ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও আমরা

সরোজ মুখোপাধ্যায়
নৌ-বাহিনীর দাবি-দাওয়া নিয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ আলোচনার পর আলোচনা চালাতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে। বহুদিন প্রতীক্ষার পর ১৮ই ফেব্রুয়ারি (১৯৪৬) তলোয়ার যুদ্ধ জাহাজের নৌবাহিনী সম্পূর্ণ ধর্মঘট করে। বোম্বাইয়ের সমুদ্র বক্ষে এই নৌবিদ্রোহ ভারতের অন্যান্য বন্দরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

আই এন এ-র (ভারতের জাতীয় ফৌজ) ক্যাপ্টেন রসিদ আলির বিচারে সাত বছর দণ্ডাদেশের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর প্রদেশ, বিহার, বাংলা, দিল্লি ও অন্যত্র বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত হতে থাকে। ছাত্র-যুব সমাজ সর্বত্র গর্জে ওঠে। মুসলিম ছাত্ররাও এই বিক্ষোভে হাজারে হাজারে যোগদান করে।
১১ই ফেব্রুয়ারি কলকাতায় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও কমিউনিস্ট ছাত্রদের সম্মিলিত বিক্ষোভ মিছিল ডালহৌসি স্কোয়ারের কাছে এলে পুলিস তাদের উপর লাঠি চার্জ করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারত ছাড় ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়। সারা দেশের অধিকাংশ শহরেই ছাত্র-যুবকদের মিছিলে এই আওয়াজ ওঠে। "সমস্ত আই এন এ বন্দীদের মুক্তি দাও, আর নয় আমাদের সকলকে গ্রেপ্তার কর”-এই আওয়াজ দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১১ই ফেব্রুয়ারি কলকাতার রাস্তায় বিশেষত দুটি স্থানে পুলিসের অজস্র গুলি বর্ষণ চলে। এই গুলি বর্ষণের ফলে নিহত হন কদম রসুল, মনোরঞ্জন দত্ত, প্রমথ আর মারাত্মকভাবে আহত হন বাস ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের নেতা নিত্য ব্যানার্জি। ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দসহ একশো জন ছাত্র আহত হন। ১২ই ফেব্রুয়ারি বোম্বাই শহরে হরতাল পালনের ডাক দেওয়া হয়। ১১ই ফেব্রুয়ারি দিল্লি শহরে বৃহত্তম সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত হয়। দিল্লি কমিউনিস্ট পার্টি, কংগ্রেসের বামপন্থী অংশ, প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশন ও অন্যান্য সংগঠন এদিনের বিক্ষোভে সমর্থন জ্ঞাপন করে এবং একসঙ্গে রসিদ আলি দিবস পালন করে। রসিদ আলির মুক্তির দাবিতে একটি বিরাট বিক্ষোভ মিছিল কেন্দ্রীয় অ্যাসেম্বলির সামনে যায়। দিল্লি শহরে হরতাল প্রতিপালিত হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ মুর্দাবাদ, আই এন এ বন্দীদের অবিলম্বে মুক্তি দাও প্রভৃতি ধ্বনি দিতে দিতে সন্ধ্যা ৭টায় মিছিলের উদ্যোক্তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের একটি কুশপুত্তলিকা ভস্মীভূত করে। সেখানে তিরিশ হাজার মানুষের একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতার মিছিলে ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দসহ একশোজন ছাত্র আহত হন। ১৪ই ফেব্রুয়ারি মাদ্রাজ শহরে সমস্ত কলেজের ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত করে। সমস্ত আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দীদের মুক্তি দাবি করে মূহুর্মুহু ধ্বনি উঠতে থাকে এই মিছিলে। একটি বিক্ষোভ সমাবেশের পর পাঁচ হাজার ছাত্রের একটি মিছিল বিভিন্ন রাস্তা পরিক্রমা করে।
নৌ-বাহিনীর দাবি-দাওয়া নিয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ আলোচনার পর আলোচনা চালাতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে। বহুদিন প্রতীক্ষার পর ১৮ই ফেব্রুয়ারি (১৯৪৬) তলোয়ার যুদ্ধ জাহাজের নৌবাহিনী সম্পূর্ণ ধর্মঘট করে। বোম্বাইয়ের সমুদ্র বক্ষে এই নৌবিদ্রোহ ভারতের অন্যান্য বন্দরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিদ্রোহী নৌবাহিনীর নেতারা কংগ্রেস ও লীগ নেতাদের কাছে তাঁদের সংগ্রামে সাহায্য করার আবেদন নিয়ে যান। তলোয়ার জাহাজে কংগ্রেস, লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির তিনটি ঝাণ্ডাই উত্তোলিত দেখা যায়। ইউনিয়ন জ্যাক ফেলে দিয়ে তাঁরা এই তিনটি পতাকা উড্ডীন রাখেন। তিনদিনের মধ্যে বোম্বাই নৌবাহিনীর ২০টি জাহাজে ২০ হাজার নৌসেনা ধর্মঘটে যোগ দেন। ইনকিলাব জিন্দাবাদ, জয় হিন্দ ধ্বনি দিতে দিতে আজাদ ময়দানে সকাল নয়টায় সমবেত হন এই বিদ্রোহী ধর্মঘটী নৌসেনারা। তারপর মিছিল করে শহর পরিক্রমা করেন। বাছাই করা সামরিক বাহিনী তলব করা হয় এই ধর্মঘটী নৌবাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালাবার জন্য। সাত ঘণ্টা ধরে দুই পক্ষে গুলি বর্ষণ চলে। সৈন্যদের কাছে ধর্মঘটীরা আবেদন জানায় "তোমরাও ভারতবাসী কেন আমাদের গুলি করছ"। ক্যাসেল ব্যারাকে ব্রিটিশ সৈন্যরা (গোরা সৈন্যরা) ধর্মঘটীদের উপর চড়াও হয়। সকাল ৯টা থেকে বেলা ৪টা পর্যন্ত লড়াই চলে। জাহাজে ও ব্যারাকে দীর্ঘ লড়াই এর পর বেলা সাড়ে চারটার সময় "কেন্দ্রীয় নৌ ধর্মঘটী কমিটি" আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাঁরা সশস্ত্র সংগ্রাম বিরতির চুক্তি করে এই লড়াই বন্ধ রাখেন। সৈন্যবাহিনীর প্রত্যাহার দাবি করেন ধর্মঘটীরা। বোম্বাই, করাচি ও পুণার দিকে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী প্রেরিত হয়। রক্তের বন্যায় নৌ বিদ্রোহীদের ভাসিয়ে দেবার পরিকল্পনা করেছিল ব্রিটিশ কর্তারা। সোমবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত লড়াই চলার পর শনিবার সকালে বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করেন। তাঁরা বলেন, "আমরা ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করছি, ব্রিটিশের কাছে নয়। জানি না আমাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। বিদায়-বিদায়।" "কেন্দ্রীয় ধর্মঘট কমিটি'র সভাপতি এই কথাগুলি বলেন। কংগ্রেস নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ও মুসলিম লীগ নেতা লিয়াকৎ আলি খান বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণ করতে পরামর্শ দেন। কিন্তু তাঁদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। দলে দলে তাঁদের বন্দী করা হয় শতশত নৌসেনাকে খুন করা হয়। তাঁদের দাবি-দাওয়ার কোন মীমাংসা হয়নি। সামরিক বাহিনী ও বিমান বাহিনীতেও এর ফলে দারুণ বিক্ষোভ দেখা দেয়। চতুর্দিকে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ শাসকরা প্রমাদ গোনে। কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে কোন মতে একটা আপসের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নটির মীমাংসা করতে উঠে পড়ে লেগে যান ব্রিটিশ কর্তারা।
বোম্বাই-এ তিনদিন রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টির বহু কর্মী আহত হন। মহিলা শ্রমিকনেত্রী কমল ধোন্ধে নিহত হন সামরিক বাহিনীর গুলিতে। শহীদ কমল ধোন্ধের ছবি (পিপলস এজে প্রকাশিত ৩রা মার্চ, ১৯৪৬-এর সংখ্যায়)।
৩রা মার্চের "পিপলস এজ"-এ বি টি রণদিভে শহীদ কমল ধোন্ধের উদ্দেশে লেখেন:
কমল
আমরা লাল পতাকা অর্ধনমিত করছি। ২২শে ফেব্রুয়ারি সাম্রাজ্যবাদী বুলেটের আঘাতে তোমার জীবনাবসান হলো। তোমার যৌবনোদ্দীপ্ত জীবনের অবসান হলো। বোম্বাই শহরের ঘরে ঘরে শোকের ছায়া যারা নামিয়ে এনেছে সেই জনশত্রুরাই তোমার জীবন ছিনিয়ে নিল। তোমায় শহীদ হতে হলো, কারণ তুমি আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে যাওনি। সামরিক বাহিনীকে দেখে তুমি তোমার নিজের স্থান ত্যাগ করনি। তুমি ভারতের বীর কন্যা। তুমি কমিউনিস্ট পার্টির বীর কন্যা। আমাদের একজন যোগ্য পার্টি সদস্য হিসাবে তোমায় সকলে ভালোবেসেছে, তাই তোমার মৃত্যুতে সকলে আজ শোকাচ্ছন্ন শোকাভিভূত। পার্টির বীর কন্যা, তোমার পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে আমি তোমায় জানাই লাল সালাম। তুমি যে স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়ে গেলে সেই স্বাধীনতার জন্য তোমার পার্টি সংগ্রাম চালিয়ে যাবে তুমি নিশ্চিন্ত থাক।
কমরেড ধোন্ধের প্রতি
তোমার গভীর শোকের আমরাও অংশীদার। কমল শহীদের মৃত্যুবরণ করেছে। তুমি একজন যোগ্য পার্টি সদস্যের ন্যায় এই শোক সহ্য করছ। বহু সংগ্রামে পরীক্ষিত সৈনিকের মতো তুমি এ সবই সহ্য করতে সক্ষম জানি। শোক ও দুঃখের মধ্যেও তোমায় সংগ্রামে অগ্রসর হতে হবে। আমরা জানি তুমি তা পারবে। - বি টি রণদিভে
২৩শে ফেব্রুয়ারি (১৯৪৬) কলকাতার বুকে এক লক্ষ ছাত্র ও শ্রমিক বোম্বাইয়ের নৌবিদ্রোহীদের সঙ্গে সংগ্রামী সংহতি জ্ঞাপনের জন্য বিরাট মিছিল বার করে। সামরিক বাহিনী ও পুলিসের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর এই দৃপ্ত মিছিল সুশৃঙ্খল ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপে শহরের বিভিন্ন রাজপথ পরিক্রমা করে। ছাত্ররা ধর্মঘট করে এই মিছিলে এসে যোগ দেয়। ট্রাম শ্রমিকরা সম্পূর্ণ ধর্মঘট করে। বি অ্যান্ড এ রেল শ্রমিকরা শিয়ালদহ শাখায় ও লোকো কারখানার কাজ বন্ধ করে বেরিয়ে আসে। ই আই ও বি এন রেলের শ্রমিকরাও এই প্রতিবাদে যোগদান করেন। ওয়েলিংটন স্কোয়ারে কমিউনিস্ট পার্টির বাংলা কমিটির উদ্যোগে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। অধ্যাপক ক্ষিতীশ প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে সোমনাথ লাহিড়ী বলেন- শ্রমিক ও ছাত্রদের একদিনের ধর্মঘট করা হলো বোম্বাইয়ের নৌবিদ্রোহীদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের প্রতি বাংলার জনগণের সংগ্রামী সংহতি জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যেই। পুলিস ও মিলিটারির নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলার প্রতিবাদ ধ্বনিত হলো এই ধর্মঘট ও সমাবেশের মাধ্যমে।
প্রকাশ: ১৩-আগস্ট-২০২৬
শেষ এডিট:: 12-Aug-26 23:22 | by 4
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-communist-party-of-india-and-us
Categories: Fact & Figures
Tags: communist party, , ina trial
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (5)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (172)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (155)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (82)
- Highlight - হাইলাইট (100)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও আমরা
- সরোজ মুখোপাধ্যায়
শ্রমিকদের ও কৃষকদের পার্টি গঠনের দিকে
- ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ
নতুন কণ্ঠস্বর
- ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ
শ্রমিক ও কৃষকদের অভিনন্দন
- ওয়েবডেস্ক
মহাত্মার চিঠি, যোশীর উত্তর
- ওয়েবডেস্ক
৯ আগস্টের চেতনা, ১০ আগস্টের অঙ্গীকার
- গার্গী চ্যাটার্জী




