ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ও মহান নভেম্বর বিপ্লব (প্রথম পর্ব)

Author
অর্ণব ভট্টাচার্য

স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক এজেন্ডার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামন্ততান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী শোষণ থেকে মুক্তি এবং সংবিধানিক গণতন্ত্রের পক্ষে প্রস্তাব ও কমিউনিস্টরা হাজির করেন। রুশ বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত কমিউনিস্টরা এভাবেই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে এক মৌলিক অবদান রেখে গিয়েছেন।

India’s Freedom Struggle and the Great November Revolution( Part-1)
২২ অগাস্ট,১৯০৭ সাল । জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে উপস্থিত ভারতের প্রতিনিধি মাদাম ভিকাজী কামা প্রথম ভারতের  ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা তুলে ধরেন। সেই সম্মেলনেই রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করে মাদাম কামা বলেন, " ...সমাজতন্ত্রই ন্যায়বিচারের সমার্থক… আমি বিশ্বাস করি, এমন একদিন আসবে যখন ভারত জেগে উঠবে এবং আমাদের রুশ কমরেডদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে...।” ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের শৃংখল থেকে যারা দেশকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন সেই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলন এবং রুশ বিপ্লব  অনুপ্রাণিত করেছিল, দিয়েছিল পথনির্দেশ।

মাদাম ভিকাজী কামা

রাশিয়ার মার্কসবাদী বিপ্লবীদের নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের কদর্য রূপ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত নিবন্ধ “Inflammable Material in World Politics”, এ লেনিন লিখলেন,  “In India lately the native slaves of the ‘civilised’ British capitalists have been a source of worry to their ‘masters’. There is no end to acts of violence and popular which go under the name of the British system of government in India. Nowhere in the world — with the exception, of course, of Russia - will you find such abject mass poverty, such chronic starvation among the people”। ১৯০৮ সালে যখন বালগঙ্গাধর তিলককে ছয় বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয় ব্রিটিশ সরকার। এর প্রতিবাদে বোম্বাইয়ের সুতাকল শ্রমিকরা ছ'দিনের ঐতিহাসিক ধর্মঘট সংঘটিত করলে তখন তাকে সমর্থন জানান লেনিন। তিলকের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করবার পাশাপাশি তিনি মন্তব্য করেন, "The class conscious workers of Europe now have Asiatic comrades and their number will grow by leaps and bounds." অর্থাৎ ভারতের শ্রমজীবী মানুষের শ্রেণী আন্দোলন বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা লেনিনকে উৎসাহিত করেছিল এবং তা যে একাধারে ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির সংগ্রামকে ও সারা বিশ্বে শোষণমুক্তির সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করবে এ বিষয়ে তিনি আশাবাদী ছিলেন।

এদিকে ব্রিটিশ শাসকের কাছে বলশেভিকবাদ ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ১৯০৫ সালে যখন প্রথম রুশ বিপ্লব সংগঠিত হয় তখনই চিন্তায় পড়েন এদেশের ব্রিটিশ শাসকরা। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন জার সাম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সামনে উদীয়মান বিপদের তুলনামূলক পর্যালোচনা করে সরকারি রিপোর্ট তৈরি করেন। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্যে এবং ভারতের মানুষের ওপর তার প্রভাবের ফলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ব্রিটিশ সরকার। ১৯১৮ সালে মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিপোর্টে লেখা হয়," The revolution in Russia(1917) was regarded in India as a triumph over despotism... It has given an impetus to Indian political aspirations" অর্থাৎ ভারতবর্ষের মানুষ রুশ বিপ্লবকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিজয় হিসেবে গণ্য করছেন এবং এর ফলে ভারতবর্ষের মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছে। রুশ বিপ্লব এযাবৎকাল সংঘটিত যেকোনো সামাজিক পরিবর্তনের থেকে ছিল মৌলিকভাবে পৃথক। কেননা এই প্রথম শোষিত শ্রেণীর মানুষ শাসকের মর্যাদায় উন্নীত হলেন। স্বভাবতই ভারতবর্ষের নিষ্পেষিত জনগণ রুশ বিপ্লবের মধ্যে তাদের মুক্তির দিশা খুঁজে পান।

সে সময় ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে অগ্রগণ্য লালা লাজপত রাই, বালগঙ্গাধর তিলক, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু সহ বিভিন্ন জাতীয় নেতৃবৃন্দ রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং জনজাগরণের প্রশংসা করেন। তিলকের সম্পাদিত "কেশরী" পত্রিকায় ১৯১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি লেনিনকে নিয়ে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। কার্ল মার্কসের ভাবনা নিয়ে ওই একই পত্রিকায় চর্চা করবার পর আশা প্রকাশ করা হয় যে "শ্রমিকরাই আগামী দিনে শাসন করবে"।

ব্রিটিশ সরকারের প্রকাশিত রিপোর্টে এ কথা উদ্বেগের সাথে উল্লেখিত হয়েছিল যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়  ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নেওয়া সৈনিকদের কাছ থেকে ভারতের গ্রামের মানুষও রুশ বিপ্লবের কথা শুনেছিলেন। উত্তর ভারত এবং পাঞ্জাব থেকে ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্য বাহিনীদের সদস্যদের এক বড় অংশের নিয়োগ হতো। রুশ বিপ্লবের পর যে গৃহযুদ্ধ হয়েছিল এখানে এদের একাংশ লাল ফৌজের সহযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ব্রিটিশ শাসকদের ভয় হয়েছিল যে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন হয়তো রুশ বিপ্লবের প্রভাবে আরো বেশি তীব্র হয়ে উঠবে। এ কথা ঠিক যে বিপ্লবের পর সোভিয়েত রাশিয়া বিভিন্ন ভারতীয় বিপ্লবীর গন্তব্যস্থল হয়ে ওঠে। ১৯১৫ সালে আফগানিস্তানের কাবুলে যে প্রবাসী ভারত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় তার কর্ণধার বিপ্লবী রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ, বরকাতুল্লাহ, ওবেইদুল্লা সিন্ধি, মার্কসবাদী চিন্তাবিদ বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমূখ মস্কো যান। লেনিন এবং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ঔপনিবেশিক দেশসমূহে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করবার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে।



ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত


১৯২০ সালে বাকুতে প্রাচ্যের দেশসমূহের শ্রমজীবী মানুষের যে ঐতিহাসিক সম্মেলন হয়েছিল তাতে ভারতবর্ষ সহ বিভিন্ন ঔপনিবেশিক দেশগুলির বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। লেনিন তার "জাতীয় ও উপনিবেশ বিষয়ক থিসিস" এর মাধ্যমে সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের সাথে উপনিবেশ গুলির মুক্তি সংগ্রামকে সংযুক্ত করেন। এর ফলে সারা পৃথিবীর উপনিবেশিকতা বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন নতুন দিশা ও গতি পায়। মানবেন্দ্রনাথ রায় উপনিবেশগুলিতে মুক্তি সংগ্রাম সম্পর্কিত নিজস্ব থিসিস পেশ করেন যাকে সংশোধন করে দেন লেনিন। লেনিনের থিসিস পড়ে আপ্লুত হয়ে ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের নেতা হো চি মিন লেখেন:  এই বই এক ভীষণ আবেগ, উৎসাহ, স্পষ্ট ধারণা ও আত্মবিশ্বাস আমার মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল। আমি আনন্দে আপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেললাম। নিজের ঘরে একা বসে আমি যেন এক বিরাট জনতাকে উদ্দেশ্য করে উদাত্ত কণ্ঠে বলে উঠলাম," শহীদ সাথীরা! আমাদের যা প্রয়োজন তা আমরা পেয়েছি, এই আমাদের মুক্তির পথ"। যে সকল বিপ্লবী সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তারা লেনিনের দেখানো পথে ঔপনিবেশিকতা বিরোধী সংগ্রামকে শক্তিশালী করবার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এই সংগ্রামের পথনির্দেশ করতে গিয়ে লেনিন মূলত তিনটি বিষয় উল্লেখ করেন-১) উপনিবেশগুলির বিপ্লবীদের শ্রমিক শ্রেণীর নিজস্ব বিপ্লবী পার্টি গড়ে তুলতে হবে ২) উপনিবেশগুলির সমস্ত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তির সাথে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বুর্জোয়ারাও থাকবেন ৩) এই জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অক্ষ হবে শ্রমিক- কৃষক মৈত্রী। ১৯২০ সালে তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠিত হয়।

বলশেভিক বিপদের আতঙ্কগ্রস্ত ব্রিটিশ সরকার অতি দ্রুত মার্কসবাদী বিপ্লবীদের কারাবন্দি করবার কাজ শুরু করে দেয়। ১৯২২-২৩ সালে লাহোর ও পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দী করা হয় দেশপ্রেমিক কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের।এরপর ১৯২৪ সালে কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা এবং ১৯২৯ সালের ঐতিহাসিক মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা কমিউনিস্ট এবং ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় যাতে এদেশের শ্রমজীবী মানুষ সমাজতন্ত্রের আদর্শে প্রভাবিত হতে না পারেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলন দেশের শ্রমিক কৃষকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত গণ আন্দোলনের রূপ ধারণ করতে না পারে। ব্রিটিশ শাসকেরই লাগাতার আক্রমণের সুবাদে সুসংহত কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করবার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়েছিল এটা ঠিকই কিন্তু কমিউনিজমের মতাদর্শের অগ্রগতি এবং মেহনতী মানুষের আন্দোলনের বিস্তারকে ব্রিটিশ সরকার স্তব্ধ করতে পারেনি।

১৯২০ সালে সারা ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতির ভাষণে লালা লাজপত রাই বলেন," সাম্রাজ্যবাদ এবং সমরবাদ পুঁজিবাদের দুই সন্তান, এরা একের মধ্যে তিন এবং তিন এর মধ্যে এক। " আমাদের দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন রুশ বিপ্লবের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।  শ্রমজীবী মানুষ তাদের উন্নত শ্রেণী চেতনার সুবাদে এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রথম ব্রিটিশ শাসন থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের ডাক দেন। তাদের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯২১ সালে আমেদাবাদে কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব পেশ করেন কমিউনিস্ট হসরত মোহানি ও তার সহযোগী স্বামী কুমারানন্দ। ১৯২২ সালে গয়া অধিবেশনে পুনরায় পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দেন কমিউনিস্ট সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার ও শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে। এর সাথে সাথে জমিদারি প্রথা বিলোপ, বৃহৎ শিল্পের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, কারখানায় শ্রমিকদের কমিটি গঠন ইত্যাদি প্রস্তাব পেশ করেন কমিউনিস্টরা এবং তার সাথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে এদেশে প্রথম সাংবিধানিক সভা বা কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলির প্রস্তাব উত্থাপন করেন কমিউনিস্টরা। অর্থাৎ স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক এজেন্ডার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামন্ততান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী শোষণ থেকে মুক্তি এবং সংবিধানিক গণতন্ত্রের পক্ষে প্রস্তাব ও কমিউনিস্টরা হাজির করেন। রুশ বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত কমিউনিস্টরা এভাবেই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে এক মৌলিক অবদান রেখে গিয়েছেন।

লালা লাজপত রায়

পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে কমিউনিস্টরা অনড় ছিলেন এবং কংগ্রেসের অভ্যন্তরে এর স্বপক্ষে জনমত সংহত করতে নিরলস চেষ্টা তারা চালিয়ে যান। ১৯২৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনে ৫০ হাজার শ্রমিকের জমায়েত করে কমিউনিস্টরা পুর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে পুনরায় আওয়াজ তোলেন। শেষমেশ ১৯২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর লাহোর অধিবেশনে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণ করে জাতীয় কংগ্রেস।
প্রকাশ: ০৮-নভেম্বর-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 06-Nov-26 18:37 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/india’s-freedom-struggle-and-the-great-november-revolution-part-1 - exists in postID 32350
Categories: Fact & Figures
Tags: november revolution, octoberrevolution
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড