অপরাধের পশ্চিমবঙ্গ: এক দশকের বিশ্লেষণ

কেন দুষ্কৃতী বললাম না? কারণ, এই বোমাটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, ঐ ওপরে লিখেছি, ‘হুসেনের মেয়ে’, হুসেন সিপিআই-এম করেন, অতএব তার মেয়েকে, ‘ঝেড়ে দে’, এটা আগাপাশতলা রাজনৈতিক অপরাধ।


এবার একটা প্রশ্ন, আপনি এতদূর এসে করতেই পারেন- এদের পিশাচ কেন বলছেন?
দেখুন, রাস্তায় আপনার কাউকে দেখে ভালো লাগতেই পারে, কিন্তু তাহলেই কি আপনি তাকে সহবাসের প্রস্তাব দিতে যান? বা ধর্ষণ করতে যান? পটকা ফাটান যখন (পেটো নয়, সকেট নয়, আমি পটকা দিয়েই উদাহরণ দিই), আপনি সুস্থ মস্তিষ্কে আপনার চরমতম শত্রুর শিশু সন্তানের বুকে ছুঁড়ে মারতে পারবেন?
পারবেন না। কেন বলুন তো? এটা আপনার মস্তিষ্কের স্নায়ু, স্নায়ুর গঠন এবং রসায়নের মধ্যেই আছে। মনস্তত্ত্ববিদরা মনের বিকৃতি, মনের অস্বাভাবিকতার অংশটা অনেক বিশদে বলতে পারবেন, জীববিজ্ঞানের, স্নায়ুবিজ্ঞানের দিকটা আমি বলতে পারি।
আমাদের মস্তিষ্কের অনেকগুলো অংশের একটা সমন্বয় কাজ করে আমাদের আটকানোর জন্য, কাউকে হত্যা করা থেকে, ধর্ষণ করা থেকে আটকাতেও এই অংশগুলো কাজ করে- শরীরস্থানগত বিশদে না গিয়েও এইটুকু বলা যায়, এই অংশগুলোর অস্বাভাবিকত্বের সাথে ধর্ষণ জাতীয় অপরাধের একটা যোগাযোগ থাকা অসম্ভব নয়।
২০১৬ সালের বিএমসি নিউরোসায়েন্স জার্নালে চেন এবং অন্যান্যরা একটা চেষ্টা করেছেন ইমেজিং এর মাধ্যমে এই ধরণের অপরাধীদের মস্তিষ্কের গঠনের অস্বাভাবিকত্ব দেখার জন্য। তাঁরা কিছু রেজাল্ট পেয়েওছেন এই ইনহিবিটরি সেন্টার, অর্থাৎ মস্তিষ্কের যে অংশ আমাদের বারণ করে, সেই অংশের গঠনগত অস্বাভাবিকত্বে।
মানুষের মস্তিষ্কের গঠনের পেছনে জিনের প্রভাব থাকে, এটা আপনারা জানেন। এবার ক্লাসিক্যাল জেনেটিক্স থেকে যেরকম আমরা জানি, যে বাবা-মায়ের জিনের গুণাবলী সন্তানের মধ্যে প্রবাহিত হয় সংখ্যাতত্ত্বের নিয়ম মেনে, ঠিক সেরকমই আরেকধরণের বৈশিষ্ট্য থাকে (নন-ক্লাসিক্যাল/নন-মেন্ডেলিয়ান), যেগুলোকে বলে এপিজেনেটিক বৈশিষ্ট্য। এপি অর্থাৎ ওপর- জিনের ওপরে বেশ কিছু কেমিক্যাল পরিবর্তন সাধিত হয় আমাদের খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ, অভিজ্ঞতা এসবের দ্বারা (মিথাইলেশন/অ্যাসিটাইলেশন/ডিঅ্যাসিটাইলেশন প্রভৃতি) আপনি যদি জিনকে মনে করেন হার্মোনিয়াম। তাহলে একটা সুর বানাতে গেলে নির্দিষ্ট যে স্বর পরপর বাজে, সেই ক্রম ঠিক করে দেয় এই এপিজেনেটিক্স। আপনি কোন সুর বাজাবেন, এটা যেমন আপনার শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল (নিশ্চয়ই সদ্য পিয়ানো শিখছে যে, সে ভি বালসারার মত বাজাবে না), এই এপিজেনেটিক মডিফিকেশনসও সেরকম।
বিভিন্ন স্নায়ুবৈচিত্র্যে এই এপিজেনেটিক সিগনেচার পাওয়া যায়। পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে যেরকম এই যোগাযোগ খুব স্পষ্ট। কিন্তু আমরা অপরাধের সাথে এই যোগাযোগের ব্যাকরণটা এখনো স্পষ্টভাবে জানি না- অন্ততঃ যেটুকু জানা, তাতে নীতি তৈরী করা দূরস্থান। তবে, এখনো অবধি পাওয়া প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে এটুকু বলা যায় খাবার, পরিবেশ, অভিভাবকদের আচরণ, হিংসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুযোগ- সবকিছুর ওপরেই একটা শিশুর সুস্থ, স্বাভাবিক বিকাশ নির্ভর করে। যে শিশুর জন্ম হচ্ছে কামানের গোলার আওয়াজে, আপনার মনে হয়, তার মস্তিষ্ক খুব আরামে থাকবে ভবিষ্যতে?
আসলে, মস্তিষ্ক, মস্তিষ্কের গঠন, তার কোষ-কলা, তার রসায়ন, তার স্নায়ুতন্ত্র এবং তদজনিত মন, মনের চলন- এগুলোকে দুম করে দাগিয়ে দেওয়াটা কঠিন। অপরাধের সাথে স্নায়ুতন্ত্র-জেনেটিক্স-এপিজেনেটিক্সের সংযোগ নিয়ে গবেষণা অত্যন্ত জরুরি এবং ইন্টারেস্টিং হলেও এই গবেষণা খুব সতর্কতার সাথে করতে হয়। মানুষ জাতির মধ্যে চিন্তাভাবনার বৈচিত্র্য, বহু বর্ণিল সমাজের যে উৎসব, তাকে উদযাপন করতে গেলে, আমাকে এই বৈচিত্র্য স্বীকার করতেই হবে। আজকে যারা ধর্মের নামে দাগিয়ে দিতে চায়, লিঙ্গের নামে পীড়ন চালায়- তারা কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক তথ্যটাকেই অস্বীকার করে।
কিন্তু অপরাধ, অপরাধই। অপরাধ কোন স্নায়ুবৈচিত্র্যের (neurodivergence) কথা বলে পার পাবে না। কলেজছাত্রীর ধর্ষণ, তামান্নার খুন এগুলোর ছত্রে ছত্রে যেটা উঠে এসেছে, সেটা হচ্ছে ঘৃণা, সংখ্যালঘুর প্রতি ঘৃণা। তামান্না শিশু, পরিবারগতভাবে ধর্মে সংখ্যালঘু, অতএব তাকে ঝেড়ে দেওয়াই যায়। ল’ কলেজের ছাত্রীটি নারী (তৃণমূলের লোকেরা অবশ্য এত সুসভ্য ভাষা ব্যবহার করে না), জুনিয়র- তাকে ধর্ষণ করাই যায়।
এই ধরণের অপরাধের মোকাবিলার জন্য পুলিশকে সক্রিয় হতে হবে-বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত এবং এফেক্টিভ হতে হবে, বিচারের সুযোগ যাতে দরিদ্রতম অংশ পর্যন্ত পৌঁছোয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে- এগুলো আমরা জানিই। এর সাথে আমাদের দেশের দরিদ্রতম অংশের শিশু যেন অভুক্ত না থাকে, বিনা চিকিৎসায় যাতে মরে না যায়, তার অভিভাবকদের যাতে সংস্থান দেওয়া যায় সুস্থ জীবনযাপনের- এই দাবিগুলো ভারতবর্ষে বামপন্থীরাই করে এসেছে। সোভিয়েত উত্তর জমানায় যখন নব্য উদারনীতিবাদী মিডিয়া এবং তাদের উলঙ্গ চামচারা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে, ‘সব কিছুর দাম হয়, everything has a price’, সেখানে দাঁড়িয়ে সিপিআই(এম) সহ বামপন্থী দলগুলো চিৎকার করে বলছে খাদ্য-স্বাস্থ্য-শিক্ষা-কাজের দাবি, রোটি-কাপড়া-মকান-বিজলী-সড়ক-পানি। এগুলো মৌলিক অধিকার।
আমরা, কমিউনিস্টরা কোনও অপরাধকে কখনো কোনওদিন আলাদা কোন আধিভৌতিক, পরাবাস্তবতা হিসেবে দেখি না।
আমরা দেখি আর্থসামাজিক কাঠামোর একটা একেকটা প্রকাশ হিসাবে।
অলমিতি।
প্রকাশ: ৩০-জুন-২০২৫
শেষ এডিট:: 04-Jul-25 06:20 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/crime-in-west-bengal-analysis-of-a-decade
Categories: Current Affairs
Tags: #tmcjungleraj, democraticright, violence against women, crimeagainstwomen
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (150)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (134)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)

.jpg)



