চা বাগানের কিস্যা

Author
কুশল ভট্টাচার্য

একজন চা-শ্রমিকের জীবনের মূল্য তার উৎপাদিত ‘চা’-র চাইতে কম হবে না।

Tea Garden of West Bengal: A Report

উত্তরবঙ্গের শান্ত সবুজ ছায়াঘেরা চা-বাগান, পাহাড়ের ঢালে সবুজ কার্পেটের মত বিছিয়ে থাকা দুটি পাতা একটি কুঁড়ির চা বাগান শহুরে পর্যটক বা ক্যামেরাশিল্পীর কাছে যতই আকর্ষণীয় এবং নয়নাভিরাম হোক না কেন, পাহাড়-সমতল নির্বিশেষে শ্রমিকের কঙ্কালসার দেহ, আর ক্ষুধার্ত চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, উত্তরবঙ্গের পাহাড়-তরাই-ডুয়ার্সের এই ‘সোনালি তরলের সোনালী অধ্যায়’ আসলে লিখিত হয়েছে শোষণ আর বঞ্চনার রক্তাক্ত অক্ষরে। বাগানের হালহকিকতের তথ্যসূত্রগুলি সে ইতিহাসেরই নির্মম দলিল। এখানকার চা-বাগান আসলে বৃহৎ বুর্জোয়ার নেতৃত্বে বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্র ব্যবস্থার বোঝাপড়া হিসাবে টিকে রয়েছে। এ বন্দোবস্তে রয়েছে শ্রমশক্তির যথেচ্ছ শোষণ ও উদ্বৃত্ত মূল্যের চুরি।

ইতিহাসের পাতা থেকে, ঔপনিবেশিক শোষণের উত্তরাধিকার

লুটেরা অর্থনীতির উপর নির্ভর করেই ডুয়ার্স ও তরাইয়ের চা-বাগানগুলির জন্ম হয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এদেশে যে ব্যবস্থা চালু করেছিল, তা ছিল মূলত বাগানকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কারাগারে পরিণত করা। এ ব্যবস্থার প্রাথমিক ভিত্তিই ছিল ভাগ-চাষি প্রথা, যেখানে শ্রমিকদের নামমাত্র মজুরি ও অতি নগণ্য ভাতার বিনিময়ে বাগানের মধ্যেই জীবন বাঁধা থাকত। এ ছিল এক বাঁধা শ্রম ব্যবস্থা, যা সামন্তবাদী উৎপাদন সম্পর্কের অবশেষ। বাগান মালিকানার এস্টেট ব্যবস্থা শ্রমিককে জমি থেকে, তার শ্রমজাত ফসল থেকে এবং শেষ পর্যন্ত তার নিয়ন্ত্রণ থেকেও বিচ্ছিন্ন করে দেয়। শ্রমিক শুধু নিজের শ্রমশক্তি বিক্রি করত না, একই সাথে তাদের সন্তান-সন্ততির ভবিষ্যতের শ্রমশক্তিও বাঁধা পড়ত।

মূলত বাম শ্রমিক সংগঠনগুলির দীর্ঘ কঠিন লড়াই সংগ্রামের ফলে অতি ধীরে ধীরে শ্রমিক তথা বাগান কর্মীদের সামান্য কিছু প্রাথমিক সুযোগ সুবিধা যেমন বাগানের নিজস্ব প্রাইমারি স্কুল ও হেলথ সেন্টার, জ্বালানী, বিদ্যুৎ ইত্যাদি মালিকপক্ষের থেকে আদায় করা সম্ভব হয়েছিল।

আজকের সংকট: বেঁচে থাকার সংগ্রাম

ঐতিহাসিকভাবেই চা বাগান ব্যবসা কখনোই সরকারি নিয়ন্ত্রণে বা মালিকানায় ছিল না, ব্রিটিশ মালিকদের হাত থেকে সরাসরি ভারতীয় মালিকদের হাতে এসেছে। কিন্তু বিগত ৩০/৩৫ বছরে সেই মালিকদের চরিত্রগত পরিবর্তন হয়েছে, বাগান হাত বদল হতে হতে এখন মূলত ছোট পুঁজিপতিদের হাতে, একটা বড় অংশের বাগান কিছু বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে, যেখানে উৎপাদন থেকে মার্কেটিংয়ের গুরুত্ব বেশি এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব আশঙ্কা করছেন খুব দ্রুত এ সমস্ত মালিকদের হাত থেকে বাগান সম্পূর্ণভাবেই কর্পোরেট মালিকানায় হস্তান্তরিত হবে।

বর্তমানে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ‘রোজ ভাতা’ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি যেখানে ২৫০ টাকার কাছাকাছি, সেখানে অনেক বাগানে তা ১২৫ থেকে ১৫০ টাকাতেই আটকে রয়েছে। এ শুধু একটি সংখ্যা নয়, এ হল শোষণের নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ। একটি শ্রমিক পরিবার যদি মাসে ২০ দিন কাজ পায়, তাহলে তাদের আয় দাঁড়ায় মাত্র ৩,০০০ টাকা। এমন মজুরি নিরঙ্কুশ দারিদ্রেরও নিচে। এটি শ্রমশক্তির মূল্য-কে (value of labour power) বজায় রাখার জন্য জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ও পূরণ করে না। ফলাফল- অপুষ্টি, কৃমি, টিবি, আর অন্যান্য রোগে ভোগা একটি বিরাট জনগোষ্ঠী। পাহাড় ও ডুয়ার্সের চালু বাগানগুলোতে এই মুহূর্তে স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ৪ লক্ষের বেশি, অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যার হিসাব পাওয়া মুশকিল এবং দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ বাগানগুলিতে শ্রমিকের সংখ্যার ধারণা করা এই মুহূর্তে যথেষ্ট জটিল। এদের গড় আয়ু রাজ্যের গড়ের চেয়ে বহুগুণ কম।

ResearchGate-এ প্রকাশিত “Out-migration from tea gardens and its cause and effect” গবেষণাপত্রটি এ সংকটের এক ভয়ঙ্কর পরিণতি নির্দেশ করে। যখন স্থানীয়ভাবে শোষণের মাত্রা সহ্যের সীমা অতিক্রম করে, তখন শ্রমিকরা সাপ্লাই চেইন অফ লেবর-এর শিকার হয়। স্থানীয় বাগান মালিক ও ঠিকাদার শ্রেণির হাত থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে আবারও দালাল ও শহুরে পুঁজিপতিদের হাতে আটকে পড়ে। পুরুষ শ্রমিকরা কাজের খোঁজে পাড়ি জমান অন্য রাজ্যে, মহিলারা অত্যন্ত কম মজুরির বিভিন্ন অস্থায়ী কাজের দিকে ঝুঁকে পড়েন । এর উপর উত্তরের বাগানগুলো থেকে নারী ও শিশু পাচারের সমস্যা রয়েছে। এই মুহূর্তে শ্রমিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর কাছে যা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়, বিশেষত এই দুষ্কর্মে পুলিশ প্রশাসনের তরফে নীরব সহায়তার ইঙ্গিত যথেষ্ট স্পষ্ট। এতে শোষণের এক নতুন মাইগ্রেশন চেইন তৈরি হয়েছে, যেখানে বাগানের কেন্দ্রীভূত শোষণ ক্রমশ বিকেন্দ্রীভূত ও ব্যক্তিগত শোষণে রূপান্তরিত হচ্ছে।

এই হল লুটেরা পুঁজিবাদের এক স্বাভাবিক প্রকৃতি— একটি এলাকাকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে নিঃশেষ করে দিয়ে পরের এলাকার দিকে ছুটে চলা।

কাঠামোগত সমস্যা

চা-বাগানের এমন দুরবস্থা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এ এক সচেতন, সংগঠিত পরিস্থিতি।

এর মূল কারণগুলির অন্যতম হল চা বাগান পরিচালনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা। একদিকে শ্রম আইন, ন্যূনতম মজুরি আইন, পিএফ, এসিটি-র মতো নিয়মকানুন, অন্যদিকে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও মালিকপক্ষের সাথে আঁতাত ঐ সকল আইনগুলিকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে। বাগান মালিকেরা প্রায়শই দেউলিয়া হওয়ার বা বাগান বন্ধ করার হুমকি দিয়ে রাষ্ট্রকে চাপে রাখে। বাগান বন্ধ করে রেখে শ্রমিক-কর্মচারিদের জমা থাকা প্রভিডেন্ড ফান্ডের অর্থ সরিয়ে ফেলার ঘটনাও আকছার হয়ে চলেছে। এসবই হল পুঁজির স্বার্থ রক্ষা। রাষ্ট্র যখন শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির পক্ষে জোরালো ভূমিকা নেয় না, তখন পুঁজির স্বার্থকেই সুরক্ষিত রাখা হয়। এতেই রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্র স্পষ্ট হয়ে যায়।

বামপন্থী শ্রমিকসংগঠনগুলির নেতৃত্বে উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলির শ্রমিক সংগঠনসমূহের যৌথমঞ্চ সরকারকে চাপ দিয়ে বিভিন্ন দাবিদাওয়াকে সামনে রেখে ত্রিপাক্ষিক- শ্রমিক, মালিক ও সরকার, সকলের পক্ষ থেকে ৮ জন করে প্রতিনিধিকে বৈঠকের টেবিলে এনেছিল। অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বাগানের স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা। বহু তর্কবিতর্কের পর ২০১৮=তে ত্রিপাক্ষিক অ্যাডভাইসরি কমিটি, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত করে রাজ্য সরকারকে সুপারিশ করা স্বত্বেও আজ অবধি সরকারি ঘোষণা হয়ে ওঠেনি। এর ফলে প্রতিবছর মজুরি ও নির্দিষ্ট বোনাস নিয়ে সমস্যা চলছেই।

শোষণ মুক্তির সম্ভাব্য রূপরেখা

চা বাগান ও শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে অনেকেই বহু আলোচনা করেছেন। এমন গভীর সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসাবে উৎপাদন সম্পর্কের কিছু পরিবর্তনের কথাও ভাবা চলে।

বন্ধ ও রুগ্ন বাগানের জমি ও কারখানা শ্রমিকদের সমবায় গঠন করে তার হাতে দেওয়া যেতে পারে। Tea board’র মত প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারি নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তাদের সিদ্ধান্ত নেবার মত অবস্থান থাকবে। বাগান শ্রমিক ও কর্মচারীদের শুধু মজুরি নয় বরং শ্রমিকদের বাসস্থানের পাট্টা প্রদান করতে হবে, যার মাধ্যমে তারা সরকারি আবাস যোজনা প্রকল্পে নিজস্ব পাকা বাড়ি পাবেন। তাদের স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা তথা বাগানে স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও স্থায়ী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীর নিয়োগ বাধ্যতামূলক হতে হবে। পরিশ্রুত পানীয়জল এবং নিকাশির উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার জন্য প্রতিটি বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বাধ্যতামূলকভাবে স্থাপন করতে হবে। উক্ত পদক্ষেপগুলি সরাসরি সরকারি তত্ত্বাবধানে করতে হবে। এ কোন দায়মাত্র নয়, সরকারকে বুঝতেই হবে এ হল তারই দায়িত্ব। এ কাজে অর্থায়নের একটি বড় অংশের বন্দোবস্ত করতে হবে বাগান থেকে প্রাপ্ত মুনাফার একটি অংশ থেকেই।

চা’র মত একফসলি অর্থনীতির উপর নির্ভরতা কমিয়ে বাগানের ভেতরে রয়ে যাওয়া অব্যবহৃত জমিতে সবজি চাষ ও পশুপালনের ব্যবস্থা শ্রমিক পরিবারগুলির জন্য বিকল্প পেশা, অতিরিক্ত আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এমন বন্দোবস্ত খাদ্য নিরাপত্তার বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। বাজারে চা এর দর কমলে শ্রমিকদের অসহায়তাকেও রোধ করতেও সহায়ক হবে। এ দেশের অর্থনীতিতে চা শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ শিল্পের মেরুদন্ড শ্রমিক কর্মচারীদের পক্ষে সরকারকে দাঁড়াতেই হবে। বেসরকারি মালিকদের যথেচ্ছাচারের পরিবর্তে বাগান পরিচালনায় শ্রমিক সমবায়ের গণতান্ত্রিক অংশীদারিত্ব ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকাকে নিশ্চিত করার কাজ সরকার তথা রাষ্ট্রেরই হাতে। তাই সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে।

উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের ইতিহাস পুঁজিবাদী শোষণের এক জীবন্ত জাদুঘর। শ্রমিকের রক্ত-ঘামে ভেজা প্রতিটি চা-পাতা মালিকদের লুটে নেওয়া মুনাফার হিসাব দেয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং ResearchGate-এর গবেষণা—সবেতেই এ সত্য উন্মোচিত হয়। আংশিক সংস্কারের রাস্তায় সে সমস্যা থেকে স্থায়ী মুক্তি নেই। প্রয়োজন by the workers, for the workers-এর অর্থকে উপলব্ধি করে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। শত অপপ্রচার স্বত্বেও উৎপাদনের উপকরণে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তাই আজও প্রাসঙ্গিক। একজন চা-শ্রমিকের জীবনের মূল্য তার উৎপাদিত ‘চা’-র চাইতে কম হবে না। উপলব্ধি করতে হবে মানুষের মত জীবনযাপনের জন্য জরুরী অধিকারের মূল্য তাদেরই শ্রমজাত পণ্যের চাইতে কম বিবেচিত হওয়া কোনও আধুনিক বিষয় না, কখনো না।


প্রকাশ: ২০-অক্টোবর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 20-Oct-25 16:25 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/tea-garden-of-west-bengal-a-report-
Categories: Fact & Figures
Tags: migrant workers, tea garden, workers
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড