ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস

‘Wherever communism manifests itself, it should be met and stamped out like the plague. The spread of communism in India is not one of those problems which may be looked at from a particular ‘angle of vision’; it must be looked straight in the face and it must be fought with the most unrelenting opposition.’

১. সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫)
সিধু ও কানহু মুর্মুর নেতৃত্বে সাঁওতাল আদিবাসীরা ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
এটি উপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম এবং এক বিরাট আদিবাসী বিদ্রোহ।
২. সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭)
প্রথম পর্যায়ে ব্যারাকপুরের সেনা মঙ্গল পাণ্ডে ও অন্যান্য সিপাহীরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।
যদিও এ বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়, কিন্তু এটি ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে পরিচিত।
৩. জাতীয় কংগ্রেস গঠন (১৮৮৫)
অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউমের উদ্যোগে গঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে ব্রিটিশদের কাছে দাবি পেশ করত।
৪. বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলন (১৯০৫)
লর্ড কার্জন বাংলাকে ভাগ করেন হিন্দুমুসলমান বিভাজনের মাধ্যমে।
প্রতিবাদে স্বদেশি আন্দোলন, বয়কট আন্দোলন শুরু হয়।
৫. ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূচনা (১৯১৭ - ১৯২৫)
১৯১৭ সালে রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব ভারতে প্রভাব ফেলে।
১৯২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর কানপুরে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (CPI) সম্মেলন আয়োজিত হয়। দেশের মাটিতে এটিই ছিল প্রথম সম্মেলন। এম এন রায়ের বিশেষ উদ্যোগে পার্টির প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২০ সালে, তাসখন্দে।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য: এম এন রায়, এস এ ডাঙ্গে, মুজফ্ফর আহ্মদ প্রমুখ।
৬. অসহযোগ আন্দোলন (১৯১৯ - ১৯২২)
গান্ধীজির ডাকে জনগণ স্কুল, চাকরি, পণ্য বর্জন করে।
ব্রিটিশ আইনের বিরুদ্ধে প্রথম গণআন্দোলন।
৭. জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (১৯১৯)
অমৃতসরে ব্রিটিশ সেনা নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালায়।
জাতীয়তাবাদ আরও তীব্র হয়।
৮. আইন অমান্য আন্দোলন ও লবণ সত্যাগ্রহ (১৯৩০)
গান্ধীজি ডান্ডি অভিযানে লবণ আইন ভেঙে প্রতিবাদ করেন।
দেশের মানুষ ব্যাপকভাবে অংশ নেয়।
৯. কমিউনিস্ট পার্টির বিপ্লবী প্রচেষ্টা (১৯৩০ - ৪০)
শ্রমিক ধর্মঘট, কৃষক বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয় CPI।
ভারত ছাড়ো আন্দোলনের আগে CPI বহু শ্রমিক-কৃষক সংগঠন গড়ে তোলে।
কমিউনিস্ট নেতা মুজফ্ফর আহমদ, এস এ ডাঙ্গে, বিপিন চন্দ্র পাল প্রমুখ নেতৃত্ব উল্লেখযোগ্য সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্য।
১০. ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষক আন্দোলন
CPI শ্রমিক সংগঠন AITUC (All India Trade Union Congress) এবং কৃষক সভা গড়ে তোলে।
কৃষকদের জমির অধিকার, খাজনা মকুব ইত্যাদির দাবিতে আন্দোলন চালায়।
১১. ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২)
গান্ধীজির ডাকে শুরু হয় ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন।
CPI তখন বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রাখলেও ব্রিটিশ বিরোধি আন্দোলন পর্যায় ক্রমে এগিয়ে নিয়ে যায়।
এই সময়ে CPI স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেই ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
১২. নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজ
সুভাষচন্দ্র বসু ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠন করেন।
স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেন।
১৩. ভারতের স্বাধীনতা দিবস (১৫ আগস্ট ১৯৪৭)
দীর্ঘ আন্দোলনের পর ব্রিটিশ সরকার অধীন থেকে দেশভাগ করে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।
কমিউনিস্ট পার্টি তখন স্বাধীন ভারতের শ্রমিককৃষকের অধিকার নিয়ে নতুন সংগ্রামে প্রবেশ করে।
কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা
স্বাধীনতার পর CPI ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম থেকে শ্রমিককৃষকের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পুরোপুরি মনোযোগ দেয়।
জমিদারি প্রথা বিলোপ, ন্যায্য মজুরি, ভূমি সংস্কার, খাজনা কমানোর দাবি তোলে।
তেলেঙ্গানা অঞ্চলে সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহে (১৯৪৬–১৯৫১) গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেয়।
সরকার বিদ্রোহ দমন করে, পরে CPI সংসদীয় রাজনীতিতে যোগ দেয়।
ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস প্রসঙ্গে ইতিমধ্যে রাজ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের একটি ছোট অংশ এক্ষেত্রে পুনঃর্ব্যবহার করা চলে-
‘ব্রিটিশ গোয়েন্দা ও পুলিশি নির্যাতনের বাধা পেরিয়েই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির সাথে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের যোগাযোগ বাড়তে থাকে। ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সাল অবধি ভারতে কমিউনিস্টদের কাজে উল্লেখযোগ্য গতি আসে, দেশের মূল অঞ্চলগুলিতে (প্রেসিডেন্সী এলাকা) সংগঠনের প্রসার ঘটে।
ভারতে কমিউনিস্টদের অগ্রগতি আটকাতে ব্রিটিশ সরকার তৎপর হয়ে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে দেশে ফেরত আসা কমিউনিস্টদের গ্রেপ্তার করে পেশোয়ার জেলে আটক রাখা হয়। এদের বিচার শেষ হয় ১৯২৩ সালে, দশ বছর অবধি সশ্রম কারাদন্ডের শাস্তি হয়। পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবে পরিচিত হলেও এটিই ছিল ভারতে কমিউনিস্টদের দমন করতে ব্রিটিশ সরকারের তরফে দায়ের হওয়া প্রথম মামলা। বলশেভিকদের আটকাতে ব্রিটিশ সরকারের স্বরাষ্ট্রদপ্তরের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল- ‘Wherever communism manifests itself, it should be met and stamped out like the plague. The spread of communism in India is not one of those problems which may be looked at from a particular ‘angle of vision’; it must be looked straight in the face and it must be fought with the most unrelenting opposition.’
কমিউনিস্টরাও উপলব্ধি করেন কেবলমাত্র বাইরে থেকে পাঠানো সহায়তার জোরে এগোনো যাবে না। কমিউনিজম সম্পর্কে, তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে দেশের জনসাধারণকে ধারণা দিতে পত্রিকা প্রকাশ হতে শুরু করে। কাজী নজরুল ইসলাম’কে সঙ্গে নিয়ে মুজফফর আহমদ বাংলায় সান্ধ্য দৈনিক‘নবযুগ’ প্রকাশ করেন। তারা দুজনে ‘ধূমকেতু’ এবং ‘গনবানী’ নামেও পত্রিকা চালিয়েছিলেন। ১৯২১ সালেই শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে’র লেখা ‘গান্ধী ভার্সেস লেনিন’ বইটি সাড়া ফেলে দেয়, পরবর্তীকালে তারই সম্পাদনায় ‘সোশ্যালিস্ট’ পত্রিকার প্রকাশ ঘটে। পেশোয়ার সরকারী কলেজের অধ্যাপক গুলাম হুসেনের সাথে মস্কো ফেরত কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পরিচয় হয়। তিনি নিজের চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে লাহোরে সংগঠনের প্রসারে মনোযোগী হন। তারই উদ্যোগে উর্দু ভাষার মাসিক পত্রিকা ‘ইনকিলাব’ প্রকাশ পায়, পাঞ্জাবে বেরোতে শুরু করে নতুন কাগজ ‘কীর্তি’। মাদ্রাজে সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার ইংরেজিতে ‘লেবর কিষাণ গেজেট’ ও তামিল ভাষায় ‘থোজিলালান’ নামের পত্রিকা প্রকাশ করেন। অন্যান্য বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলিও নিজেদের পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করে।
ব্রিটিশ সরকার রীতিমত ভয় পেয়ে যায়। ১৯২৩ সালে শওকত উসমানী’কে কানপুর থেকে এবং মুজফ্ফর আহমদ’কে কলকাতা থেকে গ্রেপ্তার করা হল। কিছুদিনের মধ্যেই লাহোর থেকে গুলাম হুসেন’কে গ্রেপ্তার করা হল। পরে নলিনী গুপ্তকেও মামলায় দোষী হিসাবে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে কানপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে চার্জশিট পেশ করার সময় অভিযুক্তের তালিকায় মোট আট জনের নাম যুক্ত হয়। বাকি তিনজন ছিলেন মানবেন্দ্রনাথ রায়, সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার এবং রামচরন লাল শর্মা। এর আগে তারা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে মামলার নথিতে বলশেভিক শব্দটি যুক্ত করেনি, ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবে উল্লেখ করেছিল। এবার তারা সরাসরি ‘কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা’ নামেই নথি দায়ের করল।
এ মামলার আবহেই দেশের বুকে সক্রিয় সমস্ত কমিউনিস্ট গোষ্ঠীকে একজায়গায় এনে কমিউনিস্ট সম্মেলন আয়োজনের আহ্বান জানানো হয়। কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা চলার সময়েই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সুবাদে কমিউনিস্টদের সম্পর্কে ক্রমশ দেশজুড়ে আগ্রহ তৈরি হয়। সেই সমস্ত খবর লেখকদের অনেকেই কমিউনিস্টদের প্রতি সমর্থনের দৃষ্টিভঙ্গি নেন। এমন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েই সম্মেলনের আহ্বান জানানো হয়। দেশের বুকে কমিউনিস্টদের প্রথম সম্মেলন এটিই।
ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন ও কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে এ মামলা এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কেন?
একটি সহজ তথ্যেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
ব্রিটিশ সরকার এ মামালার নামে বলশেভিক শব্দটি যুক্ত করেছিল এই আশায় যে বলশেভিকদের ভারতীয়রা ঘৃণা করে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছু ঘটল না, ব্রিটিশ প্রশাসন স্বীকার করে নিল ভারতে কমিউনিজমের মেয়াদ স্থায়ী হতে চলেছে (communism had come to stay)। কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজি দৈনিকে এ মামলার ফলাফল আলোচনার সময় খবরে লেখা হল ‘the fear of the law against communism has been removed’; এদেশে কমিউনিজম বিরোধী আইনের যাবতীয় ভয়-ভীতি মুছে গেছে।’
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গান্ধীজি ও কংগ্রেস যেমন নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি এদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও শ্রমিক, কৃষক, এবং মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল বহুমাত্রিক এবং কমিউনিস্ট পার্টি ছিল তারই অন্তর্গত এক গুরুত্বপূর্ণ ধারার প্রতিনিধি।
প্রকাশ: ১৫-আগস্ট-২০২৫
শেষ এডিট:: 15-Aug-25 09:47 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/snippets-of-indian-freedom-struggle
Categories: Fact & Figures
Tags: freedom, independence, indianfreedomstruggle, wethepeople
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (147)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (130)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





