সাম্রাজ্যবাদের অন্ধগলি থেকে বেরোনোর কৌশল

Author
প্রভাত পট্টনায়ক

শ্রমজীবী মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশ খরচ করে ফেলে, কিন্তু যারা উদ্বৃত্তের মালিক, তারা তা করে না। তাই উদ্বৃত্তের ভাগ বাড়লে উৎপাদনের তুলনায় ভোগের চাহিদা কমে যায়, সামগ্রিক চাহিদাও কমে। এর পরিণতি হল অতিউৎপাদনের প্রবণতা, যা দেখা দেয় অর্থনৈতিক স্থবিরতা আর বেকারত্বের মধ্য দিয়ে — যদিও সেই বেকারত্বকে অনেক সময় লুকিয়ে রাখা হয় শ্রম-বাজারে অংশগ্রহণের হার কমিয়ে দেখানোর মাধ্যমে।

Strategies to Escape the Dead End of Imperialism

 
নব্য-উদারবাদ, বিশ্ব পুঁজিবাদকে একটা অন্ধগলিতে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। কারণটা সহজ। নব্য-উদারবাদের মূল বৈশিষ্ট্য হল উত্তরের দেশগুলো থেকে উৎপাদন দক্ষিণের দেশগুলোতে সরিয়ে নেওয়া। এর ফলে উত্তরের দেশগুলোতে মজুরি কম থাকে, কারণ সেখানকার শ্রমিকদের এমন শ্রমিকদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হয় যারা অনেক কম মজুরি পান। কিন্তু উৎপাদন সরে যাওয়ার কারণে দক্ষিণের দেশগুলোর বিপুল শ্রম-সম্ভারও শেষ হয়ে যায় না, কারণ নব্য-উদারবাদের আমলে সেখানে শ্রমের উৎপাদনশীলতা এত দ্রুত বাড়ে যে দক্ষিণের শ্রমিকদের মজুরি তলানিতেই পড়ে থাকে। ফলে সারা দুনিয়া জুড়েই শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়লেও বাস্তব মজুরি তেমন বাড়ে না। আর তাই সামগ্রিক উৎপাদনে উদ্বৃত্তের ভাগ বাড়তে থাকে — বিশ্ব অর্থনীতিতেও, প্রতিটি দেশেও।

এখন শ্রমজীবী মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশ খরচ করে ফেলে, কিন্তু যারা উদ্বৃত্তের মালিক, তারা তা করে না। তাই উদ্বৃত্তের ভাগ বাড়লে উৎপাদনের তুলনায় ভোগের চাহিদা কমে যায়, সামগ্রিক চাহিদাও কমে। এর পরিণতি হল অতিউৎপাদনের প্রবণতা, যা দেখা দেয় অর্থনৈতিক স্থবিরতা আর বেকারত্বের মধ্য দিয়ে — যদিও সেই বেকারত্বকে অনেক সময় লুকিয়ে রাখা হয় শ্রম-বাজারে অংশগ্রহণের হার কমিয়ে দেখানোর মাধ্যমে। আমেরিকার আবাসন বুদবুদ ফেটে যাওয়ার পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে ঠিক এটাই হচ্ছে।
তবে এই স্থবিরতা আর বেকারত্ব নিজেরাই গলিপথের চিহ্ন নয়। আসল সংকট হল এই যে রাষ্ট্র এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর জন্য তেমন কিছু করতে পারে না। কেইনসিয়ান সমাধান — যাকে এ জাতীয় সব পরিস্থিতির মহৌষধ বলে ধরা হত — নব্য-উদারবাদের আমলে একেবারে অকার্যকর।

কারণটা এই: রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়িয়ে সামগ্রিক চাহিদা বাড়াতে হলে, সেই ব্যয়ের অর্থ আসতে হবে হয় রাজকোষ ঘাটতি থেকে, নয়তো ধনীদের উপর কর থেকে। যদি শ্রমজীবীদের উপর কর বাড়িয়ে সেই অর্থ জোগাড় করা হয়, তাহলে সামগ্রিক চাহিদায় তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। ধরা যাক, ১০০ ডলার রাষ্ট্রীয় ব্যয় যদি শ্রমজীবীদের উপর ১০০ ডলার কর চাপিয়ে মেটানো হয়, তাহলে চাহিদার মোট পরিমাণ একই থাকে — শুধু ধরন বদলায়, শ্রমিকের ভোগ থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে সরে যায়। স্থবিরতা আর বেকারত্বের কোনো সুরাহা হয় না।
কিন্তু অর্থ-পুঁজি, রাজকোষ ঘাটতি এবং ধনীদের উপর কর — এই দুটোরই বিরোধী। আর নব্য-উদারবাদের আমলে অর্থ-পুঁজি যেহেতু দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিস্তৃত, রাষ্ট্র কিন্তু জাতীয় সীমার মধ্যেই আটকে থাকে। তাই রাষ্ট্রকে অর্থ-পুঁজির কথামতো চলতে হয়, নইলে পুঁজি দেশের বাইরে পালিয়ে যাবে, সংকট তৈরি হবে। অর্থাৎ নব্য-উদারবাদ নিজেই যে সংকট তৈরি করেছে, রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তার একমাত্র সম্ভাব্য সমাধানের পথটা নব্য-উদারবাদই বন্ধ করে রেখেছে। এটাই হচ্ছে কানাগলি — নব্য-উদারবাদ এমন একটা সংকট তৈরি করেছে যা নব্য-উদারবাদের ভেতর থেকেই সমাধান করা সম্ভব নয়।

এই গলিপথ থেকে বেরোনোর জন্য পুঁজিবাদ এ পর্যন্ত যা করেছে তা হল নব্য-ফ্যাসিবাদের প্রসার ঘটানো — কর্পোরেট জগত আর ফ্যাসিস্ট রাজনীতির হাত মেলানো। এই জোট ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের ‘অপর’ করে, তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে একটা বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করে। এর মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষকে বিভক্ত রাখা যায়, আর একচেটিয়া পুঁজির আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ করার সম্ভাবনা থাকে না।
কিন্তু নব্য-ফ্যাসিবাদ চিরকাল অর্থনৈতিক প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারে না। একটা না একটা সময়ে তাকে অর্থনৈতিক কর্মসূচি দিতেই হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্পষ্টতই এমন একটা কর্মসূচি আছে।

উদারপন্থী মহল বলে: কোনো সংকট নেই; সংকটের সাথে ট্রাম্পের মতো নব্য-ফ্যাসিস্টদের উত্থানের কোনো যোগ নেই; এবং ট্রাম্পের কাজকর্ম নিছক একজন অস্থির মাথার মানুষের কাণ্ড। কিন্তু ট্রাম্প স্থিরচেতা কিনা সে প্রশ্ন এখানে মূল নয়। প্রশ্ন হল, নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদ যে গলিতে আটকা পড়েছে তার আলোকে আমরা তার কাজকর্মকে কীভাবে দেখব।
ট্রাম্পের কৌশল হল আমেরিকাকে নব্য-উদারবাদী ব্যবস্থার বাইরে বের করে আনা, কিন্তু দক্ষিণের দেশগুলোকে সেই ব্যবস্থার মধ্যেই আটকে রাখা। শুল্ক আগ্রাসন এবং ভারতের মতো দেশগুলোর উপর চাপিয়ে দেওয়া বাণিজ্য চুক্তি থেকে এটা স্পষ্ট। ভারতের সাথে প্রস্তাবিত চুক্তিতে বলা হচ্ছে, আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের উপর আগের চেয়ে বেশি শুল্ক নেবে, কিন্তু ভারত আমেরিকান পণ্যের উপর শুল্ক অনেক কমাবে। শুধু তাই নয়, ভারতকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ মার্কিন পণ্য কিনতেও বাধ্য থাকতে হবে।
‘বাজার’-কে দেবতা মানা নব্য-উদারবাদের দৃষ্টিতে এই ধরনের আমদানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ আদর্শবিরোধী। অর্থাৎ ট্রাম্প আমেরিকার ক্ষেত্রে নব্য-উদারবাদ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমেরিকা কতটা ভারতীয় পণ্য কিনবে তার কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই — সেটা ‘বাজারের’ উপর ছেড়ে দেওয়া। এই বাণিজ্য চুক্তির সারকথা হল, আমেরিকা নব্য-উদারবাদী নিয়ম মানবে না, কিন্তু ভারতকে মানতে হবে। ভিন্ন শুল্কহারের মাধ্যমেও এটাই বলা হচ্ছে — ভারত আমেরিকার পণ্যের জন্য দরজা খুলে দেবে, কিন্তু আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের বিরুদ্ধে শুল্ক দিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখবে।

এই বাণিজ্য কৌশলের উদ্দেশ্য হল ভারত ও দক্ষিণের অন্যান্য দেশ থেকে কিছু অর্থনৈতিক কার্যক্রম আমেরিকায় ফিরিয়ে আনা। একটু খোলসা করে বললে, আমেরিকার স্থবিরতা আর বেকারত্বের বোঝা দক্ষিণের দেশগুলোর উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা।
এই ধরনের অসম চুক্তি ঔপনিবেশিক আমলের কথা মনে করিয়ে দেয়। ট্রাম্পের কৌশল আসলে ঔপনিবেশিক পরিস্থিতির পুনরুৎপাদন, অথবা দুনিয়াকে ফের উপনিবেশায়িত করার প্রচেষ্টা। দক্ষিণের দেশগুলোর খনিজ সম্পদ — বিশেষত তেল — দখলের আমেরিকান তৎপরতাকেও একইভাবে দেখতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিক ঔপনিবেশিকতার অবসান হয়েছিল; তারপর শুরু হয়েছিল আরও কঠিন অর্থনৈতিক উপনিবেশ-মুক্তির লড়াই — নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে পাওয়ার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের সাফল্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনের ভূমিকা ছিল বড়। নব্য-উদারবাদ সেই সাফল্যকে উলটে দেওয়া শুরু করেছিল; ট্রাম্পের কৌশল সেই কাজ সম্পূর্ণ করতে চাইছে। ভেনেজুয়েলার উপর (যেখানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলের ভাণ্ডার) এবং ইরানের উপর আমেরিকার আক্রমণ এই লক্ষ্যেরই অঙ্গ।
এই প্রচেষ্টাই ব্যাখ্যা করে কেন আমেরিকা আন্তর্জাতিক নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে। অবশ্য নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও পুনর্উপনিবেশায়নের চেষ্টা চলে — নব্য-উদারবাদী ব্যবস্থাটাই ছিল সেরকম। কিন্তু আমেরিকায় (এবং উত্তরের অন্যান্য দেশে) নব্য-উদারবাদ ছেড়ে বেরিয়ে আসার সাথে সাথে দক্ষিণের দেশগুলোতে তা চালিয়ে যেতে হলে, নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে বাতিল করে দেওয়া ছাড়া সাম্রাজ্যবাদের কোনো উপায় নেই।
কিন্তু নব্য-উদারবাদের গলিপথ থেকে বেরোনোর এই সাম্রাজ্যবাদী কৌশল একই সাথে এটাও জানান দেয় যে এই ব্যবস্থা সকলের জন্য সুফল বয়ে আনার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে। এটা মোটের উপর স্বীকারোক্তি যে এই ব্যবস্থার পক্ষে সবার জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়াও এখন আর সম্ভব নয়। কিছু দেশ নব্য-উদারবাদের বাইরে যেতে পারবে, কিন্তু কেবল অন্য দেশগুলোকে তার আরও গভীর দাসত্বে ঠেলে দেওয়ার শর্তে।

এখন সঙ্গত প্রশ্ন ওঠে: দক্ষিণের দেশগুলোর সরকার এই ধরনের অসম চুক্তিতে রাজি হয় কেন? উত্তর হল, এই পুনর্উপনিবেশায়নের ফলে দক্ষিণের শ্রমজীবী মানুষ, ক্ষুদ্র উৎপাদক, এমনকি ছোট পুঁজিপতিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে — ভারতের ক্ষেত্রে ইন্দো-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বিশেষভাবে কৃষকদের ক্ষতি করবে — কিন্তু মহানগরীয় পুঁজির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত এই দেশগুলোর একচেটিয়া বুর্জোয়া শ্রেণীর ক্ষতি হবে না, বরং তারা লাভবান হতে পারে। আর দক্ষিণের দেশগুলোর সরকার — বিশেষত নব্য-ফ্যাসিস্ট সরকারগুলো — সেই শ্রেণীর স্বার্থই দেখে। অর্থাৎ পুনর্উপনিবেশায়ন সম্ভব হচ্ছে কারণ উপনিবেশ-মুক্তি এনেছিল যে শ্রেণী-জোট, তা ভেঙে গেছে।



পিপলস ডেমোক্রেসী ২৭শে এপ্রিল – ৩রা মে ২০২৬
প্রকাশ: ০৩-মে-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 03-May-26 03:02 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/Strategies_to_Escape_the_Dead_End_of_Imperialism
Categories: Fact & Figures
Tags: imperialism
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড