স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলার সংস্কৃতি (৫ম পর্ব)
শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাংলার সাংস্কৃতিক জগতে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব। ঐতিহ্যমুখিতা ও আধুনিকতার যে দ্বন্দ্ব গোটা সমাজেই তখন চলছিল, ঠাকুরবাড়ির পরিবেশেও ছিল তার অনুরণন। ব্রাহ্মসমাজের অগ্রসর চেতনা এবং তার সংকীর্ণতা দুইয়ের অভিজ্ঞতা নিয়েই রবীন্দ্রনাথ বেড়ে উঠেছিলেন।

৫. আন্দোলনের বিস্তৃতি ও সংস্কৃতির ভূমিকা
রবীন্দ্রনাথ
১৮৫৯ সালের নীল বিদ্রোহের একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, তার মধ্যে হিন্দু-মুসলিম কৃষকের মিলিত সংগ্রামের একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, উদীয়মান ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতা রফিক মণ্ডল নীলকর-বিরোধী সংগ্রাম পরিচালিত করায় অগ্রণী ভূমিকা নেন। শুধু তাই নয়, সিপাহি অভ্যুত্থানের সময়ে যে বাঙালি 'ভদ্রলোক' সমাজ সাধারণভাবে ব্রিটিশ প্রশাসনের পক্ষে ছিল, নীলবিদ্রোহের মাধ্যমে কৃষকের সংগ্রামের সঙ্গে তার একটি স্পষ্টতর যোগাযোগের সূত্র তৈরি হয়। 'কাঙাল হরিনাথে'র 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা' প্রথম বার হয় ১৮৬৩ সালে, তাঁর জেহাদ ছিল শুধু নীলকর সাহেব নয়, দেশী জমিদারদের বিরুদ্ধেও। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা ইংরেজি স্কুলে কিছুদিন পড়া হরিনাথের পল্লীগ্রামের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ছিল, লোকসংস্কৃতির, বিশেষত, বাউল-সহজিয়া সংস্কৃতির তিনি একজন শরিক ছিলেন। ব্যতিক্রমী চরিত্র হলেও, কৃষক-সংগ্রাম সম্বন্ধে বর্ধমান সচেতনতার যে প্রবণতা, তিনি তারই অগ্রদূত। বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৭৩ ও ১৮৭৫ সালে 'বঙ্গদর্শনে' প্রকাশিত তিনটি প্রস্তাব ও 'বঙ্গদেশের কৃষকে'র কিয়দংশ নিয়ে ১৮৭৯ সালে প্রকাশ করেন 'সাম্য'। পরে তিনি যখন 'সাম্য' পুনর্মুদ্রণ না করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি এই লেখাটির জন্য দায়ী করেন জন স্টুয়ার্ট মিলের প্রভাবকেই। 'বঙ্গদেশের কৃষক' অবশ্য 'বিবিধ প্রবন্ধ'-২য় ভাগের অংশ হিসাবে ছাপা হয়েছিল। মিলের প্রভাব ছাড়াও ষাট ও সত্তরের দশকে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের দৃষ্টি যে কিছুটা নিজের দিক থেকে অন্যান্য শোষিত ও অত্যাচারিত বর্গের দিকে ঘুরতে শুরু করেছে, বঙ্কিমচন্দ্রের এই লেখাগুলি হয়তো তারই ইঙ্গিত বহন করে। অধিকারের সাম্য নিয়ে তাঁর মতামত কৃষক-জমিদারের ক্ষেত্রে এবং স্ত্রী-পুরুষের ক্ষেত্রে তিনি যে পরে আর ব্যক্ত না করার সিদ্ধান্ত নেন এতে ঐ সমাজের দোটানাই প্রকাশিত।
এর সঙ্গে সঙ্গে শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এই মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের অধিকার এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার দাবি ক্রমশ আরো সংগঠিত ও সোচ্চার হয়ে উঠতে থাকে। মূলত কৃষকভিত্তিক ওয়াহাবি আন্দোলন সত্তরের দশকে যে তীব্রতা পায় এবং যে সন্ত্রাসবাদের রাস্তা নেয়, হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজে তখনও তার চিহ্ন ছিল না। আন্দোলন ছিল মূলত নিয়মতান্ত্রিক, রবীন্দ্রনাথের 'জীবনস্মৃতি'তে যে 'স্বাদেশিকের সভা'র উল্লেখ আছে সেখানে গুপ্ত সমিতির আদলে আচার অনুষ্ঠান পালিত হলেও, যে গোপনীয় বিষয় কিছু ছিল না তা লেখক নিজেই বলেছেন। লর্ড কার্জনের সময় গদ্যে এবং লর্ড লিটনের সময়ে পদ্যে তিনি দিল্লি দরবার নিয়ে যে লেখা লিখেছিলেন, সে প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'ইংরেজ গবর্মেন্ট রুশিয়াকেই ভয় করিত, কিন্তু চোদ্দ-পনেরো বছর বয়সের বালক কবির লেখনীকে ভয় করিত না।' কিন্তু শতাব্দীর শেষ তিন দশকে ক্রমবর্ধমান জন-অসন্তোষের প্রাবল্য ব্রিটিশের অগোচর ছিল না এবং ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাব যে সামাজিক স্তরভেদগুলিকে অতিক্রম করে যেতে পারে, এ ভয়ও তাদের ছিল। ১৮৮৫ সালের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের গোড়াপত্তন এই বিপদকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে বলে তাদের ধারণা ছিল। ১৮৭০ সালে শিশিরকুমার ঘোষ পাশ্চাত্যের ধাঁচে ভারতে সংসদীয় তথা জন-প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের দাবি প্রথম তোলেন। ১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ব্রাহ্মসমাজের প্রগতিশীল নেতারা 'ভারতসভা' প্রতিষ্ঠা করেন 'ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনে'র প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন হিসাবে, সদস্য চাঁদার হার কম রাখা হয় যাতে মধ্যবিত্ত মানুষ সদস্য হতে পারেন।
১৮৭৮ সালে দুর্ভিক্ষ তহবিলের টাকা আফগান যুদ্ধখাতে বরাদ্দ করায় যে বিক্ষোভসৃষ্টি হয় 'ভারতসভা' তাতে নেতৃত্ব দেয়। দমনমূলক 'সংবাদপত্র আইন (১৮৭৮) ও 'অস্ত্র আইনে'র (১৮৭৮) বিরুদ্ধে বিরাট বিরাট জনসভা সংগঠিত হয়। প্রজাদের অধিকার আদায় করার জন্য ভারতসভা রায়তদের সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেয়।
'সমদর্শী' গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা শিবনাথ শাস্ত্রী, 'ভারত শ্রমজীবী সংঘে'র প্রতিষ্ঠাতা শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আসামের চা-কুলিদের উপর অত্যাচারকে যিনি লোকচক্ষুর সামনে তুলে ধরেছিলেন সেই দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ও ছিলেন এর সঙ্গে জড়িত। যদিও এদৈর উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিককে সংগঠিত করা নয়, অত্যাচারের নিবারণ এবং অবস্থার উন্নয়ন, তবু এর মাধ্যমেও মধ্যবিত্তদের সঙ্গে অন্য বর্গের এক প্রাথমিক যোগসূত্র তৈরি হয়। ১৮৮৫ সালে রিপনের আমলে রাজনৈতিক চাপের ফলেই 'প্রজাস্বত্ব আইন' ও 'আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন' বাস্তবায়িত হয়। খারিজ হয় কুখ্যাত প্রেস অ্যাক্টও। ১৮৮৫ সালে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের অনুপ্রেরণায় এবং বড়লাট ডাফেরিনের সমর্থন নিয়ে যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গড়ে ওঠে, তার প্রথম অধিবেশনে সুরেন্দ্রনাথের মতো 'বিদ্রোহের উসকানিদাতা'রা আমন্ত্রণ পাননি। কিন্তু ১৮৮৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে 'ভারতসভা'র নেতৃত্বকে আর বাইরে রাখা সম্ভব হয়নি, জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তার কার্যত সংযুক্তি ঘটে। কিন্তু কংগ্রেসের ভিতরেও 'ভারতসভা'র সদস্যরা বিশিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছিলেন ১৮৮৮-তে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে প্রথম শ্রমিকদের সম্বন্ধে প্রস্তাব এনে, এবং ১৮৯৬ সালে আসামের চা-কুলিদের বিষয়টি কর্মসূচির মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করে। কংগ্রেসের মধ্যে 'চরমপন্থা'র প্রবক্তা বিপিনচন্দ্র পালের যোগ ছিল এদেরই সঙ্গে। এই উত্তাল-হওয়া আন্দোলনের ভিতরের দুর্বলতার খবর কিন্তু ইংরাজরা রাখত, তারা জানত মুসলমান-সমাজকে এই আন্দোলনের শরিক করা যায়নি। তাই পূর্ববঙ্গের যে জেলাগুলিতে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেগুলিকে নিয়ে একটি আলাদা রাজ্য গঠন করে তারা ১৯০৫ সালে আন্দোলনকে সমূলে বিনাশ করতে চায়।
উনিশ শতকের অন্তিম সময়ে রাজনৈতিক দাবির প্রেক্ষাপটে 'স্বদেশী'র যে ধারণা গড়ে উঠেছিল, তা হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজে ও সংস্কৃতিতে বিরাট আলোড়ন ঘটায়। বিদেশী বস্ত্র ও বিলাস সামগ্রী বর্জনের আহ্বানে সাড়া দিল জমিদার এবং পাশ্চাত্য ঘেঁষা উচ্চবিত্ত শ্রেণীর একাংশও। গ্রামবাংলায় অশ্বিনী দত্তের অনুপ্রেরণায় এই বার্তা গানে গানে ছড়ালেন চারণকবি মুকুন্দদাস তাঁর স্বদেশী পালাগুলির মধ্যে দিয়ে। লৌকিক সংস্কৃতির মধ্যেও এর প্রভাব দেখা যায়, যখন ক্ষুদিরামের ফাঁসি নিয়ে গান রচনা করেন লৌকিক কবি। কেবল স্বদেশী যাত্রাই নয়, গম্ভীরা প্রভৃতি আঞ্চলিক লোকনাট্যের বিষয় বদলে যাওয়াতে পুলিসের দৃষ্টি পড়ে তার ওপর। রবীন্দ্রনাথের লোকগীতির সংগ্রহ, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের লোককথার সংগ্রহ এক নতুন আগ্রহের পরিচয় দেয়।
স্বদেশী আমলে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে শিল্প-প্রদর্শনী ও পরে সরলা দেবী চৌধুরানীর উদ্যোগে 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' দেশীয় উৎপন্ন দ্রব্যকেই যে শুধু জনপ্রিয় করার চেষ্টা তা নয়, পোশাকে-আশাকে-চালচলনে, দৈনন্দিন জীবনধারায় কতগুলি নতুন রূপ আনার উদ্যোগও বটে। 'শিল্পগত ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নী সভা' দেশীয় ছাত্রদের উচ্চস্তরের কারিগরি শিক্ষা দেবার জন্য সক্রিয় হয়। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেন স্বদেশী আদর্শে অনুপ্রাণিত তাঁর ব্রহ্মবিদ্যালয়। ১৯০৬ সালে ইংরেজের নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসাবে কলকাতায় গঠিত হয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ। বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দেমাতরম' মন্ত্র আলোড়িত করে এই নতুন প্রজন্মকে। জাতীয়তার উন্মাদনা রূপ পায় ১৯০৪ সালে শিবাজি উৎসব পালনের মধ্যে এবং 'ডন' সোসাইটি,' 'ব্রতী সমিতি', 'বন্দেমাতরম্ দল' প্রভৃতির শরীরচর্চা ও কঠোর শৃঙ্খলাকে জাতীয় গৌরব উদ্ধারের উপায় হিসাবে ব্যবহার করায়। বঙ্গভঙ্গের পরের বছর 'বীরাষ্টমী ব্রতে'র আয়োজন করেন সরলা দেবী চৌধুরানী। বস্তুত, ভাষা এবং সংস্কৃতিগত ঐক্যের আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রূপ নেয়।
স্বদেশী আন্দোলনের যে সাংস্কৃতিক আদল তার ওপর আরও একজনের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্বামী বিবেকানন্দ। প্রাচ্য আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হিসাবে বিবেকানন্দ তাঁর পাশ্চাত্য সফরে বিপুল পরিচিতি লাভ করেন এবং ১৮৯৭ সালে দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর এই 'পাশ্চাত্য-জয়' জাতীয়তার উন্মাদনার মুহূর্তে তাঁকে পরাধীন দেশবাসীর কাছে বিরাট গৌরব এনে দেয়। হিন্দু সমাজের পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনাকেই যেন তিনি মূর্ত করে তুললেন তাঁর চলিষ্ণু কর্মমুখী আদর্শের মধ্যে এবং সন্ন্যাসের কঠোরতা দেশভক্তির একটি আবশ্যিক শর্ত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হলো তাঁরই পরোক্ষ অনুপ্রেরণায়। তাঁর মন্ত্রশিষ্যা নিবেদিতা স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবেই জড়িত হন, কেবলমাত্র সমাজসেবার কাজেই নয়, স্বদেশী গঠনমূলক প্রকল্পেই নয়, এই সময়ে প্রথম সশস্ত্র আন্দোলনের যে প্রস্তুতিগুলি দেখা যাচ্ছিল তাঁর যোগ ছিল তার সঙ্গেও। চিত্রকলায় দেশীয় ধারার যে সন্ধান চলছিল, তিনি তাকে অনুপ্রেরণা যোগান, অবনীন্দ্রনাথের 'ভারতমাতা' ছবির পিছনে ছিল তাঁর আগ্রহ।
শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাংলার সাংস্কৃতিক জগতে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব। ঐতিহ্যমুখিতা ও আধুনিকতার যে দ্বন্দ্ব গোটা সমাজেই তখন চলছিল, ঠাকুরবাড়ির পরিবেশেও ছিল তার অনুরণন। ব্রাহ্মসমাজের অগ্রসর চেতনা এবং তার সংকীর্ণতা দুইয়ের অভিজ্ঞতা নিয়েই রবীন্দ্রনাথ বেড়ে উঠেছিলেন। 'স্বদেশাভিমানে'র প্রত্যক্ষ প্রমাণ 'মাতৃভাষার চর্চা'র ধারা ঠাকুর পরিবারে আগে থেকেই এক বিশেষ মাত্রা পেয়েছিল, একথা আমরা 'জীবনস্মৃতি'তে পাই। বাঙালি মধ্যবিত্তের চিন্তাজগতে শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে অনেকগুলো দরজা খুলে যাওয়ার ফলে যে পরিসর সৃষ্টি হয়েছিল, সৃজনশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় যে আত্মপ্রত্যয়ের বিকাশ ঘটেছিল; রবীন্দ্রনাথের মহীরুহ প্রতিভার প্রেক্ষিত সেটাই। 'শিক্ষিতমণ্ডলীর' মধ্যে তখন 'দেশের পরিচয়হীন ও সেবাবিমুখ যে দেশানুরাগের মৃদুমাদকতা' তিনি লক্ষ্য করেছিলেন এই পরিসরের সৃষ্টি হওয়াতে তার বিরুদ্ধে এক 'অধৈর্য ও অসন্তোষ' 'তাঁর সৃষ্টিকে অনুপ্রেরিত করেছিল। তাঁর প্রথম কাব্যনাট্যগুলিতে এক 'দত্তরভাঙ্গা গীতবিপ্লবের প্রলয়ানন্দে' ভাষা ও সুর সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা পেয়ে যায়। এ যেন অপারগতা ও অবসাদের বিরুদ্ধে সৃষ্টিশীল বিদ্রোহ। পরে 'কড়ি ও কোমলে' 'ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুয়িন', 'আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দে গিয়েছে দেশ ছেয়ে' এই কবিতাগুলির মধ্য দিয়েও বাংলা কবিতা এক নতুন পর্বে উত্তীর্ণ হয়, যেখানে তার ভাষা বিধৃত করতে পারে একটি জাতির আবেগ ও তার সত্তার চেতনাকে। ইংরেজ রোমান্টিক কবিদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনা করে ভাবপ্রবণতার জন্য তাঁকে 'বাংলার শেলি' বলা একসময়ে দস্তুর হয়েছিল। তাঁর বিরোধীরা আবার ছড়া কেটে তাঁর কবিতার ভাবপ্রধানতাকে বিদ্রুপও করেছিলেন। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ভাষা নিয়ে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তরুণ রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন, ইতিহাসের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালে বোঝা যায়, স্বকীয়তার জন্য সাংস্কৃতিক চেতনায় যে আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল এ তাকে পুরণ করার কঠিন ব্রতেরই অঙ্গ, আকাশচারী ভাবালুতা নয়। এই কারণেই বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে তিনি তাৎক্ষণিক সাড়া দিয়েছিলেন, কিন্তু আবার তার অতি বাস্তব সমালোচনা এসেছিল তাঁর কাছ থেকেই।
রবীন্দ্রনাথের 'গোরা' ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ১৯০৭-৯ সালের মধ্যে। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে, কলকাতায় রাখীবন্ধন ও জাতীয় শোকদিবস হিসাবে অরন্ধন পালনে যার শুরু হয়েছিল তা জেলাগুলিতেও তখন ছড়িয়ে পড়েছে, বিলিতি কাপড়ের বন্ধু্যুৎসব চলছে ও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বন্দেমাতরম্ ধ্বনি উঠছে সর্বত্র। ব্রিটিশের নির্মম দমননীতি তখন চরমপন্থী যুবকদের হিংসার পথে ঠেলে দিয়েছে, ১৯০৮ সালে মুজফ্ফরপুরে কিংসফোর্ডের গাড়ির ওপর বোমা পড়েছে, কানাইলাল দত্ত ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ফাঁসি হয়ে গেছে এবং 'গোরা' প্রকাশিত হবার সময়েই চলেছে আলিপুর বোমার মামলা। রবীন্দ্রনাথ 'গোরা'তে যেন এই বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিত থেকেই এর প্রাক্-ইতিহাসকে ধরার চেষ্টা করেছেন উপন্যাসের কাঠামোয়। সিপাহিবিদ্রোহের সময়ে জাত গোরার যৌবনকাল ১৮৭০-এর দশকের শেষ বা ১৮৮০-এর দশকের আরম্ভ। এবং বর্তমান আন্দোলনের মধ্যে যে প্রশ্ন, অনুপস্থিতি বা স্ববিরোধগুলি ফুটে উঠছে, রবীন্দ্রনাথ তার উৎসকে আবিষ্কার করার এক বিশ্লেষণী প্রয়াস করেছেন সেই প্রাক্-ইতিহাসের মধ্যে। 'গোরা'র আরম্ভে যে সকালের বর্ণনা আছে তা যেন একটি জাতির আত্মবিকাশের প্রাতঃকাল, 'প্রভাত-সঙ্গীতে'র পিছনে যে উৎসাহের স্ফুর্তির তিনি বিবরণ দিয়েছেন 'জীবনস্মৃতি'তে, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সেই সকালের সঙ্গে 'গোরা'র এই সকালের সাদৃশ্য আছে। কলকাতার রাস্তায় তখনও বাউলের গান অবাস্তব ছিল না, 'গোরা'য় বাউল রাস্তায় দাঁড়িয়ে গায় 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়'। উপন্যাসের প্রথমে লোকসঙ্গীতের এই সমন্বয়বাদী ধারার উল্লেখ অবান্তর নয়। এর বৈপরীত্যেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গোরার আক্রমণাত্মক হিন্দুত্বকে।
বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন শুরু হবার কয়েক বছর আগে থেকে রবীন্দ্রনাথ নিজেই এই উগ্র-ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার আওতায় এসেছিলেন, তাঁর 'ব্রাহ্মণ' প্রভৃতি প্রবন্ধগুলিতে তার পরিচয়, কিন্তু যখন 'গোরা' লিখতে শুরু করেছেন, তখন এর ফাঁকগুলি সম্বন্ধে তিনি সচেতন হয়ে উঠছেন। নিবেদিতার সঙ্গে তাঁর বিতর্ক হয়েছে এই নিয়ে, নিবেদিতার চরিত্রে তিনি দেখেছেন গোরা-চরিত্রের অসহিষ্ণুতা এবং নিজের মত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টা। তাঁর মনে হয়েছে এটা ভারতবর্ষের মুক্তির রাস্তা নয়, গোরাকে তাই উপন্যাসে গ্রামভ্রমণে যেতে হয়েছে, ঠেকে শিখতে হয়েছে অবিনাশদের আদর্শ কেন শহরের ছুতোর মিস্ত্রির ছেলে নন্দ, নীলকরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে জেলে-যাওয়া মুসলিম ফরু সর্দার, আর ফরুর বালকপুত্রের আশ্রয়দাতা নাপিত দম্পতিকে স্পর্শ করতে পারেনি। শেষ অবধি সে আবিষ্কার করেছে জন্মসূত্রে সে হিন্দুই নয়। অন্যদিকে ব্রাহ্মসমাজের প্রথাবদ্ধতা, সংকীর্ণতা ও প্রতীচ্যপন্থী মনোভাবেরও লেখক তীব্র সমালোচনা করেছেন। এই সময়ের একাধিক প্রবন্ধেও স্বদেশী আন্দোলনের মধ্যে এই হিন্দুত্ববাদের প্রভাবকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, বিলিতি কাপড় বর্জনের আন্দোলন কেন মুসলিম কৃষকদের মধ্যে, কোথাও কোথাও নমঃশূদ্রদের মধ্যে, সাড়া জাগাতে পারেনি তার কারণ অনুসন্ধান করেছিলেন। তবে 'গোরা'তেই বোধহয় এর একটা সামগ্রিক ঐতিহাসিক ছবি আছে। কিন্তু 'গোরা'তে সামাজিক, রাজনৈতিক পর্যায়েই এর থেকে উত্তরণের যে সম্ভাবনা লেখক দেখেছেন, গোরার নেতৃত্ব দেবার শক্তি তার আত্মমোক্ষণের মধ্য দিয়ে যেভাবে বিকাশলাভ করেছে, 'চতুরঙ্গ' (১৯১৬) বা 'ঘরে-বাইরে'-তে (১৯১৬) কিন্তু লেখকের সেই আশাবাদ আর দেখা যায় না। 'চতুরঙ্গে' শচীশ সংস্কারবিরোধী নাস্তিকতার থেকে ভাববাদী 'রসে'র সাধনার মেরুতে উপস্থিত হয়েছে, কিন্তু সেখানেও অভীষ্টকে খুঁজে পায়নি। শেষে তার ভিতরের আগুন নিভে গেছে। 'ঘরে-বাইরে'-তে সন্দীপের মেকি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে নিখিলেশ কিন্তু ভাববাদেই আশ্রয় খুঁজেছে। সন্দীপ হিন্দু-মুসলিম বিভেদে ইন্ধন যুগিয়ে দাঙ্গা বাঁধায় এই ঘটনাটি উপন্যাসের কথনে ব্যবহার হয় ঘরের বাইরে রাজনৈতিক জগতের অসারতা প্রমাণ করার জন্যই। বিমলাকে বাইরে বেরোতে চাওয়ার মূল্য দিতে হয় তার সতী মায়ের সিঁথির সিঁদুরের কথা স্মরণ করে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্রকে ১৯০৫-১১-র আন্দোলনের সময় থেকেই ববীন্দ্রনাথ কিছুটা অনীহার চোখে দেখেছেন। সামাজিক গঠনমূলক কাজে তাঁর উৎসাহ অব্যাহত ছিল। এর ভিত্তি হিসাবে ক্রমশ রূপ নিয়েছে এক আন্তর্জাতিক মানবতাবাদের আদর্শ যা বাঙালি মধ্যবিত্তের মূলত হিন্দু জাতীয়তাবোধের থেকে ছিল খুবই আলাদা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী, হিংস্র চেহারা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের জুগুলা আরো সোচ্চার হয়েছে, কিন্তু তাঁর মানবতাবাদী অবস্থান থেকে স্বাধীনতার লড়াইয়ের বাস্তব ক্ষেত্রের দূরত্ব তবু কমেনি। আত্মশক্তির মধ্য দিয়ে ব্রিটিশের ওপর নিজেদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েই ভারতীয়দের জয়ী হতে হবে, এইটুকুই তিনি বলেছেন। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন ঘনিয়ে আসছে সেই সময়ে ইউরোপীয় 'পেট্রিয়টিজম'কে ফ্যাসিবাদে পরিণত হতে দেখে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন, কিন্তু পরাধীন দেশে 'পেট্রিয়টিজমে'র যে একটা অন্যতর তাৎপর্য আছে, সে সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ যেন কিছুটা উদাসীন হয়ে গেছেন। ১৯৩৪ সালে যখন চট্টগ্রামে Indian Republican Army-র নেতৃত্বে এক সশস্ত্র মুক্তি-আন্দোলন চলছে, তখন রবীন্দ্রনাথ লিখছেন 'চার অধ্যায়', যাতে সশস্ত্র আন্দোলনের পদস্খলনেরই বর্ণনা বয়েছে। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বা কল্পনা দত্তের মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্ব পণ করার উদাহরণ চোখের ওপর নিয়েও এলার চরিত্রে শুধুই একেছেন বিপ্লবের ব্যর্থতা।
অথচ রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে সরে গেলেও এই আন্দোলনের ওপর। ব্রিটিশ যে দমননীতি চাপাতে চাইছিল তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি অনেক সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের চাইতেও বেশি এগিয়ে গেছেন। নোবেল পুরস্কার এবং কবি হিসাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাঁকে যে গৌরবের সমুচ্চ শীর্ষে তুলেছিল, তাকে তিনি সব সময়েই ব্যবহার করেছেন সাম্রাজ্যবাদী সরকারের অত্যাচারগুলিকে সারা বিশ্বের সামনে। তুলে ধরতে। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের পরে সরকারকে ধিক্কার জানিয়ে ও নাইটহুড প্রত্যাখ্যান করে তাঁর চিঠি এরই এক অনন্য উদাহরণ। গান্ধী বা চিত্তরঞ্জন দাশ কেউই যখন এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে মিটিং ডেকে বা প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে খোঁচা দিতে চাননি, তখনই রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেন এইভাবে প্রতিবাদ জানানোর 'সময় এসেছে যখন অবমাননার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে সম্মানসূচক তকমাগুলি আমাদের লজ্জাকেই বেমানানভাবে প্রকাশ করছে, এবং আমার দিক থেকে আমি সমস্ত বিশেষ সম্মান বর্জন করে আমার সেই স্বদেশবাসীদের পাশে দাঁড়াতে চাই, নগণ্য বলে যাদের মানুষের অযোগ্য ব্যবহার পাবার সমূহ সম্ভাবনা।' সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই তিনি শ্রীনিকেতনে ঠাঁই দিয়েছেন প্রাক্তন বিপ্লবীদের, যাঁরা পরে ১৯৪২ সালে 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের ঢেউ তুলেছিলেন, বোলপুরে। হিজলি জেলে গুলিতে নিহত বন্দীদের স্মরণে এবং সরকারকে ধিক্কার জানাতে মনুমেন্টের পাদদেশে তিনি সভা করেছেন ১৯৩১ সালে, 'তাসের দেশ', 'ফাল্গুনী', 'অচলায়তন', 'মুক্তধারা', 'রক্তকরবী'র মধ্যে বাধ্যতার গণ্ডি ভেঙে স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে এক নতুন প্রাণশক্তির অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন। নজরুলের 'ধূমকেতু' পত্রিকার জন্য উদ্বোধনী কবিতা লিখে দিয়েছেন। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এইভাবেই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বাংলায় যখন স্বদেশী আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছিল, একই সঙ্গে ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সঞ্চিত বিক্ষোভের প্রকাশ ঘটতে থাকে নানাভাবে। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার মনোভাব বিভিন্ন প্রদেশে দেশীয় মানুষের মধ্যে সে সময় সহমর্মিতা ও সহযোগের একটা ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। জাতীয়তার ধারণা প্রাদেশিকতার সীমা লঙ্ঘন করছিল। ১৯০৬ সালে কলকাতায় এসে বিপুল সংবর্ধনা পান লোকমান্য তিলক। ১৯১৪ সালে গদর পার্টির প্রায় ৪০০ শিখ সমর্থক যখন 'কোমাগাতামার' জাহাজে বজবজের কাছে নোঙর করেন এবং পুলিসের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয়, স্থানীয় কৃষকরাই তাঁদের সাহায্য করেছিলেন ফেরার হয়ে থাকতে। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের পর রবীন্দ্রনাথের সোচ্চার প্রতিবাদ ভারতের অন্যপ্রান্তের দেশীয় মানুষের সঙ্গে সহমর্মিতার যোগসূত্র তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে সংগৃহীত দেশীয় সৈন্যদল ছিল ব্রিটিশের অবলম্বন, তাদের মধ্যেও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মনোভাবের বীজ বপন করতে সাহায্য করেছিল গদর পার্টি ও খিলাফৎ আন্দোলন। ১৯১৫ সালে তাঁদের প্রথম অভ্যুত্থান ঘটে সিঙ্গাপুরে। জাতীয়তাবোধের বন্ধন এখানেও সৃষ্টি হয়।
বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন অল্প কয়েকজন জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতা। লিয়াকত হোসেন দেশী কাপড়ের বোঝা মাথায় করে ছাত্রের দল নিয়ে রজনীকান্ত সেনের 'মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই।' গাইতে গাইতে কাপড় ফেরি করেছেন। অন্যদিকে ১৯০৬ সালে ঢাকার নবাবের নেতৃত্বে বেশ কিছু বিশিষ্ট মুসলমান 'শিক্ষা সম্মেলনে'র মাধ্যমে সমর্থন জানান বঙ্গভঙ্গকে। এই 'শিক্ষা সম্মেলন'ই পরে রূপান্তর নেয় মুসলিম লীগে। ১৯০৭ সালে কোনো কোনো জায়গায় জোর করে স্বদেশী জিনিস চালানোর চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে গিয়েছিল। যেমন রবীন্দ্রনাথ বর্ণনা করেছিলেন 'ঘরে-বাইরে' উপন্যাসে। মুসলিমদের পৃথক প্রতিনিধিত্বের দাবিও এই সময় থেকেই উঠতে শুরু করে। কিন্তু আবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই লীগ-কংগ্রেসের মধ্যে সমঝোতারও কতগুলি ক্ষেত্র তৈরি হয়। সারা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা সম্বন্ধে খিলাফৎ আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলিমরা তীব্রভাবে সচেতন হতে শুরু করেন। ১৯১৫ সালে সিঙ্গাপুরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে যাঁরা অভ্যুত্থানে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন পাঞ্জাব ও রাজপুতানার মুসলিম। তাঁদের সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। চেতনার স্তরে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার যে যৌথ ক্ষেত্র সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছিল এসব ঘটনা তারই ইঙ্গিত।
বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে একটি জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর জন্ম হচ্ছিল, স্বদেশী শিল্প উদ্যোগ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছিল। কাপড়ের কল, সাবানের কারখানা, জাতীয় ব্যাঙ্ক ও বীমা কোম্পানি গড়ে তোলার চেষ্টা বাংলাতেও দেখা যায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাধনাতেও ছিল দেশাত্মবোধের ইঙ্গিত। একই সঙ্গে সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণীকে আমরা ক্রমশ ইতিহাসের পটে দৃশ্যমান হয়ে উঠতে দেখি। এক সময়ে ১৮৭১ সালে প্রথম কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কাছে কলকাতা থেকে একটি চিঠি যাবার খবর আমরা পাই, যেখানে লেখকদের পক্ষ থেকে কলকাতায় আন্তর্জাতিকের একটি শাখা খোলার অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। শিবনাথ শাস্ত্রী বা শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে এ চিঠি যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু 'ভারত শ্রমজীবী'-তে যে অভিভাবকত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি আছে, তা থেকে পরবর্তী অর্ধশতকে অনেক এগিয়ে গিয়ে ১৯২০ সালে সারা ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস গঠিত হলো, যার প্রথম সভাপতির ভাষণে লাজপৎ রায় যুদ্ধবাজি ও সাম্রাজ্যবাদকে 'পুঁজিবাদের যমজ সন্তান' বলে বর্ণনা করলেন এবং পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির চাইতে সমাজতান্ত্রিক এমনকি বলশেভিক আদর্শকেও অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য বলে রায় দিলেন। শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিকতার কথাও উল্লিখিত হলো। 'স্বরাজে'র লড়াই শ্রমিকশ্রেণীর অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই-এর সঙ্গে যুক্ত হলো ট্রেড ইউনিয়নের বিবৃতিকে। ১৯১৭-র রুশ বিপ্লব ভারতীয় মুক্তি সংগ্রামের মতাদর্শগত প্রেক্ষাপটে নতুন দিগন্ত খুলে দিল।
রবীন্দ্রনাথের তরুণতর সমসাময়িকদের মধ্যে রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রভৃতি স্বদেশী গান রচনা করেছেন। বিশ শতকের প্রথম দশকের স্বদেশী আন্দোলনের প্রতিফলন মঞ্চেও ঘটেছিল। ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের নাটকে যেমন হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রাধান্য, তেমনি গিরিশচন্দ্র ঘোষের 'সিরাজদ্দৌলা' (১৯০৫) ও 'মীরকাশিম' (১৯০৬) নাটক দু'টিতে প্রধান ব্রিটিশ শাসন বিস্তারের প্রেক্ষাপটে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির আগ্রহ। ক্ষীরোদপ্রসাদ অবশ্য 'পলাশির প্রায়শ্চিত্ত' নাটকে এই আদর্শকেই অনুসরণ করেছেন। আর বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে গান্ধির অহিংস আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে তার অনুরণন কবিতায় এনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। ভাষার কথ্য ছন্দ আনার দিক থেকে তাঁকে নজরুলের পূর্বসূরি বলা যায়। ১৯২০ সালে রাওলাট অ্যাক্ট, পাঞ্জাবের গণহত্যা, খিলাফতের দাবি প্রভৃতি প্রসঙ্গ নিয়ে কংগ্রেসের যে অধিবেশন হয়, তার থেকে গান্ধি ডাক দেন অসহযোগ আন্দোলনের (১৯২১), সম্ভবত এরই পটভূমিতে হিরণ্যকশিপুর পত্নী, প্রহ্লাদের মা কয়াধুর জবানিতে সত্যেন্দ্রনাথ তুলে ধরেন অসহযোগী কিশোরের দৃঢ়তা এবং সাম্রাজ্যবাদী দমননীতির ছবি।
চিত্তবলের লড়াই শুরু পশুবলের সাথ, বন্যাবেগের হানার মুখে কিশোর-তনুর বাঁধা প্রলয়জলে বটের পাতা। চিত্ত চমৎকার! তীর্থ হলো বন্দীশালা। শিকল অলঙ্কার। এই প্রবল পরিবর্তনের সময়কে যে সাহিত্যিক-ব্যক্তিত্ব সব চাইতে সামগ্রিকভাবে প্রতিফলিত করেছিলেন, তিনি কাজি নজরুল ইসলাম, নিজের সম্বন্ধে তাঁর উক্তি: 'বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবী'। গ্রামীণ গরিব পরিবারের ছেলে, প্রথাগত শিক্ষা স্কুলেই যাঁর সমাপ্ত, এগারো বছর বয়সে জীবনের হাতে-খড়ি পেয়েছিলেন লেটো গানের দলে ঢুকে। সময়ের উত্তাল আলোড়নই তাঁকে পৌঁছে দেয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্রে; রুশ বিপ্লব এবং এশিয়া ও আফ্রিকার উপনিবেশগুলিতে মুক্তি সংগ্রামের বিকাশ-আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে এইসব ঘটনার অনুরণন কানে নিয়ে বাঙালি রেজিমেন্টের হাবিলদার দেশে ফিরলেন। তাঁর মানসিকতাকে গড়েছিল এই সব অভিজ্ঞতার বিপুল পরিধি। মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে 'নবযুগ' (পরে 'যুগবাণী') পত্রিকায় তাঁর কলমকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার শুরু। ১৯২২ সালে 'ধূমকেতু' প্রকাশিত হলো এবং ১৯২৩ সালে পত্রিকার মাধ্যমে রাজদ্রোহের অপরাধে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো। 'অগ্নিবীণা'র কবিতা ও গানের অগ্নিস্রোত সে সময়ে যুব সমাজকে উত্তাল করে তুলেছিল। কারাগারে যেসব গান তিনি মুখে মুখে রচনা করেছিলেন তার মধ্যে ছিল।
শোনা যায়, আলিপুর জেলে বা আন্দামানে এই গান বন্দী বিপ্লবীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে। জেল থেকে বেরিয়ে লেবার প্রজা স্বরাজ পার্টির মুখপত্র 'লাঙল'- এর পরিচালনার ভার তিনি গ্রহণ করেন এবং এই পত্রিকারই প্রথম সংখ্যায় তাঁর 'সাম্যবাদী' কবিতা প্রকাশিত হয়। অনেকে তাঁকে নিছক আবেগের কবি বলেছেন, কিন্তু বস্তুত নিজের ছন্দের দক্ষতাকে ভিত্তি করে বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রোত্তর ভাষার প্রস্তুতি তিনি তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নানাভাবে করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিয়েও তিনি স্পষ্টভাষায় বলেছিলেন যে, বর্তমানের কঠোর এবং রক্তাক্ত বাস্তব থেকে তিনি দূরেই রয়ে গেছেন।
সময়ের চাহিদাকে রূপ দেবার আবশ্যিকতা তাঁর উক্তির মধ্যে পরিষ্কার ধরা পড়ে। আধুনিকতার প্রধান লক্ষণ সংস্কারমুক্তি, তাঁর প্রথা-ভাঙা জীবন এবং আন্তর্জাতিকতার অভিজ্ঞান তাঁকে এই দুর্লভ গুণ দিয়েছিল। বাংলার মধ্যে উর্দু-ফার্সি বা ইসলামীয় 'মীথে'র ব্যবহার নিয়ে তাঁর কোনো টুৎমার্গ ছিল না। আবার 'মুসলিম সাহিত্যিক' হয়ে ওঠার আহ্বানের উত্তরে জানিয়েছেন: 'ওর মানে কি মুসলিমের সৃষ্ট সাহিত্য না মুসলিম ভাবাপন্ন সাহিত্য? যদি সত্যিকার সাহিত্য হয়, তবে তা সকল জাতিরই হবে।... আমি ক্ষুদ্র কবি, আমার বহু লেখার মধ্য দিয়ে আমি ইসলামের এই মহিমা গান করেছি। তবে কাব্যকে ছাপিয়ে ওঠেনি সে-গানের সুর। উঠতে পারেও না। তাহলে তা কাব্য হবে না।
প্রকাশ: ০৭-আগস্ট-২০২৬
শেষ এডিট:: 31-Jul-26 11:53 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/freedom-struggle-and-the-culture-of-bengal-part-v-
Categories: Fact & Figures
Tags:
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (5)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (172)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (155)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (82)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)



