‘ওরা বীর, ওরা আকাশে জাগাত ঝড়’

Author
সৌভিক দাস বক্সী

সত্যেন বসু নিজের প্রিয়তম রাজনৈতিক শিষ্যকে এই দায়িত্ব দিয়ে কিছুটা কষ্ট পান, কারণ এমন কর্মসূচির অর্থই নিশ্চিত মৃত্যু। যদিও ক্ষুদিরাম বিন্দু মাত্র বিচলিত না হয়ে কিংসফোর্ডকে হত্যা করার কাজে মনোনিবেশ করা শুরু করেন। তিনি জানালেন তিনি প্রস্তুত।

Khudiram Bose: The History, The Legacy
এই দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে, ভাবনাহীন চিত্তে যারা ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছেন, লড়াই আন্দোলনের নতুন দিশা দেখিয়েছেন ছাত্র যুবদের কাছে তাদের মধ্যে একটি চিরস্মরণীয় নাম হল বীর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। ১৮৮৯ এর ৩রা ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মেদিনীপুর শহরের কাছে , মৌবনী গ্রামে( হাবিবপুর) জন্মগ্রহণ করেন ক্ষুদিরাম বসু। তাঁর পিতার নাম ছিল ত্রৈলোক্যনাথ  বসু এবং মায়ের নাম ছিল লক্ষীপ্রিয়া দেবী। পিতা ত্রৈলোক্যনাথ বসু ছিলেন নাড়াজোলের তহসিলদার।তিন কন্যার পর তিনি তার মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার দুই পুত্র অকালে মৃত্যুবরণ করেন। সেকারণেই ক্ষুদিরামের জন্মের পর সংস্কার অনুযায়ী তাঁর মা তিন মুঠো খুদের (চালের) বিনিময়ে নিজের বড় মেয়ে অপরূপার কাছে নিজের সন্তানকে বিক্রি করে দেন। ক্ষুদ দিয়ে কেনা সেই শিশুটির নাম হয় ক্ষুদিরাম বসু।

ছোট্ট ক্ষুদিরাম বেঁচে থাকে। যদিও যখন ক্ষুদিরামের বয়স মাত্র পাঁচ বছর তখনই তিনি মাতৃহারা হন। সেই ঘটনার এক বছরের মধ্যেই ক্ষুদিরামের বাবাও মারা যান। ক্ষুদিরামের সমস্ত দায়িত্ব পালন করতে থাকেন তার দিদি অপরূপা। সেখানেই এক পাঠশালাতে পড়াশোনা শুরু হয় ক্ষুদিরাম বসুর। পরবর্তীতে অপরূপা দেবীর স্বামী বদলি হয়ে চলে আসেন তমলুকে। তমলুকের হ্যামিল্টন হাই স্কুলেই নতুন করে আবার শিক্ষা জীবন শুরু হয় ক্ষুদিরাম বসুর।

এখান থেকেই ক্ষুদিরাম বসুর জীবনে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসা শুরু হয়। যদিও ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে স্বভাবের ক্ষুদিরামের মনকে নাড়া দিত নিরন্ন মানুষের হাহাকার। এই দেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে শোষিত, বঞ্চিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি হতে থাকে ক্ষুদিরামের মনে। ১৯০২ এবং ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে শ্রী অরবিন্দ এবং ভগিনী নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করেন। তারা স্বাধীনতার জন্যে জনসমক্ষে ধারাবাহিক বক্তব্য রাখেন এবং বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে গোপন অধিবেশন করেন, তখন কিশোর ছাত্র ক্ষুদিরাম এই সমস্ত বিপ্লবী আলোচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ক্ষুদিরামের মননে, চিন্তায়, চেতনায় দেশকে স্বাধীন করার উন্মাদনা তৈরি হয়। যে উন্মাদনা, রাজনৈতিক চেতনায় ভর দিয়ে ছোট্ট ক্ষুদিরাম ধীরে ধীরে বিপ্লবী মননের স্বাধীনতা সংগ্রামী হয়ে ওঠেন।

স্কুলের পাঠ্যপুস্তকেই শুধুমাত্র মুখ গুঁজে থাকা আত্মকেন্দ্রীক সুবোধ বালক ছিলেন না ক্ষুদিরাম। এক শীতের সকালে লক্ষী নারায়ণ দাস নামের এক ভিক্ষুক এসে হাজির হন ক্ষুদিরামের কাছে সাহায্যের প্রত্যাশা নিয়ে । যদিও ক্ষুদিরামের নিজের বলতে তেমন কিছুই ছিল না। ছিল শুধু তাঁর মৃত বাবার দামী একটি শাল। এবং সেটি ক্ষুদিরামের কাছে থাকা নিজের পিতার একমাত্র শেষ স্মৃতি। খুব বেশি কিছু না ভেবেই সেই শেষ স্মৃতিটাও ক্ষুদিরাম দান করে দেন ভিক্ষুককে। ক্ষুদিরাম বলেন এছাড়া দেওয়ার মতো আর কিছুই তার নেই এবং এই মুহূর্তে বাবার শেষ স্মৃতিটুকু তুলে দেওয়ার মতো যোগ্য লোক ওই ভিক্ষুক ছাড়া অন্য কেউই নেই আর। ক্ষুদিরাম ভেবেছিলেন ওই শাল বিক্রি করেও যদি কিছুদিন ওই ভিক্ষুকের পেট ভরানোর অন্ন সংস্থান হয়, তাহলেও তাঁর পিতার প্রতি সেটাই শ্রেষ্ঠ সম্মানের হবে। এই চেতনা নিয়েই বড়ো হতে থাকেন ক্ষুদিরাম। সারা দেশ জুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা ঘটছিল এই সময়টাতে। ক্ষুদিরাম খোঁজ রাখতেন সব কিছুরই। বাংলার ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতার আন্দোলনে ব্রিটিশ সরকার বিভাজন ধরানোর যে কৌশল অবলম্বন করতে চলেছে তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়ে গেছে ততদিনে। ক্ষুদিরামের চিন্তা জগতে আলোড়ন চলছে। এই সময় যখন ক্ষুদিরামের বয়স তেরো, একদিন তাঁর  সহপাঠী ফনীভূষণ ঘোষ স্বদেশী কাপড়ের ধুতি পরে বিদ্যালয়ে এসেছেন। বাকি ছাত্ররা কিছুটা বিদ্রুপ শুরু করেছিল। যদিও ক্ষুদিরাম তৎক্ষণাৎ সেই সহপাঠীর পাশে দাঁড়িয়ে মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়ের পক্ষেই বাকি সহপাঠীদের বোঝান। তিনি বোঝান, দেশী কাপড় আর যায় হোক, তার মধ্যে  ব্রিটিশের গোলামির কোনো চিহ্ন নেই। এই গভীর স্বদেশ বোধ ছিল স্কুল ছাত্র ক্ষুদিরাম বসুর।

১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ক্ষুদিরাম তাঁর দিদি অপরূপার স্বামী অমৃতলাল রায়ের সঙ্গে তমলুক শহর থেকে মেদিনীপুরে চলে আসেন। অমৃতলাল রায়  সরকারি চাকরি করতেন। তমলুক থেকে বদলি হয়ে মেদিনীপুর আসতে হলে ক্ষুদিরামকে আবারও বদলাতে হয় তাঁর বিদ্যালয়। সেখানে ক্ষুদিরাম ভর্তি হলেন মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে। তখন ক্ষুদিরামের বয়স চোদ্দ। এই মেদিনীপুর ছিল ব্রিটিশ শাসকদের কাছে অত্যন্ত আতঙ্কের। বিভিন্ন বিপ্লবী কার্যকলাপে মেদিনীপুরে ভয়ে যেতে চাইতেন ব্রিটিশের বড়ো অফিসারেরা। এই মেদিনীপুরের মাটিতেই ক্ষুদিরামের বিপ্লবী চেতনা আরও তীক্ষ্ণ হতে থাকল, দৃঢ় হতে থাকলো তাঁর সংগ্রামী চেতনা। স্কুলের তথাকথিত মেধাবী ছাত্র হয়ে না উঠলেও মেদিনীপুর জুড়ে নিপীড়িত মানুষের ভরসার নাম হয় উঠছিল 'ক্ষুদিরাম'।১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে কাঁসাই নদীর বন্যার সময়ে রণপার সাহায্যে ত্রাণকাজ চালান ক্ষুদিরাম, উদ্ধার করেন বন্যা বিদ্ধস্ত গ্রামবাসীদের। সে সময় যখন কলেরা মানেই মৃত্যু, পরিবারের লোকেরাও রোগীর পাশে থাকে না, সেখানেও পৌঁছে গিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে কলেরা রোগীদের সেবা করতেন ক্ষুদিরাম। এভাবেই রাজনীতি থেকে সমাজসেবা, ক্ষুদিরাম বসু হয়ে উঠছিলেন সমস্ত ক্ষেত্রের প্রতিনিধি।

এভাবেই ধীরে ধীরে, গোপনে চলতে থাকা নানান বিপ্লবী সংগঠনের চোখে পড়তে থাকে ক্ষুদিরাম বসু।

মেদিনীপুরে বিপ্লবী কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য তৈরি হওয়া গুপ্ত সমিতি কাজ করছিল। সত্যেন বসু, হেমচন্দ্র কানুনগো-রা  নেতৃত্ব দিতেন এই সমস্ত গুপ্ত সমিতির। ক্ষুদিরাম ততদিনে নিজের মায়ের আসনে বসিয়েছেন এই দেশকে। দেশের স্বাধীনতা অর্জনই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। সেই ছাত্র ক্ষুদিরাম গুপ্ত সমিতির বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। একদিন পথ চলতি হেমচন্দ্র কানুনগো'র পথ আটকান ক্ষুদিরাম। সরাসরি হেমচন্দ্রের কাছে রিভলভার চেয়ে বসেন। হেমচন্দ্র , রিভলভারের কী প্রয়োজনীয়তা জানতে চাইলে ক্ষুদিরাম বলেন তিনি সাহেবদের মারতে চান। অন্যায়ের প্রতিশোধ নেবে ক্ষুদিরাম। এরপর সত্যেনহবসুদের সান্নিধ্যে এসে সংগঠিত ভাবে বিপ্লবী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত হলেন।

১৯০২ খ্রিস্টাব্দে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজনারায়ণ বসুর প্রভাবে মেদিনীপুরে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিল। সেই সংগঠনের নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগো এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন হেমচন্দ্রের সহযোগী। এটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্রিটিশ বিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে বারীন্দ্র কুমার ঘোষ তার সহযোগী হেমচন্দ্র কানুনগোকে প্যারিসে নির্বাসনে থাকা একজন রাশিয়ান নিকোলাস সাফ্রানস্কি-এর কাছ থেকে বোমা তৈরির কায়দা শেখার জন্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

ইতিমধ্যেই ব্রিটিশ সরকার এই বাংলার ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতার আন্দোলনকে ভেঙে ফেলার চক্রান্ত করে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা করেছে। তার বিরুদ্ধে গোটা বাংলা জুড়ে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ব্রিটিশ বিরোধী লড়াই আরও তীব্রতর হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে বাংলার সাধারণ জনগণ পথে নেমেছে ব্রিটিশ বিরোধী বাংলার সংগ্রামকে এক এবং ঐক্যবদ্ধ রাখতে। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে চলতে থাকলো বয়কট আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে দৃঢ় করতে পালিত হলো রাখি বন্ধন উৎসব। বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্যের সংগ্রামের সাক্ষী থাকল গোটা দেশ। আর সেই আন্দোলনে পিছিয়ে থাকল না মেদিনীপুর। ক্ষুদিরাম তখন মেদিনীপুরের গ্রাম শহর ঘুরে ঘুরে মানুষের মাঝে লড়াই আন্দোলনের কথা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ছাত্রদের নিয়ে চালাচ্ছেন পিকেটিং। গোপনে চলছে সমিতির কাজ। এই সময় ঘর ছাড়লেন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু।নিশ্চিত বাসস্থান ছেড়ে অনিশ্চিত জীবনের পথে আরও একধাপ এগোলেন। দিদি অপরূপা নানা ভাবে চেষ্টা করেছিলেন ভাইকে আটকানোর, কিন্তু বিপ্লবী ক্ষুদিরাম সেই সমস্ত মোহ ত্যাগ করেই দেশ স্বাধীনের মহান মুক্তিযুদ্ধের পথেই পা বাড়ালেন।

তখন ১৯০৬, মেদিনীপুরে কৃষি এবং শিল্প মেলা হবে। বহু মানুষের সমাগম হয় সেখানে। ঠিক হল সেখানেই সত্যেন বসুর লেখা 'সোনার বাংলা' নামক এক প্রচার পত্র বিলি করা হবে। এই কাজের দায়িত্ব পড়ল তরুণ ক্ষুদিরাম বসুর কাঁধে। বিপ্লবাত্মক ইশতেহার বিলি করে ধরা পড়ে যান ক্ষুদিরাম। যদিও পুলিশের হাত থেকে সেই মুহূর্তে তিনি পালিয়ে যান। কিন্তু পুলিশের খোঁজাখুঁজি চলতে থাকায় প্রকাশ্যে সংগঠনের কাজ করতে পারছিলেন না তিনি। তাই সংগঠনের সিদ্ধান্তে তিনি ধরা দেন। পুলিশ যদিও তাঁর কাছ থেকে কোনো গোপন কথা উদ্ধার করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ক্ষুদিরামের বিরুদ্ধে মামলা হলো রাজদ্রোহ এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অপরাধের। যার শাস্তি ফাঁসি এবং যাবজ্জীবন দীপান্তর।  যদিও ক্ষুদিরামের বয়স কম হওয়ায় এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত সরকার এই মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়। ক্ষুদিরাম বসু মুক্তি পায় এবং গোটা মেদিনীপুর জুড়ে ক্ষুদিরাম বসুর বীরের মর্যাদা পান। তাঁকে নিয়ে সভা, পদযাত্রা চলতে থাকে। এখন ক্ষুদিরাম আরও পরিণত, দায়িত্ব বেড়েছে অনেক। ক্ষুদিরামের প্রতি মুগ্ধ হয়ে নাড়াজোলের নরেন্দ্রনাথ খাঁ প্রচুর অর্থ সাহায্য করলেন গুপ্ত সমিতিতে।

ব্রিটিশ সরকারও স্বাভাবিকভাবেই চুপচাপ বসে ছিল না। অত্যাচার বাড়তে থাকে। বৃদ্ধি পায় নানান দমন নীতি। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর ফতোয়া চাপানো হতে থাকে। নিষিদ্ধ হয় বিভিন্ন পত্র পত্রিকা। সেই সময় মেদিনীপুরের অত্যাচারী কিংসফোর্ড আলিপুর প্রেসিডেন্সি বিচারালয়ের মুখ্য হাকিম ছিলেন, যার হাতে ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত এবং 'যুগান্তর'এর অন্যান্য সম্পাদকদের মামলা চলছিল। যাঁদের তিনি কঠোর সাজা শুনিয়েছিলেন।  যুগান্তর দ্বন্দ্বমূলক সম্পাদকীয় লিখে তার প্রতিক্রয়া জানায়, ফলে এব্যাপারে আরো পাঁচজন অভিযুক্ত হলে এই সংবাদপত্র ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে বিরাট আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যুগান্তর মামলার বিরুদ্ধে প্রচারে অংশ নেওয়ায় একজন বাঙালি যুবক সুশীল সেনকে চাবুক মারার সাজা দেওয়ায় কিংসফোর্ড সাহেবের জাতীয়তাবাদীদের কাছে কুখ্যাতি ছিল। যেমন আলিপুর প্রেসিডেন্সি আদালতে মুখ্য হাকিম হিসেবে কাজে যোগ দেওয়ার সময় থেকেই নবীন রাজনৈতিক কর্মীদের কঠোর ও নিষ্ঠুর বাক্য প্রয়োগ করতেন। তিনি ওইসব কর্মীদের শারীরিক নির্যাতনের সাজা দিতেন। কিশোর সুশীল সেন প্রতি বেত্রাঘাতের সাথে সাথে ‘বন্দেমাতরম’ স্লোগান দিতে থাকেন। গান তৈরি হলো, ‘বেত মেরে কি মা ভোলাবি, আমরা কি মায়ের সেই ছেলে?’

কিংসফোর্ডের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছিল।

গুপ্ত সমিতির গোপন সভায় অত্যাচারী কিংসফোর্ডকে মৃত্যুর শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। হেমচন্দ্রের তৈরি করা বই বোমা দিয়ে কিংসফোর্ডকে হত্যার প্রথম প্রচেষ্টা করা হয়। একটা ক্যাডবেরি কোকোর খালি টিনে এক পাউন্ড পিকরিক অ্যাসিড এবং তিনটে ডেটোনেটর। এবার এটা হার্বার্ট ব্রুমএর 'কমেন্টারিজ অন দ্য কমন ল' বইয়ের ফাঁপা অংশে প্যাক করা হয়েছিল এবং বাদামি কাগজ দিয়ে মুড়ে নবীন বিপ্লবী পরেশ মল্লিক কিংসফোর্ডের বাড়িতে দিয়ে আসেন। কিংসফোর্ড প্যাকেটটা না-খুলে পরে দেখবেন বলে তার সেলফে রেখে দেন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চে বিচারকের নিরাপত্তার ভয়ে, কিংসফোর্ডের পদোন্নতি করে সরকার তাকে বিহারের মুজাফফরপুর জেলার বিচারপতি হিসেবে বদলি করেন। তার সঙ্গে যায় আসবাবপত্র, লাইব্রেরি এবং বই বোমা। যদিও প্রাণে বেঁচে গেলেন কিংসফোর্ড।

থেমে থাকেননি বিপ্লবীরা। অনুশীলন সমিতি কিংসফোর্ডকে হত্যা করার প্রচেষ্টা জারি রেখেছিল। এপ্রিলে দুই সদস্যের একটা পরিদর্শক দল মুজাফফরপুর সফর করে, যাতে যুক্ত ছিলেন প্রফুল্ল চাকী।তাদের ফিরে আসায় বোমা দিয়েছিলেন হেমচন্দ্র, যেগুলো বানানো হয়ছিল ৬ আউন্স ডিনামাইট, একটা বিস্ফোরক এবং কালো পাউডার ফিউজ। প্রফুল্ল চাকী মুজফফরপুরে ফিরেছিলেন একটা নতুন ছেলেকে নিয়ে, যার নাম ক্ষুদিরাম।

এই কাজের দায়িত্বভার প্রফুল্ল চাকীর সাথে ক্ষুদিরাম বসুর উপর দেওয়া হলো। সত্যেন বসু নিজের প্রিয়তম রাজনৈতিক শিষ্যকে এই দায়িত্ব দিয়ে কিছুটা কষ্ট পান, কারণ এমন কর্মসূচির অর্থই নিশ্চিত মৃত্যু। যদিও ক্ষুদিরাম বিন্দু মাত্র বিচলিত না হয়ে কিংসফোর্ডকে হত্যা করার কাজে মনোনিবেশ করা শুরু করেন। তিনি জানালেন তিনি প্রস্তুত। হেমচন্দ্র কানুনগো এবং উল্লাস কর দত্ত বোমা বানানোর কাজ শেষ করলেন। জোগাড় হলো রিভলভার। কলকাতার মানিকতলাতে দেখা হলো দুই বিপ্লবী, ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল চাকীর।

অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্র ঘোষ এবং তাদের সহযোগীদের কাজকর্মে পুলিশের সন্দেহ হতে থাকে। কলকাতা পুলিশ কিংসফোর্ডের জীবন বাঁচানোর জন্যে সচেতন হয়ে ওঠে। কমিশনার এফ.এল. হলিডে মুজাফফরপুর পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্টেকে উপেক্ষার  বদলে সতর্ক হতে বলেছিলেন। যাইহোক, চারজন লোককে ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্যে ব্যবস্থা করা হয়।ইতোমধ্যে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকি নতুন নাম ধারণ করে যথাক্রমে হরেণ সরকার ও দীনেশ চন্দ্র রায় হয়েছেন এবং কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত এক দাতব্য সরাইখানায় (ধর্মশালা) তাঁরা বাসা নেন সম্ভবত ১১ই আগষ্ট । তাদের অজ্ঞাতবাসের দিনগুলোতে ওই বিপ্লবীদ্বয় তাদের লক্ষ্যের কার্যকলাপ এবং দৈনন্দিন রুটিনের ওপর নজরদারি করতেন। দুই বিপ্লবী সফলভাবে তিন সপ্তাহের ওপর তাদের পরিচয় গোপন রাখতে পেরেছিল। মুজাফফরপুরের সুপারিন্টেন্ডেন্ট আর্মস্ট্রঙের কাছ থেকে একটা চিঠি নিয়ে সিআইডি অফিসার কলকাতায় ফিরে এসেছিল, যাতে বলা হয়েছিল যে, বিপ্লবীদ্বয় ওখানে পৌঁছায়নি। ২৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল তাদের পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্যে জায়গামতো হাজির হয়েছিল। স্কুল ছাত্রের ভান করে মুজাফফরপুর পার্কে তারা সমীক্ষা করেছিলেন যে, এটা ব্রিটিশ ক্লাবের উলটো দিকে, যেখানে কিংসফোর্ড ঘনঘন আসেন। নির্ধারিত দিনে প্রিঙ্গল কেনেডি নামে একজন ব্রিটিশ ব্যারিস্টারের মেয়ে এবং স্ত্রীর সঙ্গে কিংসফোর্ড এবং তার স্ত্রী ব্রিজ খেলছিলেন। তারা রাত ৮.৩০ নাগাদ বাড়ি ফিরতে মনস্থ করেন। কিংসফোর্ড এবং তার স্ত্রী একটা গাড়িতে ছিলেন যেটা কেনেডি এবং তার পরিবারের গাড়ির মতোই দেখতে ছিল। কেনেডি কিংসফোর্ডের বাড়ির চত্বর থেকেই যাচ্ছিলেন। যখন তাদের গাড়ি ওই চত্বরের ফটকে পৌঁছায়, ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল গাড়িটার দিকে দৌড়ে যান এবং গাড়িতে বোমাগুলো ছোড়েন। একট প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে এবং গাড়িটা সঙ্গে সঙ্গে কিংসফোর্ডের বাড়িতে আনা হয়। গাড়িটা ভেঙে গিয়েছিল এবং কেনেডি ও তার মেয়ে ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। মিস কেনেডি এক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যান এবং মিসেস কেনেডি গুরুতর আঘাতের ফলে ২ মে তারিখে মারা যান।ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল নিজেদের রাস্তায় পালিয়ে যান। মধ্যরাতের মধ্যে সারা শহর ঘটনাটা জেনে গিয়েছিল, এবং খুব সকাল থেকেই সমস্ত রেলস্টেশনে সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল যাতে প্রত্যেক যাত্রীর ওপর নজর রাখা যায়। সকাল পর্যন্ত ক্ষুদিরাম ২৫ মাইল পায়ে হেঁটে ওয়াইনি নামে এক স্টেশনে পৌঁছান। যখন একটা চায়ের দোকানে তিনি এক গ্লাস জল চেয়েছিলেন, তখন তিনি ফতে সিং এবং শিউ প্রসাদ সিং নামে দুজন কনস্টেবলের মুখোমুখি হন, যারা তার ময়লা পা এবং বিধ্বস্ত ও ঘর্মাক্ত চেহারা দেখে কিছু সন্দেহ করেছিল। কয়েকটা প্রশ্ন করার পর তাদের সন্দেহ বেড়ে যায় এবং তারা ক্ষুদিরামকে আটক করার সিদ্ধান্ত নেয়। ক্ষুদিরাম তাদের দুজনের সঙ্গে সংগ্রাম শুরু করে এবং তৎক্ষণাৎ দুটো রিভলভারের একটা পড়ে যায়। অন্য রিভলভারটা দিয়ে কনস্টেবলদেরকে গুলি করতে উদ্যত হওয়ার আগেই কনস্টেবলদের একজন ক্ষুদিরামকে পিছন দিক থেকে মজবুত আলিঙ্গনাবদ্ধ করে ধরে ফেলে। নবীনতর এবং হালকা চেহারার ক্ষুদিরামের পক্ষে নিজের প্রতিরক্ষা অথবা অব্যাহতি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিলনা। তার কাছে ৩৭ রাউন্ড গোলাগুলি, ৩০ টাকা নগদ, একটা রেলপথের মানচিত্র এবং একপাতা রেলের সময়সারণি ছিল। ক্ষুদিরাম চিরকালের জন্যে ধরা পড়ে গেলেন! ওয়াইনি রেল স্টেশনটা বর্তমানে নাম বদল করে হয়েছে ক্ষুদিরাম বসু পুসা স্টেশন।

অন্যদিকে প্রফুল্ল কয়েক ঘণ্টা কষ্ট করে অনেকটা হেঁটেছিলেন। দিনের মাঝামাঝি ত্রিগুণাচরণ ঘোষ নামে এক নাগরিক লক্ষ করলেন যে, একজন যুবক তার দিকেই আসছেন। তিনি বোমা বিস্ফোরণে ভীত হয়েছেন এবং অনুভব করেছেন যে, প্রফুল্ল চাকি হলেন সেই অন্য বিপ্লবী। ত্রিগুণাচরণ ঘোষ তার জীবন রক্ষা করে তাকে তার বাড়িতে বিশ্রাম নিয়ে বাঁচাতে চাইছেন। তিনি সেই রাতেই প্রফুল্লর কলকাতায় ফেরার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি সমস্তিপুর থেকে মোকামাঘাট যাওয়ার এবং পরবর্তী যাত্রায় হাওড়া যাওয়ার ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা করেন। ট্রেনের একই বগিতে ব্রিটিশ পুলিশের একজন সব-ইন্সপেক্টর নন্দলাল ব্যানার্জি সফর করছিলেন। একটা কথোপকথনে তিনি ধরে ফেলেন যে, প্রফুল্লই হচ্ছেন সেই অন্য বিপ্লবী। শিমুরিঘাট রেল স্টেশনে প্রফুল্ল যখন জল খাওয়ার জন্যে ট্রেন থেকে নামেন, তখন মিস্টার ব্যানার্জি মুজফফরপুর থানায় একটা টেলিগ্রাম পাঠান। মোকামাঘাট রেল স্টেশনে প্রফুল্লকে পাকড়াও করার চেষ্টা করেন মিস্টার ব্যানার্জি। প্রফুল্ল তার কাছে থাকা রিভলভার দিয়ে নিজের মতো লড়াই করার চেষ্টা করেন, কিন্তু শেষে যখন দেখেন যে, রিভলভারে একটামাত্র গুলি আছে, তখন তিনি নিজের মুখের মধ্যে গুলি করেন।

হাতে হাতকড়ি লাগানো ক্ষুদিরামকে পয়লা মে মুজফফরপুর থেকে আনা হয়। পুরো শহর থানায় ভিড় করেছিল একদল সশস্ত্র পুলিশকর্মীর ঘিরে থাকা একটা কিশোর ছেলেকে শুধু একপলক দেখার জন্যে। জেলাশাসক মিস্টার উডম্যানের বাড়িতে ক্ষুদিরামকে আনা হয়েছিল। পরের দিন, অর্থাৎ ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ২ মে, ইংরেজি ' দ্য স্টেটসম্যান' লেখে স্টেশনে ভিড় জমে যায়। ১৮ অথবা ১৯ বছরের এক কিশোর হলেও তাঁকে রীতিমতো দৃঢ় দেখাচ্ছিল। বাইরে তার জন্যেই রাখা এক চারচাকার খোলা গাড়িতে উঠতে প্রথম শ্রেণীর এক রেল কামরা থেকে বেরিয়ে সে হেঁটে আসছিল, এক উৎফুল্ল কিশোরের মতো, যে কোনো উদ্বেগ জানেনা....গাড়িতে নির্দিষ্ট আসনে বসার সময় ছেলেটা চিৎকার করে বলে উঠল 'বন্দেমাতরম্'।"

বিচার শুরু হলো ক্ষুদিরামের। বিচারক ছিলেন জনৈক ব্রিটিশ মি. কর্নডফ এবং দুজন ভারতীয়, লাথুনিপ্রসাদ ও জানকীপ্রসাদ। রায় শোনার পরে ক্ষুদিরামের মুখে হাসি দেখা যায়। তাঁর বয়স খুব কম ছিল। বিচারক কর্নডফ তাঁকে প্রশ্ন করেন, তাঁকে যে ফাঁসিতে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে কিনা? ক্ষুদিরাম আবার মুচকি হাসেন। তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ভোর ছ-টায়।

ক্ষুদিরাম বসু সম্পর্কে হেমচন্দ্র কানুনগো লিখেন, ক্ষুদিরামের সহজ প্রবৃত্তি ছিল প্রাণনাশের সম্ভাবনাকে তুচ্ছ করে দুঃসাধ্য কাজ করবার। তার স্বভাবে নেশার মতো অত্যন্ত প্রবল ছিল সৎসাহস। আর তার ছিল অন্যায় অত্যাচারের তীব্র অনুভূতি। সেই অনুভূতির পরিণতি বক্তৃতায় ছিলনা, বৃথা আস্ফালনও ছিলনা; অসহ্য দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, এমনকি মৃত্যুকে বরণ করে, প্রতিকার অসম্ভব জেনেও শুধু সেই অনুভূতির জ্বালা নিবারণের জন্য, নিজ হাতে অন্যায়ের প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে প্রতিবিধানের চেষ্টা করবার ঐকান্তিক প্রবৃত্তি ও সৎসাহস ক্ষুদিরাম চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়। সারা দেশ জুড়ে ১৮বছর ১১মাস ৭ দিনে হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে জীবন দেওয়া ক্ষুদিরাম হয়েওঠেন তরুণ প্রজন্মের আদর্শ।

ক্ষুদিরাম বসুরা আসলে স্পর্ধার নাম। যে স্পর্ধাকে ভয় পায় যে কোনো সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা। আল সম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুদিরাম বসুরা যে স্পর্ধার লড়াই লড়েছিলেন আজকের দিনের তরুণ প্রজন্মের কাছে তা স্মরণীয়। ক্ষুদিরামদের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করব আমরাই।

ক্ষুদিরাম থেকে ভগৎ সিং, জীবনের খুব কম সময়েই যারা বেঁচে থাকার লোভ ত্যাগ করে  স্বাধীনতার জন্য জীবন দিলেন তাদের ভারত ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। আজকের সমাজে ছাত্রছাত্রী, যুবক-যুবতীদের ক্রমাগত রাজনীতি বিমুখ করার চেষ্টা চলছে। দেশ রক্ষার যে রাজনীতিতে আকৃষ্ট ছিলেন ক্ষুদিরাম, এই দেশেই ক্ষুদিরামকে বলা হয় সন্ত্রাসবাদী। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে ক্ষুদিরামের পথ নিতে হবে আমাদের।

শপথ নিয়ে বলতে হবে-

‘ওরা দাঙ্গা করলে নাথুরামের নামে
আমরা দেশ গড়ব ক্ষুদিরামের পথে।’

বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী অমর রহে।


প্রকাশ: ১১-আগস্ট-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image


অন্যান্য মতামত:

সমৃদ্ধ হলাম।খুবই হৃদয়স্পর্শী লেখা।
- প্রদ্যুৎ রায়, ১১-আগস্ট-২০২৫



শেষ এডিট:: 11-Aug-25 00:08 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/khudiram-bose-the-history-the-legacy
Categories: Fact & Figures
Tags: freedom, freedom fighter, historyofindia, indianfreedomstruggle
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড