পুঁজিবাদী আগ্রাসনঃ যুদ্ধ এবং জলবায়ু পরিবর্তন (দ্বিতীয় পর্ব)

Author
ডঃ তনুশ্রী চক্রবর্তী

যুদ্ধ ও পুঁজিবাদের এই মেলবন্ধন পরিবেশকে দুইভাবে আঘাত করে। সরাসরি যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ: বোমা, আগুন, রাসায়নিক, তেলকূপ ধ্বংস ইত্যাদি। পরোক্ষ পুঁজিবাদী শোষণ: অস্ত্র শিল্প, জ্বালানি রাজনীতি, পুনর্গঠন ব্যবসা, সম্পদ দখল।

Capitalist aggression: war and climate change

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন জল, খাদ্য বা উর্বর জমির সংকট তৈরি হয়, তখন তা নতুন যুদ্ধের জন্ম দেয়। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে জল ও চারণভূমি নিয়ে সংঘর্ষ, সুদানে দারফুর সংকট (Darfur conflict), কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে জলের রাজনীতি—এসবই দেখায় যে জলবায়ু পরিবর্তন এবং যুদ্ধের মধ্যে সম্পর্ক সরাসরি। পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে, কারণ সম্পদ বণ্টনে সমতা নেই। ধনী দেশ বা কোম্পানি যখন বেশি দখল করে, তখন বঞ্চিত জনগোষ্ঠী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

অনেক সময় যুদ্ধ রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে হয় না, বরং কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষার জন্য হয়। তেল কোম্পানি, খনি ব্যবসা কিংবা অস্ত্র শিল্পের স্বার্থেই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করতে গিয়ে বহুজাতিক কোম্পানি ও স্থানীয় গোষ্ঠীর সংঘর্ষ হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বা ভাড়াটে সৈন্য জড়িত ছিল।

যুদ্ধ ও পুঁজিবাদের এই মেলবন্ধন পরিবেশকে দুইভাবে আঘাত করে। সরাসরি যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ: বোমা, আগুন, রাসায়নিক, তেলকূপ ধ্বংস ইত্যাদি। পরোক্ষ পুঁজিবাদী শোষণ: অস্ত্র শিল্প, জ্বালানি রাজনীতি, পুনর্গঠন ব্যবসা, সম্পদ দখল।

ফলাফল হলো—বায়ুমণ্ডলে বাড়তি কার্বন, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, আর মানুষের জলবায়ু সহনশীলতার ভাঙন।

আজকের বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকেও অনেক সময় পুঁজিবাদী ব্যবসায়ে পরিণত করা হয়েছে। কার্বন বাজার, কার্বন ট্রেডিং, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির নাম করে কর্পোরেট মুনাফা—এসবের ভেতরেও দেখা যায় যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনীতির মতো লাভের সুযোগ। যুদ্ধ যেমন ধ্বংসের উপর দাঁড়িয়ে মুনাফা তৈরি করে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনও কর্পোরেট কাঠামোর জন্য নতুন ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করছে।

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু একটি বৈজ্ঞানিক বা পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি এখন একটি নিরাপত্তা সংকট। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সমাজে, অর্থনীতিতে এবং রাজনীতিতে। একদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, অন্যদিকে খরা ও বন্যা বাড়ছে; কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও আবার জলের চরম অভাব। এসব সংকট মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। আর সেই অনিশ্চয়তা অনেক সময় পরিণত হচ্ছে সংঘর্ষে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মানবিক প্রভাব হলো শরণার্থী সংকট। যখন মানুষ তাদের বাড়ি, জমি বা জীবিকা হারায়, তখন তারা অন্যত্র আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়। বর্তমানে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর কয়েক কোটি মানুষ পরিবেশগত কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

২১শ শতাব্দীকে অনেক গবেষক বলছেন “জল যুদ্ধের শতাব্দী।” জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, হিমবাহ গলছে, ভূগর্ভস্থ জলের স্তর কমছে। এসব কারণে দেশগুলোর মধ্যে জলের ভাগাভাগি নিয়ে সংঘাত বাড়ছে।

  • নীল নদ নিয়ে মিশর, সুদান ও ইথিওপিয়ার মধ্যে উত্তেজনা।
  • দক্ষিণ এশিয়ায় গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের জল নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ ও ভারত-চীনের মধ্যে টানাপোড়েন।

এই সংকট আরও বাড়বে যদি জলবায়ু পরিবর্তন একই হারে চলতে থাকে।

খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও বন্যার কারণে কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে। ফলে খাদ্যের দাম বাড়ছে, যা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। আরব বসন্ত আন্দোলনের পেছনে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্য সংকট আরও গভীর হলে তা নতুন বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধের জন্ম দিতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কিছু অঞ্চলে প্রাকৃতিক সম্পদ আরও মূল্যবান হয়ে উঠছে। যেমন, উত্তর মেরুর বরফ গলায় নতুন শিপিং রুট খুলছে এবং তেল-গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় আঘাত আসছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপর। ধনী দেশগুলো প্রযুক্তি ও অর্থ দিয়ে নিজেদের কিছুটা রক্ষা করছে, কিন্তু দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বৈশ্বিক বৈষম্য আরও তীব্র হচ্ছে। এই বৈষম্য রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে, যা সংঘাতকে অনিবার্য করে তুলছে।বিশ্বযুদ্ধগুলো প্রধানত তেল, উপনিবেশ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে হয়েছে। কিন্তু ২১শ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে যুদ্ধের চরিত্র পাল্টাতে পারে। ভবিষ্যতের যুদ্ধ সম্ভবত শুধু তেল নয়, বরং জল, খাদ্য ও নিরাপদ আবাসভূমি নিয়ে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন এ লড়াইকে আরও জটিল ও নির্মম করে তুলবে।

যুদ্ধ, পুঁজিবাদ ও জলবায়ু পরিবর্তনের যে অন্ধচক্র যা আলোচনা করেছি, তা অনিবার্য নয়। মানবসভ্যতা চাইলে ভিন্ন পথে চলতে পারে। তবে এজন্য প্রয়োজন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন রাজনৈতিক সাহস, আর মানুষের ভোগবাদী অভ্যাসে পরিবর্তন।

পুঁজিবাদী অর্থনীতি প্রকৃতিকে নিঃশেষিত সম্পদ হিসেবে দেখে, কিন্তু বিকল্প হতে পারে টেকসই অর্থনীতি (Sustainable Economy)। এখানে মুনাফার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামাজিক ন্যায়।

  • সমবায় মডেল: স্থানীয় জনগণের হাতে সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। যেমন কৃষি বা জ্বালানিতে সমবায় উদ্যোগ।
  • ডিগ্রোথ ধারণা (Degrowth): সীমাহীন উৎপাদন নয়, বরং কম খরচে, ন্যায্য ভাগাভাগির ভিত্তিতে অর্থনীতি চালানো।
  • নবায়নযোগ্য শক্তি: সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জোয়ার-ভাটা শক্তি—যা পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘস্থায়ী।

যুদ্ধ, কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। বিকল্প ব্যবস্থা সবসময়ই সুফল দায়ী, কিন্তু বাজারী ধান্দার পুঁজিবাজ তাকে গ্রাস করে ফেলছে। সেই মায়াজাল থেকে বেড়িয়ে কতটা টেকসই ব্যবস্থার দিকে যাওয়া যাবে, তা প্রশ্নের মুখে দাড়িয়ে আছে। “Green Planet, Save Planet, Cleanliness is godliness” এই কথা গুলো Value Education বই-এর মধ্যে আটকে গেছে। দাঁত, নখ নিয়ে বেরিয়ে আসছে পুঁজিবাদের থাবা। তবে মানুষ না বাঁচলে যে পুঁজিবাদীও বাঁচবে না, তা তারা ভুলেই গেছে মুনাফার কালো টাকায়। এটাই একমাত্র ভরসার বিষয়। কেবল রাষ্ট্র বা কর্পোরেশন নয়, সাধারণ মানুষও পরিবর্তনের চালিকা শক্তি হতে পারে।ভোগবাদী অভ্যাসে পরিবর্তন, প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার, অপচয় এড়ানো।সামাজিক আন্দোলন, জলবায়ু ন্যায়বিচার আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন। স্থানীয় উদ্যোগ যেমন বৃক্ষরোপণ, নদী রক্ষা, পুনর্ব্যবহার। তবে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে এই একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহ পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার জন্য।


প্রকাশ: ১৫-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 13-Feb-26 16:49 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/capitalist-aggression-war-and-climate-change2
Categories: Fact & Figures
Tags:
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড