স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলার সংস্কৃতি (৬ষ্ঠ পর্ব)

মালিনী-ভট্টাচার্য

প্রগতি লেখক সঙ্ঘ ও তারপরে ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সঙ্ঘ ছিল প্রচার ও আলোচনামূলক, কিন্তু গণনাট্য আন্দোলনের ভিত্তি ছিল সৃজনমূলক অনুষ্ঠান। সঙ্ঘের ইশতেহারের বিবৃতি অনুযায়ী 'জনসাধারণের মধ্যে, বিশেষত কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রদের মধ্যে ফ্যাসিস্ট আক্রমণকারী ও মজুতদারদের বিপক্ষে এবং নেতাদের বন্দীদশা থেকে মুক্তি দিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠনের সপক্ষে যে স্বতঃস্ফূর্ত নৃত্য, গীত, অভিনয়ের বিকাশ দেখা যাচ্ছে' গণনাট্য তাকেই একটা সংগঠিত সর্বভারতীয় আন্দোলনের রূপ দিতে চেয়েছিল।

Freedom Struggle and The Culture of Bengal (Part-VI)

৬. স্বাধীনতার মুহূর্ত ও গণ-সংস্কৃতির সন্ধান

‘জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’

সুকান্ত ভট্টাচার্য

‘কিন্তু সেই শুভ রাষ্ট্র ঢের দূরে আজ’

জীবনানন্দ দাশ

১৯২০-র দশকটি স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক বিবর্তনের সময়। একদিকে এই সময়ে এমন কতকগুলি ঘটনা ঘটেছিল যা ত্রিশের দশকে এই সংগ্রামকে এক গণসংগ্রামের রূপ দেয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চিন্তার বিকাশ এমনই একটি ঘটনা। ১৯২১ সালে আমেদাবাদের কংগ্রেস অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজের যে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়, তাও এনেছিলেন দু'জন কমিউনিস্ট-মৌলানা হসরৎ মোহানী এবং স্বামী কুমারানন্দ। সারা ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসেরও সর ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে লড়াই করা। সোভিয়েত রাশিয়া-প্রত্যাগত ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯২৫ সাল থেকে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রসারণে এবং শ্রমিক-কৃষকের লড়াইকে সংগঠিত করায় অগ্রণী ভূমিকা নেন এবং কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলায় (১৯২৪) ধৃতদের বিচার আলোড়ন সৃষ্টি করে। অন্যদিকে চৌরীচোরার ঘটনার পর গান্ধি সহসা অসহযোগ আন্দোলন তুলে নেবার ফলে কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয় এবং স্বরাজ্য পার্টিকে অনুমোদন দিতে গান্ধি বাধ্য হন। এই দশকের শেষ ভাগে সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণী নানা আন্দোলনে এগিয়ে আসেন। অন্যদিকে আবার কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে আন্দোলন চলছিল তার মধ্যে ভূস্বামী ও জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণীর প্রাধান্য ক্রমশ বাড়তে থাকে। মতাদর্শ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাংলার বিরাট মধ্যবিত্ত বর্গের যে প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে বজায় ছিল, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পালটানোর ফলে তাদের মধ্যে এক সঙ্কটের আবির্ভাব হয়, ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে যা আরো তুঙ্গে ওঠে। চাকরির বাজারের সীমাবদ্ধতা, জমির ওপর বর্ধমান চাপ, গ্রাম ছেড়ে শহরে যাবার প্রবণতা এই সবই মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। এই সঙ্গে এর একাংশের মধ্যে যেমন জাতিগত সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতি বেড়ে ওঠে, অন্য একাংশ তেমনি মুক্তি-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব পণ করেন এদেরই অনেকে সে সময়ে ক্রমশ কমিউনিস্ট ভাবধারায় দীক্ষিত হন। আবার কংগ্রেসের মধ্যেই সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন নেতাদের উপস্থিতি ত্রিশের দশকে বর্ধমান হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার জমি তৈরি করে।

বিশের দশকেই লিখিত হয় শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী' (১৯২৬)। ব্রিটিশ সরকার প্রকাশের পরে এই বই বাজেয়াপ্ত করে। শরৎচন্দ্র অল্প কিছুদিনের জন্য হাওড়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন, কিন্তু 'পথের দাবী' সশস্ত্র বিপ্লবের ধারার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা-জ্ঞাপন। উপন্যাস হিসাবে অনেক গলতি থাকা সত্ত্বেও এবং বিপ্লবী গোষ্ঠীর কাজকর্মের সাহিত্যিক রূপায়ণ খুব পরিষ্কার সাকার রূপ না পেলেও অদ্ভুতকর্মা বিপ্লবী নেতা সব্যসাচীর আবেদন পাঠক সমাজের কাছে ছিল জোরালো।

তুমি দেশের জন্য সমস্ত দিয়াছ, তাই ত দেশের খেয়াতরী তোমাকে বহিতে পারে না, সাঁতার দিয়া তোমাকে পদ্মা পার হইতে হয়, তাই ত দেশের রাজপথ তোমার কাছে রুদ্ধ, দুর্গম পাহাড় পর্বত তোমাকে ডিঙাইয়া চলিতে হয়, কোন্ বিস্মৃত অতীতে তোমারই জন্য, ত প্রথম শৃঙ্খল রচিত হইয়াছিল, কারাগার ত শুধু তোমাকে মনে করিয়াই প্রথম নির্মিত হইয়াছিল, সেই ত তোমার গৌরব।

এই আবেগাপ্লুত উচ্চারণ সেদিন দেশের জন্য কঠোর আত্মত্যাগে আদর্শকে উদ্ভাসিত করে তুলেছিল। এই উপন্যাসে কিন্তু আরো একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য আছে। স্বাধীনতার জন্য যারা সশস্ত্র বিপ্লব করছে, তাদের কাজকর্মের মধ্যে শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের ছবিও দেখানো হয়েছে। শরৎচন্দ্রের লেখনী শ্রমিক লাইনের ছবি আঁকতে গিয়ে আদর্শায়ন এড়াতে চেয়েছে, জোর দিয়েছে বাস্তব অবস্থার উপর দারিদ্র্য ও অশিক্ষার ভয়াবহ বিবরণে জল মেশাতে চায়নি। ভারতীর মুখ দিয়ে লেখক বলেছেন, এ নরককুণ্ড তো এরা বানায়নি। এরা শুধু তার প্রায়শ্চিত্ত করছে। ১৯২১ সালে রুশ সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলা সাহিত্যের প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র বলেছিলেন: এই অভিশপ্ত, অশেষ দুঃখের দেশে নিজের অভিমান বিসর্জন দিয়ে, রুষ সাহিত্যের মতো যেদিন সে সমাজের নিচের স্তরে আরো নেমে গিয়ে তাদের সুখ-দুঃখ-বেদনার মাঝখানে দাঁড়াতে পারবে সেদিন এই সাহিত্য-সাধনা কেবল স্বদেশ নয়, বিশ্বসাহিত্যেও আপনার স্থান করে নিতে পারবে।

Lower Depths-এর বাস্তববাদের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের এইখানেই তফাৎ যে, শরৎচন্দ্রের রূপায়ণে শ্রমিকদের কোনো নিজস্ব সত্তা নেই। সব্যসাচীর মতো বিপ্লবীর হাতে তারা যেন যন্ত্রমাত্র। কিন্তু তবু ১৯২১ সালের উক্তিতে আধুনিকতা ও বাস্তববাদের এক বিশেষ ধারণার স্বীকৃতি আছে, তারই সূত্র ধরে যেন 'পথের দাবী'তে তিনি তাঁর উপন্যাসে প্রথম প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, সাহিত্যের এই নতুন উপজীব্যকে এড়ানোর কোনো উপায় নেই। নজরুলের মতোই শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে গুরু বলে মেনেও তাঁর রচনায় এক আভিজাত্যের অদৃশ্য সীমারেখা দেখেছেন যাকে ইতিহাসের

এই বিশেষ পর্যায়ে পেরিয়ে যাওয়া তিনি প্রয়োজন মনে করেছেন। বিশেষত, ১৯২৭ সালে যখন রবীন্দ্রনাথ নিজে আধুনিকতার এই নতুন ধারণাকে আক্রমণ করে লিখলেন, তখন শরৎচন্দ্র নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তদের পক্ষেই রায় দেন। অবশ্যই তাই বলে এরকম কোনো সরলীকৃত সিদ্ধান্তে আসা ভুল হবে যে বঙ্কিমচন্দ্র বা রবীন্দ্রনাথ লেখক হিসাবে বাস্তবের কোনো মোকাবিলা করেননি, বা তাঁদের রচনায় বাস্তবের উপস্থিতি নেই। আসল ঘটনা এই যে, ইতিহাসের পালাবদলের সঙ্গে বাস্তবতার ধারণাও এক নতুন আদল পায়, পূর্বসূরিরা একসময়ে বাংলাভাষায় যে, নতুন সম্ভাবনার ফসল ফলিয়েছিলেন, পরবর্তী যুগের প্রয়োজন সব সময়েই তাকে ছাপিয়ে যায়। এই প্রয়োজনের পটভূমি রচনা করেছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে ঐতিহাসিক শক্তি হিসাবে শ্রমিকের অভ্যুত্থান।

আধুনিক বাস্তবতার এই অনুসন্ধান 'কল্লোল যুগে'ও সীমিত ছিল তথাকথিত 'ভদ্রসমাজে'র বাইরের যে জীবন তার বহিরঙ্গ বর্ণনায়, এই পদ্ধতি প্রকৃতিবাদ বা Naturalism-এর সঙ্গে তুলনীয়; মধ্যবিত্ত পাঠকের কাছে এরও একটা আলংকারিক মূল্য আছে, শরৎচন্দ্র-কথিত 'নরককুণ্ডে'র বর্ণনাও তাকে যোগাতে পারে আত্মমর্ষণের আনন্দ। কিন্তু ত্রিশের দশকের শ্রেষ্ঠ বাস্তববাদী লেখকরা তাঁদের ভাষাকে শাণিত করেছেন বিশ্লেষণী তীক্ষ্ণতায়, মধ্যবিত্ত রোমান্টিকতার স্বরূপ উদ্‌ঘাটন করেছেন নির্মোহভাবে, সমাজ সম্পর্কগুলির জটিল বিন্যাসকে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছেন। এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ আমরা পাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে, গদ্যলেখক হিসাবে যাঁর যাত্রা শুরু ১৯২৮ সালে এবং ১৯৩৪-৩৫ সালের মধ্যে যিনি 'পদ্মানদীর মাঝি' ও 'পুতুলনাচের ইতিকথা' এই দু'টি উপন্যাস লিখে বাংলা কথাসাহিত্যে বাস্তববাদকে এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছে দেন। 'কল্লোলে'র লেখকরা যেখানে অপক্ষপাতে গোর্কি-হ্যামসুনের পাঠশালায় শিক্ষা নিতে চাইছিলেন, মানিক কিন্তু এ দুয়ের মধ্যে প্রভেদকে অনুধাবন করে তারই ভিত্তিতে নিজের বাস্তববাদী শৈলীকে গড়তে চেষ্টিত ছিলেন: 'ভাবের আকাশের ঝড় আর মাটির পৃথিবীতে জীবনের বন্যার পার্থক্য কি ধরা না পড়ে পারে'? তাঁর কল্পনা বা নির্মাণশক্তিকে ভাবের বাষ্প আচ্ছন্ন করতে পারেনি বলেই তাঁর লেখা পড়া সহজ নয়। যেমন 'সমুদ্রের স্বাদে'র গল্পগুলি তাঁর ভাষায় 'ভাবের আবেগে গলে যেতে ব্যাকুল' মধ্যবিত্তদের নিয়ে লেখা। তাদের 'মিথ্যার শূন্যকে মনোরম করে উপভোগ করার ভ্রান্তি'টা তাঁর মতে 'জরার চিহ্ন, ভাঙনের ইঙ্গিত'। কিন্তু এত রুক্ষ সমালোচনাকেও সমসাময়িক মধ্যবিত্ত পাঠক যে সাদরে গ্রহণ করেছিল তাতে তাঁদের উন্নত চেতনারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যে প্রশ্ন নিয়ে মানিক তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু করেন।

'ভদ্র সমাজের বিরোধ, ভণ্ডামি, হীনতা, স্বার্থপরতা, অবিচার, অনাচার, বিকারগ্রস্ততা, সংস্কার-প্রিয়তা, যান্ত্রিকতা ইত্যাদি তুচ্ছ হয়ে এ মিথ্যা কেন প্রশ্রয় পায় যে ভদ্রজীবন শুধু সুন্দর আর মহৎ? ভদ্রসমাজের বিকার ও কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত চাষী-মজুর-মাঝি-মাল্লা-হাড়ি-বাগদীদের রুক্ষ কঠোর সংস্কারাচ্ছন্ন বিচিত্র জীবন কেন অবহেলিত হয়ে থাকে। কেন এই বিরাট মানবতা যে একটা অকথ্য অনিয়মের প্রতীক হয়ে আছে মানুষের জগতে-সাহিত্যো স্থান পায় না?'

এই প্রশ্ন ঐতিহাসিক কারণেই তখন পাঠকের মনেও ছিল। মানিক তাঁকেই রূপ দিয়েছেন। ১৯৪৪ সালে মানিক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। আমৃত্যু সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এর ফলে কেবল যে বড়ো বড়ো প্রকাশকদের দরজা তাঁর কাছে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাই নয়, অনেক সমালোচক তাঁর উত্তরকালের সাহিত্যকে নিছক প্রচারসাহিত্য বলে হেয় করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সময়ের সবচেয়ে অগ্রসর চেতনার প্রতি তাঁর বিশ্বস্ততাই তাঁর বিবর্তনের যৌক্তিক পটভূমি। এক 'কলম-পেষা মজুরা হিসাবে মানিক বুঝেছিলেন বাজারভিত্তিক পুঁজিবাদী সমাজের মধ্যে তাঁর অন্যান্য মজুরের মতোই কোনো স্বাধীনতা নেই, আর এটাও বুঝেছিলেন যে তাঁর শ্রমই সেই হাতিয়ার যাকে ব্যবহার করে স্বাধীনতার দিকে এগোনো যায়। তাঁর জীবন এবং সাহিত্যিক বিশ্বাসের মধ্যে কোনো ফাঁক ছিল না। তাই ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের সামাজিক-রাজনৈতিক আলোড়নের সমগ্রতা তাঁর লেখায় যেভাবে ধরা পড়েছে, তা অনন্য। তাঁর কাছে মার্কসবাদ আপ্তবাক্য থাকেনি, তাঁর বাস্তববাদকে আরো প্রসারিত ও বিকশিত হতে সাহায্য করেছে। 'দর্পণ', 'জীয়ন্ত', 'চিহ্ন', 'ইতিকথার পরের কথা, 'স্বাধীনতার স্বাদ', 'আজ কাল পরশুর গল্প' প্রত্যেকটি প্রয়াসেই তাৎক্ষণিকের মধ্য থেকে উঠে এসেছে ইতিহাসের সূত্রগুলি। স্বকীয়, দেশজ বাস্তববাদের ভাষা বারবার তিনি আবিষ্কার করেছেন।

ত্রিশের দশকের কথাসাহিত্যে নতুন সুর নিয়ে এসেছিলেন তারাশঙ্কর এবং বিভূতিভূষণও। বীরভূমের লৌকিক জীবনের বহু বিভিন্ন ধারার সঙ্গে তারাশঙ্করের পরিচিতি তাঁকে সাহায্য করেছিল তাঁর উপন্যাস ও ছোটোগল্পে তার নিবিড় ছবি আঁকতে, যেমন 'পথের পাঁচালি'-তে (পুস্তকাকারে প্রকাশ: ১৯২৯) বিভূতিভূষণ তাঁর চেনা পল্লীজীবনকেই ধরতে পেরেছেন তার পরিবর্তনশীলতায়। বিভূতিভূষণের লেখায় অবশ্য ত্রিশ বা চল্লিশের দশকের উত্তাল গণঅভ্যুত্থানের ছায়াপাত ঘটেনি বললেই চলে। তবু 'পথের পাঁচালি' বা 'আরণ্যকে' সামাজিক সম্পর্কের সূত্র উদঘাটনের যে বাস্তববাদ তা নিজস্ব ধরনে তাঁর সময়ের ছাপ বহন করে। কিন্তু তারাশঙ্করের সমকালীন রাজনীতির সঙ্গে যোগাযোগ অনেক প্রত্যক্ষ; তাঁর প্রথম উপন্যাস 'চৈতালী ঘূর্ণি'-তে পরিবর্তনের যে ঘূর্ণি হাওয়া গ্রামের চাষী, চাষী বৌ-কে কারখানার বস্তিতে টেনে আনে, তার মধ্যে তিনি দেখিয়েছেন 'কালবৈশাখী'র ইঙ্গিত। কিন্তু এই 'কালবৈশাখী'র গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে তারাশঙ্করের বিশ্লেষণ বেশি দূর যায়নি। 'ধাত্রীদেবতা' (১৯৩৯) এবং চল্লিশের দশকের গোড়ায় 'গণদেবতা', 'পঞ্চগ্রাম' উপন্যাসগুলিতে কেন্দ্র-চরিত্র সামাজিকভাবে লেখকেরই সম-অবস্থানের মানুষ, সমাজের অন্যান্য শোষিত শ্রেণীর মানুষকে দেখা হয়েছে তারই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, শিবনাথ বা দেবু তৎকালীন গণ-আন্দোলনে লেখকের অভিজ্ঞতাকেই ফলিয়ে তোলে। কিন্তু যেখানে আরো নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে এই আন্দোলনকে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন হয়, সেখানে তাঁর কল্পনার দুর্বলতা প্রকাশিত। তাই 'মন্বন্তরে' (১৯৪৩) কানাইয়ের পাপবোধ ও তার থেকে মুক্তির কাহিনী রোমাদের বাঁধা খাতেই চলে, সমকালীন বাস্তব কেবলমাত্র ক্যাহিনীর পৃষ্ঠভূমি হয়ে থাকে। ১৯৪৬-এ লেখা 'ঝড় ও ঝরাপাতা'য় উত্তাল গণ-আন্দোলনের যে বিবরণ, তাকে যদি ঐ একই বছরে একই প্রেক্ষাপটে রচিত মানিকের 'চিহ্ন' নামে ছোটো উপন্যাসটির সঙ্গে তুলনা করি, তাহলেই বোঝা যায় যে কেবল কিছু ঘটনার প্রতিফলন এবং প্রাসঙ্গিক মন্তব্য দিয়েই বাস্তববাদ হয় না। মানিকের প্রতিটি বাক্য এবং প্রতিটি ছবি যেখানে একটি আরেকটির সঙ্গে নিবিড় যুক্তির বন্ধনে সম্পৃক্ত, তারাশঙ্করের বর্ণনা সেখানে অনেকটাই এলোমেলো ও অসঙ্গতিপূর্ণ। ত্রিশের দশকে ফ্যাসিজমের উদ্ভব সাম্রাজ্যবাদের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এক নাতুন। সূচনা। ভারতের তৎকালীন পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদের এই উত্থান দেশের অগ্রণী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল। ফ্যাসিবাদের অন্যতম প্রধান উপাদান আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদ। ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এই মনোভাবকে আদর্শ হিসাবে দেখার মতো মানুষ বিরল ছিল না। ১৯২৬-২৭ সাল থেকেই 'প্রবাসী' ও 'মডার্ন রিভিউ'-তে মুসোলিনি ও ফ্যাসিস্ট দলের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হতে থাকে।

রবীন্দ্রনাথের ইতালি সফরকালে তাঁর মুসোলিনির আতিথ্য গ্রহণের কথা ফলাও করে ছাপানো হয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এই বিভ্রান্তির শিকার হয়েছিলেন, পরে রোলাঁ প্রভৃতির মাধ্যমে যখন ফ্যাসিস্ট দলের প্রকৃত চেহারা তিনি জানতে পারলেন, তখন প্রকাশ্য প্রতিবাদপত্রে সে কথা অকপটে ব্যক্ত করেন: “যে মুহূর্তে আমি জেনেছি সাম্রাজ্যবাদ ও জাতীয়তাবাদের প্রতি অন্ধ আসক্তিই ফ্যাসিবাদের লক্ষ্যস্থল, সেই মুহূর্তেই তার প্রতি আমার সমস্ত সহানুভূতি আমি প্রত্যাহার করে নিয়েছি।” তাঁর জীবনের শেষ কয়েক বছরে ফ্যাসিবাদকে তিনি সভ্যতার সঙ্কট হিসাবে চিহ্নিত। করেছেন এবং তাকে পাশ্চাত্যের আগ্রাসনলোলুপ সভ্যতারই সৃষ্ট দানব বলে মনে করেছেন। সংকীর্ণতা এবং জোরজবরদস্তির রাজনীতির দেশীয় প্রেক্ষিতেও তিনি বরাবর প্রতিরোধ করেছেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তিনি তাই আপসহীন। বস্তুত, হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ফ্যাসিবাদের জাতিশ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্ব খাপ খেয়ে যাচ্ছিল এবং এদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হচ্ছিল। শ্যামাপ্রসাদের আমলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মুসোলিনি-সরকারের পরিচালিত 'Indian Institute for the Middle and Far East'-এর 'নিবিড় সংযোগ' স্থাপিত হয়েছিল। যে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের মধ্যে বামপন্থীদের কাছাকাছি ছিলেন, তিনিও ১৯৩৪ সালে ইউরোপে চিকিৎসা করাতে গিয়ে মুসোলিনির সঙ্গে দেখা করেন এবং এতটা প্রভাবিত হন তাঁর কাছে মনে হয়েছিল কমুনিজম ও ফ্যাসিজমের সমন্বয়ই পৃথিবীর ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়। ইতালিতে ফ্যাসিস্ট শাসনের প্রকৃত চরিত্র জেনেও সুভাষ ভারতের স্বাধীনতার স্বার্থে ব্রিটিশ-বিরোধী যে কোনো শক্তির সঙ্গে হাত মেলাতে প্রস্তুত ছিলেন। পরে যখন তিনি গুপ্তভাবে জার্মানিতে চলে যান, হিটলারের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্দেশ্যও তাই ছিল। যখন তিনি দেখলেন, অক্ষশক্তি ভারতের স্বাধীনতার জন্য কিছুই করতে রাজি নয় তখনই তিনি জার্মানি ত্যাগ করেন। সুভাষচন্দ্র যে দেশোদ্ধারের কাজে নাৎসিশক্তিকে লাগানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, তার পটভূমি দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের একাংশে ফ্যাসিজমের প্রতি সহানুভূতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রবণতা। বিয়াল্লিশের আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন কতগুলি বামপন্থী জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীও ব্রিটিশের শত্রু বলেই অক্ষশক্তির সমর্থক ছিল।

কিন্তু এর এক নিরুদ্ধ মানসিকতাও যে প্রবল হয়ে উঠেছিল তা অস্বীকার করা যায় না। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ডিমিট্রভের যুক্তফ্রন্টের তত্ত্ব সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রগতিশীল মানুষের একটি মঞ্চ গঠনের অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল। 'নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ' লক্ষ্ণৌতে গঠিত হলো ১৯৩৬ সালে, আর এর পরের বছর রোলীর ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আহ্বানকে ভিত্তি করে 'লীগ এগেনস্ট ফ্যাসিজম অ্যান্ড ওয়ার'-এর প্রথম সর্বভারতীয় কমিটি গঠিত হলো। এই উদ্যোগে কমিউনিস্টদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল, পুলিসের গোপন রিপোর্টেও এই ভূমিকার উল্লেখ ছিল। কিন্তু অ-কমিউনিস্ট বহু মানুষ এই উদ্যোগের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহে যোগ দিয়েছিলেন। এই সময়ে স্পেনে ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির যে লড়াই চলছিল তার বিরুদ্ধে প্রচারে জওহরলাল ছিলেন সামনের সারিতে। আর 'লীগ এগেনস্ট ফ্যাসিজম অ্যান্ড ওয়ার'-এর সর্বভারতীয় কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আন্তর্জাতিকতাবাদের মুক্ত আবহাওয়ায় সেদিন প্রজাতন্ত্রী স্পেন বামপন্থী তরুণদের হৃদয়ের খুব কাছাকাছি এসে গিয়েছিল, স্পেনের মুক্তিযুদ্ধে মৃত র‍্যালফ ফক্স বা ক্রিস্টোফার কড়ওয়েলের লেখা ছিল তাঁদের প্রিয়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে মতাদর্শ ও সংস্কৃতির জরুরি ভূমিকা বিশেষ স্বীকৃতি পায়। এই লড়াইয়ে বামপন্থীরা এক অগ্রণী ভূমিকায় থাকতে পেরেছিলেন।

অনেক সময়ে প্রশ্ন তোলা হয় যে, দেশপ্রেমিক সংগ্রমের মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী মঞ্চের কী প্রয়োজন ছিল। মনে করা হয়, এ দেশের কমিউনিস্টরা সোভিয়েত নির্দেশেই ওপর থেকে এরকম একটি আন্দোলনের রূপরেখা চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলেন। বস্তুত, এ নিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত জনসাধারণের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। প্রশ্ন তোলা হয় 'জনযুদ্ধে'র লাইনের যৌক্তিকতা নিয়ে। মনে রাখতে হবে যে, হিটলারের বাহিনী সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪১-এর শেষে কমিউনিস্ট পার্টি বহু আলোচনার পর যে 'জনযুদ্ধে'র লাইন গ্রহণ করে, তার অনেক আগে ত্রিশের দশকেই সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে বামপন্থী ও অন্যান্য প্রগতিশীল লেখকরা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। 'যুক্তফ্রন্টে'র ক্ষেত্র দেশের মধ্যে তৈরি ছিল; দেশের ভিতরে যে উগ্রজাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদ স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করছিল, শিক্ষিত মানুষের একাংশের মনে এই চেতনার বিস্তার ঘটাচ্ছিল, আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদ তাকে আরো উৎসাহ যোগাচ্ছিল। এর বিরুদ্ধে লড়াইকে তাই বামপন্থীরা দেশপ্রেমিক লড়াইয়ের একটি অংশ হিসাবে নিয়েছিলেন। তাঁরা সঠিকভাবেই বুঝেছিলেন চেতনার স্তরে, সংস্কৃতির স্তরে প্রগতিশীল শক্তিগুলিকে একত্র করে এর মোকাবিলার প্রয়োজন। ১৯৪২ সালে ঢাকায় উগ্র জাতীয়তাবাদীদের হাতে ফ্যাসিবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক তরুণ লেখক সোমেন চন্দের হত্যাকাণ্ড এই আন্দোলনকে আরো জোরদার করে।

১৯৪২ সালের ৯ই আগস্ট 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ব্যাপক জনসাধারণের ব্রিটিশের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক রোষ ফেটে পড়ে। যে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এই আহ্বান প্রথম তুলেছিলেন তাঁরা কিন্তু এই বিস্ফোরণের জন্য তৈরি ছিলেন না। তাঁরা ৯ই আগস্টের পরেই কারান্তরালে চলে গেলে আন্দোলন এক অপরিকল্পিত পথে অগ্রসর হয়, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে সরকারি দমননীতি। এই আন্দোলনের প্রধান ভূমিকায় ছিলেন কংগ্রেস সোস্যালিস্টরা, কিন্তু সাধারণ মানুষ কীভাবে তাতে যোগ দিয়েছিল তার এক অসামান্য বাস্তববাদী চিত্রণ আমরা পাই সতীনাথ ভাদুড়ির 'ঢোঁড়াইচরিত মানস'-এ। রাজনৈতিক আলোড়নকে কেন্দ্র করে যে বাস্তববাদের বিকাশের কথা আগে বলেছি 'ঢোঁড়াই' সেই ধারারই অবদান। কিন্তু উপন্যাসে সতীনাথ দেখিয়েছেন, আন্দোলনের ঢেউ স্তিমিত হয়ে এলে ঢোঁড়াই দেখে তেমনি দূরেই রয়ে গেছে 'রামরাজ্যে'র স্বপ্ন, তাকে আবার প্রথম থেকে পথ চলা শুরু করতে হয়।

'৪২-এর আন্দোলনে কমিউনিস্টরা ছিলেন না, কারণ ফ্যাসিস্তদের বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির লড়াইতে কোনো বাধা সৃষ্টি না করাই ছিল 'জনযুদ্ধে'র নীতি। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক আছে, যদিও 'জনযুদ্ধে'র তাত্ত্বিক অবস্থান ছিল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী, কিন্তু কার্যত এতে কমিউনিস্টদের ব্রিটিশবিরোধিতা যে কিছুটা থমকে গিয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই।

রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এতে দ্বিধা সৃষ্টি হয়, কিন্তু 'জনযুদ্ধ'-কে একটি ধাপ হিসাবে ব্যবহার করে কমিউনিস্টরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন, ১৯৪৩-এ বাংলায় সাম্রাজ্যবাদসৃষ্ট মন্বন্তরের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে এই সাংস্কৃতিক যোগাযোগকে তাঁরা যেভাবে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন, তা তাঁদের স্বাধীনতার ঠিক আগেকার উত্তাল দিনগুলিতে এক উজ্জ্বল ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে সাহায্য করে, বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাংস্কৃতিক চেতনায় তাঁরা এক স্থায়ী ছাপ রাখতে সক্ষম হন।

এটাই হলো ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ এবং গণনাট্য আন্দোলনের জন্মকাহিনী। প্রগতি লেখক সঙ্ঘ ও তারপরে ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সঙ্ঘ ছিল প্রচার ও আলোচনামূলক, কিন্তু গণনাট্য আন্দোলনের ভিত্তি ছিল সৃজনমূলক অনুষ্ঠান। সঙ্ঘের ইশতেহারের বিবৃতি অনুযায়ী 'জনসাধারণের মধ্যে, বিশেষত কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রদের মধ্যে ফ্যাসিস্ট আক্রমণকারী ও মজুতদারদের বিপক্ষে এবং নেতাদের বন্দীদশা থেকে মুক্তি দিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠনের সপক্ষে যে স্বতঃস্ফূর্ত নৃত্য, গীত, অভিনয়ের বিকাশ দেখা যাচ্ছে' গণনাট্য তাকেই একটা সংগঠিত সর্বভারতীয় আন্দোলনের রূপ দিতে চেয়েছিল। গণনাট্য সঙ্ঘের কমিউনিস্ট সংগঠকরা এই আন্দোলনের মধ্যে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন অনুষ্ঠানমূলক সৃজনের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধরদের, এবং মন্বন্তর, শ্রমিকের আন্দোলন, তেভাগার লড়াই, বন্দীমুক্তির তীব্র আহ্বান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ব্রিটিশ দমননীতির সমালোচনা এইসব সমকালীন বিষয় যে শিল্পীর সৃজনশীলতাকে আলোড়িত করার মতো বিষয়, এই সচেতনতাকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। শহর থেকে এই আন্দোলনের বিকাশ হলেও তা গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির ধারাগুলির সঙ্গে একটা যোগাযোগের সেতু স্থাপন করতে পেরেছিল; এই ধারাগুলিকে যে কেবল আঙ্গিকের অভিনবত্বের জন্যই ব্যবহার করা হচ্ছিল তা নয়, গ্রামীণ শিল্পীদের মধ্যেও তা নতুন চেতনার বিকাশে সহায়তা করছিল। ফরমায়েসি গান রচনা নয়, শ্রোতা-দর্শকের নতুন চাহিদার সঙ্গে সাবেক ধারার শিল্পীদের পরিচয় ঘটাচ্ছিল। তাই হেমাঙ্গ বিশ্বাস, বিনয় রায়, নির্মলেন্দু চৌধুরীর পাশাপাশি রমেশ শীল, গুমানি দেওয়ান, নিবারণ পণ্ডিত এবং শ্রমিক-শিল্পী গুরুদাস পাল, দশরথলাল, লালশুকরা ওঁরাওদের অভ্যুত্থানও লক্ষ্য করার মতো। ত্রিশের দশকের গোড়ায় (১৯৩১) গুরুসদয় দত্ত ব্রতচারী আন্দোলনের ধারার মধ্যে রায়বেশে প্রভৃতি শরীরচর্চামূলক শিল্পকে নিয়ে এসে তাকে জাতীয় মর্যাদা দেবার যে চেষ্টা করেছিলেন তার প্রভাব মূলত শহরের মধ্যবিত্তের মধ্যে হলেও গ্রামীণ শিল্পীদের মধ্যেও তার একটা সীমিত, ক্ষণস্থায়ী অনুরণন ছিল। গণনাট্য আন্দোলন লোকসংস্কৃতিকে উজ্জীবিত করার প্রচেষ্টাকে সত্যিই একটা গণরূপ দেবার পথে আরো অনেক দূর এগোতে পেরেছিল। বিভিন্ন জেলার, এমনকি বিভিন্ন প্রদেশের শিল্পীদের মধ্যে আদানপ্রদান বাড়ানোর প্রয়াসে স্কোয়াডগুলি বহু সফর করেছিল। পেশাদার বঙ্গমঞ্চের বাধ্যবাধকতাকে ভেঙে বাংলায় নাট্যরীতি ও অভিনয়রীতির ক্ষেত্রে প্রবল বিবর্তন নিয়ে এল 'জবানবন্দী', 'নবান্ন', 'রাহুমুক্ত'। চিত্তপ্রসাদ ও সোমনাথ হোড়ের মতো প্রতিভাশালী চিত্রশিল্পীরা অনুপ্রেরণার ক্ষেত্র পাচ্ছিলেন এই আন্দোলনে। শিল্প এবং রাজনীতি যে পরস্পর বিরোধী নয়, এই সত্যকে তাঁরা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। এমনকি বাংলা চলচ্চিত্রে পঞ্চাশের দশকে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক বা মৃণাল সেন যে বাস্তবমুখী ধারার উন্মোচন করলেন, গণনাট্য আন্দোলনের কাছে তারও পরোক্ষ ঋণ অনেক।

ত্রিশের দশকে চট্টগ্রামের যুবক বিপ্লবীরা সেখানে যে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটান, তা ছিল মধ্যবিত্ত যুবসমাজের এই ধরনের প্রতিবাদের অন্তিম পর্ব। গণ-আন্দোলন ছাড়া যে মুক্তির পথ খুলবে না, এটা তখন পরীক্ষিত সত্যের পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রদায়িকতার ছড়িয়ে পড়া বিষবাষ্পকে মুছতে হলেও যে গণ-আন্দোলন ছাড়া উপায় নেই তার প্রমাণ ছিল ট্রাম ও অন্যান্য সংগঠিত শ্রমিকদের দাঙ্গাবিরোধী বীরোচিত ভূমিকায়, তেভাগার যৌথ লড়াইয়ে। ছাত্র-যুবকদের অগ্রসর অংশও এইসব গণ-আন্দোলনে শামিল হচ্ছিলেন, সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে মতের অমিল থাকলেও আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে বামপন্থীরা এক অগ্রণী ভূমিকা নেন, রসিদ আলি দিবসের ব্যাপক সমাবেশে যার প্রমাণ। স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে জনগণের অগ্রগামী পদক্ষেপের আওয়াজ চল্লিশের দশকে সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় স্পষ্ট শোনা যায়। প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক উচ্চারণ, এমনকি স্লোগান থেকেও যে কবিতা তৈরি হতে পারে তা এই তরুণ কবিরা সেদিন দেখিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলা কাব্যভাষার পরিসরকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কারণ স্লোগানের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছিল রাজনৈতিক বাস্তব। সমর সেন সুক্ষ্ম ব্যঙ্গের ব্যবহারে শহুরে বিষাদকে বিদ্ধ করার অভিনব প্রকরণ আনলেন। জীবনানন্দ দাশ যাঁকে অনেক সময় ভুল করা হয় রোমান্টিক অরাজনৈতিক কবি বলে-তাঁর এই সময়ের কবিতায় ইতিহাসচেতনার প্রতিভাস নিয়ে এলেন, গভীর মানবিক সংবেদন নিয়ে 'মধ্যযুগের' চাইতেও বেশি আগুন ও রক্তের চিত্রকল্প চোখের ওপর নিয়েও এক শুভ রাষ্ট্রের দূর সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দিলেন।

জাতীয় নেতাদের কাছে গণ-আন্দোলনের এই রূপ বিপজ্জনক ছিল বলেই তারা ব্রিটিশের সঙ্গে আপসের মাধ্যমেই স্বাধীনতা আনতে চেয়েছিল, কেউ কেউ উসকানি যুগিয়েছিল সাম্প্রদায়িকতাকে এবং ক্ষমতা দখল করার তড়িঘড়ি আগ্রহে দেশভাগে সায় দিয়েছিল। গণ-আন্দোলনের ধারাগুলি, ই এম এস নাম্বুদিরিপাদের ভাষায়, যখন একত্র হয়ে বিপ্লবের সমুদ্রে মিশল না, মাঝপথে শুকিয়ে গেল, তখন সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও সঙ্কট এল, কিন্তু সেই অনুপ্রেরণার প্রতিধ্বনি পঞ্চাশ বা ষাটের দশকেও ছিল জীবন্ত।


১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাসে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি থেকে একটি ছোট আকারের বই হিসাবে প্রকাশিত হয় ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলার সংস্কৃতি’। স্বাধীনতার অর্ধশবর্ষে বাংলার স্বাধীনতার সংগ্রামের বিভিন্ন ধারাগুলির সাথে সাধারণ মানুষের পরিচয় গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে পার্টির রাজ্য কমিটি কয়েকটি পুস্তিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়, বইটি ছিল সে পরিকল্পনারই অন্যতম  ফসল। এ ধারাবাহিকে বইটি ছ’টি পর্বে প্রকাশ করা হল।  

সূত্র -

(১) Nineteenth Century Studies. Ed Alok Ray. Nos 4,9,10,12. 1973-75. Calcutta.

(২) সটীক হুতোম প্যাঁচার নকশা। কালীপ্রসন্ন সিংহ (সম্পাদনা: অরুণ নাগ)। কলকাতা। ১৩৯৮।

(৩) বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ। বিনয় ঘোষ। কলকাতা। ১৯৮৪।

(৪) রামমোহন ও তৎকালীন সমাজ ও সাহিত্য। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। কলকাতা। ১৯৭২।

(৫) বাংলার ক'জন সেরা সাংবাদিক। প্রবন্ধসংকলন (মিহির ভট্টাচার্য ও কৃষ্ণ ধর সম্পাদিত)। কলকাতা। ১৯৯৩।

(৬) বঙ্গরঙ্গমঞ্চ ও বাংলা নাটক। পুলিন দাস। কলকাতা। ১৯৯৬।

(৭) মুসলিম-মানস: সংঘাত ও প্রতিক্রিয়া। রশীদ আল্-ফারুকী। কলকাতা। ১৯৮১।

(৮)Nationalism & Colonialism in Modern India. Bipan Chandra. Delhi. 1979.

(৯) The Hindu Nationalist Movement in India. Christophe Jaffrelot. Delhi. 1996

(১০) The Making of a New Indian Art. Tapati Guha Thakurta. Cambridge. 1992

(১১) Nationalist Thought and the Colonial World. Partha Chatterjee. Oxford. 1986.

(১২) The Parlour and the Streets. Elite & Popular Culture in 19th Century Calcutta Sumanta Banerjee Calcutta, 1989.

(১৩) ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রামে অবিভক্ত বাংলা। সুস্নাত দাশ। কলকাতা। ১৯৮৯।

(১৪) Marxist Cultural Movement in India. Vol. L. Ed. Sudhi Pradhan, Calcutta, 1985.

(১৫) বাংলার রেনেসাঁস। সুশোভন সরকার। কলকাতা। ১৯৯০।

(১৬) 'হিন্দুমেলা, জাতীয় পরিসর ও সংস্কৃতির রাজনীতি' ইন্দিরা চৌধুরী। বারোমাস। শারদীয় ১৯৯৬।

(১৭) কাজি নজরুল ইসলাম আত্মকথা। মুজফফর আহমেদ। কলকাতা। ১৯৬৫।

(১৮) রুশবিপ্লব ও প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী। চিম্মোহন সেহানবীশ। কলকাতা। ১৯৭৩।

(১৯) চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলাদেশের কৃষক। বদরুদ্দিন উমর। ঢাকা। ১৯৭৪।

(২০) দেশজ শিক্ষার ধারা। পরমেশ আচার্য। কলকাতা। ১৯৮৯।

(২১) The Swadeshi Movement in Bengal. Sumit Sarkar. Delhi. 1973.

(২২) রবিজীবনী (১ম-৬ষ্ঠ খণ্ড)। প্রশান্তকুমার পাল। কলকাতা। ১৯৮২-১৯৯৩।

(২৩) 'ফরাসি বিপ্লবের প্রতিধ্বনি। বাংলাদেশ': অবস্তীকুমার সান্যাল। আকাদেমি পত্রিকা। ৩। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি। মে, ১৯৯০।

(২৪) 'Marx's Perception of India". Essays in Indian History Towards A Marxist Perception. Irfan Habib, Delhi, 1995.

 


প্রকাশ: ০৭-আগস্ট-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 31-Jul-26 11:53 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/freedom-struggle-and-the-culture-of-bengal-part-vi-
Categories: Fact & Figures
Tags:
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড