোশ্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ঔপনিবেশিক বিপ্লব, (৭) কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ও ঔপনিবেশিক বিপ্লব।
পঞ্চম ভাগ: কৃষি সমস্যা
উপ-শিরোনাম
(১) ভারতীয় কৃষককূলের দারিদ্র্য, (২) সমস্যার সাম্রাজ্যিক ও জাতীয় দিক, (৩) শ্রেণী-সংগ্রামই হচ্ছে মোদ্দা কথা, (৪) সমস্যার নিরূপণ, (৫) ধনিকবাদের প্রথম স্তর- ধ্বংসকর ও প্রগতিমূলক, (৬) কষিতে ধনিকবাদের অনুপ্রবেশ, (৭) ঊনবিংশ শতাব্দীতে কৃষক অভ্যুত্থানসমূহ, (৯) কৃষি-ব্যবস্থা বিপর্যয় রোধে সাম্রাজ্যবাদী চেষ্টা, (১০) সাম্রাজ্যবাদের কৃষিনীতিতে আভ্যন্তরিক স্ববিরোধিতা, (১১) কৃষককূল দ্বারা কৃষকের স্বার্থে কৃষি-সমস্যায় সমাধান, (১২) আজকের কৃষক-সমাজের শ্রেণীরূপ (১৩) কৃষক সমস্যার প্রতি জাতীয়তাবাদীদের মনোভাব, (১৪) হালের কৃষক সংগ্রাম হতে শিক্ষা ও তার আলোচনা (১৯৩০-৩১), (১৫) কৃষি বিপ্লবই একমাত্র সমাধান, (১৬) ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস্ পার্টির কৃষক প্রোগ্রাম, (১৭) কৃষির সমাজবাদী পুনর্গঠন।
ষষ্ঠ ভাগ: ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন
(১) সংস্কারবাদী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের স্থলে বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, (২) সংগঠন, (৩) মজুরশ্রেণীর অবস্থা, (৪) ভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন।
সপ্তম ভাগ: কৌশল
(১) এই মুহূর্তের দাবি, (২) "জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়াশ্রেণীকে ব্যবহার", (৩) যুক্তফ্রন্ট, (৪) গান্ধীবাদ, (৫) ব্যক্তিগত সন্ত্রাসবাদ, (৬) সংবিধানগত অগ্রগতি (Constitutional Advance), (৭) ধনিকশ্রেণীর "বৈপ্লবিক” কৌশলসমূহ, (৮) বৈপ্লবিক গণ-উদ্যোগ, (৯) বলপ্রয়োগ।
অষ্টম ভাগ:
কমিউনিজম ও বুর্জোয়া সামাজিক ব্যবস্থাসমূহ
(১) পরিবার, (২) নারীর স্থান, (৩) ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, (৪) ধর্ম, (৫) বুর্জোয়া নৈতিকতা, (৬) রাজা, (৭) আইন, (৮) মীরাট মামলায় আসামীদের প্রতি "সদ্ব্যবহার”, (৯) সমাপ্তি।
এই হ'ল বন্দীদের যুক্ত বিবৃতির অতি সংক্ষিপ্ত সূচী। এ থেকে সকলে খুব সহজে বুঝে নিতে পারবেন যে বন্দীরা মীরাট আদালতের কাঠগড়া হতে তাঁদের মতবাদের প্রচার কিভাবে করেছেন। তাঁদের কঠোর সাজা হতে পারে কিনা সেদিকে তাঁরা দৃকপাতও করেননি। মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় বন্দীরাই জিতেছিলেন, আর হার হয়েছিল ব্রিটিশ গবর্নমেন্টের ভারতের ও ব্রিটেনের উভয় দেশেরই। বছরের পর বছর মোকদ্দমা চালিয়ে ব্রিটিশ গবর্নমেন্ট সারা বিশ্বে বন্দীদের প্রতি ঘৃণা উদ্রেকের পরিবর্তে সহানুভূতির উদ্রেক করেছিলেন। জগতের নানাস্থান হতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নিকটে অনুরোধ এসেছিল যে মীরাট মামলা তুলে নেওয়া হোক। অধ্যাপক আইনস্টাইনও র্যামসে ম্যাকডোনাল্ডকে মোকদ্দমা তুলে নেওয়ার জন্য পত্র লিখেছিলেন।যে
সব জায়গায় সহানুভূতি উদ্রিক্ত হওয়ার কথা নয় সেসব জায়গায়ও জিজ্ঞাসা জেগেছিল। যেমন, প্রফেসার হ্যারল্ড লাস্কি আমেরিকায় যখন প্রেসিডেন্ট রুজভেন্টের দ্বারা ডিনারে নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন তখন রুজভেল্টও লাসকিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "মীরাট কেসটি কি এমন ব্যাপার যে তোমরা বছরের পর বছর তা ভারতবর্ষে চালিয়ে যাচ্ছ?" মীরাট মামলার আপিল স্তরের এডভোকেট ডক্টর কৈলাসনাথ কাটজুকে লাসকি বলেছিলেন, "এই কথাটি আপনি সওয়াল-জওয়াবের সময় কোর্টে ব্যবহার করতে পারেন।” মোটের ওপরে, মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার পরিচালনার দ্বারা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন ও ভাবধারা প্রশমিত না হয়ে প্রসারিত হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টিও ভারতবর্ষে দৃঢ়তর ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কমিউনিস্ট বন্দীরা জেলের বাইরে থেকে যে অবদান সম্ভবত দিতে পারতেন না, মোকদ্দমা চলাকালে সেই অবদান তাঁরা দেশবাসীকে দিয়েছেন। তাঁদের প্রচারের প্রভাবেই যাঁরা সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী আন্দোলনে লিপ্ত ছিলেন তাঁরা নিজেদের আন্দোলন সম্বন্ধে গভীরভাবে চিন্তা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। আজ সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের ভিতরে যাঁরাই রাজনীতিতে আছেন তাঁরা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ভিতরে রয়েছেন।
জগতের এক দারুণ আর্থিক সঙ্কটের সময়ে মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা চলেছিল। সব নিয়ে এই মোকদ্দমায় ভারত ও ব্রিটিশ গবর্নমেন্ট যত খরচ করেছিলেন তা কোথাও প্রকাশিত হতে দেখিনি, তবে আমার ধারণা কমপক্ষে ৪০ হতে ৫০ লক্ষ টাকা এই মোকদ্দমার পেছনে গবর্নমেন্ট খরচ করেছিলেন। এই মোকদ্দমার দ্বারা ব্রিটিশ গবর্নমেন্ট ভারতের মাটি হতে কমিউনিস্টদের মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কার্যত এই মোকদ্দমার ভিতর দিয়ে হয়েছিল সুগঠিত কমিউনিস্ট ভাবধারার দেশময় প্রচার। তার ফলেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দৃঢ়তর ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। অবশ্য সরকারী দলিলপত্রে গবর্নমেন্ট কমিউনিস্টদের ঠাণ্ডা করেছেন বলে আস্ফালন করা হয়েছে। মীরাট মোকদ্দমা শেষ হওয়ার পরে ১৯৩৫ সালে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর তখনকার ডিরেক্টর স্যার ডেভিড পেট্রির সম্পাদনায় "কমিউনিজম ইন ইণ্ডিয়া" নাম দিয়ে একখানা গোপন পুস্তক ছাপা হয়েছে।
শাসন বিভাগের উচ্চ রাজকর্মচারীদেরই শুধু এই পুস্তক পড়ার অধিকার। আমাদের মতো লোকেদের তার নিকটে যাওয়াও বারণ। কিন্তু পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর জীবনী-লেখক মিস্টার মাইকেল ব্রেচারকে এই পুস্তক গড়তে দেওয়া হয়েছিল। তিনি তা থেকে উদ্ধৃত করেছেন :
"রাজনীতিক ক্ষেত্র হতে ৩০ জন কমিউনিস্ট আন্দোলনকারীদের সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিল্প-জগতে অবস্থার উন্নতি হয়েছিল। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে গিরেস্তারের দ্বারা অবস্থা কর্তৃপক্ষের আয়ত্তে এসেছিল। [ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে] নেতৃত্বের একটি শূন্যস্থানের সৃষ্টি হয়েছিল, তার স্থলে অযোগ্য লোকেরা এসে স্থান পূরণ করেছিল।"
এই ভাবেই ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো নিজেদের মনকে প্রবোধ দিয়েছিল।
এর পরে ব্রেচার মোকদ্দমার আপিলে যে সাজা কমে গিয়েছিল তার কারণ লিখছেন। এটাও তিনি "কমিউনিজম ইন ইণ্ডিয়া" (১৯৩৫) হতে নিয়েছেন কিনা তা জানিনে, তিনি সাজা কমে যাওয়ার কারণ দিয়েছেন :-
"ব্রিটিশ ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস ও অন্যদের চাপে পড়ে সাজা কমে গিয়েছিল।"
২৮ বছর আগে যে ব্যাপারের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল তা আজ প্রায় গবেষণার স্তরে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তা নিরর্থক গবেষণা নয়।
প্রকাশ: ০৫-আগস্ট-২০২৫
শেষ এডিট:: 05-Aug-25 00:52 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/merrut-trial-the-history
Categories: Fact & Figures
Tags: cpim, russian socialism, socialism, meerut, meerut conspiracy
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (155)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (141)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
আমরা তিমির বিলাসী নই, তিমির বিনাশী হতে চাই
- শমীক লাহিড়ী
রবীন্দ্রনাথ, ফ্যাসিবাদ ও লাল পার্টি
- ময়ূখ বিশ্বাস
ভারতে বৃটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ফলাফল
- কার্ল মার্কস
বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে: পলিট ব্যুরো বিবৃতি
- পলিট ব্যুরো
মহম্মদ সেলিমের বিবৃতি
- মহম্মদ সেলিম

.jpg)



