ডিভিসি সাতাত্তর বছরের পথ পরিক্রমা — প্রতিশ্রুতি ও পরিণতি

কেবল দোষারোপ করে বন্যা রোধ করা যাবে না।

কেন্দ্র এবং দুই রাজ্য সরকার, তৎকালীন বিহার, অধুনা ঝাড়খন্ড এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যৌথ অংশীদারিত্বের সেন্টার স্টেট রিলেশনশিপের প্রজেক্ট দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (ডিভিসি)। কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলির সুসামজ্ঞস্য মূলক প্রকল্প হিসাবেই চিহ্নিত হয়েছিল এই প্রকল্প।
স্বাধীন ভারতের প্রথম বহুমুখী নদীজল পরিকল্পনা ডিভিসি। মুখ্যত বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষেই দু:খের নদী বা রিভার অব সরো দামোদরকে বেঁধে ফেলার কথা ভাবা হয়েছিল। বৃষ্টি নির্ভর দামোদর বর্ষায় ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। উৎস ভূমি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০০ ফুট উঁচু থেকে কতবার যে ধেয়ে এসে নিম্ন দামোদর এলাকা, পশ্চিমবঙ্গ তছনছ করেছে তার ইয়ত্তা নেই। শিশুদের ’ইক্ড়ি মিক্ড়ি’ ছড়াতেও স্থান পেয়েছে ‘ধেয়ে এলো দামোদর’।
দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন অ্যাক্ট, ১৯৪৮ (X1V of 1948) অনুযায়ী স্বশাসিত সংস্থা হিসাবে ডিভিসি’র পথচলার শুরু। চারটি ড্যাম, একটি ব্যারেজ, সেচ ক্যানেল নিয়ে পথ চলেছে লাগাতার ৭৭ বছর ধরে।
সূচনার সময় মাইথন এবং পাঞ্চেত ড্যাম থেকে আড়াই হাজার কিউসেক জল ছাড়লে সেই জল সেফ রিলিজ হয়ে গেছে। এখন চলতি অক্টোবরে মাত্র ৬০ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছিল মাইথন ও পাঞ্চেত ড্যাম থেকে। সেই জলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। অর্থাৎ এখন আর মাঝারি বন্যাও সামাল দেওয়া যাচ্ছেনা।
অন্যতম অংশীদার পশ্চিমবঙ্গ সরকার ডিভিসি’র প্রতি চরম অনাস্থা প্রকাশ করে চলেছে। বন্যা প্রতিরোধে রাজ্য সরকারের করণীয় এড়িয়ে ডিভিসি’র জন্যই পশ্চিমবঙ্গে বন্যা হচ্ছে এমন একটা প্রচার তোলা হয়েছে খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর তরফ থেকে। কী করলে দামোদরের বন্যা সামাল দেওয়া যায়, এই প্রশ্নে সমাধানের কোনো সুনর্দিষ্ট প্রস্তাব নেই। কেবল ডিভিসি দায়ী বলে একপেশে অভিযোগ তোলা হয়েছে। তৃণমূল দল ইতিমধ্যে ডিভিসি’র মাইথন ও পাঞ্চেতে মন্ত্রী মলয় ঘটকের উপস্থিতিতে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। অভিযোগ, ডিভিসি না জানিয়ে জল ছাড়ছে। ডিভিসি’র বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী ডিভিসি’র আইন অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের যে দুইজন প্রতিনিধি ডিভিসি বোর্ড ও দামোদর রিজার্ভার রেগুলেশন কমিটি (ডিভিআরআরসি)’তে ছিলেন, তাদের রাজ্য সরকার প্রত্যাহার করে নিয়েছে। দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে হঠাৎ প্রবল বর্ষণ কলকাতায়। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৩৩২ মিলিমিটার। জল থৈ থৈ কলকাতা। জলবন্দি শহরে তড়িদাহত হয়ে ৭ জনের মৃত্যুও হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এমন পরিস্থিতিতেও ‘বহিরাগত জলতত্ত্ব’ মেলে ধরেছেন। উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখন্ড, বিহার হয়ে কলকাতার গঙ্গায় জল আসে। ডিভিসি তো আছেই। যদিও দামোদর আর কলকাতার মাঝখানে হুগলী নদী। দামোদরের জল হুগলী নদী পার হয়ে কী ভাবে কলকাতায় আসতে পারে তার ব্যাখ্যা নেই!
মাইথন ও পাঞ্চেত ড্যাম তাদের জল ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত জল ধরে রাখলে বাঁধ ভাঙার সম্ভাবনা। বাঁধ তো দেওয়া হয়েছিল দামোদরকে শাসন করার জন্য। বাঁধ বিহীন দামোদর কতটা ভয়ানক ছিল, তা অতীত রেকর্ডে রয়েছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে, আর হঠাৎ করে ডিভিসি তৈরি হয়েছে, ব্যাপারটা এমন নয়।
ব্রিটিশ ভারতে দামোদরের বন্যা নিয়ে ভাবনার শুরু। ১৮৬৩ সালের বন্যার পর আপার ভ্যালি বা দামোদরের উৎসে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়। উপুর্যুপরি দামোদরের বন্যা হয়েই চলে। ১৮৬৬ থেকে ১৮৬৯ পর্যন্ত আপার ভ্যালিতে দামোদরের পরিস্থিতি আবার পর্যালোচনা করা হয়। ১৯০০ সাল পর্যন্ত দামোদরকে নিয়ে ব্রিটিশ সরকার অনেক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করেন। বিশেষজ্ঞরা কেউ দামোদরে ডায়ভারশন ক্যানেল তৈরির কথা বলেছেন। কেউ দামোদর ও তার উপনদীতে ১২ জায়গায় বাঁধ দেবার কথা বলেছেন। এরমধ্যে ১৯০১, ১৯১০, ১৯১৪, ১৯১৭ সালে ভয়বহ বন্যা ও পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার জন্য আবার বিশেষজ্ঞ নিয়োগ। ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ইএল গ্লস নামে একজন এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়োগ করেন। তিনি উৎসভূমে দামোদরের কেন্দ্রীয় অববাহিকা দামোদর ও বরাকর নদে দুটি বড় ড্যাম করার প্রস্তাব দেন। বিভিন্ন উপনদীতে অনেকগুলি লো-ড্যাম তৈরির প্রস্তাব দেন। তাঁর প্রস্তাবে ড্যামে জল বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বিশাল কয়লা সমৃদ্ধ ভূমি জলের তলায় চলে যাবে। জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া তাঁর প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিমন্ডলে ১৯৪৩ সালে দামোদরে ভয়াবহ বন্যা। রেল লাইন, গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড জলের তলায়। উত্তর ভারতের সঙ্গে পূর্ব ভারত বিচ্ছিন্ন। সামরিক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বলা চলে।
এমন পরিস্থিতিতে দামোদরের বন্যা পাকাপাকি ভাবে রোধ করতেই হবে ভেবে ১৯৪৩’র ৪ ডিসেম্বর বাংলার সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি করে দামোদর ফ্লাড এনকোয়ারি কমিটি গঠন করে। বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মহাতাবকে চেয়ারম্যান করে ১০ সদস্যর কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ছিলেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, ড: এনকে বোস, সিসি ইংলিশ, হার্ট, বিএল সবরওয়াল, এ করিম, কিল ফোর্ড, স্যালিশ, বিএল সুবারওয়াল প্রমুখ। ১৯৪৪ সালের ১০ মার্চ কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে। ডিভিসি’র তৈরির সূচনা দামোদর ফ্লাড এনকোয়ারি কমিটির প্রতিবেদন কে কেন্দ্র করে। এই কমিটি প্রস্তাব করেছিল আমেরিকার টেনিসি ভ্যালি অথরিটি (টিভিএ)’র অনুসরণে দামোদরকে বাঁধা হবে। এই প্রস্তাব চূড়ান্ত রূপ পায় ১৯৪৮ সালের ৭ জুলাই সংবিধান সভায় ডিভিসি আইন তৈরির মধ্য দিয়ে। টিভিএ’র ইঞ্জিনিয়ার উইলিয়াম এল ভরডুইনকে আনা হয়েছিল, টিভিএ লাইনে দামোদরকে বাঁধার জন্য।
ছোটানাগপুর মালভূমির পালামৌ, হাজারিবাগ, মানভূমের গভীর অরণ্য বেষ্ঠিত উচ্চভূমি এলাকায় রাজরাপ্পার কাছে স্থানীয়দের ‘দেওনাদ’ বা দামোদরের উৎসভূমি খামারপাত পাহাড়। মুখ্য অববাহিকা বরাকর নদ ও তার উপনদীগুলি। যা দামোদরের ৪০ শতাংশ হয়ে উৎসে ছড়িয়ে রয়েছে। উচ্চভূমে বরাকর উপত্যকা বিস্তৃত ২৬৫০ বর্গ মাইল এবং দামোদর বিস্তৃত ৪২০০ বর্গ মাইল এলাকা জুড়ে। উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমের বিভিন্ন অববাহিকা মিশেছে দামোদরে। দামোদর উপত্যকার ৩২১১৩ বর্গ কিলোমিটার ছড়িয়ে রয়েছে ঝাড়খন্ডে। পশ্চিমবঙ্গের অংশ ২৬৩৬৬ বর্গ কিলোমিটার। উচ্চভূমি, মালভূমি, সমতল বেয়ে ৫৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দামোদর হুগলী নদীতে মিশেছে। নদীর অববাহিকা অঞ্চল প্রসারিত ১৬৬০৯ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে।
পরিবেশবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বঙ্গপোসাগরে ঘণিভূত নিম্নচাপ সমতলে ছোটানাগপুর মালভূমিতে দামোদর উপত্যকা এলাকায় গভীর নিম্নচাপের আকার নিয়ে আইসোবারিক বা সমচাপিয় পরিস্থিতি তৈরি করে থাকে। উচ্চভূমের প্রবল বৃষ্টিপাত নিম্নভূমি,পশ্চিমবঙ্গ অভিমুখে ধেয়ে আসে।
ভরডুইন দামোদরের উচ্চভূমে ৭টি ড্যাম তৈরি করে মিলিয়ন কিউসেক বন্যার জল ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। উচ্চ দামোদরে ৩.৭ মিলিয়ন একর ফিট জলাশয়ে বন্যার জল ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁর প্রস্তাবিত বাঁধগুলি তিলাইয়া, দেওলবারি, মাইথন, আইয়ার, সোনালপুর (পাঞ্চেত পাহাড়ের কাছে), কোনার ও বোকারো। সব জায়গাতে জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব ছিল। বোকারোতে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রস্তাব ছিল। নিম্নভূমে দামোদরে ব্যারেজ। বর্ধমান, হুগলী, হাওড়া ও বাঁকুড়ায় সেচের জল। পাওয়ার ট্রান্সমিশন লাইন হবে। বেরমোতে লো-ডাইভারশন ড্যাম ও পাওয়ার ক্যানাল।
পরিকল্পনার আংশিক রূপায়ণ ও জন্মগত ত্রুটি নিয়ে পথচলা শুরু করেছে ডিভিসি। পরিকল্পনার ৭টি ড্যামের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে তৈরি হয়েছে চারটি ড্যাম। মাইথন, পাঞ্চেত, তিলাইয়া ও কোনার ড্যাম। দ্বিতীয় পর্যায়ের ড্যামগুলি হয়নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবগুলি ড্যাম তৈরি হলে নিম্ন দামোদরে বন্যা হবার কথা নয়। প্রথম পর্যায়ের চারটি বাঁধে লক্ষ্যমাত্রার ৪০ ভাগ বন্যার জল ধরে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। প্রবল বর্ষণে অতিরিক্ত জল ছেড়ে দিতে হয়। বানভাসী হয় পশ্চিমবঙ্গ। বাঁধগুলির উচ্চতা পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়নি। উচ্চতা কম হওয়ায় বেশি জল ধরে রাখতে পারছেনা।
সূচনায় দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছিল, কেবল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরির একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। দামোদর উপত্যকার আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা থাকবে ডিভিসি’র। লক্ষ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন (জল ও তাপ বিদ্যুৎ), জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, শিল্পের প্রসার, মৎস্য চাষ, নৌ পরিবহন ইত্যাদি।
নিম্ন দামোদরে দুর্গাপুরে ব্যারেজ করা হয়েছে। এখানে নৌ পরিবহনের জন্য লেফ্ট ব্যাঙ্ক মেন ক্যানেল খনন করা হয়েছে। লক গেট সমেত সেচ ক্যানেল খনন করে দিয়েছে ডিভিসি। দৈর্ঘ্য ২৪৯৪ কিলোমিটার। খারিফ ও রবি মরশুমে জলের জোগান বেড়েছে। কৃষি ফসল উৎপদন বেড়েছে। বাকি ড্যামগুলি না হওয়ায় কৃষির প্রয়োজনে জলের সঙ্কটও রয়ে গেছে। সূচনা লগ্নে বহুমুখী কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ডিভিসি। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের জন্য ম্যালেরিয়া বিভাগ দীর্ঘদিন কাজ করেছে। কৃষি, মৎস্যচাষ, পশুপালনে এগিয়ে এসেছে। কৃষি শস্য সংরক্ষণের জন্য বর্ধমানের কানাইনাটশালে হিমঘর করেছে ডিভিসি। কাঠের আসবাব তৈরি করা হতো। তালা তৈরি হতো। মাইথনের ওয়ার্কশপ থেকে কোলিয়ারি জন্য টাব তৈরি করা হতো। লক গেট করতো ডিভিসি। পানাগড়ে ডিভিসি’র কৃষি ফার্ম এবং ঝাড়খন্ডের দেওচন্দার কৃষি ফার্ম সাড়া ফেলেছিল। কৃষকদের উন্নত চাষের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ভূমিক্ষয় রোধে সয়েল কনজারভেশন বিভাগ খোলা হয়েছিল। নিজস্ব ফরেস্ট বিভাগ ছিল ডিভিসি’র। বৃক্ষ রোপণ করা হতো উৎস ভূমিতে।
বহুমুখী পরিকল্পনার কর্মকান্ড থেকে বহু আগে সরে এসেছে ডিভিসি। এখন একমাত্র লক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন। সয়েল কনজার্ভেশন বিভাগ নেই। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট নেই। মৎস্য চাষ, কৃষি ফার্মের কারবার থেকে হাত গুঁটিয়ে নিয়েছে। নির্বিচারে অরণ্য উৎপাটন হয়েছে উৎসে। ছোট ছোট পাহাড়ি টিলা পাথর ব্যবসায়ীরা ভেঙে লোপাট করে দিয়েছে। বসত বেড়েছে সর্বত্র। প্রচুর ভূমিক্ষয় হয়ে চলেছে উৎসে। পলি জমছে নদীর প্রবাহে ড্যামে।
পরবর্তী পর্যায়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে আইয়ার ড্যাম করার কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। বদলে দামোদর শাসনের পরিকল্পনার বাইরে তেনুঘাটে বিশাল ড্যাম করা হলো। এই ড্যাম ডিভিসি’র নিয়ন্ত্রণে নেই। ঝাড়খন্ড সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বোকারো স্টিলে এবং অন্যান্য কারখানার প্রয়োজনে জলের জোগান দেয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য তেনুঘাটের কোনো ভূমিকা নেই। উলটে তেনুঘাটের জল চাপ তৈরি করে ডিভিসি’র পাঞ্চেত ড্যামে।
ডিভিসি’র পথচলার দীর্ঘ ৭৭ বছরে একবারও নদী খাত কিম্বা ড্যামের পলি নিষ্কাশন হয়নি। অন্যদিকে ভূমিক্ষয় বেড়ে পলি বেড়ে চলেছে। যাদের নজর দেবার কথা, তারা ডিভিসি আইন দেখিয়ে চুপ করে রয়েছে। আইন করে বন্যা নিয়ন্ত্রণের দায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডিভিসি আইনের ৩৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে- ‘The total amount capital up to fourteen crores of rupees allocated to flood control shall be shared equally between the Central Government and the Government of West Bengal and any amount in excess thereof shall be liable of the Government of West Bengal.’ এককালীন মাত্র ৭ কোটি টাকা দিয়ে হাত গুঁটিয়ে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। ন্যায্য কারণেই সিআইটিইউ অনুমোদিত ডিভিসি শ্রমিক ইউনিয়ন দাবি তুলেছে, ডিভিসি আইনের ৩৬ নম্বর ধারা পরিবর্তন করতে হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের দায় কেন্দ্রীয় সরকারকে নিতে হবে।
১৯৬৪ সালে ডিভিসি’র জল ছাড়ার জন্য দামোদর ভ্যালি রিজার্ভার রেগুলেশন কমিটি (ডিভিআরআরসি) গড়া হয়েছিল। এই কমিটিতে পশ্চিমবঙ্গের একজন প্রতিনিধি ছিলেন। তাকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তুলে নিয়েছেন। ডিভিসি’র ওয়েব সাইট, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে জল ছাড়ার খবর দেওয়া হয়। কখন কত পরিমাণ জল ছাড়া হবে, সেই জল কখন কোথায় পৌঁছাবে তার বিবরণ থাকে। জ্ঞাত করা হয় সবুজ, কমলা ও লাল সতর্কতা দিয়ে।
ছয়ের দশকের সূচনায় চুক্তি করে ডিভিসি’র দুর্গাপুর ব্যারেজ ও ড্রেনেজ সিস্টেম অপারেশন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হাতে দেওয়া হয়। অর্থাৎ দামোদরের নিকাশী ব্যবস্থার ওপর ডিভিসি’র কোনো নিয়ন্ত্রণ রইলো না। বন্যার জন্য যারা দায়ী তারা চুক্তি দেখিয়ে বলে, যাবতীয় দায় নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের।
মমতা ব্যানার্জি কেন্দ্রে তখন মনমোহন সিংয়ের সরকারে, তখন ডিভিসি আইন সংশোধন করা হয়েছে। তৃণমূলের সাহচর্যে ডিভিসি আইনের ৪ নম্বর ধারা সংশোধন করা হয়। ডিভিসি বোর্ডের সদস্য সংখ্যা ৩ জন থেকে বাড়িয়ে ১০ জন করা হয়। এতে করে বোর্ডে কেন্দ্রের দখলদারি ও আধিপত্য বেড়ে যায়। তৃণমূল নেত্রী এক সময় যাদের ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলেছিলেন, সেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধেই এখন ডিভিসি’র জল মানে কেন্দ্রের জল এই তত্ত্ব সামনে এনে উল্টো সুর ধরেছেন।
দখলদারির তৃণমূলী রাজত্বে নদী বাদ যাবে কেন? একদিকে নদী খাতের নাব্যতা কমেছে। অন্যদিকে রিভার বেসিন এরিয়া কমছে। নদী বক্ষ থেকে বেপরোয়া বালি উত্তোলন চলছেই। দখল হয়ে গেছে দামোদর অববাহিকা। ড্রেনেজ সিস্টেম আগেকার জায়গায় নেই। হাজার হাজার পরিবারের বসবাস দামোদর অববাহিকা জুড়ে। দুর্গাপুর ব্যারেজের কাছে ওয়ারিয়া ও দুর্গাপুরে দুটি বিশাল মানা চর। সেখানে মানুষের বসবাস, চাষ আবাদ।দুর্গাপুর ব্যারেজের নিচ থেকে পানাগড় পর্যন্ত দামোদরের ভূমি দখল করে হাজার হাজার মাষুষের বসবাস। চাষের জমি। পুরো জায়গাটাই রাজ্য সরকারের এক্তিয়ারে। প্লাবন ভূমি বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। প্লাবন ভূমিতে এখন মানুষের দখল, চাষ আবাদ। টাকার বিনিময়ে জায়গা বন্টন করা হয়েছে বলে শাসক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ। বিস্তীর্ণ সেচ খালের জমিও দখলদারদের কবলে। সেচ খালের দুই পাড়ে বসত গড়ে উঠেছে। নদীর চর বিক্রি, ক্যানালের পাড় বিক্রি আমবাত এই রাজ্যে। বাঁকুড়ার বড়জোড়া থানা এলাকার নদীর চর দখল হয়ে গেছে, বিক্রি হয়ে গেছে। ১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যাতেও দামোদরের নিকাশী ব্যবস্থা আজকের মতন এতটা খারাপ অবস্থায় ছিল না।
চুক্তি অনুযায়ী নিকাশী ব্যবস্থা ঠিকঠাক রাখার দায়িত্ব কার? অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের। সরকার দখলদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে দখলদারিকে বরদাস্ত করতে থাকলে পরিণতি ভয়ঙ্কর হবেই। অবস্থা এমন দিকে যাচ্ছে, মাইথন পাঞ্চেত থেকে যদি জল না ছাড়া হয়, তাহলেও প্রবল বৃষ্টিপাতে দামোদরের নিকাশী প্লাবিত হবার সম্ভাবনা থাকছে। দামোদরের নিকাশী ব্যবস্থাকে পূর্বেকার জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নিকাশী সম্বন্ধে চুপ থেকে একপেশে দোষারোপ করাটা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। ডিভিসি আইনের ৪৯ ধারায় কর্পোরেশন ও সরকারের মধ্যে বিবাদ তৈরি হলে কী করতে হবে তার উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে- “any dispute between the corporation and any participating Government regarding any matter covered by this Act or touching or arising out of it shall be referred to an arbitrator who shall be appointed by the Chief Justice of India.” মুখ্যমন্ত্রী আইনী পথে না হেঁটে ডিভিসি বিরোধী প্রচার চালাচ্ছেন। ডিভিসি’র অন্যতম অংশীদার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রধানের একরোখা ও একপেশে প্রচারে সংস্থার সাধারণ কর্মচারিরাও আশঙ্কিত।
এদিকে কেন্দ্রীয় সরকার ডিভিসিকে বাণিজ্যিক সংস্থায় পরিণত করতে চাইছে। টুকরো টুকরো করতে চাইছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও সংবহন আলাদা করতে চাইছে। ডিভিসি আইনের বাধা ডিঙিয়ে স্বয়ং শাসিত সংস্থা ডিভিসিকে কোম্পানী অ্যাক্টের আওতায় আনতে চায় কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রী গত ১৭ জুলাই ডিভিসি সদর দপ্তরে এসে ডিভিসিকে কোম্পানিতে পরিণত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ৯ আগস্ট গোয়াতে ডিভিসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বিদ্যুৎ মন্ত্রকের সচিব ডিভিসি বিভাজনের কথা বলেছেন। প্রোডাকশন, ডিস্ট্রিবিউশন ও ট্রান্সমিশন আলাদা আলাদা করতে হবে। সূত্রের খবর আদানি পাওয়ার ডিভিসি’র ট্রান্সমিশন লাইন নিতে চায়। উৎপাদক ও গ্রাহকের মাঝে মুনাফা শিকারী বেসরকারি সংস্থা। ধাপে ধাপে প্রোডাকশন ডিস্ট্রিবিউশনও বেসরকারি হাতে যাবে। এদিকে রুখে দেবার আন্দোলনও শুরু হয়েছে।
নব্বইয়ের দশকে ডিভিসিতে ২৩ হাজার বিভাগীয় শ্রমিক কর্মচারি ছিলেন। বর্তমানে ২ হাজার আধিকারিক ও ৩ হাজার শ্রমিক কর্মচারি রয়েছেন। ঠিকা শ্রমিক প্রায় ১২ হাজার। বহুমুখী জন কল্যাণকারী নদী জল পরিকল্পনা ডিভিসিকে বাণিজ্যিক মুনাফা লোটার সংস্থায় পরিণত করা হচ্ছে। এমন সময়ে অন্যতম অংশীদার পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেন্দ্রীয় সরকারকে তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। ডিভিসি বোর্ড, ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট কমিটি থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাদের প্রতিনিধিদের তুলে নিলেন। এমনিতেই বোর্ডে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধির সংখ্যা বেশি। অনাচার অবিচার স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে কথা বলার মতন পশ্চিমবঙ্গের কোনো প্রতিনিধি থাকলো না।
দামোদর উপত্যাকা বাঁচাও, ডিভিসি বাঁচাও আন্দোলন তীব্র হয়েছে। সিপিআই(এম) সাংসদ প্রয়াত বাসুদেব আচারিয়া বহুবার সংসদে ডিভিসি’র দাবি নিয়ে, বন্যা নিয়ন্ত্রণের দাবি নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। বলপাহাড়ীতে আরো একটা ড্যাম চাই জোরালো দাবি ছিল সিপিআই(এম) সাংসদদের। ডিভিসি বলপাহাড়ী নিয়ে সমীক্ষার কাজ শুরু করেছিল। কাজ অনেকটা এগিয়েছিল। কিন্তু বলপাহাড়ী বাস্তবায়িত হয়নি। বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী প্রয়াত বিনয় চৌধুরী ড্যামগুলির উচ্চতা বাড়িয়ে জল ধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। ডিভিসি কর্তৃপক্ষের কাছে এই মর্মে দাবিও জানানো হয়। ড্যামের উচ্চতা অন্তত ৫ ফুট বাড়ানো দরকার। এরজন্য জমির প্রয়োজন। কাজ আর এগোয়নি।
উচ্চভূমি থেকে দামোদরের জল নিম্নভূমি পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে যখন যাবেই, তখন কেবল দোষারোপ করে বন্যা রোধ করা যাবে না। বন্যা নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সরকারকে বাধ্য করতে হবে। ডিভিসি আইন শেষ কথা হতে পারে না। বাস্তবতা হচ্ছে, দামোদরের জলে পশ্চিমবঙ্গ বানভাসী হচ্ছে। দায় কেন্দ্রীয় সরকারকে নিতে হবে। আরো ড্যাম করো। ভরডুইনের পরিকল্পনায় থাকা বাকি তিনটি বাঁধ যদি সম্ভব না হয়, বলপাহাড়ী ড্যাম করতে হবে। অবিলম্বে বলপাহাড়ী ড্যামের কাজ শুরু করতে হবে। মাইথন ও পাঞ্চেত ড্যামের উচ্চতা বাড়াতে হবে। ব্যারেজ, নদী বক্ষ ও ড্যামের পলি নিষ্কাশন করতে হবে। ভূমিক্ষয় রোধের ব্যবস্থা করতে হবে। নিম্ন দামোদরে প্লাবন ভূমি ফিরয়ে দাও। রিভার বেসিন দখলমুক্ত করো। নদীর চর দখলমুক্ত করো। সেচ খাল দখলমুক্ত করো। দামোদরের উপনদীগুলির প্রবাহ বাধাহীন করে তোল। বালি মাফিয়াদের লাগাম পরাও। নিকাশী ব্যবস্থা আগেকার চেহারায় ফিরিয়ে দিতে হবে। সর্বোপরি ডিভিসিকে মুনাফা কেন্দ্রিক বাণিজ্যিক সংস্থায় পরিণত হতে দেওয়া যাবেনা। ভয়াল দামোদরকে কী করে বহুমুখী উন্নয়নের দামোদরে পরিণত করা যায়, তার সমাধান তো বিশেষজ্ঞরা দিয়েছিলেন। ক্রমান্বয়ে বহুমুখীনতা থেকে ডিভিসিকে সরিয়ে আনা হয়েছে। ডিভিসি সূচনা লগ্নের আশ্বাসবাণী প্রতিশ্রুতি এবং ডিভিসি’র ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে সরে যাওয়া চলবে না।
ডিভিসি আইন, ব্যারেজ ও নিকাশী ব্যবস্থার হস্তান্তরের দোহাই দিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে বন্যার কবলে ডুবিয়ে দেওয়া চলবে না। আইন মানুষের জন্য, দরকারে আইনে বদল আনতে হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের দায় দিল্লির সরকারকে নিতে হবে। যথার্থ কোনো দাবি সহজে ও স্বেচ্ছায় সরকার মেনে নেয়না। মানতে বাধ্য করাতে হয়। আন্দোলনের তীব্রতা দরকার। ডিভিসি জুড়ে এবং দামোদর উপত্যকা জুড়ে ডিভিসি বাঁচাও— দামোদর উপত্যকা বাঁচাও- বন্যা নিয়ন্ত্রণ করো জোরালো দাবি উঠেছে। সিআইটিইউ অনুমোদিত ডিভিসি শ্রমিক ইউনিয়ন এই দাবির পিছনে উপত্যাকার সাধারণ মানুষের ঐক্য গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। ডিভিসি বাঁচানো, দামোদর উপত্যকা বাঁচানো ও পশ্চিমবঙ্গের বন্যা নিয়ন্ত্রণের দাবিকে জনগণের দাবিতে পরিণত করতে হবে।
তথ্যসূত্র:
দামোদর ভ্যালি এভলিউশন অব গ্র্যান্ড ডিজাইন, ডিভিসি পাবলিকেশন।
ফেলে আসা দিনগুলি- সুশীলচন্দ্র চক্রবর্তী।
ছবি: কন্সট্রাকশন ওয়ার্ল্ড ডট ইন
প্রকাশ: ৩০-অক্টোবর-২০২৫
শেষ এডিট:: 30-Oct-25 07:06 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/dvc-a-report
Categories: Current Affairs
Tags:
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (146)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (130)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





