চীনঃ এক দুর্দমনীয় আশাবাদ

এই বিশাল দেশ চীনের বিভিন্ন প্রান্তে আমি গিয়েছি। ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও পার্টির নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। সব মিলিয়ে যা উপলব্ধি করেছি তা হল এক দুর্দমনীয় আশাবাদ চীনকে তাড়া করে নিয়ে ছুটছে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যে ভরা এই মানুষগুলি।

বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের যে মর্যাদা তার প্রধান ভিত্তিই হল তাদের অর্থনীতির পরম আশ্চর্যজনক সাফল্য। তাদের বাধাহীন ধারাবাহিক জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি দুনিয়ার সব দেশের চোখে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। অর্থনীতির বিপুল সাফল্য চীনকে বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আসনে বসিয়েছে। এই বিস্ময়ের অন্তরালে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমত, কৃষি সাফল্য। চীন ১৪২ কোটি দেশের মানুষের অন্ন সংস্থান করেছে। উন্নত মানের করেছে। ক্যালরির প্রয়োজনীয় মাত্রা রক্ষা করেছে। উপরন্তু প্রোটিন ও অন্যান্য খাদ্যগুণ যুক্ত করেছে।
আমাদের মধ্যে একজন প্রতিনিধি একটি নিটোল লাল টম্যাটোর প্রশংসা করে কাঁচা টম্যাটো খেতে শুরু করলেন। চীনের কর্তাদের একজন বললেন বিশ্বখ্যাত খুচরো ব্যবসায়ীরাও হাজির হচ্ছে। ওদের যেন এসব নিয়ে কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই। দেশের মানুষ ভালো ভাবে খেতে পারছে- এটা ওদের কাছে রূপকথা এবং ওদের স্থির বিশ্বাস এটা থাকবে। আমি চীন সফরকালে মধ্যাহ্ন ভোজনে ভাত দিচ্ছে না বলে মনে মনে আপশোষ করছিলাম। শুধু মাছ আর মাংসের বিভিন্ন পদ। শেষে ছোট এক বাটিতে এক চামচ ভাত এল। আমি প্লেটে নিয়ে জিজ্ঞেস করাতেই নেতারা বলেছিলেন আমরা অন্য কিছু পেতাম না, তাই ভাত খেতাম। এখন ঐটুকু রেখে দেওয়া হয়েছে ঐতিহ্যকে সম্মান করে।
আমি গ্রামে ছোট বড় শহরে খাদ্য তালিকা দেখেছি। পরিসংখ্যান যা বলছে- এ সম্ভব হয়েছে কৃষি ব্যবস্থার সাফল্যে। চীনের নেতারা বললেন কমিউনের সময় উৎপাদিত কৃষিজাত সামগ্রী পড়ে থাকত সেখানেই। শহরের সঙ্গে সংযোগ করা যায়নি। কিন্তু এখন ভোরবেলায় নিয়মিত সুস্বাদু সবজি, মাছ, মাংস পাচ্ছেন শহরের নাগরিকরা। উৎপাদনও বাড়ছে।
খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে কৃষিসাফল্যের ভিত্তি ক্রমান্বয়ে মজবুত হওয়ায় এসেছে অতি আধুনিক শিল্পের জোয়ার। অবশ্যই বিদেশী পুঁজি এবং পরিচালন ব্যবস্থায় চীন বিশেষ উপকৃত হয়েছে। হংকং শহরের গায়ে গড়ে উঠেছে সেনঝেন সিটি। দৈত্যের মতো এক আধুনিক শিল্প শহর। আমরা রেস্তোরাঁর ৩৬ তলায় বসে চারদিক দেখছি। এটি ঘূর্ণায়মান। কফি খাচ্ছি। বিস্ময়ের ঘোর লাগে দেখলে। অসংখ্য মানুষ আর তাদের দপ্তর। সব চীনাদেরই। এরা দুনিয়ার আধুনিকতম শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত।
দেও জিয়াও পিঙ এই নয়া রাজনীতি শুরু করেন। তিনি ছিলেন চীনের ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। এই শহরের অর্থনৈতিক দপ্তরে গিয়ে জানার চেষ্টা করছিলাম, কতগুলি বিদেশী কোম্পানি এখানে সক্রিয়? কোন দেশের কত পুঁজি? চীনের সরকারের পুঁজিই বা কত? বিদেশীরা চীনের পুঁজিকে ছাপিয়ে গিয়েছে। অর্থনীতির একজন অধ্যাপক বোঝালেন বিদেশী পুঁজির লভ্যাংশ বিদেশে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু উৎপাদনের পরিচালনার যে শিক্ষা ওরা আয়ত্ত করেছে তার দীর্ঘস্থায়ী সুফল পাওয়া যাবে। শিল্পনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এতদিনকার বন্ধ জানালা খুলে দেওয়া। দুএকটি পোকামাকড় যা আসবে আমরা সামলে নেব।
রাত্রিবেলা হোটেলে ঘুমাতে গিয়ে এই পোকামাকড়দের পরিচয় পেলাম। কয়েকটি অল্পবয়সী চীনা মেয়ে বেশ্যাবৃত্তি করছে। আমি খানিকটা দুশ্চিন্তা নিয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম।
চীনের সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রসঙ্গটি নিঃসন্দেহে একটি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। চীনা নেতৃবৃন্দ ক্রমশ তা বুঝতে পারছেন। প্রতিদিনের জীবনযাত্রা এবং সাফল্যের যে ছবি তার সঙ্গে পশ্চিমী দুনিয়ার গণতন্ত্র সম্পর্কিত অভিযোগ মেলে না। কিন্তু মানবাধিকার প্রসঙ্গটি নিছক খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান তথা শারীরিক অস্তিত্ব শুধু নয়, আরও গভীরতর কিছু, যা কোনও শর্তসাপেক্ষ নয়।
চিন্তা ও মননে এমন কিছু মৌলিক অধিকার থাকে। সেই অধিকারই যদি আক্রান্ত হয় তার রক্ষাকবচ কী? মানুষের অধিকারে কোনও ভাবেই যেন রাষ্ট্রীয় অথবা বেসরকারি সন্ত্রাসবাদ হাত না বাড়ায়। চীনা সাধারণতন্ত্রকে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতেই হবে।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পরবর্তীকালে যা চীনের নেতারা প্রতিবিপ্লব বলে চিহ্নিত করেছেন- এই বিপ্লবের গোধূলি বেলায় আমি প্রথমবার চীনে যাই (১৯৮২)। সমগ্র দেশের মধ্যে, সমগ্র জাতির মধ্যে থমথমে ভাব, সন্ত্রাসমূলক ঘটনা কমে গেছে, আত্মসমালোচনার ঝড় বইছে। কিন্তু সেই ঝড় বাইরে থেকে উপলব্ধি করা যায় না। রাস্তাঘাটে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কথাবার্তায় কেউ সোচ্চার নয়। নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কাজের ফাঁকে পরিবারের অবসর সময়ে তারা কি ভুল করেছে সেই নিয়ে বিরামহীন আলোচনা চলছে। সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনে ধারাবাহিক ভাবে বেরোচ্ছে তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ভুলভ্রান্তি নিয়ে। সত্যি বিপুল ক্ষতি হয়ে গেছে বিজ্ঞানের গবেষণায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন প্রকল্প সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন করে শুরু করা প্রায় অনিশ্চিত। সংস্কৃতি জগৎও বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একমুখী সংস্কৃতি সমাজের মধ্যে বিরোধী অংশকে পদদলিত করেছিল। প্রকৃতপক্ষে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঐ বছরগুলিতে কোনও সৃষ্টিশীল কাজ হয়নি। সাধারণ নাগরিক-জীবনে কেশবিন্যাশ, পোশাক-আশাক আবার স্বাধীনতা পেয়েছে এবং প্রসাধন ও ফ্যাশান পথ চিনে নিচ্ছে।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দিনগুলিতে কতজন মানুষ মারা গেছে তার সরকারি কোনও পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু সংখ্যাটা মামুলি নয় আর সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি যার কোনও তুলনা নেই।
যে প্রশ্ন আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে তা হল যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় লক্ষকোটি সাধারণ চীনের নাগরিকদের মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে তার জবাব কী? লক্ষকোটি নাগরিক যাঁরা রাজনীতির বলয়ের মধ্যে নেই তাঁদের নিজেদের বাড়িতে ঘরে বসে শারীরিকভাবে আক্রান্ত হতে হয়েছে অজানা অপরাধে। পরিবারের সদস্যরাও আক্রান্ত হয়েছেন। মেয়েদের চুল কেটে নেওয়া হয়েছে। পরিবারের সংগৃহীত চিত্রশিল্প পোড়ানো হয়েছে। এর কোনও প্রতিকার ছিল না? প্রশাসন কোনও ভূমিকাই পালন করল না, বিচারব্যবস্থাও হস্তক্ষেপ করল না! এই বিষয়টি চীনদেশ ভ্রমণের সময় আমাকে বার বার চিন্তিত করেছে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবে যা লঙ্ঘিত হয়েছে তা রাজনৈতিক নয়, মানবিক অধিকার এবং সেই দুর্যোগকে ঠেকাবার কোনও রক্ষাকবচ চীনের নেই। এই ঘটনার যে পুনরাবৃত্তি ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কী? সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের আলোচনায় এখনও এই প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। কোনও পথ কেউ দেখাতে পারেনি। চীনের নেতারা আমাকে বলেছিলেন পার্টিই শেষ পর্যন্ত শেষরক্ষা করবে, যদি গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বজায় থাকে। আর যদি না থাকে? ব্যক্তিপূজায় বিলীন হয়ে যায়? এখনো উত্তর মেলেনি।
এই বিশাল দেশ চীনের বিভিন্ন প্রান্তে আমি গিয়েছি। ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও পার্টির নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। সব মিলিয়ে যা উপলব্ধি করেছি তা হল এক দুর্দমনীয় আশাবাদ চীনকে তাড়া করে নিয়ে ছুটছে বিচিত্র বৈশিষ্ট্যে ভরা এই মানুষগুলি।
কমিউন উঠে গেছে। নতুন আইন এখনো পাকাপোক্ত হয়নি।
হাঁপাতে হাঁপাতে স্টেশনের উপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে আমাদের পাশ দিয়ে গেল একটি মেয়ে, লাল পোষাক, মাথায় ধুলো, মুখ চোখ রক্তবর্ণ, ঠান্ডায় কাঁপছে। হাতে এক ঝুড়ি বাদাম। বিক্রি করতে চায়।
পুলিশ দেখে পালাচ্ছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। নিজের দেশে নিজের তৈরি বাদাম বেচতে ভয় পাচ্ছে। নাম আবার চীনা বাদাম।
সমাজতন্ত্র কোন পথে?
হাসপাতালে দেখেছি বিশেষজ্ঞ এক মহিলা ডাক্তারকে। ক্লান্তিহীন কর্মী। মুখে চোখে শান্ত ভাব। বিদেশ থেকে সার্জারি শিখেছেন। অন্যের কাছে জেনেছিলাম হাসপাতালের ঝাড়ুদার ও তাঁর মাইনের ফারাক খুব কম। অবাক লেগেছে।
সেনঝেন শহরে অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ মানুষটি পেশায় অধ্যাপক, তৎকালীন অর্থনীতি (১৯৮২) সম্পর্কে গভীর আস্থা। বিশেষত দেও জিয়াও পিঙ সম্পর্কে।
এক নবীন যুবক আমার সঙ্গী ছিল ট্রেনে। খুব সিগারেট খাচ্ছে। তার বক্তব্য সে আমেরিকা চলে যাবে। এই দেশ তার ভালো লাগে না।
আর একজন যুবক কোনও একটি সভার ফাঁকে আমায় বলেছিল, আমি একটা বন্দুক পেলে ভিয়েতনামীদের গুলি করব। আমি বললাম কেন করবেন? ভিয়েতনামীরা মার্কিনীদের অনেক গুলি খেয়েছে।
রাস্তায় জটলা। একদল বিক্ষুব্ধ প্রৌঢ় মানুষ। আরেক দল বৃদ্ধ তাদের বুঝিয়ে রাগ কমাচ্ছেন।
এদেশে সারাদিন পথে ঘাটে অসংখ্য মানুষ। জোড়া জোড়া পা শুধু হাঁটছে। কাজে যাচ্ছে। খাচ্ছে, প্রত্যেকের মুখেই হাসি। হাঁটছে যত ততই প্রায় সাইকেলে চড়ে আছে। সেই সময় (১৯৮২-৮৪) ব্যক্তিগত গাড়ির চলন হয়নি। রাস্তা ঘাটে খববরের কাগজ বিক্রি হচ্ছে। ট্রাকে ট্রাকে ভর্তি বাঁধাকপি। সেবার বাঁধাকপির প্রচুর ফলন হয়েছিল। শুয়োরের মাংস চলেছে দোকানে বাজারে। রাস্তা ঘাটে পুরুষ মহিলা প্রায় সমান। নানা জনের নানা রং-এর জামা প্যান্ট। বিশাল ট্রাক চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এক মহিলা ড্রাইভার। রাস্তাঘাটে ভিখিরি ভবঘুরে ও সাধুসন্তদের কোনও চিহ্ন নেই।
চীনের এই জীবনযাত্রার অন্তর্নিহিত শক্তি কী? কী তাদের ধরে রেখেছে? কী তাদের একসঙ্গে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে? সরকারিভাবে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দর্শনকে পরবর্তীতে মাও জে দঙ-এর চিন্তাধারাকে এই শক্তির উৎস বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক কালে চীনা নেতারা দেশপ্রেমের কথা বলছেন। যা এতদিনের তাদের রাজনৈতিক সাহিত্যে ছিল না। শুধু দেশে নয় বিদেশেও বসবাসকারী চীনারা এই মহান কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছে। এ হল চীনের জাতিপ্রেম, দেশপ্রেম।
একদিন খুব ভোরে তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে খোলা মাঠে দেখি একটির পর একটি বাস থামছে আর শিশুরা বাস থেকে নেমেই ছুটছে। মনে হল যেন হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ সূর্য আকাশে উঠছে তারই লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ছে- এই হচ্ছে বিশ্বাসের ছবি, ভবিষ্যতের ছবি। লক্ষ কোটি মানুষের একোন জীবনতৃষ্ণা চীনকে সাফল্যের এই চূড়ায় নিয়ে এসেছে? তারপর কি হবে?
‘শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে’।
২০১৯ সালে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রকাশিত 'স্বর্গের নিচে মহাবিশৃঙ্খলা' বইটি থেকে সংগৃহীত।
প্রতিবেদনের ইংরেজি ও বাংলা শিরোনাম ওয়েবডেস্কের নিজস্ব।
প্রকাশ: ০৮-আগস্ট-২০২৫
শেষ এডিট:: 08-Aug-25 09:48 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/china-the-irrepressible-optimism
Categories: International
Tags:
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (149)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (132)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
.jpg)




