আলিগড়ঃ ভালোবাসা, যা ভাগাভাগি মানে না

শৌনক সরকার
“কেউ দেখছে না তো?” এই অনাকাঙ্ক্ষিত ‘চোখ’ই সিনেমার সবচেয়ে নির্মম চরিত্র। ঐ চোখ কিছু দেখে না, কেবল ফিসফিসিয়ে বিচার করে, শাস্তি দেয়।

“যে সমাজ ভালোবাসতে শেখায় না, সে শাস্তি দিতে খুব ভালো জানে।”
এ বাক্যটি হয়তো কোনোভাবেই সিনেমাটিতে নেই, কিন্তু প্রতিটি দৃশ্যে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেন হংসল মেহতা পরিচালিত আলিগড় এ কথাই বলে যায়— শব্দের জোরে নয়, নীরবতার গভীরতায় । এটি শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি আমাদের সমাজ। সংস্কৃতি, শিক্ষা ও নৈতিকতার ওপর আয়না ফেলার প্রচেষ্টা, যেখানে প্রতিবিম্বিত হয় এক নিঃসঙ্গ মানুষের সাহসী প্রতিরোধ। ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি সমাজের বিতৃষ্ণা ও এক নিঃশব্দ বিপ্লবের গাথা এই চলচ্চিত্র। আমরা অনেক কিছুতে অভ্যস্ত - রাজনীতি, ফুটবল, চায়ের আড্ডা এইসব। কিন্তু যখনই এককের ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবিক সম্মান, সমকামীতার কথা ওঠে- আমাদের যাবতীয় নৈতিক কুসংস্কার আজও একরাশ অস্বস্তিকে সামনে টেনে আনে।
সিনেমার মূল চরিত্র ড. শ্রীনিবাস রামচন্দ্র সিরাস, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের মারাঠী ভাষার অধ্যাপক, যিনি রাতে কবিতা পড়েন, একা থাকেন, এবং ভালোবাসেন— একজন পুরুষকে। শেষ কথাটায় আমরা ধাক্কা খাই। ইটের বদলে পাটকেল মেরে সমাজ, রাষ্ট্র, মিডিয়া এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা তাঁকে শাস্তি দেয়। কিন্তু তাঁর ‘অপরাধ’ কী? উত্তর খুব সহজ—তিনি ভালোবেসেছিলেন। আরেকটু কঠিন উচ্চারণে- তিনি আমাদের অনেকের থেকে ‘ভিন্ন’ ছিলেন। সমাজে অনেকেই এমন ‘ভিন্ন’ মানুষদের ভয় পায়।
শহর নামক খাঁচাটি
আলিগড় ছবিতে শহরের উপস্থিতি শুধু ভৌগোলিক নয়— এ এক মানসিক চেতনা রক্তমাংস। শহর এখানে নিষ্ঠুর, রক্ষণশীল, হিংসার প্রতীক। এটা সেই সমাজ যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তকে লুকিয়ে ক্যামেরায় ধরার অধিকার কেউ অনুভব করে, এবং সেই ফুটেজের ভিত্তিতে একজন শিক্ষকের সম্মান ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
এই শহরের দেওয়ালে, করিডোরে, দরজার ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়ায় এক অদৃশ্য আতঙ্ক— “কেউ দেখছে না তো?” এই অনাকাঙ্ক্ষিত ‘চোখ’ই সিনেমার সবচেয়ে নির্মম চরিত্র। ঐ চোখ কিছু দেখে না, কেবল ফিসফিসিয়ে বিচার করে, শাস্তি দেয়।
একটি মানুষ ও অস্তিত্বের ছাপ
মনোজ বাজপেয়ী অভিনীত সিরসা কোনো চরিত্র নন, তিনি নিজেই এক চলমান কবিতা। তাঁর মুখে কোনো কাঁটা নেই, কিন্তু চোখে জমে আছে মহাসাগর। তিনি ধীরে হাঁটেন, ধীরে কথা বলেন, তবু তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন গর্জন। তিনি বলেন, “ভালোবাসা কি কারও অনুমতির অপেক্ষায় থাকবে?”
একটি দৃশ্যে দেখা যায় তিনি একা ঘরে বসে আছেন, একটি পুরনো হিন্দি কবিতার পংক্তি আবৃত্তি করছেন, কাঁচের গ্লাসে ঠোঁট ছুঁইয়ে এক নিঃসঙ্গ স্বরূপে বিলীন হয়ে যাচ্ছেন। এই মুহূর্তে দর্শক শুধু তাঁকে দেখে না— তাঁর হয়ে কাঁদে।
দীপু: বক্তব্যের প্রকাশের বদলে কথা শোনার বন্ধু
রাজকুমার রাও অভিনীত সাংবাদিক দীপু সেবাস্তিয়ান প্রথমদিকে যেন এক সাধারণ রিপোর্টার। সে আসে খবরের খোঁজে, কিন্তু থেকে যায় মানুষের খোঁজে। সে প্রশ্ন করে না, উত্তরের জন্য তাড়া দেয় না—সে কেবল শোনে। আর এই শোনা, এই সহানুভূতিই সিরসাকে খুলে দেয়।
দুই প্রজন্মের মানুষ—একজন সমাজের চাপে থমকে যাওয়া, অন্যজন সমাজ বদলাতে চায়—যখন এক ফ্রেমে আসে, তখন বোঝা যায়, সম্পর্ক রক্তের নয়, বোঝাপড়ার। দীপু এবং সিরাসের সম্পর্ক কোনো নাম পায় না, কোনো পরিণতি নয়—তবে তা দর্শকের হৃদয়ে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিধ্বনি হয়ে থাকে।
সমাজের মুখোশে টান মারার পদক্ষেপ
আলিগড় কেবল এক ব্যক্তির যৌন পরিচয় নিয়েই কথা বলে না।প্রশ্ন তোলে—রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম কি আদৌ মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করে? সিরাসের বিরুদ্ধে কোনও মামলা নেই, কোনো অভিযোগ নেই, অথচ তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্ত মিডিয়ার পর্দায় ছড়িয়ে পড়ে।
রাষ্ট্র এখানে কোনো অস্ত্রধারী রূপে উপস্থিত নয়। বরং তার নীরবতা, ঔদাসীন্য, এবং তথাকথিত “মরালিটির” ছদ্মবেশে নির্মিত বিচারব্যবস্থাই এই ছবির ভয়ঙ্কর বাস্তবতা।
ভালোবাসা : শরীর পেরিয়ে লাল জীবনযন্ত্রের স্বর
একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে সিরসা বলেন, “আমি চাই, কেউ আমার পাশে বসুক। আমি চাই না শরীর, আমি চাই সাহচর্য।” এই সংলাপটি একাই সমাজের মত বদলে দিতে পারে। আমাদের চোখে ভালোবাসা মানেই যৌনতা, ঘনিষ্ঠতা মানেই নিষিদ্ধতা। কিন্তু সিরসা ভালোবাসেন কবিতা পড়তে, রাত্রির বাতাসে কাব্য শুনতে, এবং একজন পুরুষের কাঁধে মাথা রাখতে।
এই ভালোবাসা সমাজ বোঝে না। তাই সে শাস্তি দেয়। তাকে বলা হয় ‘অস্বাভাবিক’, তাকে বলা হয় ‘অসামাজিক’। অথচ এই ভালোবাসা তো চিৎকার করে না, সে তো নীরবতার ভাষা—যা কেবল অনুভব করা যায়। এই চলচ্চিত্র আমাদের মনে সন্দেহ জাগায়, সমাজ আসলে ভালোবাসাকে বোঝে না, সে শুধু তার পূর্বনির্ধারিত বুলি আওড়ে চলে।
চিত্রনাট্যের শিল্প
এই সিনেমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—সংলাপের চেয়ে দৃশ্য বেশি বলে। ধীর লয়, দীর্ঘ নীরবতা, একটি ফ্যানের আওয়াজ, একটি পায়ের শব্দ, কিংবা একটি হেসে ওঠা মুখ—সব মিলিয়ে যেন ছবির প্রতিটি মুহূর্ত একেকটি ছোট কবিতা বা গল্প হয়ে ওঠে।
সিনেমাটোগ্রাফি একেবারে মলিন রঙে মোড়ানো—কোনো উজ্জ্বলতা নেই, যেন এ ছবির রংই হল এক গভীর বিষণ্নতা। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যবহার এতটাই সংযত, যে কোথাও কোনো আবেগ চাপিয়ে দেওয়া হয় না, বরং দর্শককে ভাবার সময় দেওয়া হয়।
অভিনয়: এক জীবন্ত আর্তনাদ
এই সিনেমা মনোজ বাজপেয়ীর কেরিয়ারে এক মাইলফলক। তাঁর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, সংলাপ, চোখের ভাষা—সবই অসামান্য। এমনকি যখন তিনি কিছু বলছেন না, তখনও তাঁর উপস্থিতিই সংলাপ।
যখন তিনি আদালতের বারান্দায় চুপ করে বসে আছেন, অথবা যখন তিনি একা হাঁটছেন করিডোরে—তখন দর্শক বুঝতে পারে, কীভাবে একটি মানুষ ধীরে ধীরে ভিতরে ভিতরে মরে যায়, তবুও মুখে এক ফোঁটা অভিযোগ রাখে না।
একটি মৃত্যু নয়, এক আন্দোলনের জন্ম
সিরাসের মৃত্যু—হত্যা না আত্মহত্যা, সেটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু বাস্তবে, সিরসার মতো হাজারো মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে মরে যাচ্ছেন সমাজের এই নির্মমতার ভিতরে। আলিগড় সেই সব মৃত মানুষের বয়ান।
এই সিনেমা দেখার পর কেউ আর ‘ভালোবাসা’ শব্দটা আগের মতো শুনতে পারবে না। কারণ এখন সে জানে, ভালোবাসার স্বাধীনতা পাওয়াটা অনেক সময় বেঁচে থাকার থেকেও কঠিন।
স্বপ্ন দেখার ইচ্ছে বুকে নিয়ে
স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে গেলেও আলিগড় শেষ হয় না। এটি থেমে থাকে দর্শকের মনে, প্রশ্নে, স্বরে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষের ভালোবাসার অধিকার আপনি কেড়ে নিতে পারেন না।
এই সিনেমা দেখানো এক প্রতিবাদ। এ ছবি শুধু ‘LGBTQA+ rights’ সংক্রান্ত সিনেমা নয়। এ হল সেই সব মানুষের গল্প, যারা একা, যারা চুপচাপ, যারা সমাজের চোখ এড়িয়ে বেঁচে থাকে— তবু ভালোবাসতে চায়। ‘হেমলক সোসাইটি’র সেই আত্মহত্যা করতে চলা মানুষটির মতোই চায়, কেউ তাকে দেখে একটিবার হাসুক।
এই সিনেমার সুর যেন মিলে যায় মৌসুমী ভৌমিকের গানের এক দুলাইনের সঙ্গে-
‘আমি শুনেছি
তোমরা নাকি এখনও স্বপ্ন দেখ,
এখনও গল্প লেখ গান গাও প্রাণ ভরে।
মানুষের বাঁচা মরা এখনও ভাবিয়ে তোলে
তোমাদের ভালবাসা এখনও গোলাপে ফোটে।’
প্রকাশ: ০৭-আগস্ট-২০২৫
শেষ এডিট:: 07-Aug-25 00:14 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/aligarh-the-film
Categories: Fact & Figures
Tags: progressive, progressivemovement
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (171)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (155)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (82)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতি
- ওয়েবডেস্ক
মানুষের উপরেই ভরসা রাখার পথনির্দেশ
- প্রদোষকুমার বাগচী
পুঁজিবাদী উন্নয়নের ভ্রান্ত প্রতিশ্রুতি
- প্রভাত পট্টনায়ক





