‘ইয়ো সয় ফিদেল’: এক বিপ্লবীর স্মৃতির প্রতি

হাভানা ইউনিভার্সিটিতেই প্রথম ওঠে এই স্লোগান, শয়ে-শয়ে ছাত্র, এক সুরে বলে ওঠে ‘য়ো সয় ফিদেল’ - অর্থাৎ ‘আমিই ফিদেল’।

ইতিহাসের গতি বড়োই মজার, যুগের ফের ঘটানো জননেতা কখন কিভাবে তৈরী হবে তা বলা ভার। কেউ কি জানতো মার্কিন সাম্রাজ্যের পরাধীন কিউবার ওরিয়েন্টে প্রদেশের বিরানে জন্ম গ্রহণ করবেন এমন এক বিভীষিকা যা মার্কিন সাম্রাজ্যকে নাকে দড়ী দিয়ে ঘোরাবে আগামী ৯০ বছর। ১৯২৬ সালের ১৩ই আগস্ট, বিরানের এক ধনী জমিদার বাড়িতে এক ছেলের জন্ম হয়। তার জীবনটা তো সোজা পথেই যাওয়ার কথা: গ্রামের স্কুল, তারপর সান্তিয়াগো-দে-কুবা আর হাভানার নামকরা জেসুইট স্কুল, শেষে হাভানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস। একটা আরামদায়ক জীবন, সব ঠিকঠাক।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ভারী নাছোড় জায়গা! সেখানে শুধু ডিগ্রি পাওয়া যায় এমন তো নয়, শিক্ষার গণ্ডী পেরিয়ে সচেতনতা তৈরী হয় সেখানেই, পরাধীন দেশে রাজনৈতিক মনন তৈরী হতে সময় লাগে না। বিপ্লবী আদর্শ পেয়ে বসে করিডোরে-ক্যাম্পাসে, আর বিপাকে পড়েন দমঙ্কারী রাষ্ট্র, বিকে যাওয়া রাষ্ট্র। ফিদেল কাস্ত্রো রুজও তার ব্যাতিক্রম না। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালটে যায় ফিদেলের জীবন। কলেজে ঢুকেই রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সংগঠনে যোগ দেন কিশোর ফিদেল। আর তার পর? কিউবান পিপলস পার্টি। ১৯৪৭ নাগাদ পার্টির বামপন্থী শাখার নেতা হয়ে উঠলেন। সেবছরই সশস্ত্র সংগ্রামেও যোগ দেন, ডমিনিকান রিপাবলিকের ত্রুহিলো নামক সৈরাচারী একনায়ককে উৎখাৎ করতে।
৪৮-এর গোড়ায় কলম্বিয়ার বোগোটায় ছাত্রনেতা ফিদেল লাতিন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণঅভ্যূত্থানে নেতৃত্ব দেন। দেখতে দেখতে ১৯৫২, ১০ই মার্চ। ফুলজেন্সিও বাতিস্তার ক্যু, সেনা-অভ্যুত্থান। মার্কিন সমর্থিত বাতিস্তার একনায়কতন্ত্রের সাথে সম্মুখ-স্মরে যাবার প্রস্তুতি চরমে। ১৯৫৩-র ২৬ জুলাই হতে আর দেরি নেই।
২৬ জুলাই-এর অভ্যূত্থান সংগ্রামের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই-এ থাকা মানুষ মুভমেন্টো-26-দে-হুলিও, অর্থাৎ M-26-7 সম্পর্কে ভালোই ওয়াকিবহাল। মনকাদা ব্যারাকের আক্রমণ, গেরিলা যুদ্ধ, ৬০ জনেরও বেশি সহযোদ্ধাকে হারানো, জেল, ১৫ বছরের সাজা। সবটাই। আঈনের ছাত্র ফিদেল, জেলে থাকা অবস্থায় তাঁর ডিফেন্স স্পীচটিতে লিখেছিলেন সেই অমোঘ অভ্রান্ত প্যামফ্লেট – history will absolve me, ইতিহাস আমায় মুক্ত করবে। হাজারে হাজারে বিলি হয়ে যায় সেই প্যামফ্লেট, শুরু হয় জুলাই ২৬-এর গণআন্দোলন। সেই আন্দোলনের চাপে পড়ে, ১৫ বছরের সাজা প্রাপ্ত ফিদেল এবং তাঁর সমস্ত কমরেড, ২২ মাস পরেই জেল থেকে ছাড়া পান।
১৯৫৫-র ৭ই জুলাই, ইতিমধ্যেই মেক্রিকোর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন ফিদেল, শুরু হয়েছে জোরদার প্রস্তুতি, গেরিলা যুদ্ধে সংগঠিত করছেন কমরেডদের। শীঘ্রই ঢুকে পড়বেন কিউবার মাটিতে, সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি টান-টান। ১৯৫৬-র দোসরা ডিসেম্বর, এলো সেই দিন। ভাই রাউল কাস্ত্রো, সুহৃদ ও সহযোদ্ধা চে গুয়েভারা, ক্যামিলো সিএনফুএঙ্গোস, হুয়ান আলমেইদা এবং হেসুস মন্তানে সমেত ফিদেল গ্রানমা নামক কেবিন ক্রূসারে এসে পৌঁছলেন কিউবার উপকুলে। এর পর চললো দু-বছর টানা রেবেল আর্মির অপারেশন, ২৬ মুভমেন্টের নেতৃত্ব দেওয়ার সাথে সাথেই গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি। প্রাথমিক কিছু বাধা পেরিয়ে ১৯৫৮-র মধ্যে সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বত থেকে সংগ্রামের পথীগোতে এগোতে এসে পৌঁছলো কিউবান ব-দ্বীপের এক্কেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে।
আর বছর পেরোতে না পেরোতেই, ১৯৫৯-র পয়লা জানুয়ারি ফিদেলের বাহিনীর ভয়ে কিউবা থেকে পত্রপাঠ পালিয়ে গেলো বাতিস্তা, পতন হলো সৈরতন্ত্রের। ফিদেলের ডাকে এই সময়ে হাজারে হাজারে মানুষ যোগ দিলেন দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটে, নতুন স্বাধীন কিউবা প্রতিষ্ঠার দাবী বুকে নিয়ে, খেটেখাওয়া মানুষের আত্মাভিমানের দর্প সামনে রেখে, জয় হলো বিপ্লবের। বিজয়ী রেবেল আর্মির কমান্ডার-ইন-চিফ ফিদেল কাস্ত্রো ৮-ই জানুয়ারী বিজয় মিছিল নিয়ে প্রবেশ করলেন হাভানা শহর। প্রথমে প্রধাণমন্ত্রী, পরে রাষ্ট্রপতি, আগামী ৫০ বছর ধরে নেতৃত্ব দেবেন এই যুগানকারী জননেতা।
কিন্তু এই অর্ধশতাব্দী লড়েয়াই, বিপ্লবের প্রস্তুতির লড়াই-এর চেয়েও যেন কঠিন। একের পর এক মার্কিন বহিরাক্রমণে জর্জরিত কিউবা, স্যাংশন, ভয়াবহ ব্লকেড, কিউবার বৈদেশিক বাণিজ্যে হস্তক্ষেপ, বারংবার ফিদেলের উপর প্রাণঘাতী হামলা, নাশকতা। রুশ দেশের সাথে মার্কিন দেশে ঠান্ডা যুদ্ধের সময় পারমাণবিক জুয়ার গুটি হিসেবে কিউবাকে নিয়ে টানাপোড়েন, সেসব দশকই লড়তে শিখিয়েছে কিউবাকে। কিন্তু সবই ম্লান হয়ে উঠেছে সোভিয়েত পতনের পর। ৯০ এর দশকের স্পেশ্যাল পিরিয়ডে ভয়াবহ দারিদ্রে কিউবাকে তলিয়ে যেতে দেননি ফিদেল। সঙ্গে হাজারো কমরেড। হাতে হাত রেখে এগিয়ে গেছেন, লড়ে নিয়েছেন, পেরিয়েছেন স্পেশ্যাল পিরিয়ড, এই সব কিছুর মধ্যে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তব্য রেখে গেছেন জননেতা। রাষ্ট্রসংঘের ৫ মিনিট বক্তব্যের সময়ের বিধিকে সাদা কাপড়ে ঢেকে দিয়ে, বক্তব্য রেখেছেন ঘন্টার পর ঘন্টা।
২০০৬- রাউল কাস্ত্রকে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অবসরের রাস্তা নিলেন জননেতা, বয়স তখন ৮০। ২০১৬-র ২৫-শে নভেম্বর লাখো কিউবাবাসিকে কাঁদিয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বিংশশতাব্দীর প্রবাদপ্রতিম এই বিপ্লবী।
রিপাব্লিক অব কিউবার প্রথম জননেতা এবং ফিদেল কাস্ত্রোর কৈশরের রাজনৈতিক পথ প্রদর্শক হোসে মার্তি বলেছিলেন, “A man does not make a nation, but a nation at its birth may find its vibrant and triumphant voice in a man.”
“একা একটি মানুষ কোনও দেশ গঠন করতে পারে না, কিন্তু, একটি দেশ, তার জন্মকালে, হয়ত তার দৃপ্ত এবং বিজয়ী কন্ঠস্বর খুঁজে পায়, একটি মানুষের মধ্যেই।“
২০১৬-র ৪ই ডিসেম্বর, সান্তিয়াগো দে কুবায়, সেই হোসে মার্তির কবরের পাসেই চীরনিদ্রায় শায়িত হন ফিদেল। যাবার আগে কঠোরভাবে বলে যান, যেন তাঁর কোনো মুর্তি, সম্ভ, মনুমেন্ট নির্মিত না হয় কিউবায়, কোনো সরকারি ভবন, প্রমোদ কানন, নগরচত্বর, প্রতিষ্ঠান, রাস্তা বা রাজপথ তৈরী না হয় তাঁর নামে।
তাঁর মৃত্যু যেন কিউবার মানুষের অর্ধশতাব্দী পুরোনো বৈপ্লবিক চেতনাকে নতুন গনগনে আগুনে সেঁকে নেয়, যেমন নেমে আসে শোকের জোয়ার, তেমনই রাজনৈতিক উত্তেজনায় ফেটে পড়ে কিউবা। প্লাজা দে লা রেভোলিউশানে লাখো লাখো লোকের ভীড় যেন উপচে পড়ে, তাঁর মরদেহ নিয়ে গোটা দ্বীপ জুড়ে পরিক্রমা হয়, ১৯৫৯ যে পথে মার্কিন-সাহায্যপ্রাপ্ত একনায়কতন্ত্রের অবসান করতে রেবেল আর্মি ঢুকেছিলো কিউবায় তার ঠিক উলটোপথে। ফিদেলের আঈনশিক্ষার পীঠস্থান, হাভানা ইউনিভার্সিটিতেই প্রথম ওঠে এই স্লোগান, শয়ে-শয়ে ছাত্র, এক সুরে বলে ওঠে ‘য়ো সয় ফিদেল’ - অর্থাৎ ‘আমিই ফিদেল’। এই বাক্য মানুষের মুখে মুখে বিপ্লবের মন্ত্রের মত হয়ে ওঠে, লাখো লাখো কিউবান এক্স্বরে গটা দেশ জুড়ে বলে অঠে আমিই ফিদেল, এবং বৈপ্লবিক চেতনায় আরও একবার দীক্ষা নেন তারা, ঝালিয়ে নেন, বিপ্লবের প্রতি তাঁদের সংকল্প।
কমান্দান্তে চে গুয়েভারা এই ফিদেলকেই দেখেছিলেন, যখন তিনি বলেছিলেন,
“Fidel has his own special way of fusing himself with the people, [which] can be appreciated only by seeing him in action. At the great public mass meetings one can observe something like the dialogue of two tuning forks whose vibrations interact, producing new sounds. Fidel and the mass begin to vibrate together in a dialogue of growing intensity until they reach a climax in an abrupt conclusion crowned by our cry of struggle and victory.”
ফিদেল কেবল কিউবা নয়, লাতিন আমেরিকা এমনকি গোটা তৃতীয় বিশ্বের অস্তিত্বের, আত্মসম্মানের লড়াইকে একশো বছর এগিয়ে দিয়েছেন। ফিদেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, বিখ্যাত সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ফিদেল-কে নিয়ে লিখেছিলেন, “a man of austere ways and insatiable illusions, with an old-fashioned formal education, of cautious words and simple manners, and incapable of conceiving any idea which is not out of the ordinary.”
ওদিকে ফিদেল কিন্তু কখনোই পিছপা হননি যাকে তিনি বলতেন ‘আদর্শের লড়াই’ তাতে অংশুগ্রহণ করতে। তিনি বিশ্বাস করতেন তাঁর আদর্শের আয়ু মানুষ ফিদেলের আয়ুর অনেক অনেক ঊর্ধে। তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর আদর্শ, তাঁর ভাবনা বেঁচে থাকবে। তিনি বলতেন, “I believe there is something more powerful than weapons: ideas, reason and the morality of a cause... What can bring about the downfall of a military power with hundreds of bases all over the world? Ideas that are just, at the right moment, and in the appropriate historical circumstances.”
১৯৭৩ সালে আজকের দিনে হ্যানয় থেকে ফেরার পথে কলকাতার দমদম বিমান বন্দরে নামেন ফিদেল কাস্ত্রো।
সে দিনটিকে মনে রেখেই আজকের প্রতিবেদন।
প্রকাশ: ১৭-সেপ্টেম্বর-২০২৫
শেষ এডিট:: 11-Sep-25 09:15 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/fidel-castro-a-memoir
Categories: Fact & Figures
Tags: democraticright, history, scientificsocialism
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (150)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (134)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)

.jpg)



