স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলার সংস্কৃতি (২য় পর্ব)
এই পর্বে সমাজসংস্কারের প্রচেষ্টাকে ব্রিটিশশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিশ্চেষ্টতার অপর পিঠ হিসাবেও সবসময়ে দেখা যায় না। যে যুক্তিবাদের প্রয়োগ করে রামমোহন বিধবার জীবিত থাকার এবং জ্ঞানের চর্চা করার অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সেই যুক্তিতেই কোম্পানির শাসনের নানাবিধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অভিব্যক্তিও ঘটেছে। ১৮১৮ সালে সংবাদপত্র প্রকাশের উপর কঠোর বিধিনিষেধ প্রত্যাহৃত হলে সংবাদপত্র প্রকাশে অভিনব উৎসাহ দেখা যায়। রামমোহনের উদ্যোগে বাংলায় 'সম্বাদ কৌমুদী' (১৮২১) এবং ফার্সিতে 'মীরাত-উল-আখবার' (১৮২২) প্রকাশিত হয়।

২. উনিশ শতকের ‘নবজাগরণ’
আমি দেশাচারের নিতান্ত দাস নহি, নিজের বা সমাজের মঙ্গলের জন্য যাহা উচিত বা আবশ্যক বোধ হইবে, তাহা করিব
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ইদানীংকালে অনেক পণ্ডিত যেমন 'নবজাগরণকে উপনিবেশবাদের ধারাতেই পুষ্ট এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসাবে দেখেছেন, বিপরীতপক্ষের কেউ কেউ আবার হিন্দুশাস্ত্রের দোহাই দিয়ে সমাজসংস্কারের কথা বলার মধ্যে সংস্কারকদের শ্রেণীগত রক্ষণশীলতারই নিদর্শন খুজে পেয়েছেন। আগের পরিচ্ছেদে আমরা বলবার চেষ্টা করেছি যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্তরে ব্রিটিশ শাসকের উপর নির্ভরশীলতা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সাবেকি মনোভাব এ দুয়ের মধ্যে কোনো অন্তর্বিরোধ নেই, অনেক সময়ে যুগ্মভাবেই তা দেখা যায়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে 'ভদ্রলোক সমাজের একাংশের মধ্যে রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে যে তীব্র জেহাদ গড়ে উঠেছিল, তাকে যদি তাদের ব্রিটিশপ্রীতির ফসল হিসাবেই দেখা যায়, তবে তা হবে বিজিতের চেতনায় কোনো ঐতিহাসিক মুহুহূর্তে সক্রিয়তার সম্ভাবনাকেই অস্বীকার করা। ব্রিটিশের মাধ্যমে ইউরোপের ঘটনাবলী এবং চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ এসেছিল ঠিকই, এই আলোড়নের মধ্যে যা একটি উপাদান হিসাবেও বর্তমান ছিল। কিন্তু এই আলোড়ন 'ভদ্রলোক' সমাজের মধ্যে, চিন্তা চেতনা আলোচনা বিবাদ বিতর্কের যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, তা নিঃসন্দেহেই তৎকালীন সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের একটি নতুন মাত্রা, অভ্যন্তরীণ বিবর্তনের ইঙ্গিত।
মনে রাখতে হবে যে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আর্থিক মুনাফার সমস্ত উৎসগুলি চলে গিয়েছিল ইংরেজদের হাতে। অষ্টাদশ শতকের শেষে বা উনিশ শতকের গোড়াতেও ব্যক্তিগত উদ্যম বা কর্মনিষ্ঠার জোরে সামান্য অবস্থা থেকে বড়লোক হবার যে রাস্তাগুলি ছিল, সেগুলি মধ্য শতকের দিকে যেতে যেতে সংকীর্ণ হয়ে আসছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হওয়ার সুযোগও যে বিদেশী শাসকের নিয়ন্ত্রণে, এই বোধ বাড়ছিল। শহরের মানুষের একটি বড়ো অংশের চাকুরির ওপর নির্ভরশীলতা ছিল বর্ধমান। তাছাড়া উনিশ শতকের প্রথম দিক থেকেই স্থানীয় 'নোটিভ'দের সঙ্গে মেলামেশার ব্যাপারে ইংরেজ শাসকের মনোভাবেও চুৎমার্গ অনেক বেশি প্রাধান্য পাচ্ছিল। দেশীয় আমোদপ্রমোদে অংশগ্রহণ, দেশীয় বড়লোকদের বাড়ি নিমন্ত্রণরক্ষা, দেশীয় স্ত্রী বা রক্ষিতার সঙ্গে সংসর্গ যা নাকি ব্রিটিশ শাসনের প্রথম যুগে প্রচলিত রীতি ছিল তা পরবর্তীকালে নীতিগতভাবে নিন্দিত হয় এবং একদিকে ব্রিটিশের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ও অন্যদিকে মিশনারিরা অন্ধকারাচ্ছন্ন বর্বর দেশে 'সভ্যতা'র আলোকবিস্তারের দায়িত্বকেই অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখতে শুরু করেন। শ্বেতশাসক এবং কালো শাসিতের মধ্যে বিভাজনরেখা অনেক স্পষ্ট আদল পেয়ে যায়।
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে কোনো দেশীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর সৃষ্টি হয়নি। সম্পদের উৎপাদন-ব্যবস্থার সঙ্গে বাঙালি 'ভদ্রলোক'-সমাজের যোগাযোগ ছিল ক্ষীণ এবং পরোক্ষ, একটি উদীয়মান শ্রেণীর মতাদর্শগত প্রবক্তা যে 'Organic intellectual-দের' কথা আন্তনিও গ্রামশি বলেছেন, এই ভদ্রলোক-সমাজকে ঠিক তা বলা যায় না। তাঁদের এই ত্রিশঙ্কু অবস্থান ঐ বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তে তাঁদের চিন্তা-চেতনার মধ্যে কতগুলি বিকল্প ধারাকে সম্ভব করেছিল। বিদেশী শাসকের ক্রমবর্ধমান সংকীর্ণতার প্রতিক্রিয়ায় এদের মধ্যে সাহেবিয়ানার উগ্র নকল দেখা যায়, খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষা নেবারও হিড়িক পড়ে। তেমনি আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ শাসনকে স্বীকার করেও সামাজিক রক্ষণশীলতাকে স্বকীয়তায় শেষ চিহ্ন হিসাবে আঁকড়ে থাকার প্রবণতাও দেখা যায়। আবার বিদেশী প্রভু ও দেশীয় অধস্তনের মধ্যেকার বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠার ফলেই 'ভদ্রলোাক'-সমাজের ভিতর থেকেই সম্ভব হয়েছিল এক স্বতন্ত্র অবস্থানের সন্ধান, যা রক্ষণশীলতাকে অস্বীকার করে যুক্তির মধ্যেই খুজবে আত্মপরিচয়, আবার ব্রিটিশের বিজ্ঞাপিত 'সভ্যতা'র আদর্শকেও যুক্তির নিরিখেই বিচার করতে চাইবে।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় 'এনলাইটেনমেন্টের মতাদর্শগত ভিত্তি তৈরি করেছিল যুক্তিবাদ। Socialism: Utopian and Scientific বইটিতে এঙ্গেলস দেখিয়েছেন ফরাসি বিপ্লবের তোলপাড় কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে এই যুক্তিবাদকে ইউরোপীয় বুর্জোয়াশ্রেণী তাদের নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগিয়ে দিল। কিন্তু এই যুক্তিবাদই আবার ফরাসি বিপ্লবের মুহূর্তে শ্রমজীবীশ্রেণীর কাছে অন্য অর্থ নিয়ে দেখা দেয়, অন্যতর সামাজিক পরিবর্তনের প্রত্যাশাকে মূর্ত করে তোলে। এই যুক্তিবাদেরই ঢেউ যখন ফরাসি উপনিবেশ হাইতি দ্বীপে গিয়ে পৌঁছয়, তা সেখানকার ক্রীতদাস-সমাজকে উদ্বুদ্ধ করে স্বাধীনতা ও সাম্যের দাবিতে সোচ্চার হতে। যুক্তিবাদের অনেক স্তর এবং অনেক রূপ আছে, তা ঐতিহাসিকভাবে বিশেষিত এবং কোনো নিরাকার ধারণা নয়। বাংলার তথাকথিত 'নবজাগরণ' যে যুক্তিবাদী চেতনার বাহন, তাও ইউরোপের নকল নয়, ইউরোপীয় ধ্যানধারণাকে আত্মস্থ করেও তা তার নিজস্ব পথই তৈরি করার চেষ্টা করে। যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখনও ইউরোপে বিপ্লব-পরবর্তী জোয়ার শেষ হয়ে যায়নি, উপনিবেশেও সেই চিন্তা-চেতনার ঢেউ কিয়ৎ পরিমাণে পৌঁছায়। পাশ্চাত্যের সমাজবিপ্লবমুখী চিন্তা-চেতনার উপাদানগুলির আত্মীকরণের সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু ভারতীয় দর্শনের যুক্তিবাদী ধারাগুলির সঙ্গে যোগাযোগও লক্ষ্য করা যায়। রামমোহন এবং তাঁর পরে বিদ্যাসাগর যখন সমাজসংস্কারের প্রসঙ্গে বিতর্কের পত্তন করেন, তখন এই দুই ধরনের উপাদানকে ব্যবহার করে যুক্তির ভিত্তিতে এক নতুন আত্মপরিচয়ের জায়গাতে পৌঁছানোর আগ্রহই তার মধ্যে প্রকট হয়। যদিও এই পথিকৃ গ্রাই কখনোই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হননি, বরং সংস্কারের ক্ষেত্রে অনেক সময়েই ব্রিটিশ প্রশাসনের সাহায্য নিয়েছেন। তবু বাংলা গদ্যকে ব্যবহার করে বিতর্ক ও মননমুখী বুদ্ধিকে বিকশিত করার যে চেষ্টা তাঁরা করেন, তা মানসিক স্বনির্ভরতার দিকে এক নতুন পদক্ষেপ, যা কখনোই সাবেকিয়ানার কাঠামোর মধ্যে থেকে সম্ভব হতো না।
ব্রিটিশ শাসনে ১৭৯৯ থেকে সংবাদপত্র প্রকাশের ওপর যে কঠোর বিধিনিষেধ জারি ছিল, ১৮১৮ সালে তা রদ হবার পরে 'ব্রাহ্মণ সেবধি' (১৮১৮), 'সম্বাদ-কৌমুদী' (১৮২১) এবং ফার্সিতে 'মীরাত্-উল-আখবার' (১৮২২) প্রভৃতি পত্র-পত্রিকার প্রকাশে রামমোহন যে উদ্যোগ নেন, তথাকথিত 'নবজাগরণে'র কাল সেখান থেকেই শুরু। সতীদাহ প্রথা নিয়ে বিতর্ক এর একটি দিকচিহ্ন। ত্রিশের দশক হিন্দু কলেজকে কেন্দ্র করে ডিরোজিওর শিষ্যদের রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে সত্যের নামে বিদ্রোহ সেই বহমান ধারারই পরবর্তী পর্যায়। অন্যদিকে রামমোহনের পরবর্তীকালে, দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজের নেতৃত্বে আসার পরেও অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখ তরুণ যুক্তিবাদীরা বেদের অপৌরুষেয়ত্ব নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার মধ্যেও এই ধারারই প্রকাশ। এই নতুন বিতর্কমুখিনতাই শিক্ষার ক্ষেত্রে ইংরেজি এবং মাতৃভাষা চর্চা নিয়ে বিভিন্ন মতের সংঘাতের মাধ্যমে অভিব্যক্ত হয়। বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহের পক্ষে ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে কাজকর্ম এবং শিক্ষা বিশেষত, স্ত্রীশিক্ষার জন্য তাঁর প্রচেষ্টা সেই যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী প্রবণতারই সবচেয়ে পরিপক্ক ফসল। আরও পরে ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়দের অগ্রসর মতবাদ এই জাগৃতিরই এক বিলম্বিত অভিব্যক্তি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ইতোমধ্যে বদলে গেছে। জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ হচ্ছে, নানা নতুন টানাপড়েনের সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু উনিশ শতকের প্রথমার্ধের যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী চেতনা তার মধ্যে বাঙালির চিন্তাগত ঐতিহ্যের একটি অংশে পরিণত হয়েছে। তা সমাজের মুষ্টিমেয়ের কাছে লভ্য হলেও তার বৃহত্তর তাৎপর্যকে অস্বীকার করা যায় না। চিন্তার জগতে সংস্কারবদ্ধতা থেকে এক স্বকীয় আধুনিকতার দিকে প্রথম পদক্ষেপই সেই তাৎপর্য। আজকাল অনেক সময়ে আমরা দেখি যে 'দেশজ' বা 'indigenous' কথাটি একটা চরম এবং পরম অর্থে ব্যবহৃত হয়। 'দেশজ' চিন্তা-চেতনারও যে বিবর্তন থাকতে পারে, অনেক বহিরাগত উপাদানকে আত্মস্থ করেই তা অগ্রসর হয়, তার উদাহরণ উনিশশতকী যুক্তিবাদ।
রামমোহনের তরুণ বয়সের লেখা 'তুহফাত-উল-মুওয়াহিদ্দিন' নামক ফার্সি ভাষায় লিখিত পুস্তকে অলৌকিক বিশ্বাস বা বহিরঙ্গের আচার-আচরণের চাইতে মনন এবং বিবেকের চর্চার ওপর ঈশ্বর বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস ইউরোপীয় 'Deism'- এর সঙ্গে তুলনীয়। কিন্তু আবার এখানে ইসলামিক দর্শনের মধ্যকার যুক্তিবাদী, প্রতিষ্ঠিত ধর্মমতের বিরোধী ধারাগুলিকেও তিনি ব্যবহার করেছেন। 'মুনাজারা' অর্থাৎ আলোচনা ও বিতর্কের মধ্যে 'মানাহ' বা প্রতিষ্ঠিত প্রাক্-ধারণাকে প্রশ্ন করার অধিকার তাঁর কাছে একটি মৌলিক অধিকার। একইভাবে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে নিবর্তকের জবানিতে যখন তিনি কথা বলেন, তখন হিন্দুশাস্ত্রের ব্যাখ্যা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে প্রচলিত যে বিতর্কের ধারা, তাকে তিনি একটি নতুন মাত্রা দেন। তৈলাধার পাত্র না পাত্রাধার তৈল এই নিরর্থক বাবিস্তারের জায়গা থেকে তর্কপদ্ধতিকে সমকালীন, বাস্তব সমস্যার নিরসনে ব্যবহার করার ফলে তা অন্য মাত্রা পায়। সাংখ্য, ন্যায় প্রভৃতি হিন্দুদর্শনের ধারার মধ্যে যে যুক্তিবাদী উপাদান আছে, যা কখনো কখনো বেদবর্ণিত আচার-অনুষ্ঠানকেই শুধু নয়, ঈশ্বরের সিদ্ধতাকেও প্রশ্ন করে, রামমোহন তাকেই ব্যবহার করেছেন ধর্ম ও সমাজসংস্কারের প্রসঙ্গে। পরে বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহের সপক্ষে যে বিতর্ক তুলেছেন, তার ভাষা রামমোহনের তুলনায় অনেক বেশি আবেগনির্ভর। কিন্তু এখানেও তাঁর বক্তব্যের সপক্ষে শাস্ত্রীয় উক্তি উদ্ধৃত করাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য নয়, বিতর্কের ঐতিহ্যকে সমকালীন, প্রাসঙ্গিক বিষয়ে প্রয়োগ করার প্রয়াসকে আমরা দেশীয় সত্তার বিকাশেরই এক প্রয়াস বলে গণ্য করব।
এই পর্বে সমাজসংস্কারের প্রচেষ্টাকে ব্রিটিশশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিশ্চেষ্টতার অপর পিঠ হিসাবেও সবসময়ে দেখা যায় না। যে যুক্তিবাদের প্রয়োগ করে রামমোহন বিধবার জীবিত থাকার এবং জ্ঞানের চর্চা করার অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সেই যুক্তিতেই কোম্পানির শাসনের নানাবিধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অভিব্যক্তিও ঘটেছে। ১৮১৮ সালে সংবাদপত্র প্রকাশের উপর কঠোর বিধিনিষেধ প্রত্যাহৃত হলে সংবাদপত্র প্রকাশে অভিনব উৎসাহ দেখা যায়। রামমোহনের উদ্যোগে বাংলায় 'সম্বাদ কৌমুদী' (১৮২১) এবং ফার্সিতে 'মীরাত-উল-আখবার' (১৮২২) প্রকাশিত হয়। গোড়ায় রক্ষণশীল হিন্দুরা 'সম্বাদ-কৌমুদী'র সঙ্গে থাকলেও পরে তাঁরা সরে গিয়ে 'সমাচার চন্দ্রিকা' নামে একটি স্বতন্ত্র পত্রিকা করেন। কিন্তু 'সমাচার চন্দ্রিকা'র গোঁড়া হিন্দুরা নন, ব্রিটিশের বিষনজরে ছিলেন রামমোহনই। খ্রীষ্টান পাদরিদের দ্বারা প্রকাশিত 'সমাচার দুপর্ণে' ভারতীয় ধর্ম ও সমাজ সম্পর্কে যেসব বিদ্বেষমূলক মন্তব্য থাকত, তার জবাব দেওয়া ছিল রামমোহনের অন্যতম উদ্দেশ্য, কিন্তু সেই সঙ্গে এই সংবাদপত্রগুলিতে ব্রিটিশশাসনের নানাবিধ অন্যায়ের কথাও প্রকাশ করা হতো। উদারপন্থী ইংরাজ সিক্ বাকিংহামের 'ক্যালকাটা জার্নালে' এই সংবাদগুলি অনুদিত হয়ে চুম্বকাকারে বেরতো। প্রাতিষ্ঠানিক খ্রীষ্টধর্মের বা কোম্পানির সমালোচনা ব্রিটিশ শাসককে এতটাই বিচলিত করেছিল যে, ১৮২৩ সালে নিবর্তনমূলক আইন জারি করে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের ব্যবস্থা করা হয়।
রামমোহন এবং আরও কয়েকজন সুপ্রিম কোর্টে লিখিত প্রতিবেদন করে এই আইন আটকানোর চেষ্টা করেন। তা ব্যর্থ হলে তিনি একটি প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে 'মীরাত-উল-আখবার' বন্ধ করে দেন এবং ব্রিটিশ সম্রাটের কাছেও প্রতিবাদপত্র পাঠান। তাঁর বিবৃতিতে তাঁর প্রিয় কবি হাফেজের একটি বয়েতের মাধ্যমে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন। 'হাফেজ, তুমি কোণে পড়ে-থাকা ভিখারি মাত্র, চুপ করে থাকো। নিজ রাজনীতির নিগূঢ় তত্ত্ব রাজারাই জানেন'। হিন্দু ধর্মের আচার-নিয়মের বিরুদ্ধে যাঁদের বিদ্রোহ ছিল উদগ্র, সেই ডিরোজিওপন্থী 'ইয়ং বেঙ্গল'দের মধ্যে তীর আত্মসম্মানবোধ এবং স্বদেশপ্রেমের অভিব্যক্তি বিরল নয়। অবশ্য এর প্রকাশ ছিল চিন্তাচেতনা, আলোচনা ও বুদ্ধিগত চর্চার স্তরেই। জর্জ টমসনের মতো উদারপন্থীদের পৃষ্ঠপোষকতাও তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু ডিরোজিওর নিজের লেখা ভারতের প্রাচীন গৌরববিষয়ক ইংরেজি কবিতা নেহাৎ ব্যতিক্রম নয়। নেহাৎ ব্যতিক্রম নয়, কৈলাসচন্দ্র দত্তের লিখিত 'India Under Foreigners', যেখানে মুসলিমশাসনের তুলনায় ব্রিটিশশাসনে তিনি দেশবাসীর প্রতি অধিকতর অসাম্য ঘটতে দেখেন এবং বলেন: বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিদেশী শাসন স্থাপিত হয়েছে। দেশের মানুষ শুধু শাসনকার্যে অংশগ্রহণ থেকেই নয়, বঞ্চিত হয়েছেন সবরকমের দায়িত্ব এবং ক্ষমতা থেকেই। এটা সমস্ত মানুষের কাছেই ক্ষোভের বিষয়, এবং মানবতার ছিটেফোঁটাও যাঁর মধ্যে আছে তাঁর হৃদয়ই তাকে বলবে যে কোনো বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক অগ্রগতির যুক্তিতেই এর ন্যায্যতা প্রতিপাদন করা যায় না।
বস্তুত, যে সময়ে ডিরোজিওপন্থীরা হিন্দু সমাজের অন্ধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন, তাঁদের দেশাভিমানেরও সবচেয়ে স্পষ্ট অভিব্যক্তি সেই সময়কালের মধ্যেই পাওয়া যায়। যে 'সত্য'কে ভিত্তি করে তাঁরা সংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, ব্রিটিশশাসন সম্বন্ধে তাঁদের সমালোচনাও সেই সত্যপ্রীতিরই অংশ। পরবর্তীকালে তাঁরা যখন হিন্দুসমাজের মধ্যেই নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন, তখন ব্রিটিশের সমালোচনাতেও তাঁদের অনেককেই আর সোচ্চার হতে দেখা যায় না।
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায়। হিন্দু কলেজের গোড়াপত্তনের সময় থেকেই এই বদলের সূত্রপাত। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ স্থাপিত হয় ডেভিড হেয়ার এবং কয়েকজন বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের উদ্যোগে। রামমোহন এই পরিকল্পনায় উৎসাহী হলেও একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসাবে অন্যরা তাঁর উপস্থিতিতে আপত্তি করায় তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন। প্রচলিত ধর্মীয় বা সামাজিক মতের বিরোধিতা করার কোনো উদ্দেশ্য হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের ছিল না, তাঁদের মূলমন্ত্র ছিল 'হিন্দুর ছেলেদের ইউরোপীয় এবং এশীয় ভাষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষিত করা'। ডিরোজিও হিন্দু কলেজের ছাত্রদের অনাচারে দীক্ষা দিচ্ছেন, এই অভিযোগে যে রক্ষণশীলরা হিন্দু কলেজ থেকে পরে তাঁকে তাড়ান, তাঁরাও কিন্তু পুরনো শিক্ষাব্যবস্থার বদলে ইংরেজি শিক্ষার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। এ চাহিদা সেদিন ছিল ক্রমবর্ধমান। ভদ্রলোকেরা নিজেদের শ্রেণীস্বার্থেই ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত করতে চাইছিলেন ছেলেদের। গোড়ায় হিন্দু কলেজে সংস্কৃত এবং ফার্সি শেখানোর ব্যবস্থা থাকলেও অচিরেই তা উঠে যায়। ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার্থে এবং ক্ষমতার আসনের কাছাকাছি থাকার তাগিদেই ইংরেজি হয়ে ওঠে অবশ্য শিক্ষণীয়। ১৮৩৫ সালে মেকলের বিখ্যাত 'মিনিটস'-এ একজন ব্রিটিশ শাসক হিসাবে মেকলে যে কারণে প্রাচ্যশিক্ষার জায়গায় ইংরেজি শিক্ষাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে 'ভদ্রলোক'দের এই মনোভাবের একটা স্বাভাবিক সংগতি আছে। একপক্ষ হাতড়ে বেড়াচ্ছেন ওপরে-ওঠার সিড়ির ধাপ, আর অন্যপক্ষ খুঁজছেন নোটভদের সঙ্গে ভাষাবিনিময়ে সক্ষম বশংবদ একদল মানুষ। মেকলের এই মিনিটস-এর আদলেই তাই তৈরি হয়েছিল নতুন উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা, যা এই মধ্যবর্গীয় গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধাভোগের সুযোগ করে দেয়।
কিন্তু এই শিক্ষাব্যবস্থা কি সম্পূর্ণটাই মেকলের আদলকে হুবহু অনুসরণ করেছিল?
যে সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার প্রতিভূ মেকলে, তার মধ্যে বাংলা শিক্ষার কোনো জায়গা ছিল না। কিন্তু ইংরেজি ভাষায় ইউরোপীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা করে তার সাহায্যে মাতৃভাষাকে পুষ্ট করার যে আগ্রহ, তা সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার অবদান নয়। রামমোহনের মধ্যেও এই আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। ১৮৩৫ সালে 'হিন্দু পাইওনিয়র' পত্রিকায় হিন্দু কলেজের জনৈক ব্যক্তি রাজভাষা হিসাবে ফার্সির অনুপযোগিতার প্রশ্ন তুলে ইংরেজির পক্ষে মতপ্রকাশ করেন। কিন্তু একই সঙ্গে, আদালতে বাংলাভাষার ব্যবহার থাকলে বাংলাভাষা উৎকর্ষ লাভ করতে পারত, এই চাহিদাটিও তাঁর লেখায় জায়গা পায়। বিদ্যাসাগরের শিক্ষাচিন্তা এবং শিক্ষাপ্রসারের জন্য তাঁর কার্যকলাপের খতিয়ান নিলে দেখা যাবে ইংরেজিশিক্ষার সপক্ষে তাঁর মূল যুক্তি এটাই যে, এতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা বাড়বে, এবং তাতে মাতৃভাষার সমৃদ্ধি ঘটবে। ইংরেজিতে কথা বলে, চিন্তা করে ও স্বপ্ন দেখে, এমন এক প্রজন্ম নয়, বিদ্যাসাগরের অভীষ্ট ছিল: 'সংস্কৃত কলেজের ছাত্রদের যদি ইংরেজি সাহিত্য ভালভাবে শিক্ষা দেওয়া যায়, তাহলে তারাই একমাত্র সুসমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্যের সুদক্ষ ও শক্তিশালী রচয়িতা হতে পারবে।' এছাড়াও 'সর্বমতের দর্শন পাঠ করার সুযোগ দিলে ছাত্রদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত গড়ে উঠবে।' আমাদের দর্শনের 'ভ্রান্তি ও অসারতা' কোথায় তাও তাদের পক্ষে বোঝা সহজ হবে (বিনয় ঘোষ। 'বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ')। উচ্চশিক্ষার উপাদান কী হবে সে-বিষয়ে মতামত দিতে গিয়ে বিদ্যাসাগর যেমন সাংখা ও বেদান্তকে 'ভ্রান্ত দর্শন' বলেছিলেন, তেমনি বিশপ বার্কলের ভাববাদী দর্শনকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করারও তিনি বিরোধী ছিলেন। কারণ তরুণ প্রজন্মকে চিন্তার গোঁড়ামি থেকে মুক্তি দেওয়া ছিল বিদ্যাসাগরের মূল উদ্দেশ্য। বাংলাভাষা সম্বন্ধে তাঁর উৎসাহ এর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
বাংলাভাষার প্রসার ও উন্নতির আগ্রহ সেদিন শুধু বিদ্যাসাগরের মধ্যেই নয়, মুক্ত মননের সমর্থক অংশটির মধ্যে ব্যাপকভাবেই দেখা যায়। 'হিন্দু পাইওনিয়রে' প্রকাশিত পত্রের কথা আগেই বলেছি। রাজনারায়ণ বসু ১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দে স্কুলন্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ওপর জোর দেন, কারণ, বিশেষত, গ্রামাঞ্চলে শিক্ষাবিস্তারের জন্য তা আবশ্যিক, এতে 'ভূস্বামী ও রাজকর্মচারিদিগের দ্বারা তাহাদিগের পীড়িত ও প্রবঞ্চিত হইবার সম্ভাবনা অনেক পরিমাণে দুরীকৃত হইবে।' এছাড়াও, 'যদবধি কোনো দেশে বিদেশী ভাষার চালনা প্রবল থাকে তদবধি সেদেশে কোন প্রসিদ্ধ কাব্যকার উদয় হয়েন না, আর সেই দেশে জাতীয় ভাষায় অনুশীলন যত বৃদ্ধি হইতে থাকে ততই প্রসিদ্ধ কাব্যকার সকল উদয় হইতে থাকেন।' যুক্তিবাদী অক্ষয়কুমার দত্তের 'চারুপাঠ' (১৮৫২), 'পদার্থবিদ্যা' (১৮৫৬) প্রভৃতি পাঠ্যপুস্তক বাংলায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাকে উৎসাহিত করার জন্যই লেখা হয়েছিল। ছোটলাট হ্যালিডেকে অনুপ্রেরিত করে ১৮৫৫-৫৬ সালে বিদ্যাসাগর যখন জেলাস্তরে মডেল স্কুল তৈরির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন তখন তাঁর নিজের 'বর্ণপরিচয়', অক্ষয়কু মার দত্তের বইগুলি এবং ইংরেজি থেকে অনুদিত অন্যান্য বই নিয়েই পাঠ্যসূচি তৈরি হয়। বিদ্যাসাগর নিজে মুদ্রণ ও প্রকাশনের ব্যবসায় ঢুকেছিলেন বাংলাশিক্ষার মাধ্যমে স্কুলশিক্ষায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করার জন্যই। পুরনো ধরনের পাঠশালাগুলির উপযোগিতা কমে আসার ফলে হার্ডিঞ্জের কিছু প্রচেষ্টাসত্ত্বেও সেগুলি ধ্বংসের মুখে চলে যায়। বিদ্যাসাগর নতুন যুগের প্রয়োজন অনুভব করেই স্কুলস্তরে একটি নতুন-ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টায় নেমেছিলেন ইতিপূর্বে বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনায় বটতলাই ছিল প্রধান, কিন্তু বটতলার বই বিষয়ের দিক থেকে মূলত প্রাচীনপন্থী এবং বিনোদনমূলক। আলোচনা বিতর্ক জ্ঞানচর্চার অবকাশ সেখানে ছিল না। ১৮১৮-র পরে 'সম্বাদ কৌমুদী'র মতো সংবাদপত্র যে চাহিদা তৈরি করেছিল, পঞ্চাশের দশকে পূর্বোল্লিখিত পুস্তকগুলির প্রকাশ সেই চাহিদাকেই স্কুলস্তরে বিস্তৃত করার আয়োজন। সার্বজনীন শিক্ষার কথা বিদ্যাসাগর কখনো ভাবেননি; কিন্তু তাহলেও স্কুলস্তরে বাংলার মাধ্যমে জ্ঞানচর্চার প্রসারের চেষ্টার মধ্যে স্বাদেশিকতার প্রাথমিক উন্মেষই আভাসিত।
কোনো কোনো গবেষক এ-কথা মানেন না, বা তাঁরা মনে করেন বিদ্যাসাগরের উদ্দেশ্য যাই থেকে থাকুক, স্কুল ও কলেজস্তরে নয়াশিক্ষাব্যবস্থায় দেশীয় মানুষের মানসিকতাকে সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শের ঘেরাটোপেই ঢেকে রাখার ব্যবস্থা হলো। পাঠশালাগুলি ধ্বংস হওয়াতে, নতুন পাঠ্যসূচি প্রণয়নের ফলে এবং ইংরেজিশিক্ষায় শিক্ষিতদের জন্য সরকার চাকুরির ক্ষেত্রে নতুন সুযোগসুবিধা করে দেওয়াতে ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্যশিক্ষার শ্রেষ্ঠত্বই বহাল রইল। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, হ্যালিডের মতো উদারপন্থীদের জনমুখী মনোভাব সত্ত্বেও ব্রিটিশ শাসকের প্রধান স্বার্থ ছিল ইংরেজিশিক্ষার মাধ্যমে বিশেষ সুবিধাভোগী বশংবদ একটি গোষ্ঠী তৈরি করা। কিন্তু এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে কোনো বৈপরীত্যের অবকাশ ছিল না বা ইতিহাসের গতি সম্পূর্ণভাবে বিদেশী শাসকের ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলন করবে এ-কথা ভাবাও ভুল। যদি ভারত সাম্রাজ্যবাদের কবলে না পড়ত তাহলে দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা বা দেশীয় জ্ঞানচর্চা নিজস্ব গতিতেই আধুনিকতার পথ খুঁজে নিতে পারত না কিনা, এ-প্রশ্ন নিতান্তই দূরকল্পী। কিন্তু পরাধীনতার চৌহদ্দির মধ্যে, প্রবল সাম্রাজ্যবাদী শাসকের মতাদর্শগত চাপকে মোকাবিলা করার মতো মনন এবং ভাষার ধারা তৈরি না করেই পাঠশালা, টোল, মক্তব-মাদ্রাসা বা বটতলার প্রকাশনা বা যাত্রা-পাঁচালি-সং প্রভৃতি জনসংস্কৃতির ধারার অন্তর্গত উপাদান থেকেই সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী চেতনা তীব্রতা ও পূর্ণতার দিকে যেতে পারত, এটা মনে করা রোমান্টিকতা মাত্র। সেই বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তে 'ভদ্রলোক-সমাজে'র বিশেষ অবস্থানের ফলে যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদকে ভিত্তি করে তাদের একটি অংশের পক্ষে মানসিক স্বকীয়তার কিছু উপাদান গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। তার সুফল জনসাধারণের মধ্যে বিস্তারলাভকরেনি। বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও স্কুলশিক্ষার প্রসারের স্বপ্ন কখনোই ব্রিটিশের মধ্যস্থতায় পূর্ণতা পায়নি। শিক্ষাব্যবস্থা মাথাভারী রয়ে গিয়েছিল। সিপাহিবিদ্রোহের ঠিক পরেই জেলায় জেলায় মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করে বিদ্যাসাগর দেখেছিলেন সরকার আর এই গাতে পয়সা খরচ করতে রাজি নয়। কিন্তু প্রাচীনপন্থী শিক্ষা-সংস্কৃতির থেকে
যে স্বকীয়তা সৃষ্টি এয়া সম্ভব ছিল না, 'নবজাগরণ' তার সম্ভাবনাকে সৃষ্টি করেছিল। অনেকে বলেছেন, এর ফলে দেশীয় সংস্কৃতির ধারাগুলি চাপা পড়ে গেল, এবং ইংরেজি শিক্ষিত ও দ্রলোকদের প্রাধান্য সুপ্রতিষ্ঠিত হলো। কিন্তু এটা তো শ্রেণীসমাজের একটা মৌলিক নিয়ম। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের যে সংস্কৃতি তার মধ্যে সবসময়েই কিছু নিজস্বতার উপকরণ থাকে, লোকপ্রবাদে, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে সামাজিক স্তরভেদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ প্রকাশিত হবার কিছু রাস্তা পায়। কিন্তু তার মানে কি এই, যে সামন্ততান্ত্রিক সমাজের সংস্কৃতিতে সামন্তপ্রভুর প্রাধান্য কিছু কম, বা সেখানে প্রভু-সংস্কৃতির সঙ্গে প্রজা-সংস্কৃতির কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আত্মিক যোগাযোগ থাকে। সেখানেও তো আমরা দেখি প্রভু-শ্রেণী সাধারণ মানুষের সংস্কৃতির উপাদানগুলিকে আত্মসাৎ করে সেগুলোকে তাদের নিজের সুবিধামতো রূপ দেয়। যাত্রা-কবিগান-কুমুর-পাঁচালিকেও কি সামন্তপ্রভুরা নিজেদের খুশিমতো গড়ে নেবার চেষ্টা করেনি? দেশীয় সংস্কৃতির এই ধারাগুলি সম্বন্ধে, ইংরেজিশিক্ষিত 'ভদ্রলোক-সমাজ' যে 'অশ্লীলতা' ও 'অসভ্যতা'র অভিযোগ এনেছিল, তা কি কেবলই শ্রেণীগত জুগুপ্সা, না সেখানে সেই সঙ্গে সামন্ততান্ত্রিক রক্ষণশীলতার যে পচাগলা চেহারা তার বিরুদ্ধে, আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠার পক্ষে একটা জেহাদ ছিল? সত্যিই এই সময়ে ক্রমশ কলকাতা শহরে বটতলার বই, কালিঘাটের পট, যাত্রা-পাঁচালি-হাফআখড়াই-খ্যামটার প্রভাব কমে আসে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন জমিদার-বানিয়া-মুৎসুদ্দিশ্রেণীর পতনের সঙ্গে তা ছিল অবশ্যম্ভাবী। ইংরেজি শিক্ষিত 'ভদ্রলোক'-সমাজের সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের যোগাযোগের কোনো নতুন পথ শহরের এই অন্তর্বর্তীকালীন জনসংস্কৃতির মধ্যে ছিল না।
'নবজাগরণে'র হোতাদের একটি অংশের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গা থেকে, প্রধানত মনন ও যুক্তির ক্ষেত্র থেকে, জনসাধারণের অবস্থাকে বোঝার চেষ্টা কিন্তু এই সময়েই শুরু হয়। জাতপাতের প্রথাকে রাজনৈতিক দুর্দশার কারণ বলে চিহ্নিত করলেও রামমোহন নিজে কখনো উপবীত ত্যাগ করেননি। 'ইয়ং বেঙ্গলে'র যুবকবর্গ এবং শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখ ব্রাহ্মসমাজের প্রগতিশীল অংশ এই বিষয়ে ব্যবহারিক দিক থেকে আরও খানিকটা এগিয়ে ছিলেন এবং তথাকথিত নিম্নবর্ণের সঙ্গে জল-অচল বিভাজনে একটা ধাক্কা দেবার চেষ্টা করেছিলেন। রামমোহন রায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থক ছিলেন, তাঁর এবং তাঁর মতো মানুষের স্বার্থ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু তাঁর লেখার মধ্যে এই ব্যবস্থার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রায়তের দুর্দশার কথা তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়নি। রায়তের জমির ওপর অধিকার যে এই ব্যবস্থার ফলে অপহৃত হলো সেটাও তাঁর বিশ্লেষণের মধ্যে ছিল, যদিও রায়তের উন্নয়নের কথা চিন্তা করতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কাঠামোর বাইরে তিনি যেতে পারেননি। যুক্তিবাদী অক্ষয়কুমার দত্তও 'পল্লীগ্রামের প্রজার দুরবস্থা' প্রবন্ধের মাধ্যমে এদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। ১৮৫৭-র পরে কৃষকের উপর নীলকরের অত্যাচার নিয়ে সোচ্চার হয় 'হিন্দু পেট্রিয়ট' ও 'সোমপ্রকাশ'। সমাজসেবার মধ্য দিয়ে শিবনাথ শাস্ত্রী, শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের শ্রমজীবী শ্রেণীর সঙ্গে কিছু কিছু যোগসূত্র তৈরি হয়। এর মধ্যে সাম্যের ধারণার চেয়ে মানবতাবাদী চেতনাই বেশি, কিন্তু এটা একটা নতুন জিনিস। নারীজাতির জাগরণের প্রসঙ্গ আমরা চতুর্থ পরিচ্ছেদে আলোচনা করব, কিন্তু তাঁদের অবস্থা নিয়ে বিতর্ক-আলোচনারও শুরু রামমোহন থেকেই।
প্রকাশ: ০৪-আগস্ট-২০২৬
শেষ এডিট:: 31-Jul-26 11:52 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/freedom-struggle-and-the-culture-of-bengal-part-ii-
Categories: Fact & Figures
Tags:
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (172)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (155)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (82)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)


